ইকরাম কবীর
প্রকাশ : ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:২০ পিএম
চিত্রকর্ম : সহিদ কাজী
আলব্যের কামুর ‘দ্য স্ট্রেইঞ্জার’ উপন্যাস পড়ার পর ম্যোরসো মানুষটাকে আরও জানার ইচ্ছে এমন প্রবল হয় যে আমি ‘দ্য স্ট্রেইঞ্জার’ প্রায় কুড়িবার পড়ে ফেলি। এই উপন্যাস পড়তে পড়তে সবার মনে যেমন শত প্রশ্নের উদয় হয়, আমারও তেমনটা হয়। একই সঙ্গে আমি ম্যোরসোকে নিয়ে খেলা করতে চাই, তাকে নানা পরিস্থিতিতে কল্পনা করে তাকে বুঝতে চাই, কামু কেন এই চরিত্র সৃষ্টি করলেন তার কূলকিনারা খুঁজতে চাই। এই উপন্যাসের প্রতিটা লাইন আমি যতবার পড়ি, ততবারই আমি নতুন কোনো চিন্তায় ডুবে যাই। এমন চিন্তা থেকেই ম্যোরসো মানুষটাকে নিয়ে নতুন মৌলিক গল্প লেখার বাসনা জাগে। এই উপন্যাসে উল্লেখ নেই এমন অনেক পরিস্থিতি কল্পনা করে অনেকগুলো গল্প লেখাও হয়ে যায় এবং দেশের সাহিত্য সম্পাদকেরা সেগুলো ছেপেও দেন।
আমার এক বন্ধু আছে যে বাস্তব জীবনে ম্যোরসোর মতো করে ভাবে, অনুভব
করে, সচেতন চিত্তে নিজেকে একজন আউটসাইডার মনে করে। মাঝে মাঝে টের পাই যে সে ম্যোরসোকে
নিজের মধ্যে প্রতিস্থাপন করার চেষ্টা করে। আমি বন্ধুর কথাও শুনি, তাকে দেখি, তার জীবনযাপন
নিয়ে ভাবি এবং এদের দুজনকেই আমার নিজের গল্পের চরিত্র হিসেবে গল্পায়নের কল্পনা করি।
আমি জানি যে আমি ওদের মতো নই, আমি একজন পর্যবেক্ষক, আমি চরিত্র তৈরি করি, করতে চাই।
আমার কাছে ম্যোরসোর বিচার ‘দ্য স্ট্রেইঞ্জার’ উপন্যাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য
বিষয় বলে মনে হয়। তার বিচারকাজ চলার সময় আমার ম্যোরসোকে আমাদের মতোই একজন মানুষ মনে
হয়। ম্যোরসো একজন অন্যরকম মানুষ হলেও, ঠিক তখন উকিল, ধর্মযাজক, বিচারক ও সমাজ তাকে
এক সাধারণ অসহায় মানুষের পর্যায়ে নিয়ে আসে। যে অপরাধ সে করেছে সেই কারণে তার বিচার
হয় না। বরং মায়ের মৃত্যুতে না কাঁদা, মায়ের কফিনের পাশে বসে কফি-সিগারেট খাওয়া, মায়ের
মৃত্যুর পরপরই বান্ধবীকে নিয়ে সাগরসৈকতে বেড়াতে যাওয়া এসব আচরণের কারণে মানব আদালতে
তার মৃত্যুদণ্ড হয়।
আমি ম্যোরসোকে এআইয়ের আদালতের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়ে দেখতে চাই
যে প্রযুক্তি-নির্ভর বুদ্ধিমত্তার আদালত কেমন করে তার বিচার করে। এখানেও ম্যোরসো আবিষ্কার
যে প্রযুক্তি তাকে মানুষ হিসেবে গণ্য করছে না।
এই উপন্যাসে প্রধান চরিত্রের মায়ের আবেগ বা মানসিকতা নিয়ে কোনো কিছু
লেখা হয়নি। আমি ম্যোরসোর মায়ের একটা চরিত্র তৈরি করার চেষ্টা করি। মাদাম ম্যোরসোকে
