× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বাঁক বদলের রেখায় সমকালীন ছোটগল্প

সৈকত আরেফিন

প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩:০১ পিএম

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৫:১৯ পিএম

বাঁক বদলের রেখায় সমকালীন ছোটগল্প

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস একসময় প্রশ্ন তুলেছিলেন বাংলা ছোটগল্প কি মরে যাচ্ছে? অনেকের ধারণা, এই প্রশ্ন তুলে ইলিয়াস মূলত কোনো বিশেষ সময়ের সাহিত্যকে অস্বীকার বা তার ক্ষয় স্পষ্ট করতে চেয়েছিলেন। তবে আমার মনে হয়, ছোটগল্পের অন্তর্গত সৃষ্টিশক্তি, প্রাসঙ্গিকতা ও নন্দনতত্ত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখানোর উদ্দেশ্যটিই তার প্রশ্নের অন্তর্লীনে লুকিয়ে ছিল। এই প্রশ্ন উত্থাপনের অনেক বছর পরে, আজকের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বলা যায়, বাংলা ছোটগল্প মরে যায়নি। বরং তা নতুন রূপ, নতুন ভাষা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আরও জটিল, আরও বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে। ছোটগল্প এখন কেবল ঘটনার অনুবাদ নয়Ñ মানুষের অভিজ্ঞতা, সময়ের রাজনীতি, ব্যক্তিমানস, স্মৃতি, প্রযুক্তি-প্রভাবিত জীবনযাপন, শহর-গ্রামের দ্বন্দ্ব, এমনকি ভাষাপরীক্ষার এক গতিশীল ক্ষেত্র। যে-প্রশ্ন একসময় সংকট নির্দেশ করেছিল, বলা যায়, আজ তা পরিণত হয়েছে সৃষ্টিশীলতার নতুন সম্ভাবনা পরিমাপের মানদণ্ডে। সমকালীন গল্পকাররা ক্রমাগত প্রমাণ করে চলেছেনÑ বাংলা ছোটগল্প মরে যায়নি। জীবনের নতুনতম স্পন্দন আর নান্দনিক অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে তা আরও জীবন্ত, আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।

এই নতুন আবহে গল্পকাররা কেবল বাস্তবতার প্রতিবেদন রচনা করছেন না; তারা বাস্তবের ভাঙাচোরা আয়নাটিকে পুনর্গঠন করছেন, কখনও বিকৃত, কখনও বিস্তৃত, আবার কখনও সেটিকে ভেঙে সম্পূর্ণ নতুন ভাষা, নতুন দৃষ্টিকোণ ও নতুন নন্দনতত্ত্বের জন্ম দিচ্ছেন। ফলে একুশ শতকের বাংলা ছোটগল্প আর পূর্বশতাব্দীর রৈখিক ধারার মধ্যে আর সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরিণত হয়েছে এক নিরীক্ষাগারেÑ গল্প, ভাষা, গঠন, দৃশ্য এবং শব্দের মিশেলে তৈরি এক জটিল ও প্রাণবান সাহিত্যরূপে। 

এই সময়ের গল্পে যেমন রয়েছে নগরের দৃশ্যগত বিচ্ছিন্নতা, যান্ত্রিক জীবনের শূন্যতা, দারিদ্র্য, যুদ্ধ ও রাজনীতির অন্ধকার স্রোত; তেমনি উপস্থিত আছে পরাবাস্তব ও জাদুবাস্তবের বিস্ময়, দর্শনচিন্তার সূক্ষ্ম রেখা এবং মানুষের গভীর একাকিত্বের মর্মন্তুদ প্রতিধ্বনি। গদ্য এখানে কেবল বর্ণনার বাহক নয়, তা হয়ে উঠেছে চিত্র, শব্দ, ছন্দ, অনুভূতি এবং চিন্তার সেতুবন্ধ।

এই বিশাল ও বৈচিত্র্যময় গল্পযাত্রার মানচিত্র আঁকতে গেলে যে বিপুলসংখ্যক গল্পকারের দেখা পাওয়া যায় তাদের মধ্য থেকে যাদের কথা আজ বলতে চাই তারা এখনও হয়তো মূলধারার সাহিত্যে অপ্রতিষ্ঠ হয়ে আছেন, কিন্তু তাদের সৃষ্টিশীলতা, ভাষা-নিরীক্ষা ও মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা প্রমাণ করেÑ তারা সমকালীন বাংলা গল্পভুবনের জরুরি গল্পকার, যাদের ছাড়া এই সময়ের সাহিত্যধারাকে সম্পূর্ণভাবে বোঝা যাবে না। তবে যাদের কথা বলব, তাদের বাইরেও থেকে যাবে অগণন গল্পকারÑ যারা একই রকম জরুরি। অপ্রতুল-পরিসর বিবেচনায় এখানে কেবল শিমুল মাহমুদ, কবীর রানা, আবু হেনা মোস্তফা এনাম, চন্দন আনোয়ার, আনিফ রুবেদ, ইফতেখার মাহমুদ এবং কৃষ্ণ জলেশ্বরকে বেছে নিচ্ছি। মনে রাখতে হবে, এই বাছাই কোনো শ্রেণি বা শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারক নয়। তবে যাদের নিলাম, তাদের গল্পে সমকালীন মানুষের স্বপ্ন, ভয়, অভিজ্ঞতা ও অন্তর্গত টানাপড়েন নানা রূপে প্রকাশ পেয়েছে। তাদের গল্পসমূহ একদিকে আমাদের সময়ের দলিল, অন্যদিকে ভাষা ও শিল্পকলার নতুন অঞ্চলের অনুসন্ধান দেয়।

সমকালীন বাংলা ছোটগল্পে যারা পৌরাণিক বয়ান, দার্শনিক তর্ক ও আধুনিক মনস্তত্ত্বকে একসঙ্গে মিশিয়ে নতুন এক নন্দনভূমি তৈরি করেন, তাদের মধ্যে শিমুল মাহমুদ একজন। তার ‘ইলিশখড়ি ও অন্যান্য গল্প’ গল্পগ্রন্থে ভাষার গতি, বয়ানের নির্মাণ ও প্রতীকের ব্যবহারের দিক থেকে তাকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করা যায়। 

শিমুল মাহমুদের বহুল আলোচিত ‘মাতৃবিনাশ’ গল্পটি শুরু হয় এক বিশাল পৌরাণিক জগৎ নির্মাণের মাধ্যমেÑ যেখানে রাক্ষস, রাক্ষসী মৃত্তিকা ঘটকি, সুখচার্বাকের মতো চরিত্র, অগ্নি-উৎসবের আগুন, তক্ষশীলার বৌদ্ধশ্রমণ, প্রাচীন আচার-অনুষঙ্গÑ সব মিলিয়ে সৃষ্টি হয় এক দার্ঢ্য-আবহ। এই পৌরাণিক পরিসর যেন একদিকে ভারত-উপমহাদেশের বহুযুগের কল্পসংস্কৃতির স্মৃতি; অন্যদিকে আধুনিক সময়ের অশান্ত রাজনীতি, বৈরিতা ও সহিংসতার রূপক। গল্পটির শক্তি কেবল তার বিশাল কল্পজগতেই নয়Ñ এই কল্পজগতের বহুমাত্রিক উপপাঠেও। ‘মাতৃবিনাশ’-এর কেন্দ্রে আছে অন্ধবিশ্বাস, ধর্মীয় উন্মত্ততা, ভ্রান্ত মুক্তির ধারণা, যুক্তিবিরোধী নিষ্ঠুরতা এবং ‘মা’-কে উৎসর্গ করার এক ভীষণ রূপকÑ যা শেষ পর্যন্ত সভ্যতা নামের যে কাঠামো আমাদের দাঁড় করিয়ে রেখেছে তারই ভেতরের নৈতিক পতনকে নগ্ন করে। গল্পটি তাই কেবল মিথনির্ভর আখ্যান নয়; এটি সভ্যতার অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা সহিংসতার চিরন্তন ইতিহাসের এক সমালোচনামূলক প্রতিফলন।

শিমুল মাহমুদের ভাষা অত্যন্ত সুরেলা, দীর্ঘ ও তরঙ্গায়িত। তার বাক্যগঠন যেন সিম্ফনির সুরÑ একটি শব্দ, একটি ইমেজ, একটি ছন্দ বারবার ফিরে আসে, কিন্তু প্রত্যেকবার ভিন্ন টোনে, ভিন্ন শক্তিতে। এই পুনরাবৃত্তি তৈরি করে আবেশ, এক ধরনের পাঠ-মগ্নতা, যা পাঠককে গল্পজগতের ভেতর টেনে নিয়ে যায়, প্রায় সম্মোহনের মতো। তার গদ্য কাহিনিকে টেনে নেয় নাÑ কাহিনির আবহ হয়ে ওঠে। ‘মাতৃবিনাশ’ এমন এক প্রতীকী উত্তুঙ্গে পৌঁছায়, যেখানে ‘মাতৃহত্যা’ শুধু একটি ঘটনার নাম নয়Ñ তা হয়ে ওঠে সভ্যতার বিবেকহীন সময়চেতনার এক সাংকেতিক উপস্থাপনা। এখানে মাকে হত্যা মানে কেবল ব্যক্তির অপরাধ নয়, মানবতার ভিত্তিমূলÑ সহমর্মিতা, করুণা, যুক্তিবোধÑ এসবকিছুকে ধ্বংস করে দেওয়া। সেই কারণেই গল্পটি একই সঙ্গে পৌরাণিক ও অত্যন্ত আধুনিক; কালাতীত প্রতীকী, আবার নির্মমভাবে সমকালীন। 

কবীর রানা সাধারণ জীবনকে অদ্ভুত এক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখেন এবং দৈনন্দিন বাস্তবতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সামাজিক-রাজনৈতিক উত্তাপকে সংযত ভাষায় প্রকাশ করেন। তার গল্পে গ্রাম ও শহরÑ দুটি ভিন্ন ভূগোলের অভিজ্ঞতা যেমন মিশে যায়, তেমনি মিলেমিশে ওঠে ভোক্তাবাদী সমাজের অদৃশ্য চাপ, মধ্যবিত্ত জীবনযাত্রার নীরসতা, স্মৃতিচালিত বোধ এবং মানবজীবনের ক্ষুদ্র অথচ তাৎপর্যপূর্ণ দ্বন্দ্ব।

‘জল আসে মানুষের দীঘিতে’, ‘মানচিত্রকর’, ‘আমাদের গ্রামে একটা পাখিচোর আছে’, ‘বিড়াল পোষা প্রতিবেশিনীরা’, ‘কোথায় কোথায় ঘুমিয়েছিলাম’ ও ‘মেয়াদোত্তীর্ণ নিরাপত্তাসমূহ’Ñ এই গল্পগ্রন্থগুলোর প্রতিটিতেই দেখা যায়, কবীর রানার স্বাতন্ত্র্য নিহিত তার বিষয়চয়ন, ভাষার মিতব্যয়িতা এবং বিচ্ছিন্ন বাস্তবতার অনুপম পর্যবেক্ষণশক্তিতে। তিনি রাজনৈতিক উত্তাপ, প্রতিদিনের ক্ষুধা, জমি-সংকট, বিজ্ঞাপন ও পণ্যের বন্যা, নিরাপত্তাহীনতাকে বড় করে তুলে ধরেন না; বরং ছোট ছোট ঘটনার আলো-ছায়ায় সেটিকে অদ্ভুতভাবে উন্মুক্ত করেন।

‘ক্ষুধা ও খাদ্য পর্বত’ গল্পে কবীর রানা এক বিরল রূপকের আশ্রয় নেনÑ ঐশ্বর্যবান সমাজের সাজানো টেবিল ও দারিদ্র্যের বাস্তব ক্ষুধাকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে পাঠককে এক তীব্র নৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি করেন। এখানে ‘খাদ্য পর্বত’ শুধু অন্নের ব্যাপার নয়; এটি আধুনিকতার অতিভোগ, বর্জ্য-সংস্কৃতি, খাদ্যশিল্পের অন্ধকারেরও প্রতীক। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ‘ক্ষুধা’ একটি ভয়াবহ ও প্রাত্যহিক বাস্তবতা। এই দুইয়ের সংঘাতে যে ব্যঙ্গ সৃষ্টি হয় তা ক্ষুদ্র নয়; তা আমাদের সামাজিক বোধের অসাড়তাকেই উন্মোচন করে। ‘মেয়াদোত্তীর্ণ নিরাপত্তাসমূহ’-এ কবীর রানা যেন রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারÑ এই তিন স্তরের প্রতিশ্রুত ‘নিরাপত্তা’কে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। নিরাপত্তা এখানে পণ্যসম্ভারের মতোই একটি ‘মেয়াদ’-নির্ভর বস্তুÑ যার সময় ফুরোলে মানুষ হয়ে পড়ে একাকী, অনিরাপদ ও দিশাহীন। গল্পের ভাষা সংযত, প্রায় ক্লিনিকাল; কিন্তু তার ভেতর লুকিয়ে আছে সমাজের গভীর নৈতিক সংকট।

কবীর রানার গল্পের বিশেষ শক্তি হলোÑ তিনি আসবাব, জমির দলিল, ছাপানো বিজ্ঞাপন, পুরোনো নথিপত্র, এমনকি দোকানের ব্যানারকে শুধু পটভূমি হিসেবে রাখেন না; এগুলোকে গল্পের প্রতীকী কেন্দ্র করে তোলেন। ‘জমির দলিল বিক্রি করা হবে’, ‘বিজ্ঞাপন চুরি হয়ে যাচ্ছে’Ñ এ ধরনের শিরোনামই প্রমাণ করে, তিনি প্রাত্যহিকতার ভেতর একটি অদ্ভুত ফাটল খুঁজে বের করেন, যেখানে সমাজের অসহায়তা, মানুষের বেঁচে থাকা, আর রাষ্ট্রের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তার গল্পে ব্যঙ্গ উচ্চকণ্ঠ নয়, নীরব। কোথাও সেটা সামান্য ইঙ্গিত, কোথাও চরিত্রের উচ্চারণের আড়ালে, কোথাও দৃশ্যের গঠনে। এই নীরব ব্যঙ্গই শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় বেদনার গভীর উপলব্ধিতে। পাঠক বুঝতে পারেÑ ব্যঙ্গ এখানে তির্যক হাসি নয়Ñ সমাজের অক্ষমতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অসহায়তা এবং মানুষের ক্ষতবিক্ষত সময়চেতনার তীব্র প্রকাশ।

চরিত্র, ভাষা, দৃশ্য ও রূপকÑ সব মিলিয়ে কবীর রানার গল্পসমূহ সমকালীন বাংলা ছোটগল্পের এক মৌলিক শক্তি নির্মাণ করেছেÑ যেখানে গ্রাম-শহরের দ্বৈত জীবন, ভোক্তাবাদী আক্রমণ, বঞ্চনার নিচুভূমি ও মানুষের আড়ম্বরহীন অস্তিত্ব বারবার উন্মোচিত হয় নতুন আলোয়। 

আবু হেনা মোস্তফা এনাম গল্পকে শুধু ঘটনার ধারাবাহিকতা নয়, বরং ভাষার অন্তর্দর্শন, চিন্তার বিমূর্ততা ও মনস্তাত্ত্বিক বিস্তারের ক্ষেত্র হিসেবে দেখেন। তার গল্প কেবল আখ্যান নয়Ñ এটি হয়ে ওঠে চিন্তার পথরেখা, মনের ভেতরকার দৃশ্য, এবং দর্শনের সুরেলা ছায়া। ‘ক্রুশকাঠের খণ্ডচিত্র’, ‘নির্জন প্রতিধ্বনিগণ’, ‘প্রাণেশ্বরের নিরুদ্দেশ’, ‘জোনাকিবাবুই’ এবং সাম্প্রতিক ‘গোলাপ নির্মাণের গণিত’Ñ প্রতিটি গ্রন্থেই ভাষার ব্যবহার, বয়ানের ভঙ্গি এবং বাস্তব-অবাস্তবের সমান্তরাল বিশ্ব নতুন রূপে প্রকাশ পেয়েছে।

‘গোলাপ নির্মাণের গণিত’-এ আমরা দেখতে পাই এমন এক ভাষাবিশ্ব, যেখানে গ্রাম, ভোর, কুয়াশা, পাখি, গোলাপÑ সব উপাদান একসঙ্গে মিলেমিশে তৈরি করে এক পরাবাস্তব ও জাদুবাস্তবের অদ্ভুত ভূগোল। এখানে ‘গোলাপ’ কেবল একটি ফুল নয়, এক প্রতীকী অনুসন্ধানÑ সৌন্দর্য, সৃষ্টি, বিনাশ, স্মৃতি, এবং অস্তিত্বের সূক্ষ্ম গণিতের চিহ্ন। গ্রাম ও প্রকৃতির দৃশ্য তার লেখায় সরাসরি বর্ণনামূলক নয়Ñ তা একেকটি অনুভূতির ভৌগোলিক মানচিত্র। এ গল্পে বাস্তব ও কল্পনার সীমানা নরম মেঘের মতো মিলেমিশে যায়। কখনও মনে হয়, আমরা একটি বাস্তব গ্রামের ভোর দেখছি; আবার মুহূর্তেই দেখি, সেই ভোরের মধ্যে মিশে যাচ্ছে মানুষের একান্ত অভিজ্ঞতা, স্বপ্ন, অস্থিরতাÑ যা ভৌত জগৎকে ছাড়িয়ে মেটাফিজিক্যাল প্রশ্নে পৌঁছে দিচ্ছে।

এনামের গদ্য সরলরৈখিক নয়Ñ তিনি কোনো ঘটনার শুরু, মধ্য বা শেষকে আলাদা করে চিহ্নিত করেন না। তার গল্প যেন একটি চলমান নোটবুক, একটি ধারণা-স্রোত, অথবা ধ্যানের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া ভাষাশিল্প। পাঠক মনে করেন, গল্পটি যেন শুরু হওয়ার আগেই শুরু হয়ে গেছে, আর শেষ হবার পরও শেষ হচ্ছে নাÑ তার ধ্বনি আরও বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়। এটি প্রচলিত গল্পের গঠন ভেঙে দেয়; কিন্তু পাঠকের সামনে খুলে দেয় এক নতুন নন্দনতাত্ত্বিক বোধ।

এনামের গদ্যকে তাই কেবল সাহিত্যিক নয়, দার্শনিক বলাও যায়। তার লেখায়Ñ অস্তিত্বের প্রশ্ন, সময়ের রহস্য, প্রকৃতি ও মানবমনস্তত্ত্বের দ্বন্দ্ব, স্মৃতি-অবচেতন-স্বপ্নÑ এই তিনটির আন্তঃসম্পর্ক বারবার উঠে আসে। তার গল্পের ঘটনাগুলো চিরাচরিতভাবে বর্ণিত হয় না। তা ‘ধারণা’ বা ‘অনুভূতি’ হিসেবে প্রস্তাবিত হয়। অনেক সময় মনে হয়Ñ তিনি গল্প বলছেন না, বরং পাঠকের সঙ্গে এক অন্তর্দর্শনের পথে হাঁটছেন।

এনামের ভাষাও কাহিনিকে কাঁধে বয় না, ভাষাই যেন প্রধান চরিত্র। তার উপমা, তুলনা, বাক্যের ছন্দে এক ধরনের দৃশ্যভিত্তিক ও ভাববাদী কাঠামো তৈরি করে। কুয়াশা, পাখি, গোলাপ, গ্রাম প্রভৃতি উপাদান প্রতীকে রূপান্তরিত হয় এবং গল্পের ভেতর স্বতন্ত্র দার্শনিক শক্তি অর্জন করে। লাতিন আমেরিকান জাদুবাস্তব বা বাংলা মায়াবাস্তবতার আদর্শ অনুকরণ তিনি করেন না। কিন্তু মনে হয় তার গল্পে জাদুবাস্তবতা আসে অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রবাহেÑ মনে হয় এটি বাস্তবেরই এক গভীরতর স্তর।

আবু হেনা মোস্তফা এনামের গল্পসমূহ সমকালীন কথাসাহিত্যে এক বিশেষ পথে হাঁটছেÑ যেখানে গল্প, ভাষা, দর্শন ও মনস্তত্ত্ব মিলে তৈরি হয় এমন এক সাহিত্যবোধ, যা পাঠকের অভিজ্ঞতাকে প্রসারিত করে এবং গভীরভাবে রূপান্তরিত করে।

চন্দন আনোয়ার তার গল্পে সমাজ, রাষ্ট্র, ইতিহাস ও ব্যক্তিমানুষের দ্বন্দ্বকে একই ফ্রেমে ধরে রাখতে সক্ষম। বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে প্রকাশিত তার সাতটি গল্পগ্রন্থÑ এবং সেগুলো থেকে বাছাই করা পঞ্চাশটি গল্প নিয়ে তৈরি সংকলন ‘বিশেষ ৫০’Ñ তার শিল্পচিন্তার ব্যাপ্তি, বৈচিত্র্য ও নির্মাণশক্তির সাক্ষ্য বহন করে। তার লেখালেখির পরিধি বিশাল হলেও সবকিছুর ভেতর দিয়ে স্পষ্টভাবে উঠে আসে এক গভীর সামাজিক বোধ, ইতিহাসবোধ এবং মানুষের অস্তিত্বসংকটের শিল্পরূপ।

চন্দন আনোয়ারের আখ্যানজগতের মূল কেন্দ্রচিহ্নগুলো হলোÑ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও যুদ্ধোত্তর মানসিকতার ভাঙন, গুম-খুন, সন্দেহ-নজরদারি, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, ধর্মীয় উগ্রবাদ ও আইডেন্টিটি রাজনীতি, শহর-গ্রামের রাজনৈতিক উত্তাপ, হিংসা ও দুর্ভাবনা, ব্যক্তিগত প্রেম, ভাঙন, সম্পর্কের নীরব সংকট, নিঃসঙ্গতা, অপরাধবোধ, এবং ব্যক্তি-রাষ্ট্রের সংঘর্ষ। এই বিষয়গুলো শুধু সামাজিক প্রতিবেদন হিসেবে তার গল্পে আসে নাÑ তা মিশে যায় মানুষের গভীর মানসিক অস্থিরতা, ভয় এবং অনিশ্চয়তার সঙ্গে। ফলে চন্দনের গল্পগুলোতে ইতিহাস ও রাজনীতি কখনও প্রেক্ষাপট নয়Ñ সেগুলো গল্পের ভিত ও চালিকাশক্তি।

চন্দন আনোয়ারের চরিত্ররা প্রায়ই অবস্থান নেয় এক ভাঙাচোরা সেতুর ওপরÑ যেখানে দুই দিকের চাপ তাদের ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে। একদিকে তাদের ব্যক্তিগত স্বপ্ন, প্রেম, স্নেহ, সুখের আকাঙ্ক্ষা; অন্যদিকে সময়, রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং সমাজের অমোঘ চাপ। এই চরিত্রসমূহ কখনও নায়কোচিত নয়, হয়তো তারা ‘সময়ের সন্তান’Ñ আতঙ্ক, বাধা, সন্দেহ ও দুঃস্বপ্নের মধ্যে বাঁচতে থাকা সাধারণ মানুষ। চন্দনের গল্প-চরিত্ররা একটি যন্ত্রণাবহ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে, যেখানে ব্যক্তিগত আবেগও শেষ পর্যন্ত সামাজিক অস্থিরতার ছায়ায় রঙিন হয়ে ওঠে।

চন্দন আনোয়ারের ভাষাশৈলী বর্ণময় ও বহুরূপী। তার গদ্যÑ কখনও রুক্ষ, কঠিন, সরল, কখনও সূক্ষ্ম, কাব্যময়, নীরব বেদনাময়। এই দ্বৈততা তার গল্পে তীব্রতা ও কোমলতার অদ্ভুত মিশ্রণ সৃষ্টি করে। কখনও তিনি সংক্ষিপ্ত বাক্যে চরিত্রের যন্ত্রণা ফুটিয়ে তোলেন; কখনও দীর্ঘ, ঢেউতোলা বাক্যে সময়ের নির্মম ইতিহাসকে জাগিয়ে তোলেন। তার লেখায় শব্দগুলো প্রায়ই ক্ষত থেকে উঠে আসা শ্বাসের মতোÑ ব্যথামিশ্রিত, কাঁটাযুক্ত, অথচ অস্বীকার-অযোগ্য সত্যের ধার পরিবেশন করে।

চন্দনের গল্পে সময় বা ইতিহাস একদিকে পটভূমি আবার চরিত্র হিসেবেও স্বতন্ত্র।

এমন এক চরিত্র, যা মানবিক সম্পর্ককে ভেঙে ফেলে, আবার কখনও একত্রে বাঁধে; যে চরিত্র মানুষের ওপর অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ চালায়, তাদের ভিতরে ভয় ঢুকিয়ে দেয়, আবার কখনও বিদ্রোহের শক্তি জাগায়। সেই কারণেই তার গল্প পড়তে গিয়ে পাঠক অনুভব করেনÑ আমরা যে সময়ের ভেতর বাস করছি, সেটি নিজেই আমাদের ভাগ্যনিয়ন্ত্রক এক জীবন্ত সত্তা, যা মানুষকে গ্রাস করে, শাসন করে, আবার ধ্বংস করেও এগিয়ে যায়।

চন্দন আনোয়ারের গল্পের বিশেষত্ব, তিনি সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মিশিয়ে দেন গভীর ব্যক্তিমানসের আলো-ছায়া। গল্পে ‘বড় ঘটনা’ কম থাকে, কিন্তু পরিস্থিতির নির্মমতা চরিত্রদের ভেঙে দেয়। তার বয়ানে থাকে ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা, আবার তার মানুষেরা অমোঘ নিঃসঙ্গতার দিকে তাকানো। গল্প শেষ হওয়ার পরও পাঠকের মনে রয়ে যায় এক ঘন, অন্ধকার, তবু মানবিক উষ্ণতার প্রতিধ্বনি।

চন্দন আনোয়ারের গল্পসমূহ সমাজ, রাষ্ট্র, ইতিহাস ও ব্যক্তির সম্পর্ককে এক জটিল এবং ভাঙাচোরা ‘সেতু-নন্দনচিত্র’-এ রূপ দেয়Ñ যেখানে দাঁড়িয়ে আমরা শুধু সময়কে দেখি না; আমরা দেখি নিজেদেরও, আমাদের ক্ষত, আমাদের ভয়, এবং আমাদের ভেঙেচুরে দাঁড়িয়ে থাকা মানবিক অস্তিত্ব। 

আনিফ রুবেদ আখ্যানকে ভাষার দেহে, শব্দের ছন্দে এবং সাউন্ডস্কেপের জটিল বিন্যাসে পুনর্গঠন করেন। জেমকন তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার, বগুড়া লেখকচক্র পুরস্কার প্রভৃতি তার সাহিত্যিক-স্বাতন্ত্র্যের স্বীকৃতি হলেও তার প্রকৃত শক্তি নিহিত আছে গল্পকে একটি শ্রাব্য-দৃশ্যমান অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করার অসাধারণ ক্ষমতায়।

‘মন ও শরীরের গন্ধ’, ‘কালকাঠুরে’, ‘জীবগণিত’, ‘মানুষাশী মানুষ’, ‘দৃশ্যবিদ্ধ নরনারীগান’, এবং সাম্প্রতিক অণুগল্পগ্রন্থ ‘যে জীবের হাত নেই পা নেই পুরোটাই পেট’Ñ প্রতিটি বইয়েই দেখা যায় গল্পের প্রচলিত রূপ ভেঙে নতুন নির্মাণের নিরন্তর প্রয়াস।

আনিফ রুবেদের গল্পে ‘ঘটনা’ বা প্লট প্রায় গৌণ। এখানে মুখ্য হয়ে ওঠেÑ শব্দের পুনরাবৃত্তি, শহরের ট্রাফিক, রেললাইন, মানুষের হাঁপধ্বনি, চিৎকারÑ এইসব শ্রাব্য উপাদান, সংলাপের টুকরো-টুকরো বয়ান, দৃশ্যের দ্রুত কাটÑ যেন চলচ্চিত্রের দ্রুত এডিটিং, বাক্যের ছন্দ ও গতিবিধি। ফলে তার গল্প কোনো একক অর্থ বহন করে নাÑ পাঠকের সামনে বহুমাত্রিক অনুভূতির একটি শব্দ-দৃশ্য-স্থাপনা তৈরি করে। বহু সময় মনে হয়, তিনি হয়তো কাগজে গল্প লিখছেন না, কোনো অডিও ট্র্যাকের স্ক্রিপ্ট লিখছেনÑ যেখানে গল্প শুনতে পাওয়া যায়, দেখা যায়, অনুভব করা যায়।

আনিফ রুবেদ ভাষাকে কেবল প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে দেখেন না। তিনি ভাষাকে ভেঙে, খণ্ড করে, ছড়িয়ে দিয়ে, আবার নতুন করে সাজিয়ে গল্পের নিজস্ব ছন্দ তৈরি করেন। তার সংলাপ কখনও অসম্পূর্ণ, কখনও ইচ্ছাকৃতভাবে ছেঁড়া; বাক্যগুলো যেন হাঁটার সময় হঠাৎ থমকে যাওয়ার মতোÑ এইসব ভাষাসংকোচ ও ভাঙনই তার গল্পকে পরীক্ষা ও শিল্পে পরিণত করে।

‘দৃশ্যবিদ্ধ নরনারীগান’ তার অন্যতম উল্লেখযোগ্য সংকলন। এখানে তিনি দেখিয়েছেনÑ আজকের সমাজে মানুষ কীভাবে নিজেই ‘দৃশ্য’ হয়ে যায়, কীভাবে তাকে দেখানো হয়, নির্মাণ করা হয়, ব্যাখ্যা করা হয়, কীভাবে গণমাধ্যম, প্রযুক্তি ও নজরদারি মানুষের ব্যক্তিসত্তাকে ‘বিদ্ধ’ করে। এ ধরনের গল্পে চরিত্রেরা যেন রক্তমাংসের মানুষ নয়Ñ তারা একদিকে ভঙ্গুর, অন্যদিকে মিডিয়া-সৃষ্টি বাস্তবতার কার্টুন-সদৃশ প্রতিমা। ফলে গল্পগুলো পাঠকের কাছে শুধু মানুষের গল্প নয়, মানুষকে দেখা, নজর রাখা এবং তাকে ভেঙে পড়তে দেখার নির্মম যন্ত্রতন্ত্রেরও গল্প।

