× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পাঁচ আঙুলের ছাপ

তাইফুর রহমান তালাশ

প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০২৫ ১১:৫৭ এএম

পাঁচ আঙুলের ছাপ

অ আ ক খ শেখার পাশাপাশি প্রথম পাওয়া কোনো বই হাতে পাওয়া, দারুণ অনুভূতি। বার্ষিক পরীক্ষা শেষে বছরের শুরুতে নতুন বইয়ের গন্ধ, ছবিতে বুঁদ হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা আজও আছে আমার মধ্যে। এখনও কোনো বইয়ের দোকানে গেলে বইয়ে হাতের স্পর্শে, গন্ধ নিতে অদ্ভুদ আনন্দ লাগে। অনেক গল্পেই নিজেকে খুঁজে পেয়েছি, ভেসে চলেছি তবু প্রথম পড়া উপন্যাস, প্রথম পড়া কোনো ভ্রমণ গল্প, প্রথম পড়া কোনো হ‍ুমায়ূন আহমেদ আজও সেই স্মৃতি সতেজ। অমলিন।

এবার খোঁজার পালা। প্রথম. হ‍ুমায়ূন আহমেদ, বই এসব মাথায় ঘুরতে ঘুরতে বেশ পাজল তৈরি হলো। এই পাজল আমাকেই খুলতে হবে।

মনে আছে এক দুপুরের কথা। আম্মার একটা তথ্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য খালার বাসায় গিয়েছি। সাইকেল থেকে নেমে দুপুরের রোদে অবস্থা বেশ খারাপ। বিছানায় বসে আছি খালা বাতাস করছে। হঠাৎ আলমারিতে চোখ আটকে যায়। অযত্নে নীল এবং সাদা মলাটের একটা বই, পাশে আরও কয়েকটা। পাশেই রোল করে রাখা একটা ক্যালেন্ডার। খালাকে বললামÑ এই বইগুলো কার? বলল, তোমার রনি ভাইয়ের। বললাম, নিয়ে যাই। নিয়ে যাও। ন্যাকড়া দিয়ে ময়লা পরিষ্কার করে দেখলাম তাতে লেখাÑ ‘হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম’ হ‍ুমায়ূন আহমেদ। দুপুরের খাবার খেয়ে বই নিয়ে সাইকেল আগের চেয়ে দ্বিগুণ জোরে চালিয়ে বাসায় ফিরছি। রাস্তায় থেমে নীল প্রচ্ছদের মাঝে নিজের হাত বসাতে গিয়ে দেখলাম বেশ ছোট হাত আমার। এভাবেই অনেকদূর পর্যন্ত আসলাম। তপ্ত রোদ, সাইকেল চালিয়ে ক্লান্ত হলে দাঁড়াতে হচ্ছে গাছের ছায়ায়। বাবলা গাছের ছায়ায় বসে ইচ্ছে করছে কয়েকটা পৃষ্ঠা পড়ি, পড়লামও। এর পর কী হবে ভাবতে ইচ্ছে হচ্ছে। মনের মধ্যে অন্যরকম বাড়াবাড়ি কিসিমের অনুভূতি হচ্ছে যে, এই গল্পটা আমি পড়ব। হ‍ুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে  পরিচয় ঘটবে। এভাবেই মন বইয়ের মধ্যে রেখে সাইকেল চালাচ্ছি। মাঝেমধ্যেই সাইকেলের ক্যারিয়ারের দিকে তাকাচ্ছি, কোনোভাবে ঝাকি লেগে পড়ে গেল কি না! কখনও ঠিক করে দেওয়ার ছলে আবারও কয়েক লাইন পড়ছি। বাড়ির কাছাকাছি ঈদগাহ মাঠ, সেই মাঠে বসে আরও কয়েক পৃষ্ঠা পড়ার পাশাপাশি একটু পানি দিয়ে বই পরিষ্কার করার চেষ্টা করলাম। বাড়িতে এসে আম্মার সঙ্গে বার্তাবাহকের যতটুকু তথ্য দেওয়ার থাকে দিলাম। এর পর বিছানায় বসে পড়তে শুরু করলাম। একটা উদ্ভট চরিত্রের দেখা পেলাম। প্রথম পরিচয় ঘটল হিমুর সঙ্গে, বাদলের সঙ্গে। হিমু, মারিয়া, আসাদুল্লাহ, বাদল, রূপা, নূর চাচার দেখা পেলাম। কিন্তু আমাদের আশপাশের মানুষদের চাইতে তারা একটু উদ্ভট। উদ্ভট তাদের কার্যকলাপ, কথা বলা, উত্তর দেওয়াÑ গুলো কেমন যেন। সেদিন আর খেলতে গেলাম না, শেষ করলাম ‘হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম’। সন্ধ্যায় ফিক্সড কাজ থাকত আমার তা হলো হারিকেনের চিমনি ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা। তাতে কেরোসিন আছে কি না, চেক করা। সেদিন সেসব বাদ দিয়ে ডুব দিয়েছিলাম নীল রঙা বইটায়। এক সময় শেষ করলাম। খুব যে বুঝতে পারলাম তা নয়, তবে কয়েকটা জায়গায় ভেসে গেলাম। সাংকেতিক চিঠি, বাদল আর হিমুর আলাপ। ফুফার সঙ্গে হিমুর কথোপকথনে সিরিয়াস ভাব। দেশ রাষ্ট্র নিয়েও কথা যা ওই বয়সে বোঝা আমার জন্য আসলেই কষ্টকর। ভারত, বাংলাদেশ আমাদের রাজনৈতিক দল, মিছিল-মিটিং, মুক্তিযুদ্ধÑ এসব বেশ লম্বা সময় মাথায় রয়ে গেছে। এই বইয়ে ‘শালার ইন্ডিয়া’ শব্দ পড়ে মনে হয়েছিল হ‍ুমায়ূন আহমেদও গালি দিতে পারেন। তখন ‘শালা’ আমাদের কাছে গালি অর্থেই ছিল। আদর্শ নাগরিক হওয়ার কিছু কথা আজও মাথায় গেঁথে আছে এই বইয়ের বদৌলতে। তবে ভারত সম্পর্কে লেখকের এই প্রশ্ন আজও সমাধান করল না নিউরন সেলগুলো। আমাদের স্বাধীনতার জন্য তাদের সাহায্য নিতে হয়েছিল, এ কারণেই কি আমরা হীনম্মন্যতায় ভুগছি? কয়েকটি কিংবা প্রচ্ছদে পাঁচ আঙুল দিয়ে পাঁচটি পদ্মের নির্দেশ এবং তার দর্শন অনেক পরে বুঝেছি। কিন্তু হ‍ুমায়ূন আহমেদ পড়ার শুরু সেখানেই। 

