আল মুজাহিদী
মতিন বৈরাগী
প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০২৫ ১১:০১ এএম
আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২৫ ১১:০৫ এএম
আল মুজাহিদী, ১ জানুয়ারি ১৯৪৩। প্রকৃতি : জয়ন্ত সরকার
এ পৃথিবী এখনো
এ পৃথিবী এখনো তোমার। এই আলো হাওয়া বসুমতী ফুল
কত আশ্চর্য সরল নক্ষত্ররা জ্বলজ্বল করে
তোমার পুরনো দিন এবং আলিসা ভাঙো; ভুল।
জানো? আলোর বিস্ফার ঘটে নগরে প্রান্তরে।
তুমি জেগে থাক শুধু জীবিতের প্রাণে
যৌবনের জড়িম রক্তিম গান গেয়ে নাচাও ধমনি
তোমার প্রাণের ধারা বয়ে যাক বহু মোহনায়
তোমার রক্তের আমি হব ঋণী;
বহুকাল রয়ে যাবে তোমার স্মৃতির মমিÑ
এ স্মরণ এই ব্যাবেল উদ্যানে।
সূর্যাস্তের পর
শিশুরা সূর্যাস্ত দেখো!
যে সূর্যাস্তে তোমাদের পিতা-মাতা, দাদা-দাদি আর
পিতৃপুরুষের ছায়া পড়ে আছে।
তারা বললেন, ‘মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে
কাল তোমরা জন্ম নেবে
ভোরের আলোয়
নতুন পৃথিবী।
তোমাদের ডাকছে একটি সূর্যের
প্রত্যাশায়।
তোমরা সম্ভব করে তোলো
এক সূর্যভোর।
তোমাদের পূর্বপুরুষরা
সূর্যাস্তের কথা
বলে গেছেন।
ধ্বংসস্তূপের ওপর
জেগে ওঠবে নতুন সূর্য
ফিনিক্সের পোড়াডানা থেকে।
প্রজ্জ্বল, প্রোজ্জ্বল হও
অগ্নিশিখা জ্বলে ওঠো
সুন্দর স্ফুলিঙ্গ!
প্রমত্ত ছড়িয়ে পড়োÑ
আমাদের মুখমণ্ডলে এবং সভ্যতার
ক্রন্দসী গ্রীবায়Ñ
তুমি শুধু অগ্নিকান্ত হও, অগ্নিকান্ত
প্রজ্জ্বল, প্রোজ্জ্বল হও তুমি
আগুনে পোড়াও পোড়োজমি, মৃৎভূমি।
০১.
‘শরীর-মন-আত্মার অবিরাম ক্রন্দন ‘এ পৃথিবী এখনো,’ কবিতাটিতে বহুমাত্রিকতা বিদ্যমান। এখানে ‘ভাঙো’ ও ‘ভুল’ শব্দ শারীরিক ও মানসিক বিচ্ছিন্নতার প্রকাশ। [ ‘আলিসা’ ঈশ্বর কর্তৃক সুরক্ষিত বা মহৎ] ভেঙে যাওয়া মানে হারানো সম্পর্ক বা স্বপ্ন, যা মনের ক্ষত ‘রক্ত ও ধমনির ব্যথা’। ‘যৌবনের জড়িম রক্তিম গান গেয়ে নাচাও ধমনি’ এখানে ‘রক্তিম’ মানে রক্তাক্ত এবং ‘ধমনি’ বোঝায় রক্তনালি এই শাব্দিক ব্যবহার শারীরিক যন্ত্রণা ফুটিয়ে তোলে। যৌবনের গান রক্তের সঙ্গে মিশে যাওয়া মানে জীবনের বেদনাদায়ক স্পন্দন। ‘তোমার রক্তের আমি হব ঋণী’ কবি নিজেকে দায়গ্রস্ত মনে করছেন এবং আত্মিক দায়বদ্ধতার অপরাধবোধ তার বিবেক ও চেতনাকে আক্রান্ত করছে; তার অনুভূতি আমরা লক্ষ করতে পারি।
কবির ২য় কবিতা
‘সূর্যাস্তের পর’
এই কবিতায় কবি মৃত্যুভীতি ও অস্তিত্ব সংকটকে গভীর মনস্তাত্ত্বিক বোধ থেকে প্রকাশ করছেন। ‘মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে’ এখানে মৃত্যুর প্রত্যাশা ও অস্তিত্বের অনিশ্চয়তার রূপ ফুটে ওঠে। পূর্বপুরুষদের ছায়া মানে ইতিহাসের বোঝা, যা শরীর ও মনকে আচ্ছন্ন করে এবং ক্লান্ত করে। ‘ভোরের আলোয় নতুন পৃথিবী’ অর্থাৎ কবি প্রত্যাশা করছেন এক নতুন পৃথিবী যেখানে চলমান অস্তিত্ব সংকটের অবসান মিলবে; যা স্পষ্টতই মুক্তির আর্তি, হৃদয়ের আর্তনাদ।
কবির ৩য় কবিতা
‘প্রজ্জ্বল, প্রোজ্জ্বল হও’
[প্রজ্জ্বল মূল ধাতু জ্বল, প্র-যুক্ত হওয়ায় দ্বিত্ব ব্যঞ্জন ঠিক থাকে। আর প্রোজ্জ্বল-এ ভিত্তি শব্দ উজ্জ্বল। উপসর্গ যোগে ধ্বনিগত পরিবর্তনে উ→ ও হয়ে যায়, ফলে হয় প্রোজ্জ্বল।]
তৃতীয় কবিতায় সভ্যতার বেদনাগুলোকে ভাষ্যবয়ানে কবি উপস্থাপন করছেন এভাবেÑ ‘সভ্যতার ক্রন্দসী গ্রীবায়’ ‘ক্রন্দসী’ [কান্না অর্থে] এবং ‘গ্রীবা’ শব্দে সমগ্র মানবসভ্যতার ক্ষত ফুটে উঠেছে। এটি ব্যক্তির চেয়ে সামষ্টিক আত্মার ক্রন্দনকে স্ফুরিত করে। ‘আগুনে পোড়াও পোড়োজমি, মৃৎভূমি’ ‘পোড়াও’ শব্দে বর্তমান অস্তিত্বের প্রতি ঘৃণা ও ধ্বংসকামনা প্রকাশ পেয়েছে, যা শরীর ও মনের গভীর অসুস্থতার লক্ষণ।
কবিতা ১-৩ তিনটি কবিতায় পারস্পরিক বাইনারিগুলো এর অর্থকে কাঠামোবাদের আলোকে পাঠককে উপলব্ধি করতে সহায়ক হয়। যেমন :
১.
‘এ পৃথিবী এখনো’ কবিতায়
জীবন ↔ মৃত্যু ‘তুমি জেগে থাক শুধু জীবিতের প্রাণে’ বনাম, ‘তোমার স্মৃতির মমি’ [জীবন্ত অস্তিত্ব বনাম মমিকৃত স্মৃতি] অতীত ↔ ভবিষ্যৎ ‘তোমার পুরনো দিন’ বনাম ‘বহু মোহনায়’ [ভাঙা অতীত বনাম অনন্ত ভবিষ্যৎ] ব্যক্তি/ সমষ্টি ‘তোমার রক্তের আমি’ বনাম এই ব্যাবেল-উদ্যানে’ [ব্যক্তিগত ঋণ বনাম সার্বজনীন স্মরণ]
২.
‘সূর্যাস্তের পর’ কবিতায়
সূর্যাস্ত ↔ সূর্যোদয় : ‘শিশুরা সূর্যাস্ত দেখো! বনাম ‘এক সূর্যভোর’ [বিলুপ্তি বনাম পুনর্জন্ম] পূর্বপুরুষ ↔ নতুন প্রজন্ম: ‘পিতৃপুরুষের ছায়া’ বনাম ‘তোমরা জন্ম নেবে’ [ মৃত ইতিহাস বনাম ভবিষ্যতের আশা] ধ্বংস সৃষ্টি :‘ধ্বংসস্তূপের ওপর’ বনাম ‘জেগে ওঠবে নতুন সূর্য’ [পুরনো ধ্বংস বনাম নতুন সৃষ্টি]
৩.
‘প্রজ্জ্বল, প্রোজ্জ্বল হও’
অগ্নি ↔ মৃত্তিকা ‘অগ্নিশিখা জ্বলে ওঠো’ বনাম ‘মৃৎভূমি’ [শক্তির প্রতীক বনাম নিষ্ক্রিয় মৃত্তিকা] সৌন্দর্য ↔ বিকৃতি : ‘সুন্দর স্ফুলিঙ্গ! বনাম ‘ক্রন্দসী গ্রীবায়’ [আদর্শ সৌন্দর্য বনাম বর্তমানের বিকৃতি] ব্যক্তি/ সভ্যতা : ‘আমাদের মুখমণ্ডলে’ বনাম ‘সভ্যতার ক্রন্দসী গ্রীবায়’ [ ব্যক্তিগত অস্তিত্ব বনাম সামষ্টিক ব্যথা]
বাইনারির সম্পর্ক
আর্তধ্বনি কবিতার আবেগের মূল, যা শরীর-মন-আত্মার অসুস্থতা প্রকাশ করে। ব্যক্তিগত বেদনা হলেও তা সামষ্টিক অস্তিত্বের প্রতীক হয়ে ওঠে। যেমন ‘সভ্যতার ক্রন্দসী গ্রীবা’। বাইনারি বৈপরীত্য কবিতার দার্শনিক কাঠামো, যা জীবন-মৃত্যু, ধ্বংস-সৃষ্টি, অতীত-ভবিষ্যৎ প্রভৃতি দ্বন্দ্বের মাধ্যমে অস্তিত্বের অর্থ অনুসন্ধান করে। পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ায় কবিতাগুলো দার্শনিক গভীরতা ও মানবিক বেদনার এক অনন্য সংশ্লেষণ, যা আল মুজাহিদীর কবিতার মূল শক্তি। মুজাহিদী ভাইয়ের এই তিনটি কবিতা উত্তরাধুনিকতা ও উত্তর-কাঠামোবাদের আলোকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, লক্ষণীয় হয়ে ওঠে যে, এগুলো নান্দনিক ও দার্শনিক দিক থেকে সার্থকতার রূপায়ণ।
‘এ পৃথিবী এখনো’-এ ‘ব্যাবেল-উদ্যান’ প্রতীকটি একক সত্য বা ঐকমত্যের অসম্ভবতা নির্দেশ করে। বাইবেলের ব্যাবেল টাওয়ারের প্রতীক ব্যবহার করে কবি দেখান, মানুষের স্মৃতি ও অস্তিত্ব কখনও একত্রিত হতে পারে না, এটি উত্তরাধুনিক আখ্যান-বিচ্ছিন্নতার সাফল্য। ‘সূর্যাস্তের পর’-এ পূর্বপুরুষের ছায়া ও নতুন প্রজন্মের আশার মধ্যে ইতিহাসের রৈখিকতা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। কবি বলেন, ‘ধ্বংসস্তূপের ওপর জেগে ওঠবে নতুন সূর্য’ যা ইতিহাসকে চক্রাকার ও অসম্পূর্ণ হিসেবে উপস্থাপন করে। ‘প্রজ্জ্বল, প্রোজ্জ্বল হও’ কবিতায় ‘অগ্নিকান্ত’ [অগ্নির দেবতা] ও ‘স্ফুলিঙ্গ’ প্রতীকগুলো স্থির পরিচয়ের অসারতা প্রমাণ করে। কবি বলেন, ‘তুমি শুধু অগ্নিকান্ত হও’ যা কোনো স্থায়ী অস্তিত্ব নয়, বরং ক্ষণস্থায়ী শক্তির প্রতীক। এটি উত্তরাধুনিক বিকেন্দ্রিকতার সাফল্য।
তিনটি কবিতাতেই অসম্পূর্ণ বাক্য [‘আলিসা ভাঙো; ভুল।], অস্পষ্ট প্রতীক ‘ব্যাবেল-উদ্যান’, ‘ফিনিক্সের পোড়া ডানা’ এবং বহু স্তরবিশিষ্ট অর্থ ‘তোমার রক্তের আমি হব ঋণী’ ব্যবহার করা হয়েছে। এটি পাঠককে সক্রিয়ভাবে অর্থ নির্মাণে ভাবাবে।
উত্তর-কাঠামোবাদের আলোকে কবিতাকটিতে দ্বৈততার অপসারণ রয়েছে যেমন ‘এ পৃথিবী এখনো’-কবিতায় ‘জীবন/মৃত্যু’, ‘অতীত/ভবিষ্যৎ’ ব্যবহার দ্বারা বাইনারিগুলো অস্থিতিশীল করা হয়েছে। যেমন : ‘তোমার স্মৃতির মমি’ বলে মৃত্যুকে জীবন্ত করা হয়েছে, আবার ‘বহু মোহনায়’ বলে ভবিষ্যৎকে অসম্পূর্ণ রাখা হয়েছে। এটি দেরিদার ধারণা ‘ট্রেস [ঞৎধপব] এর সাফল্য, যেখানে এক ধারণা অন্যটিকে ছায়া হিসেবে বহন করে। ‘সূর্যাস্ত/সূর্যোদয়’ বাইনারি পুনরাবৃত্তিমূলক চক্রে পরিণত হয়েছে। কবি বলেন, ‘পূর্বপুরুষেরা সূর্যাস্তের কথা বলে গেছেন’ যা অতীত > ভবিষ্যৎ পরস্পরকে নির্ধারণ করে। এটি ‘ডিফারেন্স’ ‘ফরভভবৎবহপব’ ধারণার সাফল্য ধারণ করে।‘প্রজ্জ্বল, প্রোজ্জ্বল হও’ কবিতায় ‘অগ্নি/মৃত্তিকা’ বাইনারি হাইমেন [বিবাহ/সীমানা] প্রতীকে একীভূত হয়েছে। কবি বলেন, ‘আগুনে পোড়াও পোড়োজমি, মৃৎভূমি’ যেখানে ধ্বংস [অগ্নি] ও সৃষ্টি [মৃত্তিকা] একসঙ্গে ঘটে। এটি দেরিদার ‘হাইমেন’ ধারণার সাফল্য, যা বিপরীতদের মধ্যে অবিচ্ছেদ্য সীমানা তৈরি করে। তিনটি কবিতাতেই শব্দের বহুমুখী অর্থ নির্মাণের সুযোগ রয়েছে যেমন : ‘আলিসা’ নাম/বিচ্ছিন্নতা, ক্রন্দসী গ্রীবা, কান্না/সভ্যতার বোঝা ইত্যাদি। আবার পোড়োজমি, পোড়ামাটি/শূন্যতা এটি দেরিদার ‘লগোসেন্ট্রিজমের অসারতা প্রমাণ করে এবং দেখায় যে, ভাষা কখনও কোনো সত্যকে এককভাবে ধারণ করতে পারে না।
কবিতা তিনটির নির্মাণ সার্থকতা
উত্তরাধুনিক বৈশিষ্ট্যগুলো ভালোভাবে লক্ষ করলে দেখা যাবে, মুজাহিদী ভাইয়ের কবিতাগুলো তত্ত্ব অর্থে সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ সার্থকতা পেয়েছে। কবিতায় বৃহৎ আখ্যানকে অস্বীকার, পরিচয়ের অস্থিরতা, অসম্পূর্ণতা সবই সফলভাবে উপস্থাপিত আছে। বাইনারি অপসারণ, ট্রেস ও হাইমেন প্রতীকায়ন ও দার্শনিক গভীরতাও অস্তিত্বমান। কিছু প্রতীক যেমন ‘ফিনিক্স’ ক্লিশে মনে হতে পারে, তবে অধিকাংশই নতুন। অস্পষ্টতা ও বহু স্তরবিশিষ্ট অর্থ পাঠককে সক্রিয় অর্থ নির্মাণে উৎসাহিত করবে।
আল মুজাহিদী ভাইয়ের কবিতাগুলো উত্তরাধুনিক ও উত্তর-কাঠামোবাদী চেতনার একটি শক্তিশালী রূপক হিসেবে সার্থকতা পেতে পারে। এগুলো শুধু দার্শনিক ধারণাগুলোকে ব্যাখ্যা করে না, বরং কাব্যিক ভাষার মাধ্যমে অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। বিশেষ করে ‘ট্রেস’-এর ধারণা ‘তোমার স্মৃতির মমি’ ও ‘পূর্বপুরুষের ছায়া’ প্রতীকে জীবন্ত করে। ‘হাইমেন’-এর ধারণা ‘অগ্নি/ মৃত্তিকা’ বাইনারিতে দার্শনিক গভীরতা যোগ করে। অসম্পূর্ণতা ও অস্পষ্টতা পাঠককে নিজের অর্থ খুঁজতে বাধ্য করে; যা উত্তরাধুনিক পাঠের মূল লক্ষ্য। কিছু ক্ষেত্রে যেমন ফিনিক্স প্রতীক ক্লিশে এড়ানো যেতে পারত। সব মিলিয়ে এই কবিতাগুলো বাংলা কবিতায় উত্তরাধুনিক চেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হতে পারে।
[নোট : ট্রেস এবং হাইমেন তত্ত্ব জ্যাক দেরিদার। শিল্প-সাহিত্য আধুনিক আলোচকগণ এই তত্ত্ব ব্যবহার করে উত্তর কাঠামোবাদ/কাঠামোবাদ এবং উত্তরাধুনিক কাব্যালোচনা করে থাকেন। ট্রেস মানে উপস্থিতির ভেতরে অনুপস্থিতি, অর্থাৎ অর্থ অপসারণ বা অর্থ নির্মাণ। আর হাইমেন দেখায় যে দুইয়ের মধ্যবর্তী সীমা স্পষ্ট নয়; তা একই সঙ্গে যুক্তও করে, বিচ্ছিন্নও করে। অর্থাৎ হাইমেন দ্বৈত বিরোধ ভেঙে দেয়।]