দিয়ে নার্সিং হোমে বসে তার ছেলেকে নিয়ে, তার সময় কাটানো নিয়ে একটা ডায়রি লেখানোর চেষ্টা
করে একটা গল্প লিখি ‘মাদাম ম্যোরসোর ডায়েরী’। এই ডায়রির মাধ্যমে আমি ম্যোরসোর চরিত্র
এই গল্পেরই আরেকজনের চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা করি।
ম্যোরসোর প্রেমিকা মারীকে আমার এই উপন্যাসের সবচেয়ে স্বাভাবিক চরিত্র
বলে মনে হয়। সে ম্যোরসোকে বিয়েও করতে চায়। কিন্তু ম্যোরসো তার ভালোবাসার কোনোই মূল্য
দেয় না। ভালোবাসা, সংসার পাতাÑ তার কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। সে নির্লিপ্ত এক মন
নিয়ে মারীর সঙ্গে মেলামেশা করে। সে যখন জেলে যায়, মারী বুঝতে পারে যে সে যাকে ভালোবাসে
তার মৃত্যু হবে। ম্যোরসোর মৃত্যুদণ্ড হয়। আমি তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে মারীকে কবরস্থানে
এনে একটা মনোলগের মাধ্যমে ম্যোরসোকে দেখার চেষ্টা করি আমার ‘মারীর শোক’ গল্পে।
ম্যোরসোকে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন চরিত্রের চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা
করে আমি আবিষ্কার করি যে আমি কামু যেই ম্যোরসোকে তৈরি করেছেন, আমি সেখান থেকে খুব দূরে
যেতে পারিনি। আমিও সেই নির্লিপ্ত, নির্বিকার ও অস্তিত্ববাদী এক ম্যোরসোকে তৈরি করি
যার কাছে জীবনের কোনো কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এমনকি নিজের বা অন্য কারও মৃত্যুতেও তার
কিছু এসে-যায় না।
এমন এক অবস্থায় আমি ম্যোরসোকে ঢোলগ্রামে নিয়ে আসতে চাই। ঢোলগ্রামকে
আমি আবিষ্কার করেছি এক কাল্পনিক পৃথিবী হিসেবে, এক কাল্পনিক বলয় বা বাক্স হিসেবে, এক
কাল্পনিক বাসস্থান হিসেবে যেখানে মানুষ, প্রাণী ও প্রকৃতির হাসি, কান্না, সুখ, দুঃখ,
আশা, নিরাশা, স্বাধীনতা, পরাধীনতা সবই এক পরাবাস্তব ও জাদু বাস্তবতার মিশেলে পরিবেশন
করতে চাই।
ঢোলগ্রামকে প্রথমে কল্পনা করেছিলাম ঢাকা শহরকে কেন্দ্র করে। ঢাক থেকে
নাম হয়েছিল ঢাকা। ঢাককে আমি ঢোল কল্পনা করে ঢাকার নাম দিয়েছি ঢোলগ্রাম। অনেকগুলো গল্প
লিখেও ফেলি; এগুলোকে আমি ঠিক গল্প মনে করি না, ‘গল্পের কাছাকাছি’ বলে একটা নাম দিয়েছি।
এই ‘গল্পের কাছাকাছি’ গল্পগুলো লিখতে লিখতে আমি আবিষ্কার করি যে ঢোলগ্রাম নিজেই একটা
চরিত্র হয়ে উঠছে এবং স্থান হিসেবে আর ঢাকা শহর বলে মনে হচ্ছে নাÑ এখন ঢোলগ্রামের দিকে
তাকালে মনে হয়, এই স্থানটা যেন নিজের শরীর নিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে বেড়াচ্ছে; তার কাঁধে
ঝুলে আছে পুরনো বাজারের ব্যাগের ভেতর না রকমের গন্ধ, পকেটে আছে পুরনো রসিদের মতো জমে
থাকা স্মৃতি। ঢোলগ্রাম কোনো মানুষ নয়, কিন্তু মানুষের চেয়েও বেশি মানুষের মতো। তারও
অভ্যাস আছে, সকালে আকাশ রোদে উজ্জ্বল হলেই সে নিজের উঠোন ঝাড়ু দেয়, বিকালে একটু নরম
হাওয়া এলে বাড়ির পেছনের কাঁচা রাস্তা ধরে হেঁটে বেড়ায়। তবে সে রাতে ঘুমোয় না; লোকালয়ের
প্রতিটা ঘরের নিঃশব্দ নিঃশ্বাস সে শুনতে পায় সেভাবেই কেটে যায় তার রাত।
ঢোলগ্রামের চোখ নেই, কিন্তু আছে দেখার অদ্ভুত ক্ষমতা। সে দেখে কোন
বাড়িতে গ্যাসের লাইন কেটে গেছে, কোন স্বপ্নকেন্দ্রে আজ নতুন নিয়ম চালু করা হয়েছে,
কোন ছেলেটি সুখের বদলে ভয় নিয়ে ঘুমোতে যাচ্ছে, কোন মেয়েটা আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্যে
আগুনে ঝাঁপ দিচ্ছে, কীভাবে খুনিরা খুন করে হাসতে হাসতে হেঁটে চলে যাচ্ছে। ঢোলগ্রাম
এসব দেখেও কিছু বলে না; তার দায় শুধু দেখা, মনে রাখা, আর সেই স্মৃতি দিয়ে নিঃশব্দে
মানুষের গল্প সাজানোর কাজটা করে যাওয়া।
ঢোলগ্রামের শরীরের ভেতর দিয়ে বাতাস বয়ে গেলে এক ধরনের হালকা কাঁপুনি
বোঝা যায়। সে জানে মানুষ আজ ক্লান্ত। কেউ জীবন বাঁচানোর জন্য দৌড়াচ্ছে, কেউ প্রতিশোধের
গন্ধে পাগল হয়ে যাচ্ছে, কেউ টেলিভিশন দেখে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কীভাবে বাঁচবে। ঢোলগ্রাম
এসব দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে না; সে শুধু নিজের বুকের ভেতরে আরও একটু জায়গা তৈরি করে
রাখে কারণ মানুষ মনে দুঃখ-দুর্দশা বেশি জমে গেলে তার বুকটাই তাদের আশ্রয় হয়ে ওঠে।
সে কখনও কখনও রাগও করে। তখন তার আকাশ একটু নিচে নেমে আসে, বাতাস ঘন
হয়ে যায়, পাখিরা দুই মিনিট নীরব থাকে। কিন্তু সে মানুষের মতো রাগ পুষে রাখে না। ছোট্ট
একটা বাচ্চা যখন মাঠের ধারে ছবি আঁকে, অথবা কোনো বুড়ি মা যখন গাছের পাতায় হাত বুলিয়ে
বলে ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’, তখন ঢোলগ্রামই প্রথম হাসে, আনন্দ পায়। সেই হাসি শব্দহীন, শুধু
গাছের পাতার কাঁপুনিতে তা টের পাওয়া যায়।
সে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে ভালোবাসে না। সে জানে, মানুষই আসল গল্পকার।
তবু মানুষ তা ভুলে গেলে ঢোলগ্রাম তাদের গল্প বুকে ধরে রাখে। কারও ভাঙা
স্বপ্ন, কারও না বলা ভয়, কারও গোপন আশাÑ সব সে নিজের শরীরের ভাঁজে লুকিয়ে রাখে। তাই
ঢোলগ্রামে ঢুকলেই মনে হয় কেউ একজন পেছন থেকে বলছে, ‘এই শুনছো, তোমার গল্প আমি অনেক
শুনেছি।’
ঢোলগ্রাম একাকী স্বত্বা নয়। তার সঙ্গে আছে ছায়া, ধোঁয়া, বৃষ্টি,
স্মৃতি, আর একটুখানি বিদ্রূপ। কারণ সে জানে, মানুষ একই ভুল বারবার না করে বাঁচতে পারে
না। ঢোলগ্রামও বেঁচে থাকে সেই ভুলগুলোর ভেতর, কখনও তীব্র আলো হয়ে, কখনও চুপচাপ অন্ধকার
হয়ে।
এভাবেই আমার ঢোলগ্রাম হয়ে ওঠে একজন কালের সাক্ষী, এক নীরব ইতিহাস,
এক অদৃশ্য গল্পকার, যে লোকালয়ের ভেতরই জন্ম নেয়, মানুষের জীবনের সঙ্গেই হেঁটে বেড়ায়, আর শেষে মানুষের চোখের আড়ালেই
রয়ে যায়। কিন্তু কেউ যদি গভীর রাতে বাতাসের শব্দ একটু মন দিয়ে শোনে, সে বুঝবে যে ঢোলগ্রাম
তখনও তার গল্প বলে চলেছে।
আমি যখন টের পাই যে ঢোলগ্রামের সঙ্গে নিজের
একটা গভীর সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে, তখন ম্যোরসোকে সেই লোকালয়ের এক চরিত্র হিসেবে চিত্রায়িত
করতে মন চায়। তাহলে আমি কামুর ম্যোরসোর চেয়ে অন্যরকম এক ম্যোরসোকে আবিষ্কার করতে পারব।
ম্যোরসোকে এনে আমার সামনে অ্যাটেনশান করে দাঁড় করিয়ে আমার কল্পনার চাকা ঘুরিয়ে দিই।
তাকে ঢোলগ্রামের সব প্রার্থনালয়ে পাঠাই। নাহ; কাজ হচ্ছে না। আমি তাকে কৃষিকাজে নামিয়ে
দেই। একই ফলাফল। আমি তাকে প্রধানমন্ত্রী বা প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে কল্পনা করি। যদি
সে কোনোভাবে নির্লিপ্ত এক উপদেষ্টায় রূপ নেয় তাহলে গল্প আর এগুবে না।
এমন অনেক পরিস্থিতিতে এবং চরিত্রে কল্পনা করার পর আমার মনে পড়ে যে
আমি এক দুষ্টু ক্যাডেটের চরিত্র সৃষ্টি করেছিলাম যে ঢোলগ্রামের সব ক্যাডেট কলেজেই বসবাস
করে। দুষ্টু ক্যাডেট আসলে দুষ্টু নয়, সে এক খারাপ ক্যাডেট। আমি সেই খারাপ ক্যাডেটকে
গ্লোরিফাই করেছি। আমি কী ম্যোরসোকে একটা ক্যাডেট কলেজে ভর্তি করিয়ে দিয়ে দেখতে পারি
যে, সে কেমন ক্যাডেট হয়? ঢোলগ্রামের কয়েকজন সাবেক ক্যাডেটের সঙ্গে কথাও
বললাম, জানতে চাইলাম, ম্যোরসোকে ক্যাডেট চরিত্রে দাঁড় করিয়ে দিলে কী সে ক্যাডেট হতে
পারবে? সবাই জানালেন, না, একজন ক্যাডেটের নিঃসঙ্গ হওয়ার সুযোগ নেই, নির্লিপ্ত হওয়ার
সুযোগ নেই। কিছুটা অস্তিত্ববাদী হলেও হতে পারে, তবে তা সীমিত সময়ের জন্যে। একজন ক্যাডেটকে
তার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতেই হয়। আমার কাছেও তাই-ই মনে হয়, আমি কখনোই ম্যোরসোকে একজন ক্যাডেট
চরিত্রে দেখাতে পারব না।
হ্যাঁ, গল্পটা এখানেই, চ্যালেঞ্জটা এখানেই। আমাদের যখন মনেই হয় না
যে, আলব্যের কামুর ম্যোরসো আলজিয়ার্স থেকে এসে ঢোলগ্রামের এক ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হয়ে
এক নির্লিপ্ত ক্যাডেট জীবনযাপন করতে পারে, তাহলে আমার গল্পটা সেখানেই।
তাহলে, কল্পনা করা যাক সেই গল্পটা, সেই ক্যাডেট ম্যোরসোকে…