আনিফ রুবেদ যেমন নগরের শব্দময় বাস্তবতা আঁকেন, তেমনি গ্রামীণ জগতের ভেতর প্রবেশ করে সেখানকার মাটি, হাওয়া, কুয়াশা, কৃষি ও নীরবতার মধ্যে এক অদৃশ্য জাদুবাস্তবতা সৃষ্টি করেন। ‘কাকতাড়ুয়া’, ‘ভূগোল মাস্টারের শ্বাস-প্রশ্বাসের ছাপ’, ‘কুয়া আখ্যান’Ñ এই গল্পগুলোতে আছে গ্রামীণ শিক্ষাব্যবস্থা, কৃষিজীবনের রুক্ষতা, বালক-মানসের বিস্ময়, এবং বাস্তবতার ভেতরে ঢুকে থাকা নরম পরাবাস্তবতার ধোঁয়া। এখানে কুয়া, কাকতাড়ুয়া, শ্বাস-প্রশ্বাসÑ এইসব সাধারণ উপাদানই প্রতীকে রূপান্তরিত হয়।

আনিফ রুবেদের ভাষা কখনও কঠোর, কখনও আশ্চর্য সংযতÑ যেন শব্দ ব্যবহারেও তিনি ‘মিতব্যয়িতা’র বিধান মানেন। কিন্তু সেই সংযত ভাষার ভেতরেই লুকিয়ে থাকেÑ কাব্যের প্রতীকময়তা, নীরবতার সুর এবং শব্দের দৃশ্যমান শক্তি। এই দুই মেজাজের মিশ্রণই তাকে আজকের ছোটগল্পে আলাদা এক স্বর দেয়।

আনিফ রুবেদ এমন এক গল্পকার, যিনি গল্পকে ঘটনাবলি, চরিত্র বা পরিণতির মধ্যে আটকে না রেখে গল্পকে একটি অনুভূতিমূলক ‘সাউন্ড-দৃশ্য-ল্যান্ডস্কেপ’ হিসেবে পাঠকের সামনে তুলে ধরেন। তার গল্প পাঠ মানেÑ শব্দ শোনা, দৃশ্য দেখা, সম্পর্কের চূর্ণতা অনুভব করা এবং মানুষের অভ্যন্তরীণ নীরব আর্তনাদে কান দেওয়া। 

আনিফ রুবেদের গল্পসমূহ সমকালীন বাংলা ছোটগল্পের পরিসরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণÑ কারণ তিনি আখ্যানকে ভাষা, শব্দ, ছন্দ ও দৃশ্যের পরীক্ষাগারে নিয়ে গিয়ে আধুনিক গল্পধারাকে নতুন সম্ভাবনার দিকে ঠেলে দিয়েছেন।

সম্প্রতি প্রয়াত ইফতেখার মাহমুদ সমকালীন বাংলা গল্পে এমন এক সৃষ্টিশীল স্বর, যার লেখায় আখ্যানের দৃঢ়তা ও শৈলী-নিরীক্ষা একই সঙ্গে অবিচ্ছিন্নভাবে ধারণ করেছে। তার গল্পে কখনও ভাষার পরীক্ষামূলক ব্যবহার, কখনও দৃশ্য ও সংলাপের নাট্য-বিন্যাস, কখনও অন্তর্মুখী চেতনার প্রবাহÑ সবই উপস্থিত থাকে, কিন্তু আখ্যানের মূলস্রোত কখনোই ভেঙে যায় না। তার গল্প পড়তে গিয়ে পাঠক বুঝতে পারে, তিনি আখ্যানশিল্পের ভিত অক্ষুণ্ন রেখে ভাষা, গঠন ও ছন্দে নতুন সম্ভাবনার দিকে হাত বাড়িয়েছেন।

ইফতেখার মাহমুদের উল্লেখযোগ্য বইÑ ‘শিকড়ে শাখায় মেঘে’, ‘কথা আর গল্পের জীবন’, ‘হে দিগ্বিদিক, হে অদৃশ্য’, ‘অসমাপ্ত সাঁকো’, ‘অনুপস্থিত’Ñ সবকটিতে এই দ্বৈত নির্মাণ খুব স্পষ্ট। তিনি গল্প বলতে জানেন, আবার গল্পের ভাষাকে নতুন করে সাজাতে জানেন। ফলে তার সাহিত্য একদিকে পাঠকের বোধগম্য, অন্যদিকে বৌদ্ধিকভাবে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়।

‘অসমাপ্ত সাঁকো’ গ্রন্থের প্রথম গল্প ‘ইন দ্য মেকিং’ তার শৈলী-নিরীক্ষার উজ্জ্বল উদাহরণ। এখানে গল্পটি সাজানো হয়েছে প্রায় একটি নাট্যপাঠের মতোÑ দৃশ্য বিভক্তি, চরিত্রের নিজস্ব ভঙ্গিতে উচ্চারণ, নেপথ্যস্বর বা ভয়েসওভার, দৃশ্যান্তর, কথোপকথনের ভাঙা-জোড়া ছন্দ। এসব মিলিয়ে গল্পটি যেন একটি মঞ্চনির্ভর অভিজ্ঞতা তৈরি করে। কিন্তু এই নাট্য-নির্মাণ আখ্যানকে ভেঙে না দিয়ে গল্পকে আরও দৃশ্যমান ও গতিশীল করে তোলে। একটি প্রেমের গল্প পরিণত হয় সময়ের সংকট, সম্পর্কের ভঙ্গুরতা ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের সূক্ষ্ম নাট্যচিত্রে। 

‘মাথার ভেতর’ গল্পে শহুরে মানুষের মাথার ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া ‘নদী’ শুধু একটি কল্প-ইমেজ নয়; এটিÑ স্মৃতির জটিল প্রবাহ, প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্নতার দহন, শহুরে মানুষের অস্তিত্বগত দিশাহীনতা এবং হারানো শেকড়ের দীর্ঘশ্বাসÑ এই চারটি স্তরকে একত্রে বহন করে। নদী এখানে শৈশবের মাতৃভূমি, জীবনের প্রবাহ, সময়ের চলমানতার প্রতীক। শহরের ইট-কাঠের ভিড়ে মাথার ভেতর নদী বয়ে চলাÑ এই ইমেজ তার গল্পকার-সত্তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।

ইফতেখার মাহমুদের গল্পে একদিকে আছে স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট আখ্যানÑ যা পাঠককে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। অন্যদিকে রয়েছে গভীর উপপাঠÑ রাজনৈতিক-পরিবেশগত সংকট, শেকড়-বিচ্ছিন্নতা, সম্পর্কের জটিল মানসিক টানাপড়েন, শহরের অবচেতন ভয়, স্মৃতির দীর্ঘ ছায়াÑ যা গল্পের পৃষ্ঠদেশের নিচেই ধীরে ধীরে প্রবাহিত হয়। এই দ্বিমাত্রিক নির্মাণ তার লেখাকে বহুবর্ণী করে তোলেÑ একই সঙ্গে পাঠযোগ্য এবং গভীর পাঠযোগ্য।

ইফতেখারের ভাষায় কখনও অতিরিক্ত বর্ণনা নেই। তিনি খুব সংযত শব্দে দৃশ্য, অনুভূতি ও চরিত্র নির্মাণ করেন। বাক্যের অর্থনীতি এতটাই নিয়ন্ত্রিত যে একটি শব্দ, একটি ইমেজ, একটি বিরামচিহ্নই গল্পকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। তার গল্পেÑ নীরবতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কথার অভাবই অনেক সময় কথার চেয়ে বেশি অর্থবহ, চরিত্ররা নিজেদের প্রকাশ করে খুব কম শব্দে, কিন্তু গভীরভাবে।

ইফতেখার মাহমুদের গল্পে যে স্বাতন্ত্র্য তিনি পরীক্ষামূলক উপাদান ব্যবহার করেন, কিন্তু কখনোই গল্পের প্রাণ হারাতে দেন না। তার গদ্য নীরব, সংযত, কিন্তু তীক্ষ্ণ ও গভীর। প্রতীক নির্মাণে অনন্যÑ নদী, সাঁকো, অচেনা কণ্ঠ, নেপথ্যস্বরÑ সবই বহুমাত্রিক অর্থ বহন করে। তার গল্পে শহুরে জীবনের শূন্যতা ও স্মৃতি-বহনকারী মনের দ্বন্দ্ব চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে। গল্পের শেষ পাঠকের ভেতরে অনির্বচনীয় প্রতিধ্বনি রেখে যায়, যেন গল্পটি শেষ হয়ে গেলেও তার ধ্বনি বয়ে চলেছে।

ইফতেখার মাহমুদের গল্পসমূহ সমকালীন বাংলা কথাসাহিত্যে এক অনন্য সেতুবন্ধÑ যেখানে প্রচলিত আখ্যানের শক্তি অক্ষুণ্ন রেখে ভাষা, ছন্দ, নাট্যগঠন এবং প্রতীক-চিন্তার অভিনব অন্বেষণ চলতে থাকে। তার গল্প পাঠ মানে কেবল গল্প পড়া নয়, মানুষের মনস্তত্ত্ব, সময়চেতনা ও স্মৃতিনির্ভর অস্তিত্বের গভীর পথে যাত্রা করাও বটে। 

নতুন প্রজন্মের গল্পকারদের মধ্যে কৃষ্ণ জলেশ্বর বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তার লেখায় একধরনের স্বচ্ছতা, স্বাভাবিকতা ও সহজ-সাবলীল ভাষাবোধ রয়েছে, কিন্তু সেই সরলতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে জটিল ইমেজ-নির্মাণের এক ঘনীভূত শক্তি। তার ‘আনোহাবৃক্ষের জ্যামিতি’, ‘ভাঙা আয়নায় দেখা মুখ’, ‘দূর গল্পপুর’ প্রভৃতি গল্পগ্রন্থ এই স্বাতন্ত্র্যের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ।

‘আনোহাবৃক্ষের জ্যামিতি’, ‘ম্লান ছায়ার শরীর’, ‘ইয়ো ইয়ো’, ‘দ্বিঘাত সমীকরণ’, ‘জাকারিয়ার নতুন আম্মা’, ‘কুংফু না জানা মাস্টার’, ‘দূর গল্পপুর’, ‘আয়না ভেঙে গেলে’, ‘সাইকেল’, ‘বিপাশা’Ñ এইসব গল্পে আছে নানা স্তরের বর্ণনাÑ নগরজীবনের ক্লান্তি, কিশোর-মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্ম অনুভূতি, পারিবারিক সম্পর্কের ভাঙাচোরা গঠন এবং দৈনন্দিন জীবনের পরাবাস্তব স্পন্দন। কৃষ্ণ জলেশ্বরের গল্পে নগরজীবন উপস্থিত হয় পটভূমি হিসেবে এবং একটি মানসিক পরিবেশ হিসেবেÑ যেখানে ক্লান্তি, ব্যস্ততা, বিচ্ছিন্নতা, এবং ‘নিজের সঙ্গে নিজের অচেনা হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা’ বারবার ফিরে আসে। নগরের আলো-আঁধারি, ট্রাফিক, অফিস-জীবন, পরিবার-চাপÑ এসব মিলেমিশে চরিত্রদের আবেগ ও সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করে। গল্পগুলো তাই একদিকে শহরের বিবরণ এবং অন্যদিকে নগরের আত্মিক প্রভাবের গল্পও।

‘ইয়ো ইয়ো’, ‘সাইকেল’, ‘কুংফু না জানা মাস্টার’Ñ এ ধরনের গল্পগুলোতে শিশু ও কিশোরদের মানসিক জগৎ অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ধরা পড়ে। এখানেÑ আবেগের দ্রুত পরিবর্তন, ভয়, কৌতূহল, পরিবার-চাপ, বন্ধুত্বের উষ্ণতা, লুকোনো ক্ষোভÑ এসব তরঙ্গ যেন ভাষা ও ইমেজের মাধ্যমে দৃশ্যায়িত হয়। কৃষ্ণ জলেশ্বর শিশুমনের অনিশ্চয়তা ও ভয়ের গভীরতা বোঝেন এবং তাই তার কিশোর চরিত্রগুলোর অভিজ্ঞতা পাঠকের কাছে জীবন্ত হয়ে ওঠে।

‘জাকারিয়ার নতুন আম্মা’ গল্পে সৎমা-সন্তানের সম্পর্ক এমনভাবে ফুটে ওঠে, যেখানে মমতা ও সন্দেহ, ঘনিষ্ঠতা ও দূরত্বÑ এই দুই বিপরীত অনুভূতি একসঙ্গে উপস্থিত। কৃষ্ণ জলেশ্বর সম্পর্কগুলোকে নাটকীয় করে তোলেন না। খুব নরমভাবে, নীরবতার ভেতর দিয়ে, সামান্য ইঙ্গিতে, সংকোচে এবং অদৃশ্য আবেগে নির্মাণ করেন। ফলে মানবিক সম্পর্কের জটিলতা আরও বাস্তব হয়ে ওঠে।

কৃষ্ণ জলেশ্বরের প্রধান শক্তি তার ইমেজ-নির্মাণ। তার ভাষা সহজÑ কিন্তু ইমেজ জটিল, বহুস্তরীয়। একটি গাছ, একটি ছায়া, একটি আয়না, একটি সাইকেলÑ এইসব প্রতিদিন দেখা জিনিসও তার গল্পে হয়ে ওঠেÑ স্মৃতির জায়গা, ভয়ের প্রতীক, ভাঙা মানবিক সম্পর্কের চিহ্ন অথবা সময়ের অভ্যন্তরীণ চাপের রূপক। এই প্রতীকীকরণ এতটাই স্বাভাবিক যে পাঠক তা অনুভব করেন গল্পের ভেতরের আবহ হিসেবে, কোনো বাহুল্য বা জোরজবরদস্তি নয়।

‘আনোহাবৃক্ষের জ্যামিতি’-তে এক গাছের শিকড়, শাখা-প্রশাখা, আকার-প্রকৃতিÑ এসব দিয়ে তিনি স্মৃতি, সম্পর্ক ও মানবিক সংযোগের জ্যামিতিক মানচিত্র নির্মাণ করেছেন। গাছ এখানেÑ স্মৃতির ধারক, সম্পর্কের ‘অবস্থান-বিন্দু’, সময় ও মানুষের দূরত্বের প্রতীক এবং একই সঙ্গে পারিবারিক ভাঙন-জোড়ার জৈব চিহ্ন। কৃষ্ণ জলেশ্বর প্রকৃতি, গণিত ও মানসিক অভিজ্ঞতাকে একসঙ্গে মিলিয়ে এমন কাঠামো তৈরি করেন, যা বাংলা ছোটগল্পে এক বিশেষ নান্দনিক সংযোজন।

‘ম্লান ছায়ার শরীর’-এ আলো-অন্ধকারের স্তর মিলেমিশে স্মৃতি ও বর্তমানকে নতুনভাবে পাঠকের সামনে উন্মোচন করে। এখানে ছায়া কেবল আলোর বিপরীত নয়; এটি এক মানসিক প্রক্রিয়াÑ  স্মৃতি ফিকে হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত, সম্পর্কের দূরত্ব, সময়ের ক্ষয়ের রূপক। এই গল্পে দৃশ্য-ইমেজ প্রায় চিত্রকর্মের মতো সাজানো।

কৃষ্ণ জলেশ্বরের গল্পে পরাবাস্তবতা কখনও তীব্র বা অতিরঞ্জিত নয়। এটি প্রাত্যহিকতার ভেতর এক হালকা সরে যাওয়া অনুভূতি, এক অদ্ভুত পরিবেশ অথবা দৃশ্য-মনস্তত্ত্বের সামান্য অসামঞ্জস্য। এর ফলে তার গল্পে যে স্বপ্নময়তা তৈরি হয়, তা বাস্তবতাকে অস্বীকার না করে গভীর করে তোলে।

বলা যায়, কৃষ্ণ জলেশ্বর এমন একজন গল্পকার, যিনি সহজ ভাষায় জীবনের সবচেয়ে জটিল অনুভূতি, স্মৃতি, ভাঙন ও অভিজ্ঞতাকে ইমেজ-নির্ভর বয়ানে ধরে রাখতে সক্ষম। তার গল্পে সরলতা কখনও সরল নয়; সেটি গভীরতার মুখোশ, যেখানে মানুষের সময়, সম্পর্ক, স্মৃতি ও ব্যথাÑ সব মিলেমিশে তৈরি করে অনন্য এক গল্প-জীবন।

সমকালীন বাংলা ছোটগল্পকে বলা যেতে পারে এক বহুবর্ণ নদী। এই নদীর জলও এক নয়, স্রোতও এক নয়। এখানে আছে ইতিহাসের ঢেউ, শহরের ক্লান্তি, গ্রামের মাটি, স্মৃতির আলোছায়া, মনস্তত্ত্বের গভীর অন্ধকার, শব্দের প্রতিধ্বনি, পরাবাস্তবের নরম কুয়াশা। সাতজন গম্ভীর, উজ্জ্বল ভাবুক গল্পকারÑ শিমুল মাহমুদ, কবীর রানা, আবু হেনা মোস্তফা এনাম, চন্দন আনোয়ার, আনিফ রুবেদ, ইফতেখার মাহমুদ ও কৃষ্ণ জলেশ্বর এই নদীর সামনে দাঁড়িয়ে নিজ নিজ কণ্ঠে সময়কে উচ্চারণ করছেন। সেই উচ্চারণে কখনও আমরা দেখি সভ্যতার ক্ষত, কখনও মানুষের একাকিত্বের নীরব আর্তনাদ, কখনও ভাষার সদ্য-জন্ম নেওয়া ছন্দ, কখনও ভাঙাচোরা সম্পর্কের ভঙ্গি, আবার কখনও শিশুমনের অস্থির প্রশ্ন। এসব গল্প পড়ার পর মনে হয়Ñ আমরা শুধু পাঠক নই, নিজেদের সময়, নিজের ভয়, নিজের স্মৃতি এবং নিজের ভাঙা সুখের দিকে তাকিয়ে-থাকা দর্শক। ফলে গল্পগুলো পরিণত হয় আয়নায় কিংবা আয়নার গভীরে থাকা আলো-অন্ধকারের এক অসরল ভুবনে। এই গল্পকাররা আমাদের শিখিয়ে দেনÑ মানুষের জীবন যত সহজ দেখা যায়, তার ভিত ততই দুর্বোধ্য, আর ভাষা যতই সরল হয়, তার ভেতর লুকিয়ে থাকে তত জটিল আলো ও ছায়া।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা