× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের সাক্ষাৎকার

আমার মনে গভীর ছাপ ফেলেন টমাস বের্নহার্ড

নকিব মুকশি

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২৫ ১২:০০ পিএম

লাসলো ক্রাসনাহোরকাই

লাসলো ক্রাসনাহোরকাই

২০১২ সালে লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণকালে ঔপন্যাসিক মাউরো হাভিয়ের কারদেনাস সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন। পরে মিউজিক অ্যান্ড লিটারেটারের দ্বিতীয় সংখ্যায় এটি প্রকাশিত হয়। সাক্ষাৎকারটি ভাষান্তর করেছেন কবি নকিব মুকশি। আজ থাকছে তার তৃতীয় পর্ব।

কারদেনাস: ‘দ্য মেলানকলি অব রেজিস্ট্যান্স’–এ অনেক হাস্যরসের মুহূর্ত আছে, কিন্তু বেলা তারের চলচ্চিত্র রূপটি অনেক বেশি গম্ভীর, বইয়ের তুলনায় একেবারে ভিন্ন সুর…

ক্রাসনাহোরকাই: ‘স্যাটানট্যাঙ্গো’র পর এ সিনেমা বানানো একটু জটিল ব্যাপার ছিল। কারণ, ‘স্যাটানট্যাঙ্গো’ ছিল খুব দীর্ঘ। কিছু প্রযোজক ছবিটি দেখেছিলেন, টেলিভিশনে সেটি দেখানোর চেষ্টাও করেছিলেন, কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। বেলার ভয় ছিল—যদি ‘দ্য মেলানকলি অব রেজিস্ট্যান্স’কে ‘স্যাটানট্যাঙ্গো’র মতো বিশ্বস্তভাবে বানানো হয়, তাহলে ছবিটা এত দীর্ঘ হবে যে ভবিষ্যতে কেউ এক পয়সাও দেবে না। [হাসি]

তাই আমরা বাধ্য হই চারটি প্রধান চরিত্রের মধ্য থেকে শুধু একটি চরিত্রকে বেছে নিতে, যার নাম ভালুসকা। আর এর ফলে ছবিটি এত ভাবগম্ভীর ও ঘন হয়ে ওঠে।

কারদেনাস: ‘স্যাটানট্যাঙ্গো’ সিনেমাটি নিয়ে আমার একটা ছোট প্রশ্ন আছে—হয়তো ততটা ছোটও নয়। তবে বই ও সিনেমা তো দুটি আলাদা মাধ্যম, কিন্তু ‘স্যাটানট্যাঙ্গো’ চলচ্চিত্রে দুটি সংলাপ আছে, যা বইয়ে নেই। যখন এসতিকা তার ভাইয়ের সঙ্গে টাকাগাছে টাকা জুড়ে দিচ্ছিল, তখন সে তার ভাইকে বলে: ‘আমরা কি ধনী হতে যাচ্ছি?’, ‘লোকজন কি আমাদের দেখে হিংসা করবে?’ তার ভাই দুটো প্রশ্নেরই উত্তর দেয়—‘হ্যাঁ’। কিন্তু বইয়ে এসটিকা টাকার প্রতি উদাসীন। ধনী হওয়া নিয়ে তার কোনো আগ্রহ নেই। সে বলে, টাকা তো সে ভাইকেই দিতে চেয়েছিল…

ক্রাসনাহোরকাই: সিনেমায় এটা ছিল একটা ভুল সিদ্ধান্ত। এসটিকার আগ্রহ ছিল কেবল তার ভাইকে ঘিরে, টাকা বা ধনী হওয়া নিয়ে নয়। আমরা সেটা ঠিকভাবে দেখাতে পারিনি, তাই ভাবলাম—টাকা ও ধনসম্পদ হয়তো এসটিকার কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এটা সত্য নয়, এটা ভুল ছিল।

তবে বেলা শুধু এসটিকার মুখেই বিশ্বাস করত, আর সে চেয়েছিল এসটিকার মুখটাই দেখাতে—যতক্ষণ সম্ভব, যত দীর্ঘ সময় ধরে সম্ভব।

কারদেনাস: সিনেমাটা দেখার সময় আমার মনে হয়, বিড়ালটার সঙ্গে তার খারাপ ব্যবহারের কারণ—তার মনে হচ্ছিল (অন্তত আমি তো এমনটাই বুঝেছি), ‘এই তো, আমি ধনী হতে যাচ্ছি, আমি যা খুশি তা-ই করতে পারি, আমার হাতে ক্ষমতা আছে। বিড়াল, তোর ওপরও ক্ষমতা খাটাতে পারি।’ তো বিড়ালের প্রতি তার এই খারাপ ব্যবহারের পেছনে একটা আলাদা ধরনের কারণ কাজ করছিল। আর পরে যখন দেখা গেল, সে ধনী হতে পারবে না, তখন আত্মহত্যা করে বসে। কিন্তু বইয়ে ব্যাপারটা একদম আলাদা—সেখানে এই ঘটনার কারণ-সম্পর্ক (কজালিটি) একেবারেই ভিন্ন।

ক্রাসনাহোরকাই: তুমি ঠিক বলেছ। ‘স্যাটানট্যাঙ্গো’তে আরও অনেক সমস্যা ছিল। তবে ‘দ্য ট্যুরিন হর্স’ সিনেমায় তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। যেমন মাঝের মনোলগটি বইয়ে দ্বিগুণ দীর্ঘ ছিল। শুটিংয়ের সময় আমি বলেছিলাম, ‘এটা খুব দীর্ঘ, হয়তো বাদ দেওয়া যায়।’ কিন্তু বেলা এর ছোট সংস্করণটি বেছে নেয়। তো সমস্যা বলতে এটুকুই ছিল। কিন্তু ‘স্যাটানট্যাঙ্গো’তে এ ধরনের সমস্যা ছিল না। কারণ, আমি একটা বিশ্বস্ত রূপান্তর চেয়েছিলাম। এটা কোনো রকমের ‘অ্যাডাপটেশন’ ছিল না। কারণ, আমরা অ্যাডাপটেশন করি না। আমি চেষ্টা করেছিলাম এমন কিছু বানাতে, যাতে বেলা নিজের মতো করে যা করতে চায়, সেটা করতে পারে। এটাই ছিল স্ক্রিপ্ট। উপন্যাসটা ছিল একধরনের অনুপ্রেরণা। প্রায় সবকিছু ঠিক হয়েছিল শুটিংয়ের সময়েই, আর সবকিছু নির্ভর করছিল চরিত্রগুলোর মানসিক অবস্থার ওপর। কারণ, শুটিংটা ছিল অনেক দীর্ঘ। আর দেখা যেত, সারা দিন প্রায় সবাই মাতাল থাকত।

কারদেনাস: অভিনেতারা?

ক্রাসনাহোরকাই: শুধু অভিনেতারা নন, ক্যামেরার পেছনের লোকজন, আলোক বিভাগের লোকজন—সবাই।

কারদেনাস: আর বারের সেই দৃশ্য, যেটা নিয়ে আমরা আগে কথা বলছিলাম, যেখানে আমার প্রিয় হাঙ্গেরীয় শব্দ ‘বাবতেতু’ বারবার বলা হয়…

ক্রাসনাহোরকাই: যে ব্যক্তি শব্দটি বারবার বলেছেন, তিনি আসলে অভিনেতা নন। তিনি ছিলেন এক অসাধারণ ক্যামেরাম্যান—ছোট ছোট জিনিসের ছবি তুলত, নানা পরিকাঠামোর অপূর্ব সব ছবি। অন্য যেসব অভিনেতা ছিলেন, তাঁদের কেউ চিত্রশিল্পী, কেউ সংগীতশিল্পী, আর তাঁদের একজন ছিলেন যুগোস্লাভিয়ার অভিনেত্রী। বেলা তাঁদের অসাধারণ দক্ষতায় পরিচালনা করতে পারতেন—কখনো কঠোরভাবে, কখনো বন্ধুতায়।

কারদেনাস: বারের সেই দীর্ঘ দৃশ্য কি পূর্বপরিকল্পিত ছিল, নাকি পুরো দৃশ্যটাই তাদের সত্যিকার মাতলামির?

ক্রাসনাহোরকাই: সবাই তখন সত্যিই মাতাল ছিল। ক্যামেরা চলার সময় বেলা, আমি বা অ্যাগনেস নির্দেশ দিতাম—‘বামে যাও’, তারা বলত, ‘হ্যাঁ? কী?’ ‘বামে, বামে!’ ‘কী!’ [হাসি]

কারদেনাস: একটা সাক্ষাৎকারে আপনি বলেছিলেন একটা দারুণ মুহূর্তের কথা, যেটা ঘটেছিল আপনার আর বেলা তারের সঙ্গে, যখন ওই একই ক্যামেরাম্যান ওই একই বারের দৃশ্যের মধ্যে হঠাৎ গেয়ে উঠলেন, ‘ট্যাঙ্গো, ট্যাঙ্গো…’

ক্রাসনাহোরকাই: ওটাই ছিল বেলা আর আমার জন্য মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। তার আগপর্যন্ত আমরা একদমই বুঝে উঠতে পারছিলাম না, এই ছাইপাশ কেন করছি! তারপর হঠাৎই লোকটি, মানে ওই ক্যামেরাম্যান গান গাওয়া শুরু করল। একদম হঠাৎ, একেবারে স্বতঃস্ফূর্ত। কিন্তু ভাবছিলাম, সে কি সব মনে করতে পারবে? গাইতে পারবে? কারণ, সে তো বেশ মাতাল ছিল। সে তার সঙ্গে করে একটা হারমোনিয়াম এনেছিল। হঠাৎই তা বাজাতে শুরু করে, আর গেয়ে ওঠে, ‘ওহ, ট্যাঙ্গো, আমার মা গাইত এই গান! ওহ, ট্যাঙ্গো, আমার মা গাইত এই গান! তুমি কি জানো তা? ওহ, ট্যাঙ্গো!’ তখন বেলা আর অ্যাগনেস বলে ওঠে, ‘দয়া করে, তাড়াতাড়ি শুট করো, শুট করো!’

এই দৃশ্য গল্পের বাইরে ছিল, একেবারেই আলাদা। কিন্তু সময়টা এতটাই আকস্মিক, উত্তেজনাকর, হৃদয় উথালপাতাল করা ছিল, আমি হঠাৎ টের পেলাম বেলা আমার পা চেপে ধরে আছে—আমরা পাশাপাশি বসেছিলাম। ওর হাত এত শক্ত ছিল, কয়েক মিনিট পর দেখি, আমার পায়ের ওপর রক্তদাগ ফুটে উঠেছে। আর বেলা কেঁদে ফেলল। অথচ বেলা এমন ব্যক্তি নয়, যে সহজে আবেগে ভাসে।

কিন্তু ওই গানটা, ওই মুহূর্তটা—যেটা সে আমাদের জন্য গাইছিল—তা এতটাই চমকানো, এতটাই বাস্তব যে তখনই আমরা বুঝে গেলাম, ঠিক আছে, তাহলে সিনেমাটা আমাদের হয়েই গেল এর কারণে।

কারদেনাস: গানটি হয়তো আপনার কাছে বিশেষ কোনো অর্থ বহন করে না, কিন্তু এর তো ছিল স্বতঃস্ফূর্তার এক অসাধারণ সৌন্দর্য, তা-ই তো?

ক্রাসনাহোরকাই: হ্যাঁ। তবে আমরা গানটির সঙ্গে পরিচিত ছিলাম না। পরে এতে কিছু কাজ করতে হয়েছিল। কারণ, আমাদের সুর দরকার ছিল, কিন্তু হারমোনিয়ামটা ছিল একেবারে…

কারদেনাস: দ্য মিলিয়নসের একটি সাক্ষাৎকারে আপনি বলেছিলেন, বেলা তারের ওপর আপনার বেশ প্রভাব ছিল। এটা বিশাল ব্যাপার। আমি বুঝতে পারছি না, সেটা কীভাবে কাজ করত…

ক্রাসনাহোরকাই: মূল বিষয় ছিল বই। কারণ, বেলা খুব ভালো পাঠক। ‘স্যাটানট্যাঙ্গো’ তার ভালো লেগেছিল। এ ছাড়া ‘দ্য মেলানকলি অব রেজিস্ট্যান্স’–এর প্রথম অধ্যায়, বিশেষ করে ট্রেনের অংশটিও তাকে টেনেছিল, যদিও আমরা সেটা সিনেমায় ব্যবহার করিনি। সত্যি কথা হলো—সে আমাকে সম্মান করে, প্রশংসা করে আমার কাজের। সব সময় আমাকে ডিফেন্ড করে। কারণ, আমি সিনেমা বানাতে অপছন্দ করি, আর সে সেটা জানেও। এটাই ছিল আমাদের বন্ধুত্বের এসেন্স: সিনেমা বানানোর সময় আমার ওপর ভরসা রাখে, আর আমাকে গ্রহণ করে একজন দার্শনিক হিসেবে। আমি তাঁকে সব সময় দার্শনিক প্রেক্ষাপট নিয়ে বলতাম, নানা প্রশ্ন করতাম, তবে ঠিক সিনেমার দৃশ্য নিয়ে নয়।

অনেক সময় আমি তাকে বলেছি হেরাক্লিটাস, শেক্‌সপিয়ার, টমাস বের্নহার্ড সম্পর্কে, যাঁদের সে চিনত না। কারণ, কমিউনিজমের সময় সে এসব বই পড়তে পারেনি। সে খুব অল্প বয়সে সিনেমা বানানো শুরু করে। মাত্র বিশ বছর বয়সে জার্মানির একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাভান্ট-গার্ড চলচ্চিত্র উৎসবে ‘ফ্যামিলি নেস্ট’ ছবির জন্য প্রধান পুরস্কারটি পায় সে। ছবিটি ছিল অসাধারণ, তরে এর অভিনেতারা ছিল একেবারে নতুন, শিক্ষানবিশ।

এরপর সে তিনটি ছবি বানায়, তার পর থেকে সে মূলত আমার বই বা চিত্রনাট্য নিয়েই কাজ করে। সিনেমার শিরোনাম, গল্প, প্রেক্ষাপট, আবহ—সবকিছুতেই আমি তাকে সহযোগিতা করতাম।

কারদেনাস: আপনার কাজের সঙ্গে টমাস বের্নহার্ডের কাজের অনেক মিল খোঁজা হয় যুক্তরাষ্ট্রের সাহিত্য সমাজে। আপনি কি বের্নহার্ডের সঙ্গে কোনো গভীর আত্মিক টান অনুভব করেন? কোনো যোগসূত্র আছে কি?

ক্রাসনাহোরকাই: তিনি আমার মনে গভীর ছাপ ফেলেছিলেন, নিঃসন্দেহে। ধরুন, ‘ফ্রস্ট’ পড়ার প্রথম অভিজ্ঞতা, কিংবা ‘দ্য লাইম ওয়ার্কস’—এই দুই উপন্যাস আমার জন্য ছিল বিশাল এক অভিজ্ঞতা। কিন্তু এটাই তো টমাস বের্নহার্ড। আমাদের মধ্যে বড় একটা পার্থক্য আছে—আমি আবেগপ্রবণ নই, তবে বের্নহার্ড, সবকিছুর পরও, আবেগপ্রবণ ছিলেন। তিনি মহত্ত্ব বা নৈতিকতায় বিশ্বাস করতেন। তাই ছিলেন এতটা বিদ্রুপপ্রবণ। কারণ, তিনি বড় মাপের চিন্তকদের শ্রদ্ধা করতেন, শিল্পের প্রতিও ছিলেন গভীর অনুরাগী। আমি তা নই। আমি একজন পর্যবেক্ষক। এটাই আমাদের মধ্যে বড় পার্থক্য।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা