চন্দন আনোয়ার
প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:৫৬ পিএম
চিত্রকর্ম : অমিতাভ সরকার
ছোটগল্পের বিষয়বৈচিত্র্য ও আঙ্গিক বৈশিষ্ট্য অভিনব-কবিতা, উপন্যাস, নাটকের কম-বেশি বৈশিষ্ট্য নিয়ে একটি জটিল রূপ-বৈশিষ্ট্যে প্রতিষ্ঠিত ও বিকশিত একটি সর্বকনিষ্ঠ সাহিত্যশাখা। রোমান্টিক কবিতার মতো একক ভাবাশ্রয়ী কিন্তু কল্পনা-প্রধান নয়, জীবনমুখী শিল্প। আকারে-প্রকারে উপন্যাসের সঙ্গে যথেষ্ট মিল কিন্তু জীবনের সমগ্রতা ও পূর্ণতা নেই, বিশেষ মুহূর্তের খণ্ডিতাংশ মাত্র ও অপূর্ণতার অতৃপ্তির আনন্দই প্রধান প্রসঙ্গ। অ্যারিস্টটল বর্ণিত নাটকের আদি-মধ্য-অন্ত নিয়ে একটি কাহিনী আছে কিন্তু নাটকের মতো সংলাপপ্রধান নয়, মঞ্চায়ন যোগ্যও নয়। ছোটগল্প প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। ‘ছোটগল্পের সংজ্ঞা যে রকম অস্থির, তার গঠনও তেমনি অনিশ্চিত। ... সাম্প্রতিক ছোটগল্প ঘটনা, চরিত্র ও বক্তব্যের প্রচলিত সংস্কার লঙ্ঘিত, ফলে কবিতা, নাটক, উপন্যাস প্রবন্ধ মিলে মিশে ছোটগল্পের একটি জটিল রূপাবয়ব গড়ে উঠছে।’ (অলোক রায়)
গল্প শোনা ও বলার রেওয়াজ চলে আসছে প্রাগৈতিহাসিককাল হতে। আদিতে গল্প বলা ও শোনার বিষয়টি ছিল মুখে মুখে। পরে লেখনশৈলী ও পাঠাভ্যাস তৈরি হওয়ায় বহু বিবর্তন ও বিকাশের মধ্য দিয়ে আধুনিক শিল্পগঠনে প্রথমে উপন্যাস ও পরে ছোটগল্পের ফ্রেম গড়ে উঠেছে। সকল সভ্যসমাজে মহাকাব্যের পরিচর্চা ও বিকাশের নেপথ্যের কারণ হচ্ছে কাহিনী-প্রধান বলে। কথাশিল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য প্রায় সবই উপস্থিতি প্রাচীন মহাকাব্য রামায়ণ-মহাভারত ও পুরাণে, মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান, চরিতসাহিত্য, নাথসাহিত্য ও লোকসাহিত্যে। পার্থক্য হচ্ছে, এসব পদ্যে লেখা এবং গীত হতো; অন্যদিকে গল্প বর্ণনাত্মক গদ্যে লেখা এবং গীত হওয়ার অনুপযোগ্য। কাহিনী-প্রধান হলেও মধ্যযুগে গল্প সৃষ্টি হয়নি জীবন-জিজ্ঞাসার অভাবে। মধ্যযুগের সমাজ ও ধর্মের বারণ-নিষেধে শৃঙ্খলিত মানুষ সাহিত্যে নিজের অস্তিত্বকে সগৌরবে উঁচু করে ধরতে পারেনি। কিন্তু ধরার চেষ্টা যে হয়নি তা বলা যাবে না। প্রধান দুই মহাকাব্যে ও মঙ্গলকাব্যের কাহিনীর মধ্যে এমন চরিত্রও খুঁজে পাওয়া যায়, যারা ধর্মের শাসনকে অস্বীকার করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের উপলব্ধি স্পষ্ট না হওয়ায় এবং দেবতার প্রবল আধিপত্যের কাছে চালু বাস্তবতায় টিকতে না পেরে সেই চরিত্রও নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে বেরিয়ে এসে নিজের চূড়ান্ত মুক্তি ঘোষণা করতে পারেনি। ‘মনসা মঙ্গলকাব্যে’র চাঁদ সওদাগর অটল পৌরুষত্ব নিয়ে দেবী মনসার উন্মত্ততা ও আঘাতের বিরুদ্ধে যেভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে এবং পরিণামে নিয়তির কাছে নয়, পুত্রস্নেহের কাছে পরাজয় মেনে নিয়ে মাথা অবনত করেছে, তাতেই আধুনিক উপন্যাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য ব্যক্তিজাগরণের বীজ নিহিত আছে। কাহিনীর প্রয়োজনে চাঁদ সওদাগরকে শেষ পর্যন্ত যদি নিয়তির কাছে পরাভব স্বীকার করতে না হতো তবে পাঁচশ বছর আগেই বাংলাসাহিত্যে মানবিকতার জয় ঘোষিত হয়ে যেত। কবি কঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর (আনু.১৫৪০-১৬০০) ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যে আধুনিক উপন্যাসের প্রায় সকল বৈশিষ্ট্য সর্বাংশে বর্তমান। ময়মনসিংহ গীতিকার কোনো কোনো কাহিনী প্রায় উপন্যাসের কাহিনীকে ধারণ করেছে, যা গদ্যে রচিত হলে নিশ্চিত কথাসাহিত্যের মর্যাদা লাভ করত। জীবনের নানামুখী সংকট আছে, প্রকট জীবন-জিজ্ঞাসাও রয়েছে। বাংলা সাহিত্যের দুর্ভাগ্য মধ্যযুগের বাংলা কাব্যসাহিত্যের ধারাকে আধুনিক যুগে বাংলা গদ্যে অনুসরণ করেনি, তাই বাংলা কথাসাহিত্যের আবির্ভাব বিলম্বিত হয়েছে অকারণে। সংস্কৃত সাহিত্যের নিবিড় সাহচর্যের কারণে বাংলা উপন্যাস আরও দ্রুত পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। ‘বেতালপঞ্চবিংশতি’, ‘কুমারচরিত’, ‘কাদম্বরী’ জাতীয় গদ্যকাব্যের ধারা অনুসৃত হলেও বাংলা কথাসাহিত্যের আবির্ভাব এত বিলম্ব হতো না।
ইউরোপ ও পৃথিবীর অন্যান্য দেশে মধ্যযুগে কাহিনীনির্ভর সাহিত্যের প্রাধান্য ছিল। আধুনিক যুগের উপন্যাসের লক্ষণযুক্ত প্রথম রচনার সন্ধান পাওয়া যায় জাপানে। আনুমানিক ১০০০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি কোনো এক সময় মুরাশাকি নামে এক অভিজাত মহিলার লেখা ‘গেঞ্জি মোনোঙ্গাতারি’ নামে গ্রন্থটিকে পৃথিবীর প্রথম উপন্যাস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে, গদ্যে নির্মিত ‘পিকারেস্ক’ জাতীয় কাহিনীর বিবর্তনের সমৃদ্ধ ইতিহাস থেকে জানা যায়, আধুনিক উপন্যাসের সার্বিক প্রস্তুতি চলেছে ইউরোপে। স্পেনীয় ভাষায় ‘পিকারো’ শব্দটির অর্থ ‘দুর্বৃত্ত’। পিকারেস্ক হচ্ছে দুর্বৃত্ত বা দুর্নীতিপরায়ণ চরিত্রের ইতিবৃত্তমূলক কাহিনী। ইউরোপে বিভিন্ন ভাষায় পিকারেস্ক নভেলের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও বিস্তৃতি ঘটেছে সপ্তদশ শতাব্দীতে। বস্তুত, পিকারেস্ক নভেলের জন্ম মধ্যযুগীয় রোমান্সের বীরত্বপূর্ণ কাহিনীর অবিশ্বাসজনিত প্রতিক্রিয়া থেকে। মহাকাব্য, পুরাণকাহিনী, লোককাহিনীর রূপকথা, উপকথার কল্পকাহিনীর সাহিত্যের কাঠামো পাল্টে উপন্যাসের শিল্পরূপ পেতে নিরন্তর বিবর্তন-বিকাশ চলেছে ষোড়শ, সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে। তবে উপন্যাসের বাস্তব বিকাশ ঘটেছে উনিশ শতকে। মানুষের আধুনিক জীবন-জিজ্ঞাসার উপলব্ধি উনিশ শতকের। অদৃষ্ট শক্তির নিয়ন্ত্রণে সপিতভাগ্যের মুক্তির কালও এই শতক।
উনিশ শতকীয় ব্যক্তিচৈতন্যের গণতান্ত্রিক জাগরণের কালপটে ইউরোপে যখন উপন্যাস সমৃদ্ধ ও প্রতিষ্ঠিত একটি শিল্পমাধ্যম, তখন বাংলাসাহিত্যে প্রস্তুতিপর্ব চলছে। আধুনিক ভারতের জনক রাজা রামমোহন রায়ের (১৭৭২-১৮৩৩) ধর্মাশ্রিত যুক্তিবাদ ও মানবিকতার ধারণা বাঙালির আত্মানুসন্ধানের পথকে যথেষ্ট প্রসারিত করেছে। বাংলা কথাসাহিত্য সৃষ্টির সকল সম্ভাবনাই জন্মেছিল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের (১৮২০-১৮৯১) মধ্যে। তার শিক্ষা, চারিত্রিক দৃঢ়তা, ব্যক্তিত্ব, জীবনবীক্ষণ সবকিছুই একটি গল্পের বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। কিন্তু সেই সম্ভাবনাও বাস্তবরূপ পায়নি সমাজসংস্কারের গুরুভার বহন করতে গিয়ে। একই সম্ভাবনা জেগেছিল ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের (১৭৩২-১৮১৯) মধ্যে; পর্যাপ্ত ব্যক্তিত্ব ও গদ্যভাষা তৈরি করতে পারেননি বলে তা বাস্তব হয়নি। ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৭৮৭-১৮৪৮) ‘নববাবু বিলাস (১৮২৫)’ ও হ্যানা ক্যাথারিন ম্যুলের (১৮২৬-১৮৬৯) প্রচারধর্মী অনুবাদমূলক গদ্যাখ্যান ‘ফুলমণি ও করুণার বিবরণ (১৮৫২)’, এবং ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের (১৮২৪-১৮৯৮) ঐতিহাসিক উপাখ্যান বলে খ্যাত ‘সফল স্বপ্ন’ ও ‘আঙ্গুরীয় বিনিময়’ বাংলা উপন্যাসের প্রস্তুতিপর্বে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হলেও প্যারিচাঁদ মিত্র ওরফে টেকচাঁদ ঠাকুরের (১৮১৪-১৮৮৩) নক্সাজাতীয় রচনা ‘আলালের ঘরের দুলাল (১৮৫৮)’ উপন্যাসের সর্বাধিক বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করেছে এবং প্রস্তুতি পর্বের শেষধাপ হিসেবে বিবেচিত।
ইউরোপে বিকশিত উপন্যাসের কোনো চেহারাই প্রস্তুতিপর্বের গদ্যাখ্যানগুলোতে পাওয়া যায় না। তার জন্য বাংলার প্রথম গ্র্যাজুয়েট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-১৮৯৪) আগমন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। তার ‘দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫)’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম শিল্পশাসিত খাঁটি উপন্যাস। উপন্যাসের ‘কায়া’ ও ‘কান্তি’ দুটিই নির্মাণ করেছেন তিনি। বাংলা উপন্যাসের পাঠকপ্রিয়তা সৃষ্টির গৌরবও তার। তার রচিত ছোট-বড় চৌদ্দটি উপন্যাস বাংলা উপন্যাস সাহিত্যের স্থায়ী বুনিয়াদ নির্মাণ করেছে। বাংলা গদ্যের সার্থক মুক্তিদান করে বাঙালির চিন্তার দ্বার প্রসারিত করে সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশের পথ উন্মোচন করে দিয়েছেন বঙ্কিমচন্দ্র, যা বাংলা সাহিত্যে মাইকেল মধুসূদন দত্তের কৃতিত্বের সঙ্গে তুলনা করা যায়। বঙ্কিমচন্দ্রের এই উত্তরাধিকার নিয়ে কথাসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) আবির্ভাব। তার প্রথম প্রকাশিত দুটি উপন্যাস ‘বউ-ঠাকুরানীর হাট’ (১৮৮৩)’ ও ‘রাজর্ষি’ (১৮৮৭) বঙ্কিমচন্দ্রের রোমান্সধর্মী উপন্যাসের পথানুগামী। প্রতিভার স্বাতন্ত্র্য, সময় বাস্তবতা ও সমাজধর্মের পার্থক্যের কারণে বঙ্কিমের রোমান্সধর্মী ঐতিহাসিক ধারায় খুব বেশি দিন নিজেকে আটকে রাখতে পারেনি রবীন্দ্রনাথ। সেই ধারা থেকে খুব দ্রুত বেরিয়ে এসে বাংলা উপন্যাসের নতুন একটি সড়ক নির্মাণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ বাংলা উপন্যাসের বাস্তবতার মৌলিক প্রবর্তক, মনস্তাত্ত্বিক ধারার প্রবর্তকও তিনি। বঙ্কিমচন্দ্রের মৃত্যুর প্রায় ১০ বছর পরে লেখা ‘চোখের বালি’ (১৯০৩) উপন্যাসেই প্রচলিত উপন্যাসের ধারণাটাকে পাল্টে ফেলেছেন রবীন্দ্রনাথ। এই একটি মাত্র উপন্যাসই বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের চালু গঠনকাঠামোকে একেবারে উল্টিয়ে দিয়ে নতুন বুনিয়াদ নির্মাণ করেছে।
রবীন্দ্রনাথ বাংলা কথাসাহিত্যের একাংশ উপন্যাসের প্রধানশিল্পী, অপরাংশ বাংলা ছোটগল্পের পথিকৃৎ ও সংজ্ঞাকারক। উনিশ শতকের পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার অগ্রসরমান বাস্তবতায় বহুমাত্রিক জটিলতা ও অপূর্ণতার আধার হয়ে ওঠে আধুনিক মানুষের জীবন। উপন্যাসের ক্যানভাসে যতভাবেই ধরা হোক না কেন ছোট ছোট কিছু দুঃখ, কিছু ব্যথা, অপ্রাপ্তি, অজ্ঞাত ভাবনা, অখ্যাত কর্ম যেন আড়ালেই থেকে যাচ্ছিল বা উপন্যাসের লেন্সে অতিসূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো ধরা পড়ছিল না, জীবনের এই প্রবণতা প্রকাশের জন্য নতুন আঙ্গিকের শিল্পরূপ হিসেবে ছোটগল্পের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। বোকাচ্চিও, চসার, র্যাঁবেল, সারভান্টেসের আর্ভিঙ, গী দ্য মোঁপাসা, এডগার এলান পো, নিকোলাই গোগোলÑ এদের সবার সাধনায় বিশ্বসাহিত্যে ছোটগল্পের আঙ্গিকরূপ গড়ে উঠেছে। রোমান্টিক কবিতার সঙ্গে ছোটগল্পের আত্মিক মিল অত্যন্ত নিবিড়। যে কারণে উনিশ শতকের রোমান্টিক কবিতার যুগে ছোটগল্পের জন্ম এবং বিকাশ। তবে ছোটগল্পের পূর্ণ বিকাশকাল হলো উনিশ শতকের মধ্য ও শেষভাগ। তাই বাংলা ছোটগল্পের সার্থক সৃষ্টি রোমান্টিক কবি রবীন্দ্রনাথের হাতেই ঘটেছে। ইউরোপে শিল্প বিকাশের প্রেক্ষিতে বাংলা ছোটগল্পের সৃষ্টি ও বিকাশ হলেও বাঙালির জীবনপ্রবাহের স্বচ্ছন্দ গতিকে প্রবেশ ঘটিয়ে বাংলা উপন্যাসের তুলনায় বাংলা ছোটগল্পকে আরও বেশি নিজেদের সম্পদ করে তুলেছেন রবীন্দ্রনাথ।
রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস ও গল্পের সমাজতন্বিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণী ধারার অনুসরণ করেছেন জনপ্রিয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৮-১৯৩৮)। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কাব্যানুভূতি ও তত্ত্বজ্ঞানে সহজাত উপলব্ধি না থাকায় খুব দ্রুতই শরৎচন্দ্র রবীন্দ্রঘরানা থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেও তিনি মূলত, বঙ্কিমী ধারারই সার্থক উত্তরসূরি। বাংলা কথাসাহিত্যকে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের বাইরে নিম্নবিত্তের জীবন, মেসের ঝি, চাকর, পতিতা, মালো-দুলো-কৈবর্ত-জোলার, যাদের অস্পৃর্শ ও পাপ বলে দূরে ঠেলা হয়, শরৎচন্দ্র সেই জীবনকে গল্প-উপন্যাসের প্রাঙ্গণে প্রবেশাধিকার দিয়ে বাংলা কথাসাহিত্যে গণতান্ত্রিকতাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
বাংলা কথাশিল্পের তিন প্রধান পুরুষÑ বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের হাতে বাংলা কথাসাহিত্যের একটি সার্থক বলয় তৈরি হয়েছিল। প্রতিষ্ঠিত এই বলয়ের বাইরে কথাসাহিত্যের পরিচর্চা করেছে কল্লোলগোষ্ঠীর লেখকবৃন্দ। কল্লোল যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্যই ছিল বিদ্রোহ, আর এই বিদ্রোহের প্রধান কাজ ছিল রবীন্দ্র বিরোধিতা। পুঁজিবাদের বিস্ময়কর উত্থান, প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে সমাজ, রাজনীতি, ধর্ম, নীতি-নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের পুনর্বিন্যাস, ক্ষুধা, দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্যের যূপকাষ্ঠে পতিত বিপুল জনগোষ্ঠীর আর্ত-হাহাকার কল্লোলের তরুণ লেখকদের রবীন্দ্রনাথের আস্তিবাচক স্বপ্নরাজ্য থেকে নেতিবাচক চিন্তার রাজ্যে প্রবেশ করিয়েছে। অবক্ষয়িত ও হতাশাগ্রস্ত মন নিয়ে তারা বিচরণ করেছে কয়লাকুঠিতে, ফুটপাতে, খোলা বস্তিতে, পরিত্যক্ত ও নিষিদ্ধ এলাকায়। কল্লোল চেতনার শ্রেষ্ঠ রূপকার ছিলেন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত (১৯০৩-১৯৭৬)। এ ছাড়াও উল্লেখযোগ্য কথাশিল্পী হলেন শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় (১৯০১-১৯৭৬), বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (১৮৯৯-১৯৭৯), প্রেমেন্দ্র মিত্র (১৯০৪-১৯৮৮), বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪) প্রমুখ।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৫০), তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১) ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯১০-১৯৫৬) এই তিনজন কল্লোলযুগের কিন্তু কল্লোলগোষ্ঠীর ছিলেন না। তারা বাংলা কথাসাহিত্যকে ইউরোপীয় শাসনমুক্ত করে বাঙালির জীবনদর্শন নির্মাণে একটি নিজস্ব ভাষা তৈরি করেছেন। আধুনিক নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবন ও লোক ঐতিহ্যের গ্রামীণ জীবনকে উপন্যাস ও গল্পের পটভূমিতে নিয়ে এসে বাঙালির বাস্তব জীবনালেখ্য নির্মাণ করেছেন। বিভূতিভূষণের গল্প-উপন্যাসে আমাদের গ্রাম বাংলার বাস্তব সুরটি ধরা পড়েছে। তার রচনায়ও ক্ষুধা, দারিদ্র্য, রোগ-শোক, নিপীড়ন, বঞ্চনা, জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির প্রশ্ন আছে। কিন্তু সমকালের কল্লোলের লেখকদের মতো সংশয়পীড়িত চোখ নিয়ে তাকাননি, বাস্তব চোখ দিয়ে তাকিয়েছেন। যে কারণে, ‘পথের পাঁচালী’র অপু, দুর্গা, সর্বজায়া, হরিহরÑ এরা আজন্ম দারিদ্র্যপীড়িত, দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই তাদের নিরন্তর, জীবনের লাভ-লোভের প্রশ্নও আছে। কিন্তু জীবনের প্রতি বিশ্বাস হারায়নি। দারিদ্র্যের নিষ্ঠুরতা আছে, অজস্র অভাব-অনটন আছে, কিন্তু প্রকৃতির বিরল ঐশ্বর্যে লালিত পল্লীবাংলার জনজীবন ও প্রকৃতির যে ছবি বিভূতিভূষণের গল্প-উপন্যাসে পাই, তার মধ্যে বাংলার যথার্থ ইতিহাস নিহিত। তারাশঙ্করের গল্প-উপন্যাসে বাংলার নতুন আর এক বাস্তবতার ছবি পাই, তার একদিকে ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা, অন্যদিকে নবগঠিত যান্ত্রিকসভ্যতা। আঞ্চলিক কথাসাহিত্য রচনার পথিকৃৎ তারাশঙ্করের প্রথম পর্বের গল্প-উপন্যাসে পাই রাঢ়বঙ্গের একটি প্রামাণ্য ও বিশ্বস্ত সমাজচিত্র। দ্বিতীয় পর্বে ক্ষমতাকেন্দ্রিক জাতীয় কংগ্রেস দলীয় রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংস্রব ও আনুকূল্যে মোহাবিষ্ট হয়ে ‘পরিবর্তিত দেশকালের বিরূপতাÑক্ষুধা-দারিদ্র্য-বেকারত্ব-বাস্তুসংকটÑ স্বাধীনতার অনুষঙ্গে প্রাপ্ত এই বাস্তবিক উত্তরাধিকারকে তিনি অস্বীকার করলেন এবং ভিন্নমাত্রিক আকর্ষণে রাষ্ট্রশক্তির প্রতিভূ কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাহিত্যিকÑ মুখপাত্র পরিচয়ে তিনি স্বস্তি অনুসন্ধান করলেন।’ (ভীষ্মদেব চৌধুরী)
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ‘মধ্য-বিশ-শতকের বাংলাদেশের সামাজিক বিশৃঙ্খলার ঘনিষ্ঠ রূপকার।’ তার সৃষ্টির বিরাট ক্যানভাস মধ্যবিত্ত মানুষদের দখলে। স্বশ্রেণির স্বরূপ সন্ধানে তিনি ছিলেন আপসহীন। মধ্যবিত্তশ্রেণির জীবনবাস্তবতা রূপায়ণে অত্যন্ত সচেতনভাবেই মানিক এড়িয়ে গেছেন বাস্তবতাবর্জিত কল্পনাপ্রসূত আবেগ-উচ্ছ্বাসকে। বিশ শতকের সামাজিক বাস্তবতা এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাই তাকে এ পথে ঠেলেছে। জীবন, জগত, ব্যক্তি ও সমাজ সম্পর্কে কল্লোলের লেখকদের মধ্যবিত্সুলভ রোমান্টিক ভাবাবেগের প্রশ্রয় দেননি মানিক। কল্লোল-কালিকলমে মানিকের কোনো লেখা প্রকাশিত হয়নি। মানিক যখন পরিপূর্ণ লেখক, তার পূর্বেই পত্রিকা দুটির প্রচার বন্ধ হয়ে গেছে। ‘কল্লোল চেতনার যথার্থ ধারাবাহী না হলেও, জটিল জীবন-সমস্যার রূপবিন্যাসে ও জীবন সম্পর্কে প্রথাবিরুদ্ধ বিদ্রোহ চেতনায় তিনি অনেকাংশে এদেরই সমধর্মী।’ (চৌধুরী) মানুষের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ এবং ভেতরে লুক্কায়িত অমিত সম্ভাবনার আবিষ্কারে মানিকের বিস্ময়কর সহজাত ক্ষমতা ছিল। জীবনকে নির্মোহ ও নিরপেক্ষভাবে দেখেছেন। আর তা সম্ভব হয়েছে প্রখর বিজ্ঞানচেতনার ফলে। ‘একজন আদিম মানুষ যেন নিরঞ্জন দৃষ্টিতে বাঙালী মধ্যবিত্ত সমাজকে দেখে নিচ্ছে, তার ওপরে সমস্ত বর্ণ-প্রলেপের নেপথ্যে যে ভণ্ডামি, স্বার্থবাদ আর কূটকামনার সর্পিল প্রবাহ বইছেÑ তার কিছুই তার চোখকে এড়িয়ে যায়নি।’ (সৈয়দ) তার গল্পের অসুস্থ, বিকারগ্রস্ত, উদ্ভ্রান্ত প্রকৃতির চরিত্রগুলো ‘আমাদেরই রূগ্ণতার প্রতিবিম্ব।’
ফ্রয়েডীয় মনোবিকলন ধারণা মানিকের গল্প-উপন্যাসে যতটা শিল্পিত হয়ে এসেছে, আর কারও লেখায় আসেনি। তবে মানিক এ সত্যও উপলব্ধি করেন, যৌন সমস্যার মতো মানুষের জীবনে অর্থনৈতিক সমস্যাও গুরুত্বপূর্ণ। বরং তা যৌন প্রবৃত্তির চেয়েও মানুষের জীবনের বেশি মৌলিক শক্তি। এই বিশ্বাস থেকে কমিউনিস্ট পার্টিতে (১৯৪৩) যোগ দিলে তার সৃষ্টির বাঁকবদল ঘটে। মতাদর্শ পরিবর্তনে মার্কসীয় আদর্শের পাঠক-সমালোচকরা সাধুবাদ জানিয়েছেন, অন্যদিকে অনেকে জাতীয় জীবনের ভাঙা-গড়ার ইতিহাস, শক্তিমানের অশুভ দাপট, শ্রমিক-মালিকের দ্বন্দ্ব, স্বাধীনতা আবেগের কাঙ্ক্ষিত রূপায়ণ ঘটেনি বলে মানিকের প্রতিভার মৃত্যু ঘটার কথা বলেছে।
তিরিশের দশকের বাংলা কথাসাহিত্যের অখণ্ড বিকাশের সুযোগে সমৃদ্ধি ঘটেছে। কিন্তু চল্লিশের দশকেই বাংলা কথাসাহিত্য ভাঙনের কবলে পড়ে। বাংলাদেশের সাহিত্য নামে নতুন একটি ধারা সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, সমসাময়িক দুর্ভিক্ষ, মহামারি, স্বরাজ আন্দোলন, পাকিস্তান আন্দোলন, ভারতীয় রাজনীতিতে বাংলায় অনেকটা স্বতন্ত্র রাজনৈতিক মেরুকরণ, দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগ, বাংলার দুই অংশ দুই দেশের অন্তর্ভুক্তি, বাঙালির দ্বিখণ্ডিত জাতিসত্তা ইত্যাদি ঘটনা বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের সক্রিয় উপাদান। বাঙালির সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের স্বাতন্ত্র্য এবং প্রতিকূল ভূগোল পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির বিপরীতে ছিল। পাকিস্তান জন্মের পর থেকেই অস্তিত্বের সংকট তৈরি হয়েছিল। বাঙালির মতো বড় ও বাস্তব এক ঐতিহাসিক জাতিকে কুক্ষিগত করে হজম করার অপচেষ্টা চালিয়েছিল। সামরিক, শাসনতন্ত্র, ভাষা, শিক্ষা, শিল্প, স্বাস্থ্য, কৃষি ইত্যাদি ইস্যুতে পাকিস্তানিদের ফ্যাসিবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে ক্রমশ হতাশ বাঙালি কিছুদিনের মধ্যে জেনে যায় একটি অলিক ও অবাস্তব স্বপ্নের মোহে পড়ে নব্য ঔপনিবেশিক শোষণের কবলে পড়েছে। বাঙালির মোহভঙ্গ শুরু হয়। বাংলার প্রগতিশীল ও জনপ্রিয় মুসলিম নেতৃবৃন্দকে জাতির কাছে হেয় ও দুর্বল করে দিতে ঘৃণ্য অপতৎপরতা চলে প্রথম থেকেই। বিশেষত, ১৯৪৬-এর নির্বাচনে জয়ী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সরকারকে ষড়যন্ত্রের ফাঁদে ফেলে উৎখাত করে জিন্নাহর অনুগত নাজিমউদ্দীন ও নুরুল আমিনরা ক্ষমতার কেন্দ্র চলে এলে বাঙালির স্বপ্ন, বিশ্বাস ও প্রত্যাশার এক প্রকার অপমৃত্যু ঘটে। প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীতে ভূস্বামী, ধর্মান্ধ, পীর-মাসায়েকের একাধিপত্য বিস্তার করে বাংলাকে পশ্চাৎপদ ইসলামী রাষ্ট্র গড়ার জন্য এগিয়ে যায়। আর এই কাজে বাঙালির সেকুলার চিন্তাচেতনা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জীবনচর্চার ধারা প্রধান বাধা। আর সবচেয়ে দুর্ভেদ্য বাধা হচ্ছে, বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য ও বাঙালি সংস্কৃতি, এককথায় বাঙালিত্ব। তাই বাঙালিত্বের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পাওয়ার ব্যবহার করে চিরকালের জন্য পূর্ববাংলাকে পাকিস্তানের কলোনি করার সব প্রচেষ্টা করেছে প্রকাশ্যে ও আড়ালে। পাকিস্তানের সংহতি ও ইসলামের দোহাই দিয়ে বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতিকে ভারতীয় ও হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাবমুক্ত করে ধর্মাদর্শ অনুয়ায়ী পুনর্বিন্যাস করার লক্ষ্যে একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে গেছে। সরকারের সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করেছে নবজাগরিত পাকিস্তানপন্থি বাঙালি বুদ্ধিজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিল্পী-সাহিত্যিক, মিডিয়া, সংগঠন ও সংস্থা। ফলে যেকোনো আক্রমণেই সরকার পূর্ববাংলার ভেতরের বিশেষ গোষ্ঠীর সমর্থন পেয়েছে। অন্যদিকে সরকার ও তার প্রতিক্রিয়াশীল বুদ্ধিজীবী ও শিল্পী-সাহিত্যিকরা যত আগ্রাসী হয়েছে, তার দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, শিল্পী-সাহিত্যিক, সংগঠন পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে আন্দোলনে নেমেছে। এই সময়কালের কথাসাহিত্যের ‘বিষয় ভাবনায় অনিবার্য হয়ে উঠেছে প্রগতি ও প্রতিক্রিয়ার দ্বন্দ্বময় প্রকাশ।’ (খান) বিকাশমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশকে অবরুদ্ধ করে সামাজিক-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধ্যত্ব সৃষ্টিতে ধর্মকেই ব্যবহার করেছে প্রধান ধর্ম হিসেবে। কিন্তু বাঙালির সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জীবনবিন্যাসের অন্তঃশীলা পরিবর্তনের স্রোতকে আটকাতে পারেনি। এই প্রেক্ষিত, বাংলা কথাসাহিত্যের চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে স্বতন্ত্র বিষয় ও আঙ্গিক তৈরিতে প্রধান ভূমিকা রাখে। যেহেতু মধ্যবিত্ত শ্রেণি অবিকশিত, নগরায়ণ বিলম্বিত এবং ধর্মকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ধর্মাশ্রিত স্বল্পশিক্ষিত গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে জিম্মি করে পাকিস্তানি শাসকবর্গ পূর্ববাংলাকে শোষণের অভয়ারণ্য বানিয়েছে, সেই বাস্তবতায় কথাশিল্পীরা গল্প-উপন্যাসের বিষয় উপাদান হিসেবে বেছে নিয়েছেন গ্রামীণ জীবন ও জনপদকে। কলকাতার পাশাপাশি ঢাকাকেন্দ্রিক সাহিত্যের একটি বিশেষ স্রোত তৈরি হয়, যা বাংলাদেশের সাহিত্য নামে পরিচিতি পেয়েছে। বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্র, কল্লোলগোষ্ঠী ও তিরিশের তিন বন্দ্যোপাধ্যায়সহ শক্তিমান কথাশিল্পীর হাতে বাংলা কথাসাহিত্য যে উৎকর্ষ লাভ করেছে, সেই উত্তরাধিকার নিয়েই ঢাকাকেন্দ্রিক কথাসাহিত্যের যাত্রা। দেশবিভাগের পূর্বে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমানের কথাসাহিত্যে অবদান উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ছিল না। বাংলা কথাসাহিত্যের বঙ্কিমীয় বিকাশের কালে ধর্মীয় সংস্কার চেতনাবশত কথাসাহিত্য চর্চাকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি মুসলমানরা। মীর মশাররফ হোসেন ও কাজী নজরুল ইসলাম কথাসাহিত্য চর্চা করেছেন, কিন্তু তাদের কোনো রচনাই খাঁটি উপন্যাস বা গল্প হয়ে ওঠেনি। প্রাক-পাকিস্তান পর্বে কাজী আব্দুল ওদুদের (১৮৯৪-১৯৭০) ‘নদীবক্ষে’ (১৯১৯) ও হুমায়ুন কবিরের (১৯০৬-১৯৬৯) ‘নদী ও নারী’ (১৯৪৫) উপন্যাস দুটির নাম উল্লেখ করা যায়। চল্লিশের দশকে বাংলা কথাসাহিত্যে উজ্জ্বল সম্ভাবনা নিয়ে আবির্ভাব ঘটেছে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর (১৯২২-১৯৭১)। তার প্রথম উপন্যাস ‘লালসালু’ (১৯৪৮) ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়। চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশক বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ একটি ধারা প্রতিষ্ঠার কাল। এই প্রতিষ্ঠা পর্বে যারা অবদান রেখেছেন তারা হলেন আবুল ফজল (১৯০৩-৮৩), আবুল মনসুর আহমেদ (১৮৯৭-১৯৭৯), সত্যেন সেন (১৯০৭-১৯৮১), সোমেন চন্দ (১৯২০-৪২), আবু ইসহাক (১৯২৬-২০০৩), মাহবুব-উল্ আলম (১৮৯৮-১৯৮১), শাহেদ আলী (১৯২৪-২০০১), আবু রুশদ (১৯১৯-), কাজী আফসার উদ্দীন (১৯২১-৭৫), সরদার জয়েনউদ্দীন (১৯২৩-), শওকত ওসমান (১৯১৯-১৯৯৮), শামসুদ্দীন আবুল কালাম (১৯২৬-১৯৯৯), শহীদুল্লা কায়সার (১৯২৫-৭১), জহির রায়হান (১৯৩৩-১৯৭২), রাজিয়া খান (১৯৩৬-), আবু জাফর শামসুদ্দীন (১৯১১-১৯৮৮), সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫), আলাউদ্দীন আল আজাদ (১৯৩২-২০০৯), রশীদ করীম (জন্ম ১৯২৫), আব্দুল গাফফার চৌধুরী (জন্ম ১৯৩৪) প্রমুখ। উল্লিখিত কথাশিল্পীদের প্রত্যেকেই ছিলেন প্রবলভাবে জীবনবাদী, সমাজ ও রাজনীতি সচেতন। তাদের গল্পের বিষয় হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছে বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, মন্বন্তর, দাঙ্গা, উদ্বাস্তু সমস্যা।
গ্রামনির্ভর কথাসাহিত্যের এই ধারাটি ক্ষীণ হয়ে আসে ষাটের দশকে। এই সময় অগ্রজ গল্পকারদের অনেকেই গল্পের ভুবন থেকে এক প্রকার প্রস্থান করলে একদল নতুন প্রজন্মের গল্পকার উঠে আসে। হাসান আজিজুল হক (জন্ম ১৯৩৯), জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত (জন্ম ১৯৩৯) আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১৯৪৩-১৯৯৭), আব্দুস শাকুর (জন্ম ১৯৪১), রশীদ হায়দার (জন্ম ১৯৪১), রিজিয়া রহমান (জন্ম ১৯৩৯) শওকত আলী (জন্ম ১৯৩৬), বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর (জন্ম ১৯৩৬) আব্দুল মান্নান সৈয়দ (১৯৪৩-২০১০) আহমদ ছফা (১৯৪৩-২০০২) প্রমুখ ষাটের দশকের গল্পকার। ষাটের দশকের তরুণ প্রজন্মের গল্পকারদের প্রায় সবারই জন্ম ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চার বছরের উত্তাল বিশ্ব, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশভাগ ও সৃষ্ট জটিলতা হিসেবে কোটি কোটি উদ্বাস্তু মানুষের অসহায়ত্ব-ইতিহাসের এই বাস্তবতার প্রভাব পড়েছে ষাটের দশকের তরুণ কথাশিল্পীদের মানস গঠনে। তারপর স্বাধীন পাকিস্তান আমলে বাঙালির স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন থেকে স্বাধিকার আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, গণতন্ত্রের অপমৃত্যু ও সেনাশাসন, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশের বাস্তবতা সবই ষাটের দশকের গল্পকারদের প্রধান অনুষঙ্গ হয়েছে। এই দশকেরই একজন প্রধান গল্পকার আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের দৃষ্টিতে সময় সংকট ধরা পড়েছে এভাবেÑ
‘ঐ যে সেনাবাহিনীর থাবার নিচে পড়লাম, সারাটা যৌবনকাল চলে গেল তারই সাঁড়াশির ভেতর, আজও তা থেকে রেহাই মিলল না। মার্শাল ল’র জগদ্দল পাথরে চাপা পড়ে যে কিশোর পরিণত হলো যুবকে, যৌবনকাল পার করে দিয়ে আজ সে পক্বকেশ প্রৌঢ়, তার বৃদ্ধি কি আর পাঁচটা মানুষের মতো হতে পারে? তার ক্ষোভ, তার গ্লানি, তার ব্যর্থতা, তার অসহায়ত্ব, তার অসন্তোষÑ এসবই কি আমার সময়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য।’
বাঙালির জাতীয় জীবনে ঘটে যাওয়া ভাষা আন্দালন, স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতার আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান বাঙালি মুসলমানের পায়ের নিচে পরিপূর্ণ বাঙালিত্বের জমিন তৈরি করেছে, মুক্তিযুদ্ধ সেই জমিনকে পাকাপোক্ত দালিলিক স্বীকৃতি এনে দিয়েছে। জীবন ও সম্পদের বিরাট ধ্বংসযজ্ঞ, খুন-লুটপাট-ধর্ষণ-বলাৎকারের মধ্য দিয়ে বাঙালি মুসলমান বেরিয়ে আসে তার আত্মপরিচয়ের ধোঁয়াটে বাস্তবতা থেকে। বাঙালির অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য, ভাষা ও সাহিত্য, জীবনবিন্যাস নিয়ে গড়ে ওঠে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সরকার ও সংবিধান। প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্র ভাষা বাংলাÑ এ স্বীকৃতি ঘটে বাংলা ভাষার। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক অগ্রগতির একটি সুবর্ণরেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু এই সুবর্ণরেখা কালো বিবর্ণ ও বিষাদের রেখায় পরিণত হতেও বেশি দিন সময় লাগেনি।
বিরাট এই প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির স্বাধীনতার বাস্তব পরিণতি কী এবং চার দশকে স্বাধীনতার প্রার্থিত সুখ-সমৃদ্ধি-অগ্রগতির কতটুকু অর্জিত হয়েছে এবং কারা ভোগদখল করেছে, এই ইতিহাস এখন আর কারও অজানা নেই। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে জাতির জনককে সপরিবারে নৃশংসভাবে খুন করে খুব স্বাচ্ছন্দ্যে চালু করেছে পাকিস্তানি গণতন্ত্র। বন্দুকের নলের মুখে একবার করে ক্ষমতার রদবদল ঘটে, আর একটি করে গণতন্ত্রের ফর্মুলা আসে, গণিত পরীক্ষার খাতার মতো কাটাকুটি করে শোষণের অনুকূল একটি সংবিধান তৈরি করে, যেখানে ধর্ম সিন্দাবাদের জাহাজের মতো বিশালাকায় বৈতরণী। বাকসর্বস্ব, বিবেকমৃত, স্বার্থান্ধ, সুনীতি-সুশিক্ষাবর্জিত, চামার-পামর জাতীয় কিছু মানুষ, যারা মানুষের চেহারা নিয়ে থাকলেও বাস্তবে জন্তু-জানোয়ারের চেয়ে বিবেকবর্জিত, তারা সমাজনীতি থেকে রাজনীতি, রাষ্ট্রযন্ত্রের তৃণমূল অর্থাৎ একেবারে গ্রাম-মহল্লা থেকে সংসদ ভবন দখলে নিয়ে খুব আয়েশের সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তানি শাসন, শোষণ, লোভ-লুটপাট, দুর্নীতি। রাজনীতির নামে অপরাজনীতি জন্ডিসের মতো স্বাধীন বাংলাদেশের শরীরে সেই যে বাসা বেঁধেছে, তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি বৈ মুক্তি নেই। চমৎকার এক বিধিব্যবস্থা করে নিয়েছেÑ একদল হারে তো আর এক দল জেতে। শোষণের চেহারার কোনো পরিবর্তন হয় না। গণতন্ত্রের চেহারায়ও কোনো পরিবর্তন হয় না। রাষ্ট্রের জনগণ, যাদের জীবন ও ক্ষতির বিনিময়ে স্বাধীনতা, তাদের এই সুখ-প্রাচুর্য, সেই জনগণের সঙ্গে না রাষ্ট্রের, না রাজনীতির কোনো সম্পর্ক আছে। গণতন্ত্র কী জিনিস, সেই জিজ্ঞাসার জবাবে অন্ধকে হাতি দেখানোর মতো চাতুরি আশ্রয় নিয়েছে। ইতিহাসের এই ট্র্যাজেডি আর কোথাও ঘটেছে কি না, জানি না। একটি দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন-সম্পদ-সম্ভ্রম বিলিয়েছে যে জনগোষ্ঠী, তারাই সেই রাষ্ট্রে অপাঙক্তেয়, অভুক্ত, অবাঞ্ছিত, আফ্রিকার কালো মানুষের মতো শোষণের শিকার। চালু ইতিহাসের এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা ভয়ানক হতাশা নিয়ে জেঁকে বসে একাত্তর-উত্তর গল্পকারদের মধ্যে।
মুক্তিুযুদ্ধের মহত্ত্ব নিয়ে গল্প লেখা হয়েছে বটে, কিন্তু কোনোটিই গল্প হিসেবে উত্তীর্ণ হয়ে ওঠেনি, যে অর্থে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যাশামৃত, বিষাদ-হতাশামাখা গল্পগুলো সফল হয়েছে। বাস্তব সত্যে, সার্বিকভাবে এখনও মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে মহৎ গল্প লেখা হয়নি। সৈয়দ শামসুল হক, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আবুবকর সিদ্দিক, আলাউদ্দিন আজাদ, সেলিনা হোসেন, সুশান্ত মজুমদারÑ এ রকম আরও কিছু গল্পকারের নাম উচ্চারণ করা যাবে, যাদের গল্প মুক্তিযুদ্ধের অর্জন ও মহত্ত্বকে ছুঁয়ে গেছে। এ ছাড়া স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে প্রতিশ্রুতিশীল অনেক গল্পকারের আবির্ভাব ঘটেছে, যারা বাংলা ছোটগল্পের বিকাশ ও বিস্তৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন। খালেদা এদিব চৌধুরী (১৯৩৯-২০০৮), কায়েস আহমেদ (১৯৪৮-১৯৯২), মকবুলা মনজুর (জন্ম ১৯৩৮), আবুল খায়ের মুসলেহ উদ্দিন (জন্ম ১৯৩৪), মাহমুদুল হক (১৯৪০-২০০৮), মঈনুল আহসান সাবের (জন্ম ১৯৫৮), মঞ্জু সরকার (জন্ম ১৯৫৩), অনামিকা হক লিলি (জন্ম ১৯৪৮), হুমায়ূন আহমেদ (জন্ম ১৯৪৮), পূরবী বসু (জন্ম ১৯৪৯), ভাস্কর চেীধুরী (জন্ম ১৯৫২), শহীদুল জহির (১৯৫৩-২০০৮), জুলফিকার মতিন (জন্ম ১৯৪৬), জাহানারা নওশীন, ইমদাদুল হক মিলন, হরিপদ দত্ত (জন্ম ১৯৪৭), নাসরিন জাহান (জন্ম ১৯৬৪), মামুন হুসাইন (জন্ম ১৯৬২) মহীবুল আজিজ (জন্ম ১৯৬২), জাফর তালুকদার (জন্ম ১৯৫২), রফিকুর রশীদ (জন্ম ১৯৫৭), সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম (জন্ম ১৯৫১), ইমতিয়ার শামীম (জন্ম ১৯৬৫), আহমাদ মোস্তফা কামাল (জন্ম ১৯৬৯), ওয়াসি আহমেদ (জন্ম ১৯৫৫), হুমায়ূন মালিক (জন্ম ১৯৫৭), জাকির তালুকদার (জন্ম ১৯৬৫), কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর (জন্ম ১৯৬৩) প্রমুখ স্বাধীনতা-উত্তর গল্পকারদের মধ্যে বিশেষভাবে স্মরণীয়। এ ছাড়া পাপড়ি রহমান, ঝর্ণা রহমান, সমীর আহমেদ, প্রশান্ত মৃধা, কবীর রানা, হাসান অরিন্দম, চন্দন আনোয়ার, আবু হেনা মোস্তফা এনাম, শাশ্বত নিপ্পন, নিরমিন শিমেল, লতিফ জোয়ার্দার, রেজা নূর, আবু নোমান, আকিম মাহমুদ, রেজা নূর, জাহেদ মোতালেব, নূরুন্নবী শান্ত, হামীম কামরুল হক, মহি মুহাম্মদ, পিন্টু রহমান, শাহনেওয়াজ বিপ্লব, মোহাম্মদ শোয়াইব, আহমদ জসিম, বদরুন নাহার, এমরান কবির, সোলায়মান সুমন, কাফি কামাল, সৈকত আরেফিন, মাজুল হাসান, স্বকৃত নোমান, আনিফ রুবেদ, ফজলুল কাবিরী, মোজাফ্ফর হোসেন, মেহেদী উল্লাহ প্রমুখ গল্পকারের নাম উচ্চারণ করা যায়, যারা নব্বই দশকের শেষের দিক এবং বিশ শতকের প্রথম দশক অর্থাৎ শূন্য দশক থেকে নিয়মিত লিখছেন; এ তালিকা তাৎক্ষণিক স্মৃতি থেকে সংগৃহীত এবং এই তালিকা নিঃসন্দেহে দীর্ঘ হবে।