× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আমার হ‍ুমায়ূন যাত্রা

নুসরাত জাহান চ্যাম্প

প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০২৫ ১১:৪১ এএম

আমার হ‍ুমায়ূন যাত্রা

হ‍ুমায়ূন পাঠের শুরুটা বলতে চাইলে তার ছোট ভাই আহসান হাবীবের প্রসঙ্গ টানতে হবে আগে। তাকে নাকি সব সময় শুনতে হয়েছে উনি হ‍ুমায়ূন আহমেদের ছোট ভাই। আমার বেলায় হয়েছিল উল্টো! সবে ক্লাস থ্রিতে উঠেছি। জন্মদিনে বড় দুই ভাই হ‍ুমায়ূন আহমেদের ‘কিশোর সমগ্র’ উপহার দিলেন। থান ইটের মতো দেখতে ইয়া মোটা একটা বই! কিন্তু সে বই আমি কোনোভাবেই পড়তে চাই না। একে তো ভীষণ মোটা বই, শুয়ে পড়তে চাইলে হাতে ধরে রাখতে পারি না, তার ওপর এত ছোট ছোট হরফ, তার মধ্যে আবার কোনো ছবি নেই, কে পড়ে এ বই? মেজো ভাই বোঝালেন এভাবে, এই বইটার গল্পগুলো উন্মাদের বড় ভাইয়া লিখেছে! উন্মাদ কত মজা না? তাহলে তার বড় ভাই আরও মজা হবে না? তারপর আমি আগ্রহ পেলাম ‘কিশোর সমগ্র’ পড়তে! ঘটনা হলো আমার বুঝতে শেখার পর থেকেই দেখি বাড়িভর্তি উন্মাদ। আর ছিল আহসান হাবীবের আঁকা ও লেখা আরও বই। যখন পড়তে শিখিনি। ভাইরা পড়ে শোনাতেন। ভাত খাওয়ানো হতো হাতে একটা উন্মাদের কপি ধরিয়ে দিয়ে, পাতা উল্টে কার্টুন না দেখলে ভাত খাওয়ার গতি হতো মন্থর। সে কারণেই এখনও হ‍ুমায়ূন আহমেদ আমার কাছে আহসান হাবীবের বড় ভাই।

অবশ্য এভাবে বোঝানোর একটা কারণও ছিল। আমি তখন টুকটাক লিখতে শুরু করেছি। ছোটদের কাগজে লেখা ছেপেছে কয়েকটা। পুরস্কারও পেয়েছি কিছু। মেজো ভাইও লিখত ছোটদের কাগজে। আমার চেয়ে মেজো ভাইয়ের পুরস্কার কেন বেশিÑ এই নিয়ে কান্নাকাটি করতাম। মেজো ভাই বেশি পুরস্কার পান, কারণ তিনি আমার চেয়ে বড় বলে বেশি ভালো লেখেনÑ এসব জিনিস মাথায় ঢোকানো হয়েছিল। এ কারণেই বড়রা বেশি ভালো হয় মনে হতো। আচ্ছা, মূল প্রসঙ্গে ফেরত যাই, হ‍ুমায়ূন আহমেদের লেখা আমার পড়া প্রথম বইটা নিয়ে বলি। 

সেই যে থান ইটের মতো বইটার কথা বলেছিলাম, কিশোর সমগ্র, সেটাতে ছিল অনেকগুলো বই। তার সূচিপত্র খুঁজে পছন্দ হলো ‘নুহাশ এবং আলাদিনের আশ্চর্য চেরাগ’। যেহেতু তখন রূপকথার অনেক বইটই পড়ে ফেলেছি, তাই আলাদিন বা তার চেরাগকে চিনতে কষ্ট হয়নি। কিন্তু তার সঙ্গে নুহাশের সম্পর্ক কী?

গল্পের নুহাশ ক্লাস ফোরে পড়ে, থাকে বাবা-মায়ের সঙ্গে। কিন্তু বাবা-মা সারা দিনই ঝগড়া করেন। বাবা অবশ্য ঝগড়া করেন না, মা ঝগড়া করেন। আর বাবা মিটিমিটি হাসেন। নুহাশ যদিও কোনো দিন বাবাকে রাগ করতে দেখেনি, কিন্তু নুহাশের বাবার বিরুদ্ধে তার মায়ের অনেক অভিযোগ। নুহাশের বাবা সংসার, স্ত্রী-সন্তান সম্পর্কে উদাসীন। তিনি সারা দিন বন্ধুবান্ধব নিয়ে থাকেন, কখনও হয়তো জোছনা দেখতে গভীর রাতে শালবনে চলে যান। নুহাশের বাবা মানুষ হিসেবে খুব ভালো, কিন্তু খুবই খামখেয়ালি। তাই নুহাশের মা সিদ্ধান্ত নিলেন, তার সঙ্গে সংসার করবেন না। তিনি নুহাশকে নিয়ে আলাদা একটা ফ্ল্যাটে ওঠেন। এদিকে বাসা পাল্টানোর কারণে বাবার সঙ্গে তার অনেক দিন দেখাও হয় না। নুহাশ সব ঘটনায় খুব কষ্ট পায়। এমনই এক মন খারাপের রাতে মেজো মামার দেওয়া উপহার আলাদিনের চেরাগে ঘষা দেয় নুহাশ। যদিও মামা বলেছিল এটা খেলনা প্রদীপ, কিন্তু তা থেকে বেরিয়ে আসে শার্ট-প্যান্ট পরা, চোখে চশমা আর পকেটে বলপয়েন্ট কলম নিয়ে এক দৈত্য। নুহাশ প্রথমে ভয় পেল। কিন্তু একটু পরে সে বুঝল, দৈত্যটি খুবই ভালো। এরপর নুহাশ আর দৈত্য মিলে ভাবতে বসল, কীভাবে ওর বাবা-মাকে আবার এক করা যায়। শেষ পর্যন্ত দৈত্যের একটা বুদ্ধিতেই কিন্তু আবার নুহাশের বাবা-মা একসঙ্গে থাকা শুরু করলেন।

কী সেই বুদ্ধিটা, তা আর বলছি না। আমার ধারণা, এই উপন্যাসটা বেশিরভাগ মানুষেরই পড়া। তাও যারা পড়েননি, পড়ে নেবেন। আর যদি বাসায় থাকে ছোট্ট পাঠক, তাকেও পড়তে দেবেন। উপন্যাসটা আমার শিশুমনে খুব প্রভাব ফেলেছিল। কাল্পনিক জগতে বাস করা আলাদিনের মতো কোনো চরিত্রকে বাস্তব জগতের ঘটনায় এভাবে নিয়ে আসাÑ এমন প্রেক্ষাপটের বই আমার জন্য ছিল এটিই প্রথম। আমার তখন মনে হতো, আমাদের আশপাশে থাকা আমাদের ইচ্ছে পূরণ করা মানুষগুলো হয়তো সত্যি সত্যি আলাদিনের দৈত্য!

সহজবোধ্য বাংলা, ছোট ছোট বাক্য এবং শিশুদের উপযোগী করে কৌতূহল জাগানো উপস্থাপনে ‘নুহাশ ও আলাদিনের আশ্চর্য চেরাগ’ একটি দারুণ ফ্যান্টাসি ভিত্তিক শিশুতোষ উপন্যাস, যেখানে বাস্তবতা ও কল্পনার মিশ্রণ এত চমৎকার, নুহাশের মতো সমাধান চেয়ে বসতে চাইবে মন। কিন্তু বড় হওয়ার পর আবার পড়ে টের পেয়েছি, মূলত ছোটদের জন্য হলেও গল্পটা বড়দের। পারিবারিক কলহ বা বিচ্ছেদ শিশুদের মানসিক অবস্থা কেমন করে তুলতে পারে, তা গল্পোচ্ছলে হাসতে হাসতে তুলে ধরা আছে এই উপন্যাসে।

মূল বইয়ের ফ্ল্যাপে লেখা আছে, ঔপন্যাসিক হ‍ুমায়ূন আহমেদের বড় ছেলের নাম নুহাশ। সে যখন খুব ছোট তখন তাকে খুশি করার জন্য তিনি এই লেখা শুরু করেন। রোজ রাতে ঘুমুতে যাওয়ার আগে ছেলেকে কয়েক পাতা করে পড়ে শোনান। নুহাশ একই সঙ্গে আনন্দিত হয় এবং রাগ করে। তাকে নিয়ে একটা উপন্যাস লেখা হচ্ছে এই নিয়ে আনন্দ কিন্তু উপন্যাসের নুহাশ একটি মেয়ে এই কারণে রাগ। সে হিসেব করলে বলা যায় বইটা বাবা-ছেলের সুন্দর সম্পর্কের একটা অনন্য দলিল। হ‍ুমায়ূন আহমেদের ব্যক্তিগত অনুভূতি ও ভালোবাসা এই বইয়ের প্রতিটি পাতায় ছড়িয়ে আছে।

শেষটুকু বলে যাই। সেই যে থান ইটের মতো বইটা দিয়ে আমার হ‍ুমায়ূন আহমেদের বই পড়া শুরু হলো, আর কিন্তু থামিনি! হ‍ুমায়ূন আহমেদ নামের একজন শব্দের জাদুকরের সব বই আমার পড়া আছে, এতেই আমার আনন্দ। এখনও যখন ‘রিডার্স ব্লক’ হয়, আমি তার একটা বই টেনে নিই, হিমুর হাত ধরে কড়া রোদে ঘুরে বেড়াই, মিসির আলির সঙ্গে চায়ের কাপ নিয়ে বসি অথবা হ‍ুমায়ূন আহমেদের স্মৃতির করিডোর ধরে হাঁটি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা