ফয়জুল লতিফ চৌধুরী
প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০২৫ ১১:৪৩ এএম
হুমায়ূন আহমেদ তার প্রথম দুটি উপন্যাস নন্দিত নরকে এবং শঙ্খনীল কারাগারের জন্য স্বাধীনতার অব্যাহিত পরেই বিখ্যাত হয়েছিলেন। ১৯৮১ সালে যখন আমি দৈনিক বাংলার সাহিত্য পাতার জন্য বুদ্ধদেব বসুর লেখা ‘রাত ভরে বৃষ্টি’ উপন্যাসটির আলোচনা লিখতে বসি তখনও এই দুটি উপন্যাসের কোনটিই আমার পড়া হয়নি। তার তৃতীয় উপন্যাসের নাম ‘আমার আছে জল’ ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয়। শীর্ষেন্দু-সুনীলের প্রতাপে বাংলাদেশের সাহিত্য তখন কোণঠাসা।
বছরখানেক পর আমার বাল্যবন্ধু বাহারুল আলম আমাকে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস পড়ার তাগিদ দেয়। আমি থাকি যশোর-খুলনা এলাকায়। সেসময় আমি কবি শামসুর রাহমানের সম্পাদনায় ‘অধুনা’ নামের ত্রৈমাসিক সাহিত্যপত্র প্রকাশের কাজে মহাব্যস্ত। মাঝেমধ্যে ঢাকা যেতে হচ্ছে। এ সময় এক দিন কিনে ফেলি ‘ফেরা’ নামের একটি উপন্যাস, যেটি হুমায়ূন আহমেদের চতুর্থ উপন্যাস বলে মনে হয়। এই উপন্যাসটি পড়ার পূর্বাবধি বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে আমার না ছিল ব্যক্তিগত জানাশোনা, না ছিল তার লেখার সঙ্গে কোনোরূপ পরিচয়।
মহৎ লেখকের বই সচেতন পাঠককে আন্দোলিত করে। ‘ফেরা’ পড়ে মনে ধাক্কা লাগল। মনে হয় ‘ফেরা’ আমাকে প্রবলভাবে আন্দোলিত করেছিল এবং হুমায়ূন আহমেদের চিন্তাভাবনা লিখনশৈলী সম্পর্কে ভাবতে প্রণোদিত করেছিল।
‘ফেরা’ উপন্যাসটিতে আমরা এমন একজন হুমায়ূন আহমেদের মুখোমুখি হই, যিনি ২০০৪ সালে ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ এবং ২০০৬ সালে ‘মধ্যাহ্ন’ লিখবেন। ফেরার প্রেক্ষাপটে অনেক চরিত্র। সবাই যেন নায়ক। কিন্তু মতি মিয়া প্রধান একটি চরিত্র। বাউল টাইপের মানুষ মতি মিয়ার কথা অবিস্মরণীয়। সবচেয়ে বিস্ময়কর মনে হয়েছিল বর্ণনার গতি। হুমায়ূন আহমেদ এত দ্রুত লিখছিলেন যে, স্বল্প পরিসরে গল্প অনেকখানি এগিয়ে গিয়েছিল। হুমায়ূন আহমেদের কথাসাহিত্যের অভিমুখ, তার গদ্যশৈলীর বৈশিষ্ট্য, তার চরিত্রচিত্রণের দক্ষতা, সংলাপপ্রাধান্য সবই ফেরার মধ্যে আবিষ্কার করা যায়।
মাত্র ৭৫ পৃষ্ঠায় ক্ষুদ্রাবায়ব একটি উপন্যাস ‘ফেরা’। কিন্তু একে উপন্যাসিকা বা নভোলা বলা যাবে না। হ্রস্ব-পরিসরের মধ্যেই হুমায়ূন আহমেদ গ্রামীণ মানুষের সম্পূর্ণ প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছেন। গ্রামীণ জীবন কেবল দুঃখ এবং অভাব-অনটনের জীবন নয়। গ্রামীণ জীবনের রয়েছে নানা আঙ্গিক। হুমায়ূন আহমেদ পর্যবেক্ষণী মানুষ। তিনি তার বেছে নিয়া প্রেক্ষাপটের নানাদিকের ওপর চকিতে আলোকপাত করেছেন।
মতি মিয়ার চরিত্রটি আমাদের অপরিচিত নয়। বাউলদের মনমানসিকতা এবং গায়কি সবই মতি মিয়ার মধ্যে আছে। আছে এক ধরনের নির্লিপ্ততা। আছে কাম ও বাসনা। চিকিৎসকরা শরিফার পা কেটে বাদ দিয়েছে। সে গ্রামে ফিরে এসেছে। এক দিনের কথা। অনেক রাত্রে মতি মিয়া যখন ঘুমোতে এসেছে, তখন শরিফা জেগে। ফু দিয়ে কুপি নিভিয়ে ফেলার সঙ্গে সঙ্গে শরিফা মৃদু স্বরে বলল, একটা কথা সত্যি জবাব দিবা?
কী কথা?
তুমি কি রহিমারে বিয়ে করতে চাও?
মতি মিয়া দীর্ঘ সময় চুপচাপ থেকে বলল, হ।
তুমি রহিমারে এই কথা কইছ?
না, আমিন ডাক্তার কইছে রহিমার মত নাই। রহিমার ধারণা হ্যার স্বামী এখনও বাইচ্চা আছে। এক দিন আইয়া পড়ব।
মতি মিয়া হুক্কা ধরাল। শরিফা ধরা গলায় বলল, বিয়াডা কবে?
মত না থাকলে বিয়াডা হইব কেমনে?
আইজ মত নাই, এক দিন হইব।
মতি মিয়া নির্বিকার ভঙ্গিতে শুয়ে পড়ল। অল্পক্ষণের মধ্যে তার নাক ডাকতে লাগল। শরিফা সারা রাত জেগে বসে রইল।
আরেকটি ঘটনার কথা মনে পড়েÑ হুমায়ূন আহমেদ কীভাবে লিখেছেন তা দেখবার মত।
চায়ে চুমুক দিয়ে মতি মিয়া অস্বাভাবিক নিচু স্বরে বলল, বাজারে তিনটা মাইয়া আইছে, দেখছ? হাটবার দেখে রঙ্গ-তামাশা করতাছে।
আমিন ডাক্তার অবাক হয়ে তাকাল।
মতি মিয়া বলল, বাজারের মেয়ে মানুষ ছাড়া কি হাট জমে? কও দেহি? এর মধ্যে একটার নাম ফুলন। কাঁচা হলদির নাহান গায়ের চামড়া। আর চুল কী!
তুমি এত কিছু জানলা ক্যামনে?
আহ্ দেখলাম। দূর থাইক্যা দেখলাম। তুমি কি ভাবছ গেছিলাম? মাবুদে এলাহী।
চা গলায় লেগে মতি মিয়া বিষম খেল।
মেয়ে তিনটি নৌকা নিয়ে এসেছে। সেজেগুজে নৌকার সামনে বসে আছে দুজন।
আমিন ডাক্তার অবাক হয়ে দেখল একটি মেয়ে সত্যিই অপূর্ব। সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে দেবী-প্রতিমার মতো লাগছে। মতি মিয়া আমিন ডাক্তারের হাতে একটি মৃদু চাপ দিয়ে বলল, চোখ ট্যারা হইয়া যায়, কী কও ডাক্তার? ফুলনের আরেকটা নাম হইল গিয়া তোমার পরিবানু।
তুমি জানলা ক্যামনে?
হুনসি, হুনা কথা।
উত্তর বন্দে নেমে মতি মিয়া গুনগুন করে গান ধরল,
‘ও কইন্যা সোনার কইন্যারে
ও কইন্যা রূপের কন্যা রে…’
মতি মিয়ার গলা ভালো, আমিন ডাক্তারের মনটা উদাস হয়ে গেল।
আমি যখন ক্লাস ফাইভে পড়ি, তখন হারম্যান মেলভিলের লেখা ‘মবি ডিক’ পড়ে ফেলেছি। লরা অ্যাঙ্গেলস ওয়াইল্ডারের দুটি বই পড়া হয়ে গেছে। শেক্সপিয়ারের নাটক দেখেছি এবং পড়েছি ক্লাস সিক্সে পড়ার সময়। ময়মনসিংহে ওসমানিয়া বুক ডিপোতে ইংরেজি পেপারব্যাক বই পাওয়া যেত। ৫ টাকা দাম। বেশ কয়েকটা পড়েছি। পড়েছি ননী ভৌমিকের অনবদ্য অনুবাদে তলস্টয় এবং অন্য কয়েকজন রুশ লেখকের গল্প ও উপন্যাস। ১৯৮২ সালে আখতারুজ্জামানের গল্পগ্রন্থ ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’ নিয়ে বিশদ আলোচনা লিখেছি। এর কিছু আগে শিবনারায়ণ রায়ের ‘কবির নির্বাসন ও অন্যান্য ভাবনা’ পড়ে সাহিত্যপাঠের রীতি সম্পর্কে ধারণা জন্মেছে। ধারণা জন্মেছে কীভাবে কথাসাহিত্য পড়তে হয় ক্রিটিক্যালি।
হুমায়ূন আহমেদের নির্মেদ বর্ণনা আমাকে মোহিত করল। অল্প পরিসরে সংলাপের মধ্য দিয়ে একদিকে চরিত্র ফুটিয়ে তোলা, অন্যদিকে ঘটনা বর্ণনা করার যে কৌশল সেটি অনন্যসাধারণ বলে মনে হলো। আজও তাই মনে হয়। হুমায়ূন আহমেদের লিখনশৈলী তুলনাহীনভাবে প্রঞ্জল ও গতিময়। বিংশ শতাব্দীর পৃথিবী সাহিত্যের পৃথিবী। এখানে হুমায়ূন আহমেদের সমকক্ষ কাউকে চোখে পড়ে না। হয়তো মহত্ত্বর শিল্পী অনেকে আছেন, কিন্তু কথাসাহিত্য গল্প বলার সাহিত্য। এর জন্য যে জাদুকরী প্রতিভার প্রয়োজন, হুমায়ূন আহমেদের জন্ম হয়েছিল সেই প্রতিভা নিয়ে। এই প্রতিভা সবার থাকে না।
‘ফেরা’ তেমন আলোচিত উপন্যাস না হলেও আজ মনে হচ্ছে এটি তার প্রতিনিধিত্বশীল একটি উপন্যাস। আমার পড়া প্রথম উপন্যাস। এই উপন্যাস নিয়ে বিস্তর আলোচনার অবকাশ রয়েছে।