আমির খসরু সেলিম
প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০২৫ ১২:০১ পিএম
‘প্রথম স্কুলে যাবার দিন, প্রথমবার ফেল, / প্রথম ছুটি হাওড়া থেকে ছেলেবেলার রেল... এই শহর জানে আমার প্রথম সবকিছু, পালাতে চাই যত সে আসে আমার পিছু পিছু...।’ কবীর সুমনের এ গানটা বিভিন্নভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। যেমন হুমায়ূন আহমেদের লেখা যে বইটি আমার প্রথম পড়াÑ সেটির কথা বলতে গেলে ফিরে আসে পঞ্চগড় শহরের নাম। মফস্বল এই শহরের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস ওয়ান থেকে ফোর পর্যন্ত পড়েছি।
১৯৮৯ সালে ক্লাস ফোরে পড়ি। তখনই হুমায়ূন আহমেদের একটি বই পড়ি। ওই বয়সে স্কুলপাঠ্যের বাইরে হাতে যেসব বই পেতামÑ এক বসায় তা পড়ে শেষ করে উঠতাম। ঠাকুরমার ঝুলি, ঠানদিদির থলে, রসদাদুর গল্পের ঝুলি, রাক্ষসের দেশে, হাতেমতাই, সিন্দাবাদের অভিযান, মামদো ভূতের গল্প..., আর হাজারখানেক ‘কমিকস’। কমিকসের সংখ্যা একটু বেশিই, ক্লাস টু পর্যন্ত ‘ছবিওলা’ বই ছাড়া কিছুই পড়তে চাইতাম না। ভূত-প্রেত, রাক্ষস-খোক্কস, দৈত্য-দানব, জিন-পরী... এরা সবাই তখন আমার অতি পরিচিত। ফলে বাথরুমে একা যেতে পারতাম না, দরজার কাছে কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। সন্ধ্যার পর খোলা আকাশের দিকে তাকালেই মনে হতোÑ অন্ধকার থেকে ডানা ঝাঁপিয়ে নেমে আসবে দানব। সবচেয়ে কমন ছিলÑ খাটের নিচ থেকে ‘কিছু একটা’ বের হয়ে এসে খপ করে পা চেপে ধরবে...।
এইসব নিয়ে একটু একটু বেড়ে উঠছি। তখন একটা বই এসে আমার চিন্তার জগৎ পাল্টে দিল। বইটার নাম : বোতল ভূত, লেখক : হুমায়ূন আহমেদ। ফ্যান্টাসি এ বইটি ১৯৮৯ সালের আগস্ট মাসে প্রকাশ হয় প্রতীক প্রকাশন থেকে। বইটি একটি ছোট্ট ‘গল্প’-কে ঘিরে চলতে থাকে। গল্পকথক হুমায়ূন নামের এক দুষ্ট ছেলে মুনির নামের এক ভালো ছাত্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে এবং ভূতের বাচ্চা পোষে।
আহামরি তেমন কিছু নয়। অল্পকথায় বলা এই ‘ঘটনার’ সঙ্গে লেখক যুক্ত করেছেন সরল সংলাপ, সহ-ঘটনা, হাস্যরস, দ্রুত পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপট, সংক্ষিপ্ত অথচ প্রভাবশালী দৃশ্যকল্প, চরিত্রবিন্যাস।
তবে তখন যে বিষয়টা আমাকে ‘ক্যাচ’ করেছিলÑ ‘গল্পের টাইম-লোকেশন’ আর ‘ক্যারেক্টার’।
হুমায়ূন যারা পড়েন, তারা জানেনÑ লেখক তার গল্প, উপন্যাসের শুরু থেকেই একটা একটা করে চরিত্র প্রকাশ করেন। প্রথমে, সাধারণত নাম জানান, তারপর অন্য চরিত্রের সঙ্গে সংযোগ ঘটান। এসব চলতে থাকে, এই ফাঁকে লেখক চিত্তাকর্ষক কিছু তথ্য দেন, পাঠক বোর হওয়ার আগেই পটপরিবর্তন করেন। তারপর চরিত্রগুলোকে এগিয়ে যেতে দেন। একদম শেষে থাকে ট্র্যাজেডি, হ্যাপি এন্ডিং অথবা কন্টিউনিটি।
তার সৃষ্টি চরিত্রগুলো বেশিরভাগ পাঠক নিজেদের চেনা জগতের চরিত্রের সঙ্গে রিলেট করতে পারেন। আরে! এই ‘রঞ্জু’ তো আমাদের বিল্ডিংয়ের দোতলায় থাকে।
ক্যারেক্টার স্ট্যাবলিশমেন্টের বেলায় হুমায়ূন অতি দক্ষ। যে কারণেই বুঝি পরবর্তীতে ‘সিরিজ’ লিখেছিলেন! মিসির আলি, হিমু, শুভ্র...।
ক্যারেক্টার স্ট্যাবলিস্টমেন্ট করে, সিরিজ লিখেছেন এ রকম লেখক সাহিত্যজগতে অনেক আছেন। তবে তারা সাধারণত একটি ক্যারেক্টারকেই গড়ে তুলতে চেয়েছেন, লিখেছেন। কিন্তু বাংলাসাহিত্যে একাধিক ক্যারেক্টার জনপ্রিয় করেছেন, নিয়মিত লিখেছেন, এমন মানুষের সংখ্যা কম।
হুমায়ূন আহমেদ এই তালিকায় ওপরের দিকে আছেন। সংক্ষিপ্ততম ‘টাইমল্যাপস’ পার হলে এ রকম আরও একজন লেখকের নাম পাওয়া যায়। তিনি সত্যজিৎ রায়। তার সৃষ্ট চরিত্রগুলোÑ ফেলুদা, প্রফেসর শঙ্কু, তারিণী খুড়ো...।
ফিরি প্রসঙ্গে। আমার শৈশব, পাঠ, অভিজ্ঞতা, মনোভাব... এসবে বিস্তারিত বর্ণনায় একটা ক্যারেক্টার স্ট্যাবলিশমেন্ট হলো। যে আমি ধরে নিয়েছিলাম হরর এলিমেন্ট শুধু ‘লিমিটেড’ আবহেই থাকবে, তার বাইরে আসতে পারবে না। থাকবে গাছের মগডালে, ঝোপে, পানির গভীরে, তালগাছের মাথা, অন্ধকারে…।
এই ধারণা পাল্টে দিলেন হুমায়ূন আহমেদ। বুঝলাম ভূত জিনিসটা শুধু হঠাৎ করে এসে ঘাড় মটকায় না; সে মানুষের কাছেও আসতে পারে, বন্ধু হতে পারে...!
কী যে বিস্ময় ভর করেছিল সেদিন! এই লেখায় হুবহু অনুভূতিটা প্রকাশ করতে পারছি না। সহজ কথায় বলা যায়, ওই বইটি আমার কাছে স্মৃতির এক বিরাট সম্বল। কেননা বোতল ভূত পড়ার পর আমার মন থেকে ভূতের ভয় একেবারে ‘নাই’ হয়ে গিয়েছিল।