× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বাংলাদেশের ছোটগল্পের পর্বান্তর ও প্রবণতা

ফারুক সুমন

প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩:০৪ পিএম

বাংলাদেশের ছোটগল্পের পর্বান্তর ও প্রবণতা

ছোটগল্প আধুনিক সাহিত্যধারায় জনপ্রিয় একটি শাখা। এটি আকারে ক্ষুদ্র হলেও প্রভাব, তীক্ষ্ণতা ও অন্তর্নিহিত শক্তিতে কখনোবা উপন্যাসের সীমাকেও অতিক্রম করেছে। সাহিত্যিক ঐতিহ্যের ধারায় পূর্ববাংলা বা বাংলাদেশে যে নিজস্ব ছোটগল্প-ধারা নির্মাণ হয়েছে, তার বীজ উপ্ত রয়েছে মূলত দেশভাগ-পর্বে। পঞ্চাশের দশক থেকে বর্তমান পর্যন্ত এই শিল্প শাখা বহুবার ভাষা, বিষয় ও দৃষ্টিভঙ্গিগত দিক থেকে নিত্যনতুন রূপে উপস্থাপিত হয়েছে। কখনও প্রাত্যহিক জীবন, কখনও রাজনৈতিক উত্তাল সময়, কখনও ব্যক্তির অন্তর্গত সংকট, আবার কখনও প্রযুক্তির বদলে যাওয়া পৃথিবীÑ সবকিছু মিলিয়ে বাংলা ছোটগল্প ধীরে ধীরে এক সমৃদ্ধ, বহুতল ও কণ্ঠসমৃদ্ধ শিল্পমাধ্যমে পরিণত হয়েছে। এই প্রবন্ধে সেই দীর্ঘ যাত্রাপথকে সংক্ষেপে বিশ্লেষণ করার প্রয়াস পাব। 

শুরুতেই বলে নেওয়া ভালো, বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে প্রতিটি প্রজন্মের বিকাশ সাধারণত পরবর্তী দশকে পরিপূর্ণতা পায়। পঞ্চাশের লেখকরা স্বনামধন্য হন স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে, ষাটের প্রজন্ম উজ্জ্বল হয় আশির দশকে, আর সত্তরের গল্পকাররা নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেন নব্বইয়ে। আশির প্রজন্ম প্রথম কিংবা দ্বিতীয় দশকে এসে এখনও সদর্পে লিখে যাচ্ছেন। আর যারা নতুন সহস্রাব্দে লেখালেখিতে এসেছেন, এখনও চল্লিশের কোঠায় থাকা সেই প্রজন্মকে বিচার করার মতো সময় এখনও পুরোপুরি আসেনি। এভাবে দশকওয়ারি আলোচনায় লেখকের নাম কখনোবা এক দশক আগে-পরে উচ্চারিত হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

এবারে মূল আলোচনায় যাওয়া যাক। বাংলাদেশ তখনও পূর্ব পাকিস্তান। এই সময় ছোটগল্পে জাতিগত পরিচয়, ভাষা আন্দোলন, শোষণ-বঞ্চনার অভিজ্ঞতা এবং গ্রামীণ জীবনের সংঘাত বিশেষভাবে উঠে আসে। ইব্রাহীম খাঁ, মাহবুব-উল আলম, আবুল ফজল, আবু জাফর শামসুদ্দীন, শওকত ওসমান, সরদার জয়নউদ্দীন, আবদুল হক, শাহেদ আলী, জহির রায়হান, রণেশ দাশগুপ্ত প্রমুখ লেখক সাধারণ মানুষের জীবন-সংগ্রামকে নতুন শিল্পরীতিতে উপস্থাপন করেন।

দেশভাগের পর পূর্ববাংলার সমাজ ছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ। রাষ্ট্রভাষা প্রশ্ন, শরণার্থীর ঢল ও নতুন রাষ্ট্রের পরিচয়-সংকট ইত্যাদি কারণে মানুষের চেতনা ছিল আলোড়িত। এই বাস্তবতা ছোটগল্পে প্রথম যে প্রজন্ম শক্তভাবে নিয়ে আসে, তারা হলো শহীদুল্লা কায়সার, শওকত ওসমান, আবু ইসহাক প্রমুখ। তাদের গল্পে দেখা যায়, গ্রামীণ জীবনের দুঃখ-দুর্দশা, নিপীড়ন, জমিদারি-উত্তর সমাজব্যবস্থার রূপান্তর, রাজনৈতিক চেতনা এবং ভাষাগত আত্মপরিচয় সংকট। পঞ্চাশের দশকের গল্পকলায় বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল বাস্তববাদ। তখন চরিত্র যেমন ছিল বাস্তব, তেমনই গল্পের ভাষা ছিল সরল, প্রাঞ্জল, কখনও কঠোর। এই সময় গল্প মূলত সমাজ-রাজনীতিকে কেন্দ্র করে লেখা। মানুষের দুঃসহ জীবনের দলিল হিসেবেই ছোটগল্প প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল। এই দশক-পরবর্তী গল্পচর্চার ভিত্তি স্থাপন করেছে।

ষাটের দশকে বাঙালির জাতীয়তাবোধ জোরালো হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক শোষণ, সাংস্কৃতিক দমননীতি ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা গল্পে নতুনভাবে প্রতিফলিত হয়। এই সময়ে যারা আত্মপ্রকাশ করেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু নামÑ লায়লা সামাদ, রাবেয়া খাতুন, শহীদ আখন্দ, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, আবুবকর সিদ্দিক, শওকত আলী, মাহমুদুল হক, রাহাত খান, রিজিয়া রহমান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আহমদ ছফা, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, বুলবন ওসমান, সেলিনা হোসেন, হাসনাত আবদুল হাই প্রমুখ। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লেখা গল্পের পরম্পরাকে ধারণ করে লিখেছেন। এই দশকের ছোটগল্পে মনস্তত্ত্ব, রাজনৈতিক চেতনা, পরীক্ষামূলক বয়ান এবং ভাষার নতুন প্রয়োগসহ নানাবিধ কারণে স্মরণীয়। গল্পের আখ্যান ও চরিত্র আরও ব্যক্তিনির্ভর, গভীর ও দার্শনিক হয়ে উঠতে শুরু করে।

ষাটের দশকে বাংলা গল্পে দেখা যায় কাঠামোগত পরিবর্তন। ভাষায় রূপক, প্রতীক, মানসিক জটিলতাÑ এসব যুক্ত হয়ে গল্পকে আরও ঘন করে তোলে। জহির রায়হান, আনোয়ার পাশা, হাসান আজিজুল হক গল্পে স্বতন্ত্র দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বিশেষত হাসান আজিজুল হকের গল্পে দেখা যায় গভীর মানসিক অনুসন্ধান। মানবিক সম্পর্কের অগোচর দিক, প্রেমের জটিলতা, ব্যক্তির নিঃসঙ্গতা, গ্রামীণ সমাজের নির্দয়তার সঙ্গে মানুষের অন্তর্গত ব্যথাকে হক এক অনন্য ভাষায় উপস্থাপন করেন। গল্প এখন কেবল ঘটনাপ্রবাহ নয়; এটি চরিত্রের মনের গভীরে আলো ফেলার উপায় হয়ে ওঠে।

ষাটের শেষ থেকে সত্তরের শুরুÑ এই সময়-পর্বে বাঙালির ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধ ছোটগল্পে বিস্ফোরণের মতো উঠে আসে। বাংলাদেশের সাহিত্য-ইতিহাসে সত্তরের দশক এক সংকটময় অথচ সৃজনশীল সময়। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা, নতুন রাষ্ট্রগঠনের উত্তাল বাস্তবতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক টানাপড়েন এবং সামাজিক রূপান্তর মুখ্য হয়ে ওঠে। অবধারিতভাবে লেখকদের মনোভূমি হয়ে ওঠে বৈপরীত্যে ভরপুর। এই জটিল বাস্তবতা সরাসরি প্রভাব ফেলে ছোটগল্পের ধারায়। ফলে সত্তরের দশকের ছোটগল্প হয়ে ওঠে একদিকে বাস্তবমুখী, অন্যদিকে গভীর মানবিক বোধসম্পন্ন।

সত্তরের দশকের গল্পকাররা সবচেয়ে বেশি নির্ভর করেছেন যুদ্ধের রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা, মুক্তিযোদ্ধার বেদনাভরা জীবন, শরণার্থী শিবিরের দুঃসহ সময়, পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা এবং স্বাধীনতার পর হতাশাজনক রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর। যুদ্ধক্ষেত্রের ট্র্যাজেডি, নারী নির্যাতন ও যুদ্ধকালীন লাঞ্ছনা, দেশত্যাগ ও বাস্তুচ্যুতির অভিজ্ঞতা, স্বাধীনতার স্বপ্নভঙ্গসহ ইত্যাদি বিষয় গল্পকে দিয়েছে তীক্ষ্ণ বাস্তবতা ও আবেগঘন গভীরতা।

স্বাধীনতার-পরবর্তী বছরগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সন্ত্রাস, খাদ্য সংকট ও দুর্নীতির কারণে সমাজে হতাশা ছড়িয়ে পড়ে। সত্তরের দশকের গল্পকাররা এ বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাননি। ফলে ছোটগল্পে উঠে আসে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর দুর্নীতি, নতুন অভিজাত শ্রেণির উত্থান, নিম্নবিত্তের সংগ্রাম, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, মূল্যবোধের সংকট। গল্পগুলোতে দেশ গঠনের ব্যর্থতা ও মানুষের ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের বিষয়টি তীব্রভাবে ফুটে ওঠে।

সত্তরের দশকের ভাষা আগের দশকের তুলনায় অনেক বেশি সংক্ষিপ্ত, তীক্ষ্ণ ও বাস্তবমুখী। গল্পকাররা অতিরিক্ত রোমান্টিসিজম, অলংকার প্রধান ভাষা ইত্যাদি বর্জন করেন। তারা কথ্যভাষার ব্যবহার ও সংলাপনির্ভরতার মাধ্যমে দৃশ্যমান চিত্রকল্প তৈরি করেন। এই ভাষাশৈলী গল্পকে করে তুলেছিল জীবন্ত ও বাস্তবসম্মত। এ দশকের গল্পকাররা সমাজের বহুমাত্রিক চরিত্র তুলে ধরতে সচেষ্ট ছিলেন। বিশেষ করে যুদ্ধাহত মানুষ, বিধবা ও নির্যাতিত নারী, গেরিলা ও মুক্তিযোদ্ধা, শহুরে নিম্নবিত্ত, রিকশাওয়ালা, মজুর, বেকার যুবক, রাজনৈতিক কর্মী ও চরম দরিদ্র গ্রামীণ মানুষ চরিত্রগুলো হয়ে ওঠে বাস্তব জীবনের প্রতিচিত্র। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের গল্পকে মৌলিকভাবে পাল্টে দেয়। জাতির জন্মযন্ত্রণা, মানসিক ক্ষত, আত্মত্যাগ ও নৃশংসতার দগদগে অভিজ্ঞতা গল্পে উঠে আসে নতুন বলিষ্ঠতায়। এই দশকে অনেকেই গল্পলেখায় সক্রিয় ছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের নামÑ আহমদ ছফা, সাযযাদ কাদির, হরিপদ দত্ত, কায়েস আহমেদ, হ‍ুমায়ূন আহমেদ, শান্তনু কায়সার, মুস্তাফা পান্না, ইসহাক খান, ভাস্কর চৌধুরী, সুশান্ত মজুমদার, ইমদাদুল হক মিলন, আহমদ বশীর, ইসহাক খান, আহমদ মুসা, মঞ্জু সরকার, মঈনুল আহসান সাবের। হ‍ুমায়ূন আহমেদের গল্পে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গ চমৎকারভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। এ ছাড়া তার গল্পে দেখা যায়, নিখাদ মানবিকতা ও মৃদু হাস্যরস; অন্যদিকে ইমদাদুল হক মিলনের গল্পে উঠে আসে মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত জীবনের দুঃসহ বাস্তবতা।

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতায় সাধারণ মানুষ হয়ে ওঠে গল্পের নায়ক। যুদ্ধের স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জন, অসহায়ত্ব ও পুনর্গঠনের আকাঙ্ক্ষাÑ সব মিলিয়ে গল্পে তৈরি হয় মানবিকতার এক গভীর বৃত্ত। গল্পের ভাষাও হয় আরও সংহত, বেশি প্রতিরোধী, রাজনৈতিকভাবে সজাগ। সত্তরের দশকে অনেক লেখক প্রচলিত গল্পরীতিকে ভেঙে নতুন আঙ্গিকে গল্প লিখেছেন। যেমনÑ ভাঙা প্লট, সময়ের অরৈখিক ব্যবহার, মনোলগ ও অন্তর্গত কথন, খোলা সমাপ্তি, রূপক ও প্রতীকী বয়ান, এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছোটগল্পকে দেয় আধুনিকতার স্পর্শ। সাযযাদ কাদির, হ‍ুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, হরিপদ দত্ত, কায়েস আহমেদ, মঈনুল আহসান সাবের, মঞ্জু সরকারসহ অনেকে যুদ্ধ, রাষ্ট্রগঠন, উদ্বাস্তু সংকট ও মানবিক ক্ষতের বর্ণনা দেন। 

বাংলাদেশের সাহিত্য ইতিহাসে আশির দশক একটি বিশেষ পরিবর্তনের সময়। সত্তরের দশক যেখানে ছিল যুদ্ধ, রাজনীতি ও সামাজিক অস্থিরতার গভীর প্রভাবমণ্ডিত, আশির দশকে এসে গল্পকাররা মনোযোগ দেন মানুষের ভেতরের অস্থিরতা, ব্যক্তিগত সত্তা, সমাজ-সংস্কৃতির পরিবর্তন এবং নব্য-মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপড়েনে। এ দশকে সাহিত্যচর্চায় একটি স্পষ্ট ‘অভ্যন্তরমুখিতা’ এবং ‘আধুনিকতার সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গি’ তৈরি হয়।

আশির দশক ছিল সামরিক শাসনের যুগ। রাজনৈতিক স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ, মতপ্রকাশের বাধা, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের চাপের ফলে লেখকদের মনে তৈরি হয় এক ধরনের দমবন্ধ বাস্তবতা। এ বাস্তবতা গল্পে প্রকাশ পায়। ভয়, নিপীড়ন ও নজরদারির প্রতীকী চিত্রে স্বাধীনতাহীন মানুষের মধ্যে মানসিক সংকট তৈরি হয়। গল্পকাররা অনেক সময় সরাসরি রাজনৈতিক কথা না বলে প্রতীকের মাধ্যমে সূক্ষ্মভাবে বিষয়টি ফুটিয়ে তুলেছেন। এ দশকের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রবণতা ছিল অন্তর্মুখিতা। গল্পে দেখা যায়Ñ ব্যক্তির মানসিক ক্লান্তি, আত্মপরিচয়ের সংকট, অস্থিরতা, বিষণ্নতা ও নৈরাশ্য, একাকিত্ব, বিচ্ছিন্নতা, সম্পর্কের ভাঙন। এই গল্পগুলোতে বর্ণনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে মানুষের মনের ভেতরে চলমান সংগ্রাম।

আশির দশকে শহর দ্রুত প্রসারিত হয়, মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবনযাপন বদলে যায়। এই পরিবর্তন গল্পে প্রবলভাবে উঠে আসেÑ চাকরি ও আয় অনিশ্চয়তা, অতিরিক্ত ভাড়া বাড়ির জীবন, ভোগবাদী আকাঙ্ক্ষা, দাম্পত্যে দ্বন্দ্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, সম্পর্কের জটিলতা শহুরে জীবনের অস্থিরতা ও মানসিক চাপ গল্পে নতুন মাত্রা যোগ করে। গল্পগুলোতে বাস্তবতা থাকলেও সেটি কেবল বাহ্যিক নয়, অভ্যন্তরীণ চিন্তার বাস্তবতা। এটি ছোটগল্পকে দেয় দার্শনিকতা, মানসিক বিশ্লেষণ, অস্তিত্ববাদী ভাবনা ও জীবনের অর্থহীনতার সূক্ষ্ম আভাস। এই প্রবণতা আশির দশকের গল্পকে ভিন্ন সৌন্দর্য দেয়। এই দশকেও অগ্রজ গল্পকারদের পাশাপাশি নবীন গল্পকারদের আবির্ভাব ঘটে। এদের লেখা শহরের মধ্যবিত্ত মানসিকতা, আধুনিক গল্প নির্মাণ এবং মনস্তাত্ত্বিক গভীরতার নতুন ধারা তৈরি করে।

সংক্ষেপে আশির দশকের ছোটগল্পের বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলো হলোÑ গল্পের কেন্দ্রবিন্দু ব্যক্তি-মানুষ, তার মানসিক সংকট। রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও অস্বস্তির প্রতীকী বয়ান। মধ্যবিত্ত জীবনের ক্লান্তি, নগরায়ণের চাপ। নারীর আত্মপরিচয়ের লড়াই এবং নারীবাদী ভাষ্য। আশির দশক থেকে ছোটগল্পে শুরু হয় বৈচিত্র্যের বিস্তার। গ্রাম-নগর-উপশহরের বিরোধ, সামাজিক পরিবর্তন, একাকিত্ব, প্রেম, ভাঙাগড়া সম্পর্কÑ এসব বিষয় গল্পে সুস্পষ্ট হয়। এই দশকে সক্রিয় গল্পকারদের মধ্যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আবু জাফর শামসুদ্দীন, শহীদুল জহির, নাসরীন জাহান, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, বিশ্বজিৎ চৌধুরী, আনিসুল হক, মশিউল আলম, সেলিম মোরশেদ, ঝর্না রহমান, মামুন হোসাইন, ওয়াসি আহমেদ, শাহাদুজ্জামান প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। তারা গল্পকে নতুন ভাষা, বয়ান ও কৌশলে সমৃদ্ধ করেন। বিশেষত শহীদুল জহির ছোটগল্পে এমন এক মায়াবাস্তব ও রূপকধর্মী ভাষা তৈরি করেন, যা বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্রধারা সৃষ্টি করে। এ সময় গল্পে দেখা যায় উত্তরাধুনিক প্রবণতা। যেমন : খণ্ডিত বয়ান, সময়-স্থান ভেঙে ফেলা, অপ্রচলিত চরিত্র নির্মাণ ও পাঠককে গল্প তৈরির অংশীদার করে তোলা।

বাংলাদেশের ছোটগল্পের ইতিহাসে নব্বই দশক একটি বহুমাত্রিক ও রূপান্তরময় সময়। আশির দশকের রাজনৈতিক আলোড়ন, সমাজে দ্রুত পরিবর্তন, বিশ্বায়নের ঢেউ, গণমাধ্যমের বিস্তার এবং শহুরে মধ্যবিত্তের জীবনযাপনের সংকট এই দশকের ছোটগল্পে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নব্বই দশকের গল্পকাররা পূর্ববর্তী প্রজন্মের ধারা অনুসরণ করলেও কেবল অনুকরণে থেমে থাকেননি; বরং ভাষা, বিন্যাস, চরিত্র, থিম ও বাস্তবতা আহরণের ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছেন।

নব্বইয়ের গোড়ায় সামরিক শাসনের পতন ও গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন সমাজে বড় ধরনের আলোড়ন তৈরি করে। এ পরিবর্তনের ঢেউ ছোটগল্পেও ছাপ ফেলে। অনেক লেখক রাজনৈতিক সহিংসতা, দলীয় বিভাজন, ছাত্ররাজনীতি, শহুরে বুদ্ধিজীবী সমাজের হতাশার বিষয়কে গল্পে তুলে ধরেন। গল্পগুলোতে রাজনৈতিক বাস্তবতা সরাসরি উপস্থিত না থাকলেও তার অভিঘাত চরিত্রদের জীবনে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও মানসিক ক্লান্তি অনেকটা পরোক্ষ প্রতীকের ভাষায় গল্পে প্রকাশ পায়।

নব্বই দশকের গল্পের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো নগর-মনস্কতা। ঢাকা ঘিরে গড়ে ওঠা দ্রুত নগরায়ণ মধ্যবিত্ত জীবনে যেমন নতুন সুযোগ এনেছিল, তেমনি সৃষ্টি করেছিল বিচ্ছিন্নতা, দাম্পত্য-বৈকল্য, চাকরির অনিশ্চয়তা, আত্মপরিচয়ের সংকট। গল্পকাররা শহুরে মানুষের ব্যস্ততা, আর্থিক চাপ, বস্তুবাদী আকাঙ্ক্ষা, একাকিত্ব, প্রেমের জটিলতা এবং সম্পর্কের ভাঙাচোরা অবস্থা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তোলেন। গল্পের ভাষায় একধরনের সংযমী কিন্তু আধুনিক ঢং তৈরি করেন। সংলাপ কম, বর্ণনা ঘন এবং ভেতরের মনস্তত্ত্বভিত্তিক বয়ান বেশি। একই সঙ্গে আখ্যান কাঠামোয় কিছু পরীক্ষামূলক ঢং দেখা যায়। 

যদিও নগরজীবন প্রাধান্য পায়, তবে গ্রামীণ বাস্তবতাও নতুন দৃষ্টিকোণে পুনর্নির্মিত হয়। গ্রাম এখন আর কেবল লোকজ বা রোমান্টিক পরিবেশ নয়; বরং উন্নয়ন রাজনীতি, দারিদ্র্য, ভূমির দ্বন্দ্ব, ধর্মীয় রক্ষণশীলতা এবং সমাজ-সংস্কারের প্রশ্নগুলো গ্রামকে নতুন আলোয় দেখা শুরু হয়। গ্রাম ও শহরের দ্বন্দ্বও গল্পে প্রভাব ফেলে। নব্বই দশকের গল্পে নারীর আত্মপরিচয়, সামাজিক অবস্থান, পারিবারিক নিপীড়ন, প্রেম-বিয়ে-সম্পর্কে দ্বন্দ্ব এবং কর্মজীবী নারীর সংগ্রাম প্রসঙ্গ স্পষ্টভাবে উঠে আসে। আগের দশকেও নারীর অনুভূতি ছিল, কিন্তু নব্বইয়ের গল্পে নারীর নিজস্ব কণ্ঠ আরও শক্তিশালী হয়। পিতৃতান্ত্রিক সমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতা দেখা যায়। নারী স্বাধীনতা, যৌন স্বায়ত্তশাসন, মানসিক নিপীড়নÑ এসব নতুন মাত্রা যোগ করে।

এই দশকে অনেক স্বনামধন্য লেখক ছোটগল্পকে সমৃদ্ধ করেন। অনেকে আশির দশক থেকে লিখলেও নব্বই দশকে এসে তাদের লেখার পূর্ণতা ও স্বকীয়তা প্রকাশ পায়। এ সময়ে বিশিষ্ট গল্পকারদের মধ্যে রয়েছেন জাকির তালুকদার, মাসুদা ভাট্টি, শাহনাজ মুন্নী, আকমল হোসেন নিপু, অদিতি ফাল্গুনী, কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, পাপড়ি রহমান, প্রশান্ত মৃধা, আহমাদ মোস্তফা কামাল, মনি হায়দার, মশিউল আলম, মহীবুল আজিজ, রবিউল করিম, মাহবুব মোর্শেদ, রাখাল রাহা, রায়হান রাইন, রাজীব নূর, শাহীন আখতারসহ অনেকে। 

নব্বই দশকের অব্যবহিত পরে শূন্য দশক ও দ্বিতীয় দশকে লেখা গল্প নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই সময়-পর্বে লেখা ছোটগল্পের প্রবণতা সম্পর্কে এখনই সুনিশ্চিত হয়ে বলা না গেলেও গল্পের আঙ্গিক ও বিষয় নির্মাণে গল্পকারদের সচেতন মনোভঙ্গি লক্ষণীয়। শূন্য দশক থেকে দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত সময়টি ধারাবাহিক রূপান্তর ও নন্দনতাত্ত্বিক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। সাহিত্য সমাজ-সংস্কৃতি, প্রযুক্তি ও পাঠকচেতনার পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে পুনঃসঙ্গায়িত করে; এ সত্য এই সময়ের ছোটগল্পে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। শূন্য দশকের শুরু থেকেই গল্পকারদের মনোযোগ সরতে থাকে বহির্বিশ্বের রাজনৈতিক-সামাজিক অভিঘাত থেকে ব্যক্তিক অভিজ্ঞতার দিকে, আর দ্বিতীয় দশকে এসে সেই প্রবণতা একটি সুস্পষ্ট রূপ ধারণ করে।

বাংলাদেশের ছোটগল্প দীর্ঘদিন ধরেই গণমানুষের অভিজ্ঞতা, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত, স্বাধীনতা-উত্তর সংকট এবং জাতীয় ঘটনাপ্রবাহকে মুখ্য বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছে। কিন্তু শূন্য দশকে এসে এই ধারা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সংবাদমাধ্যমের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তারের ফলে সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনার অবিলম্বে জানাশোনা সহজ হয়ে ওঠে। ফলে এ ধরনের ঘটনার সাহিত্যিক পুনর্নির্মাণ পাঠকের কাছে আকর্ষণ হারাতে থাকে। সাহিত্য যে আংশিকভাবে সংবাদ পরিবেশনের ভূমিকা পালন করত, আধুনিক মিডিয়া-ব্যবস্থায় সেই প্রয়োজন আর ততটা জরুরি নয়। এর ফলে গল্পকারদের মনোযোগ স্থানান্তর ঘটে ব্যক্তিক সংকট, মানসিক টানাপড়েন, বিচ্ছিন্নতা ও নৈঃশব্দ্যের দিকে।

শূন্য দশক থেকে দ্বিতীয় দশকের গল্পের ভাষাপ্রয়োগে একটা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়। ভাষা ক্রমে অলংকারমুক্ত, সংক্ষিপ্ত, সরল ও সরাসরি হয়ে ওঠে। এটি মূলত পাঠকের দ্রুততার সঙ্গে সংগতিপূর্ণÑ ডিজিটাল যুগের পাঠ আচরণ ভাষাকে সংক্ষেপিত করেছে। এ ছাড়া বিশ্বসাহিত্যের অনুবাদ-প্রবাহ, ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার ও অনলাইন পড়ার সংস্কৃতি গল্পকারদের দৃষ্টিভঙ্গিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ফলে আধুনিক গল্পে ভাষা ও গঠনে আন্তর্জাতিক প্রবণতার প্রভাব স্পষ্ট। 

এই সময়ের গল্পে আত্মপ্রকাশ করে সমাজের কাঠামোগত রূপান্তর। পুঁজিবাদের বিকাশ, পেশাভিত্তিক জীবনের প্রতিযোগিতা, গ্রাম থেকে শহরমুখী জোয়ার এবং যৌথ পরিবারের পতনের ফলে ব্যক্তিজীবনে যে বিচ্ছিন্নতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা গল্পকারদের রচনায় প্রধান প্রসঙ্গ হয়ে ওঠে। অতীতের মতো সামষ্টিক চেতনানির্ভর গল্প আর প্রধান নয়; বরং ব্যক্তি একক সত্তা, তার ভয়, একাকিত্ব, সম্পর্কের ভাঙন ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা গল্পের অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। এর ফলে ‘সমষ্টির গল্প’ থেকে ‘ব্যক্তির গল্প’-এ একটি নির্দিষ্ট স্থানান্তর লক্ষ করা যায়। দ্বিতীয় দশকে এসে তরুণ গল্পকারদের অনেকেই ডিজিটাল প্লাটফর্ম, সাহিত্য পত্রিকা ও অনলাইন ম্যাগাজিনে নিয়মিত লেখার মাধ্যমে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রজন্ম বিষয় নির্বাচনে সাহসী, ভাষায় সংযত এবং চিন্তায় বহুমাত্রিক। প্রযুক্তি, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, মানসিক স্বাস্থ্য, যৌন-রাজনীতি, নগরজীবন ও নান্দনিক সংকটÑ এসব বিষয় নতুনভাবে গল্পে স্থান পায়, যা পূর্ববর্তী দশকের প্রবণতা থেকে স্পষ্টতই আলাদা।

শূন্য দশক থেকে দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত বাংলাদেশের ছোটগল্পে যে রূপান্তর ঘটে, তা কেবল সাহিত্যিক ধারা পরিবর্তনের ঘটনাই নয়; এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রতিফলন। এই সময়ের গল্পকাররা ব্যক্তি ও সমাজের জটিল সম্পর্ককে আধুনিক নন্দনতত্ত্বের আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন। গল্পের ভাষা, গঠন, বিষয়Ñ সবকিছুই সমসাময়িক মানব-অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুগোপযোগী হয়ে উঠেছে। সমষ্টিক থেকে ব্যক্তিক, অলংকারময়তা থেকে সাদামাটা, স্থির রূপ থেকে বহুরূপী কাঠামোÑ এসব মিলিয়ে এই দুই দশক ছোটগল্পের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় রচনা করেছে।

সর্বোপরি বলা যায়, পঞ্চাশের দশকে ছোটগল্প যেখানে ছিল রাষ্ট্র-সমাজ-মানুষের সংগ্রামের এক প্রামাণ্য দলিল, আজ তা হয়ে উঠেছে বহু বিচিত্র অভিজ্ঞতার সৃজনশীল ভুবন। প্রতিটি দশকে গল্প নতুন ভাষা, নতুন দৃষ্টিকোণ এবং নতুন বয়ান পেয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে। বাংলাদেশের ছোটগল্প তাই শুধু সাহিত্যধারা নয়; এটি এদেশের মানুষের ইতিহাস, চিন্তা, দুঃখ, স্বপ্ন, সংগ্রামের এক অনবদ্য নথি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা