হাবীব ইমন
প্রকাশ : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩:৪৭ পিএম
আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩:৫৭ পিএম
চিলেকোঠা ঘরটাতে সময় যেন থমকে আছে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছি। আকাশে মেঘ দৌড়াচ্ছে, রোদ বেরোচ্ছে, আবার মেঘ ঢেকে যাচ্ছে- সবকিছু যেন এক ধীর নর্তকীর মতো দুলছে। চশমার কাচে সূর্যের আলো পড়ছে- মনে হচ্ছে বহুদিনের পুরনো দুপুরের স্মৃতি চোখে ভেসে উঠছেÑ শীতল বাতাসের নরম ছোঁয়া, ভেজা মাটির সুঘ্রাণ, দূরের পাখির কলরব।
আমি নিজেকে প্রশ্ন করি- ‘কেন জানালা সবসময় আমাকে টানে? কী অপেক্ষা করছি আমি? কী হারিয়েছি?’ ঠিক তখনই রূপা আসে। তার হাঁটায় একধরনের স্মৃতির শব্দ- ধীরে ধীরে, যেন ঘরের কাঠের মেঝেতে নরম রিদম বাজে। আমি তাকিয়ে থাকি। ভাবি, ‘আগে কি কোথাও দেখেছি এই দৃশ্য? নাকি কোনো নিঃশব্দ রাতে অনুভব করেছি?’
- ‘আবার জানালার পাশে দাঁড়ানো?’ রূপা হেসে বলে।
- ‘কিছু সময় থাকে, যা কেবল দাঁড়ানোর জন্য- দেখার জন্য নয়।’
রূপা জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে। নীরবতাও যেন কোনো ভাষা- শব্দবিহীন। কিন্তু বোঝাপড়ার গভীরতা ভরা। বাতাসের সঙ্গে মৃদু গন্ধ আসেÑ ছায়ার ভেজা মাটির সুবাস, চায়ের পাতার গন্ধ।
আমরা কোনো স্বাপ্নিক নই। জ্যোৎস্না আর পূর্ণিমার উদযাপনের জন্য চিলেকোঠার এ ঘরটি বেছে নিয়েছি। রেলস্টেশন থেকে বাড়িটি এক ঘণ্টার পথ- একদম নিরিবিলি। আমি চেয়েছি, কোনো অবাঞ্ছিত কান যেন ‘গুলির আওয়াজের কাছাকাছি’ না যায়।
আমি বাঁ-হাতি। কেউ কেউ বলে, বাঁ-হাতিরা সমাজের বামপন্থার প্রতীক- একটু অচল, কিন্তু নিজেদের যুক্তিতে টিকে থাকে এরা। আমরা বাঁ-হাতিরা একটি সংঘ গড়ে তুলি। রূপার সঙ্গে সেখানে পরিচয় হয়েছিল। একজন ডানহাতি মানুষ আমাদের প্রশিক্ষণ দিতেন- চা তোলা, দরজা খোলা, হাত মেলানো পর্যন্ত। এখন আর প্রশিক্ষক আসে না; কর্তৃপক্ষ বলেছে, ‘নিজেদের মতো শিখে নাও।’ আমরা তাই করছি। কিন্তু আমি জানি- বাঁ হাতে ধরতে না পারলে প্রেমের উষ্ণতা ঠিকভাবে মাপা যায় না।
আমার বয়স যখন ষোলো, প্রথমবারের মতো একটি মেয়েকে জড়িয়ে ধরি। ও বলেছিল, ‘তুমি বুঝি বাঁহাতি?’ তারপর আশাহত হয়ে জামা থেকে আমার হাত সরিয়ে দিয়েছিল। সেই স্মৃতিগুলো আজও রয়ে গেছে- বাঁ-হাতির মতোই একপেশে, অসমাপ্ত।
রূপা দুহাতে চায়ের মগ এগিয়ে দেয়। একটায় কম চিনি, অন্যটায় বেশি। আমি জানি, কোনটা কার জন্য।
- ‘তুমি এখনও মিষ্টি পছন্দ করো, ধ্রুব?’
- ‘আমার রুচি বদলায় না… ঠিক যেমন তোমার।’
চা ঠান্ডা হয়ে আসে, কিন্তু নীরবতা উষ্ণ হয়ে ওঠে। জানালার বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে। বাতাসে আর্দ্রতা, আকাশ ধূসর, মেঘের নরম গা ছোঁয়া, আর ঘরের ভেতরে নরম আলো- সমস্ত অনুভূতি যেন একসঙ্গে মিশে গেছে।
- ‘তুমি এখনও কবিতা লেখো?’ রূপা জিজ্ঞেস করে।
- ‘লিখি, তবে এখন রিপোর্ট।’ ‘কবি নিঃস্ব, প্রকাশক নিস্পৃহ’- এখন এমন শিরোনামই চলে।
রূপা হেসে বলে, ‘তুমি বদলাওনি।’
- ‘রোমান্টিকতা না থাকলে মানুষ ভোট দেবে কেন? জানালা খুলে সবাই ভাবে আলো আসবে- শেষে দেখা যায় পাশের বাড়ির টিভির রিফ্লেকশন।’
- ‘তুমি জানালা দিয়ে সমাজতন্ত্র দেখো, আমি দেখি- লিপস্টিকের দাম।’
আমরা দুজনেই হেসে উঠি। হাসির নিচে লুকিয়ে থাকে ক্লান্তি, ব্যর্থ ভালোবাসা, আর জীবনের সূক্ষ্ম পরিহাস- যেখানে মানুষ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু বাইরে তাকায় না।
- ‘আমরা কি কখনও…?’ রূপা বলল। বাক্য অসমাপ্ত।
- ‘না, হয়তো না। কিন্তু হৃদয় তো জানে।’
বৃষ্টি নামে। জানালার বাইরে ঝরছে ধূসর সময়, আকাশ ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে।
- ‘তুমি জানালা ছাড়া থাকতে পারবে?’
- ‘না। জানালা তো শুধু বাইরে নয়, ভেতরেও থাকে- আমাদের ভেতরে।’
- ‘তুমি জানো, এখনকার জানালাগুলো ডাবল গ্লাসের- ঠান্ডা ঢোকে না, আওয়াজও না। মানুষও না।’
- ‘তাহলে আমরা পুরনো জানালা- বৃষ্টি ঢোকে, আলোও ঢোকে।’
বাইরে মেঘ জমছে। ঘরের আলো নরম, দুলে ওঠা।
- ‘রূপা, জানালা বন্ধ করো না। একদিন হয়তো এই জানালা দিয়েই আলো নয়, কেউ কড়া নাড়বে।’
- ‘আর যদি কেউ না আসে?’
- ‘তাহলে আমি নিজেই আসবÑ নতুন চায়ের কাপে, একটুখানি কম চিনি নিয়ে।’
দুজনেই হেসে উঠি। বৃষ্টির শব্দ মিশে যায় হাসির সঙ্গে। ঘরের ভেতর সময় নড়ে ওঠে- যেন জানালার কাচে প্রথম সূর্যের প্রতিফলন।
- ভালোবাসা আসলে জানালা নয়, রূপা… আলো। একটুখানি ফাঁক পেলেই ঢুকে পড়ে।
রূপা হেসে বলে,
- ‘তুমি কি জানো, জানালার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটা কী?’
- ‘কী?’
- ‘এটা বন্ধ করলেও মানুষ ভাবে, বাইরে থেকে কেউ দেখছে!’
বৃষ্টি থেমে যায়। রোদ ঝলমল করে। চিলেকোঠার ঘরে সময় আবার চলতে শুরু করে- একটা পুরনো ঘড়ির টিকটিক শব্দে, একটি নতুন হাসির মধ্যে।