তাসনুভা অরিন
প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০২৫ ১৮:১১ পিএম
মানুষ কি এখনও জানে চাঁদের অপর পৃষ্ঠে কী আছে?
উত্তরে বলবেন নিশ্চয়ই আছে, অসংখ্য বড় বড় গর্ত, কালো সমতল অঞ্চল এবং সাউথ পোলÑ এইটকেন বেসিন …এই তো। এরপর যদি প্রশ্ন করা হয়, এগুলো দেখেছেন? বলবেন বইয়ে পড়েছি বা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ছবি দেখেছি। কিন্তু রাতে যে চাঁদকে বছর বছর ধরে দেখে আসছেন, তাকে নিয়ে মিথের শেষ নেই। বুড়ির সুতা কাটা। আবার চাঁদমামাকে নিয়ে তো শেষ নেই। তাকেও কি দেখছেন?
আমরা খালি চোখে, চিত হয়ে শুয়ে আর যাই দেখি না কেন, চাঁদের উল্টো পাশ দেখি না। অভিমানও ঠিক সে রকম এক অনুভূতি, যা দেখি না কিন্তু বুঝি। যা ছিল কিন্তু হারিয়ে গেছে, যেন এক রক্তপাতহীন যুদ্ধভূমি খাঁ খাঁ করছে কিছু অমীমাংসিত কাঁটাতারসহ। কিংবা ফুল থেকে উড়ে যাওয়া তুলাও মনে রাখে তার শিমুল ঘ্রাণ, কেবল ফিরতে পারে না, যা ছিল এখন নেই, এমন এক অস্তিত্ব, নির্বাক অনুভূতিতে দারুণ সরব।
ঠিক রাগ কিংবা ক্ষোভ না, বিষাদ কিংবা দুঃখ নাÑ এক নীরব দূরত্ব যা প্রচণ্ড ভালোবাসা থেকে সৃষ্ট কিন্তু ভালোবাসায় থাকতে না পারার দুঃখে বিজড়িত। যেন চাঁদের উল্টো পাশ, রাগ করে মুখ ঘুড়িয়ে শুয়ে আছে, ফিরেও তাকাবে না, কথাও বলবে না। অথচ এই অনুভূতি যেন শেষ হয়েও হয় না শেষ। ছোটগল্পের মতো, অসমাপ্ত অনুভূতি ভেতরে বাজতেই থাকবে সন্ধ্যার ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজ হয়ে।
‘বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে নাÑ ইহা দূরেও ঠেলিয়া ফেলে।’ শ্রীকান্ত, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
কথা হচ্ছে দূরে ঠেলে দিলেও কি কিছু শেষ হয়ে যায়? অন্ধকারে যে শিখা জ্বলছিল, এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দেওয়ার পর কোথায় যায় আলোটা? ছিল কিন্তু নেই, আসলেই কী নেই?
‘আমাদের গেছে যে দিন / একেবারেই কি গেছে, / কিছুই কি নেই বাকি।’ তখন মনে হতে পারে ‘রাতের সব তারাই আছে/ দিনের আলোর গভীরে।’ Ñ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অভিমানের ইংলিশ Resentment, Grudge, Sullenness অথবা Hurt pride. এই শব্দগুচ্ছের ভেতর থেকে আমার কাছে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক মনে হয় ‘Resentment’ শব্দটিকে, যার অর্থ ‘মানসিক কষ্ট বা অবহেলার কারণে যে ক্ষোভ বা মন খারাপ হয়।’ তাহলে অভিমান, ভালোবাসা থেকে জন্ম নেয় কিন্তু ভালোবাসা সবসময় যে ভালোই থাকে, শান্তি দেয়, তা হয় না। ভালোবাসা একমাত্রিক কোনো বিষয় না। যদি তাই হতো পৃথিবীর চেহারা অন্যরকম হতে পারত। ভালোবাসা একই সঙ্গে আকর্ষণ আর বিকর্ষণের লীলা। যেমন তীব্র এর আকুতি তেমন তীব্র এর বিচ্ছেদ। যেন এক পৃথিবীর, এক গোলার্ধে রাত তো অন্যপাশ আলো। মূলত অভিমানকেই বলা যায় সেই বিচ্ছেদের প্রধান চাবিকাঠি। অভিমান মানুষকে ভালোবাসা থেকে না পারে কাছে আনতে না পারে দূরে সরাতে। মনকে পেণ্ডুলামের মতো করে কেবল তাড়িয়ে বেড়ায়। তাই এর যন্ত্রণা তীব্র। আর উপশম প্রায়শ জটিল। ভালোবাসা যে বহুমাত্রিক, তার কারণ মূলত অভিমান। তাহলে বলাই যায় অভিমান খুব সহজ কোনো বিষয় না।
‘এতকাল জীবনটা কাটিল উপগ্রহের মতো। যাহাকে কেন্দ্র করিয়া ঘুরি, না পাইলাম তাহার কাছে আসিবার অধিকার, না পাইলাম দূরে যাইবার অনুমতি।’ Ñ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
ভালোবাসায় মুক্তি থাকলেও অভিমানে মুক্তি প্রায় নেই। যেন দুইটা বিপরীতধর্মী আবেগ একসঙ্গে মন নিয়ে খেলছে সমান্তরালে। এই খেলা কিংবা যুদ্ধে যে জিতবে রাজত্ব তার। ভালোবাসাকে অভিমানের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়, তবে ভালোবাসা জিতে যায়, না হলে বিচ্ছেদের অন্ধকারে হারিয়ে যেতে হয়। ওই এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দেওয়া আলোর শিখার মতো। বলা যায় এই মানসিক টানাপড়েন ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের ওপরই নির্ভর করে অনেকটা হ্যামলেটের ‘To be or not to be’ আইডিয়ার মতো। এই টানাপড়েনে, ভালোবাসায় ফিরতে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় ব্যক্তির ইগো। ইগো সরিয়ে অবারিত ভালোবাসা যে বাসতে পারে, অভিমানের কুয়াশা কাটিয়ে প্রেমের সূর্য শৌর্য দেখা তারই কপালে জোটে। যদিও এ বিষয়ে কিন্তু আছে। যদি অবমূল্যায়নের মাত্রা বেশি হয়ে যায় অর্থাৎ অবহেলার মাত্রা যদি বেশি হয়ে যায়, তখন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বিসর্জন দিয়ে ভালোবাসার প্রতি একনিষ্ঠতা কী যুক্তিসংগত হবে?
‘প্রতি সন্ধ্যেবেলা আমার বুকের মধ্যে হাওয়া ঘুরে ওঠে, হৃদয়কে অবহেলা করে রক্ত;
আমি মানুষের পায়ের কাছে কাছে বসে থাকিÑ তার ভেতরের কুকুরটাকে দেখব বলে।’
Ñসুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
নিজেকেও তো ভালোবাসতে হবে। এই আগ্রহ থেকে জন্ম নেয় আত্মপ্রেম বা নার্সিসিজম। যেখানে ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির দ্বারা নয় বরং নিজেই নিজের প্রেমের রূপ এবং প্রকাশ হয়ে ওঠে। প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের চিন্তাধারা ও দর্শন অনুযায়ী অভিমানের ধরন, ধারণ ও স্বভাব আলাদা। প্রাচীন গ্রিক মিথ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় পাশ্চাত্যে অভিমানের চেয়ে ক্রোধ কিংবা ঘৃণা যেন বেশি, নার্সিসিজমও বেশি। হয়তো তারা ভাববাদের চেয়ে বস্তুবাদী বলেই এ রকম। তারা বিসর্জনে আগ্রহী না, তারা ছিনিয়ে নিতে বা বিজয়ী হতে পছন্দ করে বেশি, যার রূপ দেখা যায় হোমারের ইলিয়াডে। এখানে মেলেনাউসের স্ত্রী হেলেনকে প্যারিস অপহরণ করে নিয়ে যায়, যদিও এই অপহরণ রাবণের সীতা অপহরণের মতো না। এখানে প্রেমিক প্যারিস তার প্রেমিকা হেলেনকে যিনি মেলেনাউসের স্ত্রী উঠিয়ে নিয়ে যায় ভালোবেসেÑ যা মেলেনাউস কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি, যার ফলে ট্রয়ের যুদ্ধ। এখানে মেলেনাউস রবীন্দ্রনাথের মতো গাইতে পারেনিÑ
‘যদি আর-কারে ভালোবাসো, যদি আর ফিরে নাহি আস,
তবে, তুমি যাহা চাও, তাই যেন পাও, আমি যত দুখ পাই গো।’
হেলেন-প্যারিসের প্রেমকে দেখেছে তার প্রতি হওয়া অন্যায় এবং থ্রেট হিসেবে, একই সঙ্গে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারী হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ক্ষোভ থেকে। পরিণামে ভয়ংকর যুদ্ধ এবং যুদ্ধে জয়ী হয়ে প্যারিসকে হত্যা করে হেলেনকে ফের নিজ রাজ্যে ফিরিয়ে আনা। ওদিকে আহত প্যারিস তার প্রথম স্ত্রী ঈনোনেকে যিনি নিরাময়ে সক্ষম, জীবন সন্ধিক্ষণে ডাকলেও ঈনোনে আর ফিরে আসেনি এবং মরতে দিয়েছিল প্যারিসকে। এইসব চরিত্র বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় পাশ্চাত্যে অভিমান নয় ক্ষোভ, রাগ, প্রতিহিংসা বেশি। কিন্তু প্রাচ্যের রূপ এর বিপরীত। অভিমান বিষয়টা প্রাচ্যের একটি বৈশিষ্ট্য বলা যায়।
যেমন সীতা তার সতীত্বের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরেও প্রজাদের প্রশ্ন ‘লঙ্কা থেকে ফিরেছে, সীতাকে কি সত্যিই গ্রহণ করা উচিত?’ এর উত্তরে ব্যথিত ও মৌন স্বামীর প্রতি অভিমান থেকেই বলতে পেরেছিলÑ
‘হে ধরণী, তুমি দ্বিধা হও। আমাকে তোমার কাছে ফিরে যেতে দাও।’
তার এই বিসর্জন অভিমানের, আত্মসম্মানের। অভিমান, ভালোবাসা থেকে জন্ম নিয়ে, ভালোবাসাতেই আত্মাহুতি দেয়।
এ নিয়ে তাহলে আর দ্বিমত থাকে না যে অভিমান জন্ম নেয় ভালোবাসা থেকেÑ যার পরিণতি বিচ্ছেদ হলেও ভালোবাসাকে সে বৃন্দাবন করে রাখে। রাগ, ক্ষোভ, দুঃখের আঁচড় থেকে বাঁচিয়ে এই অভিমান, ভালোবাসাকেই যেন আরও বিশেষ করে তোলে। প্রাচ্যের প্রেম তাই অভিমানে ভরা। ভালোবাসা এখানে মেঘে ঢাকা চাঁদ, কুয়াশায় ঢাকা সূর্য। ষড়ঋতুর দেশে ভালোবাসাও তাই বহুমাত্রিক, অভিমান মুক্ত নয়।
অভিমানের এই সাতকাহন যুগ যুগ থেকেই আছে আর থাকবেও। যতই মানুষ যুক্তিবাদী হয়ে উঠুক না কেন জেনেটিক্যালি এই অঞ্চলের মানুষ অভিমানী। তাই এখানে বিচ্ছেদের গান, কবিতা, উপন্যাস জনপ্রিয়। এখানে ভালোবাসা উদযাপনময় না, বিরহ কাতর এবং দ্বান্দ্বিক।
অভিমানের এই স্বরূপ কেবল প্রেম-ভালোবাসাকেন্দ্রিক না। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিও মানুষের ক্ষোভ বা অভিমান জন্ম নেয় এবং মানুষ এই অভিমান থেকে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়, হোক তা ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচকÑ পরোয়া করে না। কখনও কখনও অভিমান থেকে নেওয়া সিদ্ধান্ত যতটা না যুক্তিযুক্ত, তার চেয়ে বেশি সুইসাইডাল। বিখ্যাত ব্যক্তিরা অভিমানমুক্ত কখনোই ছিল না। যেমন জীবনানন্দ দাশ কিংবা মাইকেল মধুসূদন দত্ত যথেষ্ট অভিমানী ছিলেন। তাদের অভিমান ছিল সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি, যা তৈরি হয়েছিল একই সঙ্গে নার্সিসিজম এবং গভীর এক অস্তিত্ব সংকটের দ্বন্দ্ব থেকে। ফ্রিদা কাহলোর অভিমান ছিল তীব্র, যা তার চিত্রকর্মের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। একেকটা চিত্রকর্ম যেন গুমরে ওঠা প্রতিটি অভিমানের সাক্ষী। তার অভিমান ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে নিয়তির প্রতি ছিল সবচেয়ে তীব্র। মৃত্যুর আগে তার ডায়েরিতে পাওয়া শেষ বাক্য ছিল ‘I hope the exit is joyful, and I hope never to return.’ পৃথিবীতে তিনি আর ফিরে আসতে চান না। নিয়তিতাড়িত জীবন, মৃত্যু আর বিরহের ফাঁদ থেকে মুক্তিই শান্তি; আর সেটাই সে কামনা করেন। তাই সে মৃত্যুকে কামনা করে বলেনÑ
‘You can come in.’
অন্যদিকে লেখক ফ্রান্ৎস কাফকা তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ম্যাক্স ব্রডকে বলে গিয়েছিলেন মৃত্যুর পর তার সমস্ত পাণ্ডুলিপি, নোটবুক, চিঠি, ডায়েরি পুড়িয়ে ফেলতে। যদিও বন্ধু ম্যাক্স ব্রড তার বন্ধুর কথা না শুনে লেখাগুলো সংরক্ষণ, সম্পাদন এবং প্রকাশ করেন এবং বিশ্বের কাছে কাফকাকে পরিচয় করে দেন প্রতিভাবান লেখক হিসেবে। কিন্তু কাফকার কেন ইচ্ছা হয়েছিল নিজের লেখা থেকে পৃথিবীকে বঞ্চিত রাখার? তার এই অভিমান কি কেবল সমাজের সঙ্গে, না নিজের সঙ্গেও? প্রশ্নগুলো সচেতন মানুষকে ভাবায়, একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেয় মানুষ যদি আরও একটু সংবেদনশীল হতো, অভিমানগুলো হয়তো অন্ধকারে জোনাকির গল্প হয়ে অন্য এক জীবন চেনাত।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন এক বস্তুবাদী পৃথিবীর চেহারা দেখায়। মানুষের ইচ্ছা আর অনিচ্ছার ভেতর দুলে ওঠে তার অস্তিত্ব, জন্মায় অভিমান। যদিও সবার অভিমান শৈল্পিক ভঙ্গিমায় প্রকাশ পাবে না, প্রতিটি মানুষ জীবনে কখনও না কখনও অভিমান করে। এমনকি এই অভিমান থেকে তার সিদ্ধান্তও বদলে যেতে পারে। এই অভিমান যে কারও সঙ্গে হতে পারে; দুজন বন্ধুর ভেতর, প্রেমিক-প্রেমিকার ভেতর কিংবা বাবা মা ও সন্তানের সঙ্গে, হতে পারে ব্যক্তির সঙ্গে রাষ্ট্রের। তাই ‘অভিমান’ শব্দটিকে যত সহজে উচ্চারণ করা যায় এর পরিধি তত ছোট না। ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়, প্রতিটি মানুষ ভালোবাসার পাশাপাশি অভিমানী।
এখন প্রশ্ন হলো অভিমান আর ভালোবাসার কচ্ছপ-খরগোশ দৌড়ে শেষ পর্যন্ত জিতবে কে? যদি সবাই অভিমান করে মুখ ফিরিয়ে নেয়, কথা না বলে, ভেতরে টলটলে ভালোবাসার ঢেউ নিয়ে দূরে সরে যেতে থাকে, তাহলে পৃথিবী আরও সঙ্কুচিত হয়ে আসবে। তাই ভালোবাসা থেকে অভিমান সৃষ্টি হয়, এজন্যই ভালোবাসা দিয়েই অভিমান ভাঙানো উচিত। ভালোবাসার উষ্ণতায় অভিমানের বরফ গলতে বাধ্য। তাই ইগো, ক্ষোভ, রাগ, দুঃখ যতই থাকুক ভালোবাসা যদি স্থির থেকে কচ্ছপ গতিতে এগিয়ে যায়, মানুষকে তাহলে আর বিচ্ছেদের বহ্নিতে জ্বলতে হয় না।