ইশরাত তানিয়া
প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০২৫ ১৮:০৫ পিএম
প্রচ্ছদ: মন্দিরা ভাদুড়ী, অধ্যাপক, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
দুই হাতে ডালিম চেরার সময় বিকালের নিভু নিভু লালচে সূর্যটাই যেনবা দুটুকরো হয়ে যায়। খোসা ফাটার মৃদু শব্দ হলো যখন, আস্ত এক বেদনাবোধ ঢুকে পড়ল সেখানে। হলুদ কুয়াশায় ভর দিয়ে নিকট-দূর, ভূত-প্রভূত অতীতের নানান অলিগলি পেরিয়ে, মোহাম্মদপুরে বয়স্ক বাড়িতে। তারপর স্ফটিকদানা হয়ে অভিমানী গাল ঠেকিয়ে রাখল ডালিমের ভেতরে। একটু আনমনা হয়েছি কি আঙুলের ফোকর গলে মধুবীজ গড়িয়ে গেল টেবিলের আড়ালে।
দৃষ্টির সামনে যতটা, তুলে নেব কি? ভাবতে ভাবতে স্বচ্ছ কাচের বাটি ভরে যায়। থাকুক যেখানে যা পড়ে আছে। অথচ কী আশ্চর্য সব অভিমানে হাত বুলিয়ে বেদনা জাগাই! একটা একটা করে রসের হালকা ছিটামাখা বিষাদদানা তুলে নিই। আঙুলে উজ্জ্বল গোলাপি লেগে যায়। সেই যে ছুটির দিন মা রান্নাঘরে মসলা পিষলÑ আমি পাশে বসে তাকিয়ে দেখলাম মায়ের চুড়ির সঙ্গে গাঁথা সেফটিপিনের দোলা। বাকিটা সময় ছাত্রদের পরীক্ষার খাতা দেখে কাটিয়ে দিল, আমার হাতের পাতায় লাল কলমে ফুল এঁকে দিল না তো! আমি যে সারাক্ষণ ভিখারির মতো প্রায় হাত পেতে দাঁড়িয়ে ছিলাম, তার পাশে এসে বসেছিলাম, একটুও যেন তাকাতে নেই! বিকালে ট্যাসেল দিয়ে খোঁপা করে, মুখে ট্যালকম পাউডার বুলিয়ে মা ছোট ভাইকে কোলে নিয়ে খালার সঙ্গে বেড়াতে চলে গেল। যাওয়ার আগে বলে গেলÑ ছোটকে নিয়ে গেলাম। তুমি যে বড়, বড়র বড় গুণ থাকতে হয়। দুঃখে আমার শ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে যেত। জেনে-বুঝে নিজের ইচ্ছায় তো আমি বড় হইনি, এখন আমার বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছাটাকে কী করি? একটা টিনের কৌটায় পুরে রাখি। ততদিনে জেনে গেছি, দায়িত্ব শুধু আমার আর সব আদর ছোট ভাইয়ের প্রাপ্য। সারা দিন জুড়ে এক বুক মেঘ জমে থাকলেও কেউ জানে না। প্লেটে ভাত মেখেই চলেছিÑ মুখে তুলছি না, তুললেও গালের ভেতর, দাঁতের নিচে, জিভের ওপর এক নলা ভাতের ঘুরপাক। গলা দিয়ে নামছে না, সেটা কেউ দেখে না। শুধু যেদিন স্কুলের হোমওয়ার্ক করার সময় বাইরে ঝড়ের ঘূর্ণি ওঠে, বারান্দায় মেলে দেওয়া কাপড় তোলার হিড়িকে আমার ডাক পড়েÑ কাপড়গুলো ধরো কিংবা শিগগির জানালা লাগাও।
আমার জ্বর হলে মায়ের কপালে ভাঁজ পড়ে। মা গলাভাত মুখে তুলে দেয়। কপালে জলপট্টি দিয়ে সারা রাত নির্ঘুম জেগে থাকে। জ্বর পার করে মায়ের নিশ্চিন্ত মুখ দেখি। সেদিন আমার মন খারাপের মেঘগুলো জল ঝরিয়ে দূরে চলে যায়। যেভাবে জ্বরমাখা কমলালেবু নিয়ে চলে গেছে শৈশব। সেই রঙিন মার্বেল, ডাকটিকেটের অ্যালবাম, জ্যামিতিবক্সের কাঁটা-কম্পাস, বন্ধুর দেওয়া ভিউকার্ড, পুঁতির মালা…। কেন যে চলে গেল! কে জানে চলে যাওয়ার কিসের এত তাড়া? আর না গেলেইবা কার কী এমন ক্ষতি! বালিকার কিশোরী, কিশোরীর তরুণী হয়ে ওঠারও একটা অভিমান আছে, যা ফুরায় না। অনন্ত চরাচরে বারবার একটি প্রশ্নের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে উৎসে ফিরে আসে। স্বর্গে-মর্ত্যে প্রতিধ্বনিত হয়Ñ কেন চলে যায়?
ওই বিচ্ছিন্ন দানার মতো মানুষও সময়ে অসময়ে ভালোবাসা আর প্রত্যাশার জায়গা থেকে একটু একটু করে হারিয়ে যায়। যেভাবে তুমি হারিয়ে গিয়েছিলে। তোমার সিগারেটের ডগায় আগুনের কুঁড়ি জ্বলে; লম্বা সুখটান দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেÑ মন কীভাবে গড়ে ওঠে? উত্তরে বলেছিলামÑ সুখ, দুঃখ, ভয়, ঘৃণা, ক্ষোভ, লোভ কিংবা ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা, সহানুভূতি কত কী বিচিত্র আবেগ-অনুভূতির আনাগোনা মিলিয়েই মন। আবেগ তীব্র আর তাৎক্ষণিক। অনুভূতি গভীর আর বৌদ্ধিক। আমার কথায় হেসেছিলেÑ যাহ! অনুভূতি আর চিন্তাশীলতা একসঙ্গে যায়? জানিয়েছিলাম, আনন্দ আর বেদনা অনুভবের কথা। কখন হয় সুখবোধ আর কখনোইবা দুঃখবোধ? তোমার নিজস্ব চিন্তা, মূল্যবোধ, অভিজ্ঞতা আর উপলব্ধিই সেটা নির্ধারণ করে দেয়। আমাদের লাগোয়া মন তখন পলাশের বনে বসন্তের ফুলে ঘুরে বেড়ায়। তাজমহল রোডের ফুচকা আর ভেলপুরির টকঝাল লেগে যায় ঠোঁটের কোণে। দুচোখ স্বপ্নাতুর। আবেগ অনেকটাই মস্তিষ্কের সহজাত প্রতিক্রিয়া। সে তুলনায় অনুভূতি এক অন্তর্নিহিত বোধ; বলা যায় আবেগের পরিণত রূপ। সিগারেটের মাথা অ্যাশ-ট্রেতে চেপে বলেছিলেÑ আবেগ তাহলে ঝড়ো হাওয়া আর অনুভূতি ঝড়ের পরে স্তব্ধতা। ঘোরের দিনগুলোয় বেপথু সব পথ পেরিয়ে আজ সচেতনভাবে নিজেকেই জিজ্ঞাসাÑ অভিমান কী? আবেগ না অনুভূতি? এর রূপ কেমন? রঙ কী? দেখি এর রহস্য অপার। মর্ম নিগূঢ়। অভিমানই সম্পর্ককে গাঢ় গভীরতর করে। অপ্রকাশিত ব্যথার সুর বাজে ভায়োলিনে, সে কি আমায় নেবে চিনে… মায়া বাড়ে, ভালোবাসা বাড়ে, প্রেম আর বন্ধুত্বের অভিমানও বাড়ে।
তবু আকাঙ্ক্ষা ‘মম দুঃখবেদন মম সফল স্বপন তুমি ভরিবে সৌরভে নিশীথিনী-সম’। কে জানত আমার মনের ভেতর অপূর্ণতাগুলো ক্রমশ নম্রনীল নীরবতার আইসবার্গ হয়ে যাবে! যা দেখা যায় না, সেটা অবচেতনের এক রূপ। পানির অতলে আত্মা ক্ষয়ে ক্ষয়ে শুধু আয়তনে বাড়ে। যদি বলি কেবল তুমিই পারতে এ বরফস্তম্ভ ভেঙে দিতে, সেটা বোধহয় ভুলই। কারণ জমাট যা কিছু, তরল করে বইয়ে দেওয়ার সামর্থ্য সবার থাকে না। ‘সীন’ করে উত্তর না দেওয়া মেসেজের মানে বোঝোনি। অভিমানের ভাষা বোঝা হয়তো এতই কঠিন। তাই দূরত্ব বাড়ে আর একেকটি দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন হয়ে আমরা ভাসতে থাকি আর ভাবি আবেগের ঘনিষ্ঠতা থেকে পড়ে যাওয়া মধুবীজ কেউ হয়তো তুলে নেবে। সেই ‘কেউ’ আর আসে না। কাছে আসার আগেই মানুষ মিথ্যা হয়ে যায়।
তাই কলম খুলে লিখে ফেলিÑ ব্যথাতুর কোমল অনুভব শুধু অপ্রাপ্তির প্রতিক্রিয়াই নয়, অহমের প্রতিফলনও। কারও অবহেলায় দুঃখ পেয়ে, অভিমান প্রকাশ করে অস্তিত্বের দাবিও জানানো যায়। অভিমান কখনও অহংকারী করে না, বরং সম্পর্কের মাত্রা নিয়ে চিন্তাভাবনা করে। এটুকু লিখে কলম থমকে যায়। হৃদয়ের সূক্ষ্ম রঙ আঁকতে গিয়ে মনে হয় মায়াবী মেলাঙ্কোলি না এলে ঠিক তেমন একটা লেখা আসলে লেখা যায় না। বিষয়-বাসনায় অযুত সম্ভাবনার কত আখ্যান এভাবে হারিয়ে গেছে। চিন্তার সুতা উড়ে গেছে বাস্তবতার মৌসুমি ঝড়ে। ঝরে পড়েছে নষ্টমুকুল, না-হওয়া গল্পের মতো। হারিয়ে যাওয়া সেই অভিমানী আখ্যানের জন্য মায়ায় যত্নে বীজ বুনি। অক্ষরের পর অক্ষর, শব্দের পর শব্দ জুড়ে ডায়েরির পাতা ভরে যায়। কাটাকুটিতে কখনও ছিন্নভিন্ন। নিড়ানি দিয়ে আলগা করি বাড়তি বৈকল্যের আগাছা। বাইরে সুনসান পথঘাটে ইতঃস্তত ভাসমান রিকশা। দুরন্ত বাইক, দুয়েকটা টয়োটা ঘুরে বেড়ায়। রাস্তার পাশে ফুটপাতের দেয়ালে সিনেমার পোস্টার সাঁটা। আমার ঘরবারান্দা করাই সার। নির্ধারিত লেখাগুলোর একটি শব্দও লেখা হয় না। হিসাবের বাইরে কিছু লেখা পাখির ডানায় উড়ে উড়ে আসে। একটা-দুটা খুদকুঁড়া ফেলে যায় ল্যাপটপের কীবোর্ডে। সেটুকুই আঁকড়ে ধরি। জানি তো, উড়ে যাওয়া যার প্রবণতা তার সবটুকু ধরে রাখা যায় না। ফুর্তির কাদা লেগেছে আত্মায়। এবার সৃজনে ঘষে ঘষে তুলব ছিটাফোঁটা, যা লেগে আছে। উপযুক্ত ভাষা খুঁজি; উপভাষাও। আমার সামান্য অবহেলায় আখ্যানের কী অভিমান। তাকে ডাকি সন্তর্পণে। এসো, মনমধু হে! এসো মনের জনপদ চরে। যা কিছু না-লেখার সাফোকেশান পড়ে ছিল বুকের ঝোপঝাড়ে, তাকে বলি অরণ্য হও। উপলব্ধিকে ধারণ করো। এসো, নিমরস! এসো প্রথম পাতে। সতেজ করো। তেতো বলে অভক্তি করি না। জেনে গেছি, স্বাদগ্রন্থি মুখ ফিরিয়ে নিলেও তিক্ততার উপকারিতা কমে না। ভালোবাসা যেখানে গভীর, সেখানে অভিমান থাকে, সহাবস্থানে বিষ আর মধু।
নানা ঘটনার আবর্তে পাক খাওয়া মনের স্থিরতা দরকার। অপ্রয়োজনীয় কোলাহলে পানিতে শুধু ঘাঁটা পড়ে। থিতিয়ে আসতে পারে না, তাই আয়না হয়ে ওঠে না। জলস্রোত শান্ত হলে আত্মমগ্নতায় স্বরূপ দেখি। প্রতিচ্ছায়ায় মন পাঠ করি একান্ত নিবিষ্টতায়। চোখ মেলে দেখি যা দেখায় জলের ওপর আমার ছায়া। কান পেতে শুনি কী বলতে চায় এই নীরবতা? ভুল-ঠিক এর খোলস সরিয়ে দেখি সবই ঢুকে যায় বিশাল এক হাঁ মুখের ভেতর। আমার সমস্ত অন্তর্দ্বন্দ্ব নিয়ে আজ নিজের সঙ্গেই