তার কিছুদিন আগে ছুটিতে ফুফুর বাসায় গিয়ে ‘চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস’ পড়েছি, কিন্তু শেষ না করেই বাড়িতে এসেছি। অনেককাল আগে পড়া সেই বই আবারও পড়ার সুযোগ হয়েছিল। এই জগতে প্রবেশের আগ পর্যন্ত স্কুল ম্যাগাজিন ‘চয়নিকা’, চাচার বাসায় বেড়াতে গিয়ে রোমেনা আফাজের দস্যু বনহুর, সুকুমারের আবোল-তাবোল এবং ইউনিসেফ/সেফ দ্য চিলড্রেন কর্তৃক প্রাইমারি স্কুলে আসা কিছু জাদুর বাক্স, যা দিয়েছিল সুনীল সাগরে বৈঠা বাওয়ার অভিজ্ঞতা। এখনও ওয়াল্ট ডিজনি এর কমিক্স বইয়ের নামগুলো মাথায় ঘোরে অনবরত ১০১ ডালমেশিয়ান, বামবি, পোকাহনতাস, নোতরদামের কুঁজো, সিনডেরেলা, জঙ্গলের কাহিনী, টারজান, ঘুমকুমারী, পিটার প্যান, পিনোকিও, ডামবো, হারকিউলিস, আলদিন ইত্যাদি। এই জগতে বুঁদ হয়ে থাকা ছিল পুরো কৈশোরজুড়ে।

‘হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম’ শুরু হলেও লম্বা সময় বিচ্ছিন্ন ছিলাম হ‍ুমায়ূন আহমেদ থেকে। বরং মাঝের সময়গুলোতে শরৎ, এম ডি মুরাদ, এম সজল এই নামগুলোই। বাজারের লাইব্রেরিগুলোতে পাওয়া যেত, সহজেই কেনা যেত। তবে হ‍ুমায়ূন জগৎ আজও অসাধারণ। হয়তো নানান কিসিমের বই পড়ার যে অভিজ্ঞতা, সেটা হ‍ুমায়ূন আহমেদ না পড়লে সম্ভব হতো না। অনেকগুলো জানালা বন্ধ করে দক্ষিণ জানালাটা খুলে দিয়েছিলেন হ‍ুমায়ূন আহমেদ। আজও পথ চলছি, তার দেখানো পথেই। যেভাবে আমি আর বন্ধু লিংকন সকাল-বিকাল বগুড়ার পুরাতন লাইব্রেরিতে ঢুঁ দিতাম নতুন কোনো পুরাতন বই আসছে কি না! সেই পথ অনেক চেনা, আজও ঘুমের ঘোরে হেঁটে যাই শাপলা মার্কেট থেকে আকবরিয়ার গলির বইয়ের দোকানে। আজও ময়ূরাক্ষীর স্বচ্ছজল হয়তো দেখা হলো না, কিন্তু স্বাদ নিয়েছি ভরা পূর্ণিমায় যমুনার দৃশ্য, টিনের চালের বৃষ্টি, আজও ভীষণ ভালোবাসি। এখনও মাঝেমধ্যে রিডিং ব্লক তৈরি হলেই বুক সেলফ থেকে হাতে উঠে নিই প্রিয় সেই হ‍ুমায়ূন আহমেদ। নিমিষেই ভেসে যাই শুরুর দিনগুলোতে হ‍ুমায়ূন আহমেদের বই সংগ্রহ এবং পড়ার রাস্তায়। যে পথ দারুণ মসৃণ আর ঝলমলে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা