সরকার মাসুদ
প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০২৫ ১১:১১ এএম
চিত্রকর্মের শিরোনাম : নিঃশব্দের গান। শিল্পী : রাফি হক
রোমান্টিক যুগের কল্পনাউর্বর কবিতার পরিণতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে জন্ম হয়েছিল আধুনিক কবিতার। দেড়শ/দুশ বছর আগে এ রকম ভাবা হতো, যার কল্পনাশক্তি যত প্রখর তিনি তত ভালো কবি। কিন্তু শুধু কল্পনার ডানায় ভর করে অলীকের বা অস্পষ্টতার চর্চা করাই যে বড় কবির চারিত্র্য নয় তা প্রমাণ করেছিলেন ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কোলরিজ প্রমুখ। একই সঙ্গে চমৎকার কবিকল্পনা ও গভীর দার্শনিকতা ওয়ার্ডসওয়ার্থকে দিয়েছে মহৎ কবির মুকট। এ কথা জীবনানন্দ দাশ সম্বন্ধেও সমানভাবে প্রযোজ্য। রবার্ট ফ্রস্ট, যার কাব্যে নিসর্গের ও গভীর জীবনভাবনার অবস্থান পাশাপাশি, বহু যুগ আগে বলেছিলেন, ‘আধুনিক কবিতা তা-ই, যা আধুনিক মানুষকে স্পর্শ করে।’ এ বক্তব্য আংশিকভাবে গ্রহণযোগ্য। কেননা লি পো শেলি, কিটস, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখের শ্রেষ্ঠ কাব্যসমূহও আমাদের স্পর্শ করে। কিন্তু তাদের কবিতায় প্রযুক্ত অতি আবেগ ও ভাষাগত অতিরেক (বিশেষত রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে) আমাদের অস্বস্তির কারণ হয়। ভাবনার অভিনবত্বের ও প্রকাশভঙ্গির চমৎকারিত্বেরর জন্য দুশ-তিনশ বছর বা তারও আগের কোনো কবি আমাদের আকৃষ্ট করতে পারেন। কিন্তু Imagism (চিত্রকল্পবাদ) আন্দোলনের সমকালিক কিংবা তার পরবর্তী কোনো কবিতাকে আমরা আধুনিক বলব না যদি না তাতে থাকে চিত্রকল্পের, প্রতীকের এবং ইশারা-ইঙ্গিতের বলিষ্ঠ প্রয়োগ। সেই অর্থে বাংলাভাষী কবিরা আধুনিকতাকে প্রথম ধারণ করতে পেরেছিলেন তিরিশের দশকে। চিত্রকল্পের কাজ কী? একটি মনোমুগ্ধকর কল্পছবি উপহার দেওয়া। আর শুধু চিত্রকল্পের নয়, প্রতীকের ব্যবহার ও একটি কবিতাকে যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত করে তুলতে সাহায্য করে। আধুনিক কাব্যের আরও অনেক বৈশিষ্ট্য আছে। তার মধ্যে কয়েকটি হচ্ছেÑ যথাসম্ভব কম কথা বলা ২. নতুন ধরনের উপমা ব্যবহার করা ৩. অভিনব বাকপ্রতিমা ৪. প্রথাগতভাবে কবিতার সমাপ্তি না টানা ৪. নগরজীবনের নানা অনুষঙ্গ ৫. গ্রামীণ ছবির সুরুচিসম্মত স্মার্ট প্রকাশ ৬. ধর্ম বিষয়ে ঔদাসীন্য অথবা বড়জোর ধর্মনিরপেক্ষতা ৭. অধ্যাত্মভাবনা।
এজরা পাউন্ড, এমি লোয়েলদের উদ্ভাবিত ‘চিত্রকল্পবাদ’ যেভাবে টি. এস এলিয়ট ও তার ভাবশিষ্যদেরকে এবং সেই সূত্রে জীবনানন্দ দাশ, অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে প্রমুখ কবিকে আলোড়িত করেছিল, সেই জিনিসকে উত্তরকালের অসংখ্য লেখক কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে পারেননি তাদের স্বল্প শিক্ষার ও অক্ষমতার কারণে। বাংলা ভাষার পঞ্চাশের ও ষাটের প্রধান কবিরা অনেকখানি দক্ষতার সঙ্গে চিত্রকল্প ব্যবহার করতে