অভিমান। এই আত্মাভিমানের সপক্ষে তুলে নেওয়া দুয়েকটি ডালিমদানা অত্যুজ্জ্বল হয়ে চেয়ে থাকে। নিজের মতো করে নিজেকে তখন কোথাও দেখতে পাই না, ভুল সময়ে ভুল সিদ্ধান্তগুলোর কথা মনে পড়ে। নিজের অবহেলায় বন্ধুদের হারিয়ে ফেলেছি কতবার! অজ্ঞাতসারে আঘাত করেছি প্রিয়জনকে। কোনো এক আসন্ন সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে বলা আধেক কথা মনে পড়ে। তেমন অসমাপ্ত সন্ধ্যা কখনও ফিরে এলে মনে হয়, বাকিটুকু আর বলা হলো না! কেন এমন করলাম? এর উত্তর আমার কাছে আসে না, পাশ কেটে চলে যায়। আমার আর কিছুই লেখা হয়ে ওঠে না। স্কিপিং রোপ হাতে মেয়ে দৌড়ে আসে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলেÑ মা, আজকেও তুমি আইড্রপ দাওনি।
মন দেখি স্তব্ধতায়, অভিনিবিষ্টতায়। গান এসে মনের কার্নিশে বসেÑ তুমি রবে নীরবে। লুকিয়ে পালিয়ে যে বারবার এতটুকু আশ্রয় চেয়েছে, দাঁড়িয়ে থেকেছে মোহাম্মদপুরের বয়স্ক বাড়ির অন্ধকার সিঁড়িকোঠায়Ñ তার দিকে দুটো বাতাসা ছুড়ে দিয়েছিলাম। কাচের প্লেটে জুঁই ফুলের মতো ভাত সাজিয়ে হয়তো খাওয়াতে পারতাম। আমার আসলে কিছুই হয়ে ওঠে না। এই সিঁড়ি কোটায় দিগন্ত নেমে এলে মনে হয় অযথাই এত চাপ নিয়েছি। এর আসলে কোনো মানে হয় না। কারও কাছে দায়বদ্ধতা নেই। কোথাও পৌঁছে যাওয়ার তাড়া নেই। ইচ্ছায় বাঁচাটা জরুরি। পৃথিবীতে আকাশ আর ভূমির মিলে যাওয়া, অপটিক্যাল ইলিউশনের অলৌকিক ম্যাজিক দেখায়। দৈবের করুণায় যারা দেখতে পায়, দ্যাখে। টিমোলেট ওডি আইড্রপের সাধ্য নেই এতদূর, চোখ থেকে মুছে দেয় অপেক্ষমাণ কারও সেই দাঁড়ানোর ভঙ্গিমা। আমার ভীষণ অভিমান হয়। অক্টোবরের রাতে হেমন্তের আভাস। মেসেঞ্জারে গান ভেসে আসে। গানের সঙ্গে কেউ দুটো আকাশ পাঠিয়েছে৷ কিছুটা অস্পষ্ট। ফোনের সাউন্ড ভলিয়ম বাড়াই। গভীর রাতে জাগি, খুঁজি তোমারে… ভাবি, এত সুন্দর গাইতে পারে অথচ গায় না কেন? গানের ছায়া পড়ে পানিতে। কত কিছুই যে দেখায় ওই গান। উড়ে আসা নিতান্ত এক ঝরাপাতা, ঝিরিজলের বয়ে যাওয়া, আমাকে ফেলে চলে যাওয়া তাজমহল রোডের রাস্তাটা...।
সময় আর সম্পর্কের বহু বৈচিত্র্যের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাই। নির্জন মনে। টের পাই শেষতক ‘আমি’ নেই তো কিছুই নেই। এই ভাবনাগুলো নেই, গান নেই, লড়াই নেই, প্রেম নেই, আনন্দ নেই, বিষাদবীজ নেই, লেখা নেই। জগৎটাই নেই। সমস্ত শূন্যতার মাঝে শুধু একটা ছায়াঘন দীর্ঘশ্বাস আর আজ পর্যন্ত না-বলা অভিমান ধরা থাকে।