নকিব মুকশি
প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০২৫ ১২:২৮ পিএম
সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে আছে দীঘল দেহের লোকটি
কারদেনাস: আমরা এর আগে হাঙ্গেরীয় সুরকার দ্যোর্জ কুরতাগ সম্পর্কে কথা বলছিলাম। তিনি বেকেটের রচনায় অনুপ্রাণিত হয়ে একটি গীতিনাট্য রচনা করেছিলেন…
ক্রাসনাহোরকাই: হ্যাঁ, স্যামুয়েল বেকেটের ‘এন্ডগেম’ অবলম্বনে রচনা করা সেটি তাঁর প্রথম অপেরা। কুরতাগ আমার বই ‘সেইওবো দেয়ার বিলো’ পড়েছিলেন। হঠাৎ একদিন আমাকে ফোন করেন এবং কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলেন, ‘হ্যালো, আমি দ্যোর্জ, দ্যোর্জ কুরতাগ।’
আমি বলি, ‘ওহ, দ্যোর্জ কুরতাগ! কেমন আছেন?’
‘ভালো, ভালো।’
‘তা কী ব্যাপার?’
‘ও কিছু না, কিছু না…আমরা…আমরা… এখনই আপনার বইটা শেষ করলাম।’
‘কোন বই?’
‘সে…সে…ওইবো।’
‘ওহ, ‘সেইওবো দেয়ার বিলো’! ভালো লেগেছে?’
‘হ্যাঁ, আসলে ফোন করার কারণ হলো—আমরা আপনাকে ভালোবাসি, এটা বলতে চেয়েছিলাম।’
এরপর আমি দক্ষিণ ফ্রান্সে তাঁর ও তাঁর স্ত্রী মার্তার সঙ্গে দেখা করতে যাই। তিনি অপেরার প্রথম পৃষ্ঠাগুলো আমাকে দেখান। সেটা জটিল, বহুস্তরীয়, যার ভিত্তি ‘এন্ডগেম’। আমরা বেকেট নিয়ে কথা বলতে শুরু করি।
বেকেটের প্রথম দিকের কবিতা পড়ার আমার প্রথম অভিজ্ঞতার কথা তাকে বলি। হয়তো তিনি সেগুলো ব্যবহার করেছিলেন। তিনি বেকেট ও তাঁর ভাষার সম্পর্ক নিয়ে আমার মতামত জানতে চাইলেন।
বেকেটের ভাষাই কুরতাগকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছিল। আমি তাঁকে বেকেটের ভাষার সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রামের কথা বলেছিলাম। কারণ, আমি দেখি, ভাষার সঙ্গে বেকেটের সম্পর্ক মুক্ত নয়, বরং তা ছিল এক আহব। তিনি ভাষার সঙ্গে লড়তেন। কারণ, তিনি অপ্রয়োজনীয় শব্দকে ঘৃণা করতেন। কুরতাগ তাঁর এই ভাষা-সংযম, সাধুর মতো ভাষার এই অনাড়ম্বরতা খুব উপভোগ করতেন।
কারদেনাস: তার মানে বেকেটের শুরুর পর্যায়ের কবিতাগুলো আপনার ওপর প্রভাব ফেলেছিল…
ক্রাসনাহোরকাই: আমার জন্য সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একটি কবিতা আছে, যেখানে এক লোক একা দাঁড়িয়ে আছে এক সমুদ্রসৈকতে। চারপাশ ধূসর, বিষণ্ন। কোনো আবেগ–উচ্ছ্বাস নেই, কিচ্ছু নেই। সৈকতটিতে কেবল একটি লোক দাঁড়িয়ে আছে। ঠান্ডা বাতাস বইছে।
আমি তখন ১৯ বছরের তরুণ। কে লিখেছে এমন কবিতা, পাগলের মতো খুঁজছিলাম তাঁকে। যেহেতু আমি তখন খুব তরুণ, তাঁর সম্পর্কে জানা আমার খুব দরকার ছিল। এই কবিতাগুলো যেন বলছিল—সবকিছু সম্ভব। [হাসি]
লম্বা লোকটি সমুদ্রসৈকতের বালুতে দাঁড়ানো। মিহি ঠান্ডা বাতাস বইছে। এই দৃশ্য কুরতাগের কাছেও খুব তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। তিনি বললেন, ‘সত্যিই, একজন লম্বা মানুষ? কতটা লম্বা? ঠিক কতটা?’
‘আমি জানি না।’ [হাসি]
‘সকাল না সন্ধ্যা?’
সমস্ত সৃষ্টিজগতের সঙ্গে তার এক গোপন সংযোগ
কারদেনাস: আপনার বইয়ে ফিরে আসি—আমার মনে হয়, ‘স্যাটানট্যাঙ্গো’র এসতিকা, ‘দ্য মেলানকলি অব রেজিস্ট্যান্স’–এর ভালুসকা এবং ‘ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার’–এর কোরিন—এই তিন চরিত্রের মধ্যে একটা সংযোগ আছে, যেন তারা এই পৃথিবীর কেউ নয়।
ক্রাসনাহোরকাই: হ্যাঁ, তারা এমন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, যাদের জন্যই আমরা এই জগতে থাকার সুযোগ পাচ্ছি। কারণ, তারাই আত্মত্যাগ করে, তারাই এই দুনিয়ার শিকারে পরিণত হয়। রুশ সাহিত্যে, দস্তয়েভস্কি-তারকোভস্কির মতে, তারাই আমাদের জন্য সেই মূল্য, যা দিয়ে আমরা এই পৃথিবীতে আপস-নিষ্পত্তি করে বেঁচে থাকার সুযোগ কিনি। এই পৃথিবীতে আপসের সঙ্গে বেঁচে থাকার যে সম্ভাবনা, তার মূল্য হিসেবে আমরা তাঁদেরই বলি দিই। এদের মধ্যে অবশ্যই কিছু মিল আছে, কিন্তু তারা একেবারে একরকম নয়।
এসতিকা হলো শুদ্ধতম, সরলতম বলি। কারণ, সে যাকে ভালোবাসে, তার দেওয়া সব প্রতিশ্রুতিই বিশ্বাস করে। কিন্তু সে সম্পূর্ণভাবে অসহায়। আর এই ধরনের মানুষকেই আমি খুব ভালোবাসি। প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যেও আমি এই ধরনের মানুষকে সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারি। আর তারাও এই পৃথিবীতে একে অপরের অস্তিত্ব টের পায়। এ ধরনের মানুষদের মধ্যে একটি আড়াল সম্প্রদায় রয়েছে। কিন্তু তারা সব সময় একা। তারা একে অপরের কোনো সাহায্য করতে পারে না। তাদের নিয়তি একটাই: নিজেকে হারিয়ে ফেলা। কারণ, তারা সত্যিকার ভুক্তভোগী বা বলির শিকার হয়। এই পৃথিবীতে এটাই তাদের একমাত্র কাজ, চরম নিষ্ঠুর কাজ। এই চরিত্রগুলো না থাকলে এই পৃথিবীর গোটা যন্ত্রকাঠামোই অচল হয়ে পড়বে।
এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো ‘স্যাটানট্যাঙ্গো’। ‘স্যাটানট্যাঙ্গো’র গোটা কাঠামো, এর পুরো গল্প, সেখানে থাকা পুরুষ ও মহিলাদের অবস্থা—এগুলো কোনো বলি বা শিকার হওয়া ছাড়া অস্তিত্বশীল হতে পারত না। এসতিকার আত্মত্যাগ না থাকলে এই উপন্যাসের চরিত্ররা নিজেদের ভাগ্য তৈরি করতে পারত না।
ভালুসকার ব্যাপারটা সামান্য ভিন্ন। ভালুসকা একটি ছোট প্রাণীর মতো, সে বিশ্বাসের সৃষ্টি। কারণ, পুরো সৃষ্টিজগতের সঙ্গে তার একটা গোপন সংযোগ আছে, আর গোটা সৃষ্টিই তার কাছে চমৎকার—ভালুসকা কেবল এ সত্যই দেখে। ভালুসকার কাছে এই পৃথিবী আর কল্পজগৎ একই। আর মানুষ হলো এই বিশাল সৃষ্টির ক্ষুদ্র অংশমাত্র। তার কাছে মানুষ খুব একটা আগ্রহের বিষয় নয়, সৃষ্টির মধ্যে একটি অতি ছোট ভুল বা ত্রুটিমাত্র। কারণ, সামগ্রিক সৃষ্টিজগৎ সত্যিই চমৎকার।
আসলে তুমি আর আমি এখন প্রকৃতির খুব কাছে বসে আছি (প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে আঙুল উঁচিয়ে ইঙ্গিত)। যদি তুমি এমন একটি জায়গা খুঁজে পাও, যেখানে শুধু প্রকৃতি আছে, মানুষ নেই, তবে সেটাই স্বর্গ। কিন্তু পর মুহূর্তেই যদি একজন মানুষ সেই দৃশ্যপটে প্রবেশ করে, আমরা সঙ্গে সঙ্গে চলে যাই ‘ওল্ড টেস্টামেন্ট’–এর প্রথম অধ্যায়ে। আর আমরা সেই স্বর্গ হারিয়ে ফেলি।