মাহমুদ কামাল
প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০২৫ ১১:০৮ এএম
ষাটের দশকের অন্যতম কবি আল মুজাহিদী শুরু করেছিলেন ছাত্ররাজনীতি দিয়ে। কবিতাও লিখতেন কিন্তু সেই সময় ছাত্ররাজনীতিই ছিল মুখ্য। বক্তা হিসেবে ছিলেন অসম্ভব জনপ্রিয়। বহুদূর এগিয়েছিলেন। রাজনীতিতে সময় এবং সিদ্ধান্ত বড় একটি বিষয়। একটু এদিক-ওদিক হলেই বিপর্যয়। মুজাহিদী ভাই ছিলেন ডাকসাইটে ছাত্রনেতা। লেগে থাকলে মন্ত্রী হতেন নিশ্চিত। বীর মুক্তিযোদ্ধা রাজনীতিতে থিতু হতে পারলেন না। হৃদয়ে যার সাহিত্যপ্রীতি একসময় তা ফুটে উঠবেই। তিনিও প্রস্ফুটিত হলেন। ষাটের দশকের কবি হিসেবে তার স্থান এখন নির্ধারিত।
কবি আল মুজাহিদী দীর্ঘদিন দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্যের পাতা সম্পাদনা করতেন। তখন দৈনিকের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। মুজাহিদী ভাই তার জন্মস্থান টাঙ্গাইল থেকে অফিস করতেন। রোববারের (এখন শুক্রবার) সাহিত্যের পাতার সঙ্গে তুলনা করার জন্য অন্য দুয়েকটি দৈনিক পত্রিকা কিনে আনতেন। আমরা অর্থাৎ কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজ, শফিকুল হাসান মুজাহিদ ভাইয়ের নির্দেশমতো প্রতি রোববার তার বেপারিপাড়ার বাড়িতে উপস্থিত থাকতাম। একটি বড় টেবিলে অন্যান্য কাগজের সাহিত্যের পাতা রেখে ইত্তেফাকের পাতাটি রেখে আমাদের মন্তব্য করতে বলতেন। এ কথা ঠিক তিনি খুব আন্তরিকতার সঙ্গে পৃষ্ঠা দুটো সাজাতেন। সেখানে প্রায়ই আমাদের লেখা থাকত। মুজাহিদী ভাই আমার অসংখ্য কবিতা ছেপেছেন। সেই সঙ্গে সম্মানিপ্রাপ্তও হয়েছি। ছাত্রজীবনে এই প্রাপ্তি আমাদের প্রচুর উৎসাহ জুগিয়েছে।
রাজনীতি বাদ দিয়ে মুজাহিদী ভাই পুরোপুরি কবিতায় আত্মনিয়োগ করে ষাটের দশকের অন্যতম কবি হিসেবে অভিষিক্ত হয়েছেন। রাজনীতির বাইরে আসলে কেউ নয়। মাঠের রাজনীতি না হলেও অনেকেই মনে ধারণ করেন নিজস্ব চিন্তা ও চেতনা। যেহেতু কবি আল মুজাহিদী রাজনীতি করেছেন, সংগত কারণেই তার রাজনৈতিক কবিতা থাকবেই। প্রথম কাব্য ‘হেমলকের পেয়ালা’র প্রথম কবিতাটির নাম, ‘কারাবন্দি’। তার কারাগারের সময়টুকু নিয়েই এই কবিতাটি। প্রায় সব বিষয় নিয়েই তিনি কবিতা লিখেছেন। প্রেম, প্রকৃতি তো আছেই আন্তর্জাতিকতাও লক্ষণীয় তার বিভিন্ন কবিতায়। প্রকৃতি-বিষয়ক কবিতার মধ্যে তিনি ‘মৃত্তিকা’ শব্দটি বেশি ব্যবহার করেছেন। প্রকৃতির বহু অংশ জুড়েই তো মৃত্তিকা। নীলিমাও তার প্রিয় বিষয়। ‘নীলম নীলিমা’ নামে রয়েছে তার শিশু-বিষয়ক ছড়াগ্রন্থ।
কবিতা নির্মাণে কবি আল মুজাহিদীর রয়েছে নিজস্বতা। এ প্রসঙ্গে তার ‘আমার নির্মাণ’ কবিতাটি এখানে উদ্ধৃত করি।
“আমিও আমার ‘আমি’-আমাকে নির্মাণ করি যদিÑ
দিনরাত বয়ে যায় শুধু একটি নিঃসঙ্গ নদী
নীরবে নিভৃতে। আমি কি তখন আরও নিভৃতির
তীরে গিয়ে হবো ভীষণ অস্থির?
জলধির জলরেখা ছুঁয়ে পার হয়ে ছুটে যাই আরেক জলধিÑ
আমিও আমার ‘আমি’- আমাকে নির্মাণ করি যদি
তুমি কি তখন আমার আমাকে খুঁজে পাবে নির্বাক পয়োধি?
বলো?”
সাগরের কাছে নিজের অস্তিত্বের প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন তিনি। সাগর কখনোই নির্বাক নয়। কবির সংশয় তিনি কি নির্বাক? কিন্তু কবি এক জলধির সীমারেখা পার হয়ে অন্যটির কাছে ছুটে যান। এখনেই কবির স্বকীয়তা। কবি তার কবিতা নির্মাণ নিজস্ব আঙ্গিকের মধ্যেই বেঁধে রেখেছেন।
কবি আল মুজাহিদী দীর্ঘ পথ পেরিয়ে নিজের কাছেই আবার ফিরে এসেছেন। প্রতিটি মানুষের জীবনের হিসাব-নিকাশ অবশ্যই থাকে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অনেকেই মিলিয়ে দেখেন তার জীবনের হিসাবের খাতা। মেলাতে পারেন না অনেকেই। কবি আল মুজাহিদী তার ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ গ্রন্থের শেষ কবিতা ‘ধরিত্রীর ধুলো’ কবিতায় এই প্রশ্ন করেছেন।
“জীবনের ধুলো কত যে ধূসর
আমরা কি জানি?
জীবনের নভোগ্রাম কতো যে বিস্তীর্ণ
বর্ণিল, অস্থির
আমরা কি জানি? জীবন কি বসুন্ধরা
বসুন্ধরা কি জীবন, ভ্রাম্যমাণ?
জীবনের ধুলো কতো যে ধূসর
অস্মৃত, অস্তর্থ্য, অন্তঃসার
আমরা কি জানি?”
আমরা সবাই তো এই পৃথিবীতে ভ্রমণ করতেই এসেছি। এই বসুন্ধরা আসলেই অন্তঃসার। এই উপলব্ধি জীবনের শেষ প্রান্তে এলে ভীষণ পীড়া দেয়। কবি আল মুজাহিদী তার ব্যতিক্রম নন।