পেরেছেন। এর বর্ণাঢ্য ও চিত্তাকর্ষক প্রয়োগ দেখি শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, উৎপলকুমার বসু, শঙ্খ ঘোষ, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত, আলোক সরকারের লেখায়। আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী ও শামসুর রাহমানের শ্রেষ্ঠ কবিতাসমূহ চিহ্নিত হয়ে আছে বাকরীতির অনন্যতা দ্বারা। পঞ্চাশের কবিদের সামগ্রিক সিদ্ধির তুলনায় ষাটের প্রজন্মের কবিদের অর্জন খাটো। এটা ঠিক, তাদের সময়ে বাংলা কাব্য অনেক বেশি বৈচিত্র্য ধারণ করেছে। বিষয় ও প্রকাশভঙ্গি উভয় দিক থেকেই। আবুল হাসান, রফিক আজাদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, মুস্তফা আনোয়ার, আলতাফ হোসেন, সিকদার আমিনুল হক প্রমুখের বলার ধরন (Apparoach) আলাদা আলাদা। পশ্চিমবঙ্গের ষাটের কবিতাতেও এই বহুরূপিতা লক্ষযোগ্য। মানিক চক্রবর্তী, প্রভাত চৌধুরী, ভাস্কর চক্রবর্তী, দেবারতি মিত্র, শামসের আনোয়ারদের কাব্যসামর্থ্য ও রচনারীতির বিচিত্র ধরন নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু কবিতার উঁচু মান, জীবনদর্শন, শিল্প-অশিল্পের বিচারে পঞ্চাশের কৃতী কবিদেরকেই আমরা বেশি মার্কস দেব।
বাংলাদেশে সত্তর দশকে আবির্ভূত কবিদের চৌদ্দ আনাই সহজবোধ্য ও যোগাযোগসক্ষম কবিতা লিখেছেন। তারা চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন কম। যতখানি ব্যবহৃত হয়েছে তার ভেতর নতুনতা খুব একটা নেই। একই সঙ্গে কাব্যসম্মত, উদ্ভাবনী বাকভঙ্গি ও হৃদয়গাহী প্রকাশরীতি সত্তরের খুব কম কবিতায় পাওয়া যায়। ভেবে অবাক হই, পঞ্চাশের ও ষাটের দশকের কবিরা চিত্রকল্প ও প্রতীক-সম্পর্কিত যে শিক্ষা অর্জন করেছিলেন, সাধ্যমাফিক কাজেও লাগিয়েছেন; সেই কার্যকর শিক্ষার যথাযথ মূল্য সত্তরের, এমনকি আশিরও অনেক কবি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে কী ঘটেছে? ‘এ কোন জীবন আমি বেছে নিলাম, প্রভু?’(ইকবাল আজিজ) কিংবা ‘এই রাত নষ্ট রাত’ (বিমল গুহ) অথবা ‘ভালোবাসতে বাসতে আমি ফতুর করে দেবো’ (ত্রিদিব দস্তিদার)Ñ এ জাতীয় পঙ্ক্তি তারা রচনা করেছেন যেগুলো নিম্নমানের সাহিত্যরুচির পরিচায়ক। ভাষার ব্যবহার সম্বন্ধে এখানে আমি বিশেষভাবে দুজনের কথা বলব। রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কবিতা যদি অভিনিবেশসহ পাঠ করা হয় দেখা যাবে, তিনি যথেষ্ট সহজ-সরলভাবে লিখেছেন। তার চেয়েও যেটা বেশি ক্ষতিকর তা হচ্ছে, তিনি সব কথা খোলাখুলি বলে দিয়েছেন; কোনো আড়াল রাখেননি। ওই যে তিনি লিখেছেন ‘জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে পুরনো শকুন’Ñ এর ভেতর কাব্য কোথায়? শকুন প্রতীকটি বহু ব্যবহারের জীর্ণ এবং তার বলবার ধরনটিও শিল্পসম্মত নয়। রুদ্র কবিশোভন সৎসাহস ও তেজের অধিকারী ছিলেন, কাব্যভাষাটিকে আধুনিক ও নিজস্বমণ্ডিত করে তুলতে পারেননি। ত্রিদিব দস্তিদারের লাইফস্টাইল আধুনিক ছিল, তার কাব্যে আধুনিকতার চিহ্ন সে তুলনায় অনেক কম। আত্মগত ভাবোচ্ছ্বাসের এতখানি প্রকাশ, তার প্রায় অমার্জিত রূপ একালের অন্য কোনো ভাষার আধুনিক কবিদের ভেতর খুব কমই মিলবে। ‘চোখ ও দাঁত’ শিরোনামে ত্রিদিবের একটা কবিতা আছে যেখানে ভাবনার সংহত রূপ ও প্রকাশরীতির অনন্যতা দেখা যায়। এ রকম কবিতা ত্রিদিব সারা জীবন হয়তো পাঁচ/সাতটি লিখতে পেরেছেন।
সঠিক বিবেচনায় আবিদ আজাদ সত্তরের উজ্জ্বলতম কবি। চিত্রকল্পের অভিনব ও অভিঘাতী প্রয়োগ তাকে সমপ্রজন্মের সবার থেকে আলাদা করেছে। তিনি নতুন ধরনের উপমা (শালিকের ঠ্যাং-এর মতো ফ্রেমঅলা দাদার চশমা) এবং প্রতীক ব্যবহার করেছেন সবচেয়ে বেশি। আবিদ যখন বলেন, ‘আমি ছুঁয়েছিলাম তার স্তন? এমন মর্মরিত নৈঃশব্দ্য আমি জীবনে ছুঁইনি/ আমি ছুঁয়েছিলাম তার আঙুলগুচ্ছের অন্ধকার? আমি নাক ডুবিয়ে দিয়েছিলাম তার চুলে/এমন পল্লবিত গাছের ঘ্রাণ আমি আর কখনো পাইনি’ তখন লেখকের ক্ষমতার জায়গাগুলো পরিষ্কার বোঝা যায়। আবিদ আজাদের কবিতায় চিন্তার স্থান অতি সীমিত। সহজাত দার্শনিকতা নেই বললেই চলে। এ জিনিস আছে ইকবাল আজিজ, ফারুক মাহমুদ, জাহাঙ্গীর ফিরোজ, নাসির আহমেদ, আহমদ আজিজ, মাহবুব বারী প্রমুখের মধ্যে। আবিদের সবচেয়ে বড় ত্রুটি অসংখ্য কবিতায় অপ্রয়োজনীয় বাকবিস্তার ঘটিয়েছেন। তিনি জানতেন সঠিক শব্দ সঠিক জায়গায় প্রয়োগ করতে। জানতেন না কোথায় থামতে হবে। এ সমস্যা সত্তরের অগণন কবির মতো তার লেখারও ক্ষতির কারণ হয়েছে। ভাবোচ্ছ্বাসের ও ভাষার অতিরেকের প্রকাশ শুধু সত্তরের নয়, সবসময়ের কবিদের এক প্রধান সমস্যা। পৃথিবীর অল্প কিছু কবি, সত্যিকার অর্থে, এ বিড়ম্বনা থেকে মুক্ত রাখতে পেরেছেন নিজেদরকে। গেয়র্গ ট্রাকল, পাউল সেলান, সিলভিয়া প্লাথ, জিম পাওয়েল, এলিজাবেথ বিশপ, টেড হিউজ, টমাস ট্রান্সটোমার, সিমাস হিনি, এ. আর অ্যামনস, জন অ্যাশবেরি, ডেরেক ওয়ালকট, ক্রেগ রেইন প্রভৃতি কবির কাব্যে ভাষাকেন্দ্রিক অমিতাচার অনেক কম বলে মনে হয়।
বাংলাদেশের কবিদের মধ্যে আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান (আংশিক), মনজুরে মওলা, শহীদ কাদরী, আবুল হাসান, মুস্তফা আনোয়ার, রফিক আজাদ, সিকদার আমিনুল হক (আংশিক), মুহম্মদ নূরুল হক, আলতাফ হোসেন, সুরাইয়া খানম, আবিদ আজাদ (আংশিক), ফারুক মাহমুদ, আহমদ আজিজ, ময়ূখ চৌধুরী, নাসিমা সুলতানা, কালাম চৌধুরী, মাহমুদ কামাল, জাহাঙ্গীর ফিরোজ, আতাহার খান, অমিতাভ পাল, আহমেদ মুজিব, রিফাত চৌধুরী, কাজল শাহনেওয়াজ, শশী হক, শরীফ শাহরিয়ার, রাজা হাসান, মাসুদ খান, মিজান রহমান, পুলক হাসান, মারুফ রায়হান, ওমর কায়সার, মোহাম্মদ কামাল, জুয়েল মাজহার (আংশিক), মাহবুব কবির, চঞ্চল আশরাফ, আলফ্রেড খোকন, অনিন্দ্য জসীম, আশরাফ রোকন, রোকসানা আফরিন, টোকন ঠাকুর প্রমুখ তুলনামূলকভাবে কম কথা বলেছেন কবিতায়। তা সত্ত্বেও এদের অনেক লেখা প্রাগুক্ত দোষে দুষ্ট।
বাংলা ভাষী কবিদের এক বিরাট অংশই বেশি বাক্যব্যয়ের প্রবণতা দ্বারা চিহ্নিত। বাচালতা আমাদের জাতিগত দোষ। জাতির এ বৈশিষ্ট্যের সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে আমাদের কবিতায়। প্রাত্যহিক আচার-আচরণের বেলায় যেমন, তেমনি কাব্যরচনার সময়ও আমরা ভুলে যাই যে বাংলা কবিতায় ভাবাবেগের তুমুল চর্চা হয়েছে। এখন নিয়ন্ত্রিত আবেগের সঙ্গে চিন্তার চর্চা হওয়া দরকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে।
জনপ্রিয় না হওয়াই আধুনিক কবিতার নিয়তি এবং সেটাই স্বাভাবিক। যেহেতু আধনিক কাব্য ঘুরিয়ে কথা বলতে অভ্যস্ত। প্রতীকের ও ইশারা-ইঙ্গিতের অঢেল প্রয়োগের কারণে এ ধরনের কাব্য ততটা সুগম নয় পাঠক যতটা প্রত্যাশা করেন। শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, আসাদ চৌধুরী, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ জনপ্রিয় হয়েছেন কেন? প্রধান কারণ তাদের অধিকাংশ কবিতা সহজ-সরল ভঙ্গিতে রচিত। প্রায় আড়ালহীন এসব কাব্যে কখনও কখনও চিত্রকল্পের কিংবা নতুন উপমার উপস্থিতি থাকলেও ওইসব লেখার মূল সুর ধরতে পাঠকের অসুবিধা হয় না। জনপ্রিয়তার মোহ এ কবিদের পিছু ছাড়েনি। এ মোহ এমনই যে, একজন কবি তার বইয়ের বিক্রি-বাটার চিন্তা মাথায় রেখে ‘কোথায় যাবো, কার কাছে যাবো’র মতো প্রথানুগ ও সস্তা গ্রন্থনাম রাখতেও দ্বিধা করেন না। এটা মহাদেব সাহার একটি কাব্যের নাম, যা সত্তরোর্ধ্ব বয়স প্রকাশিত। অথচ একই লেখক তার উত্থানপর্যায়ে ‘এই গৃহ এই সন্ন্যাস’, ‘চাই বিষ অমরতায়’র মতো চিত্তস্পর্শী কাব্যিক নাম ব্যবহার করেছিলেন। এ যুগেও যারা জনপ্রিয় কবি হিসেবে পরিচিত পেয়েছেন তাদেরও বেশ কিছু লেখায় আধুনিকতার উপাদান উপস্থিত কিন্তু শেষ বিচারে ওইসব কবিতা কতটা আধুনিক, আদৌ আধুনিক কি নাÑ এ প্রশ্ন থেকেই যায়। কেননা উপাদান থাকাটাই বড় কথা নয়, তাকে কীভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে, সেটাই আসল কথা।
আধুনিক কবিতা ধারণ করে মৃত্যুচেতনা, শূন্যতাবোধ, নিঃসঙ্গতার উপলব্ধি, বিষাদগ্রস্ততা প্রভৃতি। আধুনিক মানুষ হচ্ছে খাপ না-খাওয়া প্রাণী। সমাজের ও পরিবারের সঙ্গে তার খাপ খায় না, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গেও না। নগরের নির্বেদ তাকে পীড়া দেয়, ব্যর্থতার বোধ তাকে হতাশা করে তোলে। মেকি নাগরিক জীবন তাকে এনে দেয় ক্লান্তি। কিন্তু পঞ্চাশ-পরবর্তী সময়ের কটি কবিতায় এসব বিষয় এসেছে? অল্প কিছু লেখায় এগুলো স্থান পেলেও কতখানি সামর্থ্যের সঙ্গে প্রযুক্ত হয়েছে তারাÑ এ প্রশ্ন করাই চলে। অন্যদিকে বর্ধিষ্ণু বিশাল নগরের বিপরীতে ক্ষয়িষ্ণু গ্রামীণ জীবনের হাহাকার নিয়ে রচিত আধুনিক কাব্য আর যা-ই হোক ভিড়ের যন্ত্রণা তুলে ধরতে অনিচ্ছুক। তা বরং ওই ব্যক্তি মানুষকে তারা অনিরামেয় বেদনা ও নৈঃসঙ্গের পটভূমিতে নতুন দৃষ্টিকোণসমেত উপস্থাপন করতে আগ্রহী।
বিশ্বকবিতায় আধুনিকতা সূচিত হয়েছিল আজ থেকে একশ বছর আগে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাতে যুক্ত হয়েছে অভাবনীয় বৈচিত্র্য। ওই আধুনিকতা এখন আরও বহুরূপী ও সূদৃঢ়। ফলে চিত্রকল্পের ও বাকপ্রতিমার ব্যবহারগত ধরনও পরিবর্তিত হয়েছে। সেজন্য আজ বুদ্ধিদীপ্ত কবিকল্পনার এবং সংক্রামী শব্দের ও ভাবনার কোনো বিকল্প নেই। গত ৭৫-৭৭ বছরের কবিরা প্রাকরণিক বিষয়ে দক্ষ হয়েছেন। শব্দ ও শব্দবন্ধ ব্যবহারের বিচিত্র নতুন কৌশল রপ্ত করেছেন তারা। আমি সব সময়ই ভাবগভীর কবিতার পক্ষে। সহজ-স্বচ্ছন্দ ভাষার মাধ্যমে যদি ওই গভীরতাকে ধরা যায়, তাহলে তার চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারে না। তবে এখানে কথা আছে; ভাষিক সহজতা ও সারল্যের ভেতর দিয়ে লেখক যদি কোনো কিছুর বর্ণনা দেন অথবা কোনো পরিস্থিত তুলে ধরেন এবং সেখানে কাব্যভাষার জাদুকরী প্রকাশ বা কল্পনাভাবনার প্রাতিস্বীকতা না থাকে, সেই রচনা আধুনিক কাব্য হিসেবে মার খেতে বাধ্য। লেখক যদি চিন্তাচেতনা ও রুচির ক্ষেত্রে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির ধারক না হন, তাহলে তার পক্ষে আধুনিক কবিতা লেখা অসম্ভব।
বাংলাদেশে এমন কবিতা(?) অনেক বেশি লেখা হচ্ছে, যা খুব দ্রুত বুঝে ফেলা যায়; দ্বিতীয়বার পাঠ করতে হয় না। এ ধরনের লেখা আমাদের মনে চমৎকারিত্বের কিংবা মুগ্ধতার বোধ জাগায় না। এসব রচনায় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের ছাপ দেখতে পাই না সচরাচর। অথচ বহির্বিশ্বের আধুনিক কাব্যের একটা বড় অংশে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়। এ যুগে কবিতার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ একই সঙ্গে শিল্পোত্তীর্ণ ও সুগম হওয়া। কিন্তু সে কাজ সহজসাধ্য নয়। আধুনিক কবিতা হচ্ছে ব্যক্তিগত কবিতা, যেহেতু তা ব্যক্তির একান্ত নিগূঢ় অভিজ্ঞতা সাকার করে তোলে। এ জাতীয় রচনা তখনই গ্রহণযোগ্যতা পায়, যখন তাতে প্রযুক্ত বিশেষ শব্দাবলির ও প্রতীকের ভেতর অর্থসংগতি থাকে। একটা দৃষ্টান্ত দেব, সমুদ্রসৈকতে রাস্তার প্রান্তের একটা পিলার দেখে কবি লিখলেন, ‘এই যে পিলার, এর মানে রাস্তা শেষ। রাস্তা কি শেষ আসলেই? এখান থেকেই তো সমুদ্রের রূপকথা শুরু।’ এখন কথা হচ্ছে, কবির ওই পিলার দেখার মুহূর্তের অনুভূতি ঠিক কেমনি ছিল পাঠক তা কোনোদিনই ধরতে পারবেন না। কিন্তু ‘জলপথ’ শব্দটি যদি মনে থাকে এবং গভীর সমুদ্রের বর্ণাঢ্য মাছ-গাছগাছালি সম্বন্ধে যদি পাঠক অবগত হন, তাহলে সমুদ্রের রূপকথার এক/একাধিক অর্থ তিনি খুঁজে পাবেন। হৃদয়স্পর্শী ভাব কল্পনাকে শব্দের যথাসম্ভব সহজ প্রয়োগের ভেতর দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা আধুনিক কবির এক বড় কাজ। এবং এ পথেই কবিতাকে বিনোদীও করে তোলা সম্ভব যেমনটা করতে পেরেছিলেন লোরকা, শক্তি চট্টোপাধ্যায় বা আবুল হাসানের মতো কবিগণ। আজ আমরা তেমন কবিতাই চাই, যাতে থাকবে স্পষ্টভাবে কথা বলার গুণ, সেইসঙ্গে অনেকখানি আলোছায়া।