× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জন্মশতবর্ষে আবু ইসহাক

সূর্য-দীঘল বাড়ী : একটি সমাজতাত্ত্বিক পাঠ

আহমেদ মাওলা

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২৫ ১১:৪৮ এএম

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৫ ১১:৪৯ এএম

আবু ইসহাক, ১ নভেম্বর ১৯২৬- ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৩। প্রতিকৃতি : বনানী সিমলাই

আবু ইসহাক, ১ নভেম্বর ১৯২৬- ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৩। প্রতিকৃতি : বনানী সিমলাই

অনেকের কাছে হয়তো অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু এটা সত্য যে, আবু ইসহাক (১ নভেম্বর ১৯২৬-১৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৩) মাত্র একুশ বছর বয়সে লিখেছিলেন তার বিখ্যাত উপন্যাস সূর্য-দীঘল বাড়ী। পঞ্চাশের উপন্যাস ছিল গ্রামকেন্দ্রিক ও ঔপন্যাসিকদের জীবনদৃষ্টি ছিল বাস্তবতা নির্মাণ। আবু ইসহাক এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। খুব নীরবেই কেটে যাচ্ছে তার জন্মশতবর্ষ। ২০০৩ সালে বাংলা একাডেমির বার্ষিক সাধারণ সভায় তার সঙ্গে আমার শেষ দেখা ও সামান্য আলাপ হয় এবং আমরা দুজনের একটা ছবি তুলি। তার কিছুদিন পরই তিনি মারা যান।

আধুনিক সাহিত্যে ‘বাস্তবতা’ বা ‘রিয়েলিটি’ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়ে থাকে; বিশেষত কার্ল মার্ক্স (১৮১৮-৮৩) ও ফ্লিডরশ অ্যাঞ্জেলস্ (১৮২০-৯৫) দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ নামে সমাজবিশ্লেষণ ‘পদ্ধতি প্রবর্তন করার পর থেকেই। মার্কসীয় চিন্তাধারা অনুযায়ী, মানুষের ভাগ্য বা নিয়মিত নিয়ন্ত্রিক হয় যে সমাজে সে বাস করে তার অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দ্বারা। ফলে একটি দ্বান্দ্বিক অবস্থা বিরাজ করছে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোয়। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে এর মূলে আঘাত করেছেন প্রথমে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। ধর্মীয় সংস্কারকে তুলে ধরেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমান ও আবু ইসহাক প্রমুখ। সূর্য-দীঘল বাড়ী উপন্যাসের সমাজবিশ্লেষণে উপরোক্ত কথাগুলো বিশেষভাবে অনুধাবনযোগ্য। কেননা, সূর্য-দীঘল বাড়ী, লালসালু, জননী এবং সারেং বৌ উপন্যাসে বিধৃত সমাজ এই পটভূমিরই, যার পাত্র-পাত্রী এই সমাজের অদৃশ্য শৃঙ্খলে বাঁধা।

আবু ইসহাকের সূর্য-দীঘল বাড়ী (প্রথম প্রকাশ ১৯৫৫ কলকাতা, দ্বিতীয় প্রকাশ ১৯৬২ ঢাকা) উপন্যাসের সময়কাল বাংলা তেরোশ পঞ্চাশ সালের মন্বন্তর ও তার পরবর্তী পাঁচ বছর অর্থাৎ তেরোশ পঞ্চান্ন পর্যন্ত।

পটভূমি-গ্রামীণ জীবন, মুসলিম সমাজ। ভূগোল-ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল। পঞ্চাশের মন্বন্তর এবং ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগ ও পরবর্তী পাঁচ বছরের গ্রামবাংলার বাস্তব পরিবেশ তুলে ধরতে গিয়ে লেখক বিত্তহীন ও স্বামী পরিত্যক্ত জয়গুন এবং তার ছেলে হাসু, মেয়ে মায়মুন, ভাইপো শফি, তার বিধবা মায়ের নিষ্করুণ জীবনসংগ্রামকে উপজীব্য করেছেন। কিন্তু এটিই উপন্যাসের একমাত্র বিষয় নয়, বিত্তহীন এই খুদে পরিবারটি দেশটিতে বেঁচে থাকার সংগ্রাম তো আছেই, তার ওপর ধর্মীয় সংস্কার আছে, আছে ভূতের ভয়, গ্রামের গদু প্রধানের চক্রান্ত। দুর্বিসহ মন্বন্তরে বেঁচে থাকতে গ্রাম ছেড়ে তারা শহরের বুকে পা বাড়িয়েছিল। কিন্তু সেখানেও ভাতের লড়াইয়ে হেরে গিয়ে তারা আবার ফিরে আসে গ্রামে।

স্মর্তব্য, পঞ্চাশের মন্বন্তরকে নিয়ে শিল্পাচার্য জয়নুল এঁকেছেন দুর্ভিক্ষের বিখ্যাত ছবি, ‘লাশ’, কবিতা লিখেছেন কবি ফররুখ আহমদ, আলাউদ্দীন আল আজাদ লিখেছেন উপন্যাস ক্ষুধা ও আশা, আবুল ফজল লিখেছেন রাঙ্গাপ্রভাত। আবু ইসহাক সূর্য-দীঘল বাড়ীতে মন্বন্তরের বিষয়টি তির্যকভাবে আনলেও সমকালীন রাজনীতি তথা পাকিস্তান আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। সে যাই হোক ‘জয়গুন আবার গ্রামে আসে একটি মাত্র আশা নিয়ে, ছাড়া ভিটে আছে একটা। আট আনা অংশের মালিক সে, বাকি আট আনার অংশীদার নাবালক ভাইপো শফি। কিন্তু এটা যে সূর্য-দীঘল বাড়ীÑ ‘পূর্ব ও পশ্চিম সূর্যের উদয়াস্ত দিক। পূর্ব-পশ্চিম প্রসারি বাড়ির নাম তাই সূর্য-দীঘল বাড়ী। সূর্য-দীঘল বাড়ী গ্রামে ক্বচিৎ দুয়েকটা দেখা যায়। কিন্তু তাতে কেউ বসবাস করে না। কারণ গাঁয়ের লোকের বিশ্বাস সূর্য-দীঘল বাড়ীতে মানুষ টিকতে পারে না। যে বাস করে তার বংশ ধ্বংস হয়।’         

সূর্য-দীঘল বাড়ীর ইতিহাসও ভীতিজনক। সে ইতিহাস জয়গুন শফির মা জানে। লক্ষণীয়, ভূত কিন্তু স্থানীয় লোকের মুখের ভাষায় কথা বলে। আরও অনেকে নাকি ভূত দেখেছে। সূর্য-দীঘল বাড়ীর ভূতের গল্পের তাই কোনো অন্ত নেই। তাই দিনে দুপুরেও কেউ পারতপক্ষে এ বাড়ির পাশ দিয়ে হাঁটে না। তবু জয়গুন ও শফির মা এ বাড়িতে আশ্রয় নেয়। কারণ এক নামকরা ফকির জোবেদ আলী এ সংকট থেকে তাদের উদ্ধার করে। বাড়ির চারকোণে চারটা তাবিজ পুঁতে দিয়ে বলে, আর কোনো ভয় নাই। ধুলাপড়া দিয়ে ভূত-পেতনির আখড়া ভেঙে দেওয়া হয়েছে। চার কোনায় চারটা আলিসান পাহারাদার দেওয়া হয়েছে। সুতরাং আর ভূত-পেতনির কোনো ভয় নাই। এ কাজ বাবদ ফকিরকে শফির মা ভিক্ষার ঝুলি থেকে সোয়া সের চাল দেন, জয়গুন দেন সোরা পাঁচ আনা পয়সা। কিন্তু তাতে ফকিরের মন ভরে না। ফকির বলে বাড়ি ঠিকঠাক হলে তাকে একটা পিতলের কলসি দিতে হবে। আর বছর বছর বাড়ির পাহারাদার বদলাতে হবে। লক্ষণীয়, ফকিরকে যখন পারিশ্রমিক কম দেওয়া হয়েছে, তখন সে বলে বছর বছর পাহারাদার বদলাতে হবে। এর অর্থ, বছর বছর এসে তাদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা আদায় করা। অল্প কিছুদিন পরেই ফকির জোবেদ আলীর আসল চেহারা বেরিয়ে আসে। জয়গুনকে ‘বেয়ান’ বলে সম্পর্ক স্থাপন করে। এবং এক দিন সুযোগ বুঝে বৃষ্টিরাতে তাদের ঘরে উঠে জয়গুনের হাত ধরতে যায়। জয়গুন ফকিরের মতলব বুঝতে পেরে চুনের ঘটিটা তার মুখের ওপর ছুড়ে মারে। সেই থেকে ফকির আর আসে না। শফির মা এ ঘটনা জানে না, পাহারা বদলানোর সময় তো পেরিয়ে যায়। কিন্তু জয়গুন জানে কেন ফকির আসে না। 

জয়গুন তার ছেলে হাসু আর মেয়ে মায়মুনকে নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করে যায়। ট্রেনে করে গিয়ে উত্তর থেকে কম দামে চাল এনে বাজারে বিক্রি করে। হাসু স্টেশনে কুলির কাজ করে। মায়মুন ঘরে রান্নাবান্না ও সাংসারিক কাজ করে। শফির মা ভিক্ষা করে। বিত্তহীন এ বাড়ির জনজীবন এভাবে চলে। গরিব হলেও জয়গুনের ধর্মবোধ প্রবল। নিয়মিত নামাজ পড়ে সে। হাঁসের প্রথম ডিমটা নিজে না খেয়ে ছেলেমেয়েদের দিকে না তাকিয়ে জুমা ঘরে পাঠায়। ফজিলত আর বরকতের আশায়। কিন্তু মসজিদের ইমাম সাহেব বলেÑ

‘তওবা! তওবা! হারাম! হারাম! হারাম! ফিরাইয়া দাও অহনি, বেপর্দা আওরতের চিজ। ছি! ছি! ছি!

‘একজন ইঙ্গিত করেÑ একলা একলা সে মমিনসিং যায় টেরেনে কইর‌্যা। কী হিম্মত।’

শুধু এখানেই শেষ নয়। জয়গুনের দশ/এগারো বছরের মেয়ে মায়মুনের বিয়ে ঠিক হয় সোলেমান খাঁর ছেলে দোজবর তিরিশ বছরের ওসমানের সঙ্গে। বিয়ের আসরে উপস্থিত হয় গ্রামের মাতব্বর গদু প্রধান। গদু প্রধান বলেÑ সোলেমান খাঁ তোমার বেয়ানরে আগে তোবা করাইতে অইব।’ ক্যাঁ? ক্যাঁ আবার, হায়ানের মতো যেখানে হেইখানে ঘুইর‌্যা বেড়ায় দ্যাখতে পাও না? তোবা করাইয়া দিতে অইব। পরচাতে আর যেন বাড়ির বাইর না অয়। কিন্তু সোলেমান খাঁ কথাটা মজলিশে ওঠাতে লজ্জাবোধ করে। ‘না আপনে উডান। আমার শরম করে।’ গদু প্রধান বলে বেশ জোরের সাথেÑ ‘বিয়ার আগে বৌর মারে তোবা করাইতে অইব।’ কিন্তু জয়গুন কোনো রকমেই তওবা করতে রাজি হয় না। ‘তোবা আমি করতাম না। আমি কোনো গোনা করি না। মৌলভী সাব বিয়া না পড়াইলে না পড়াউক। আমার মায়মুনের বিয়া দিমু না।’

কিন্তু জয়গুন পারে না। কেননা, পুরো সমাজের দাবি সে তওবা করুক। শফির মা তাকে বোঝায় এ বিয়ে ভেঙে গেলে মায়মুনের আর বিয়ে হবে না। বদনাম হবে। শুনে জয়গুন চিন্তিত হয়। তার মুখে কালো ছায়া। সে ভাবে, তওবা করলে ঘরে বন্ধ থাকতে হবে। ঘরে বন্ধ হয়ে থাকার অর্থÑ না খেয়ে তিলে তিলে শুকিয়ে মরা। সে তীব্র কণ্ঠে বলেÑ ‘না, আমি তোবা করতাম না।’ শফির মা কেরামত ও জহিরুদ্দিন মোড়লকে ডেকে আনে। জহিরুদ্দিন বলেÑ ‘মৌলভী সাব ঠিক কথাই কইছে হাসুর মা। তোবা কইর‌্যা ফ্যাল।’ জয়গুন এবার বলেÑ ‘তোমরা ইনসাফ কইর‌্যা কও, তোবা করলে কে আমাকে ঘরে আইন্যা খাওয়াইব?’

জয়গুনের এই প্রশ্নের উত্তরও সমাজ দেয়। জহিরুদ্দিন বলেÑ ‘খোদায় খাওয়াইব। মোখ দিচ্ছে যে, আহার দিব সে।’ জয়গুনের মুখে শেষের হাসি। কেউ তার খাওয়া-পরার দায়িত্ব নেয় না। যে সমাজ তার খাওয়া-পরার দায়িত্ব নেয় না অথচ ধর্মের বিধান দেখিয়ে তাকে করতে চায় ঘরবন্দি, এই সমাজ বা ধর্ম শুধু জয়গুনের জন্য তো নয়। ধর্মের বিধানের চেয়ে এখানে গদু প্রধানের ইচ্ছাটাই প্রবল। কেননা, গদু প্রধান প্রস্তাব দিয়েছিল জয়গুনকে বিয়ে করতে-জয়গুন সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল। সেজন্য গদু প্রধানের ইচ্ছা আজ ধর্মের বিধান হয়ে জয়গুনকে বন্দি করতে চায় এবং হয়ও।

চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত জয়গুন তোবা করেÑ ‘দ্বিধার সাথে জয়গুন পাগড়ির মাথাটা দুই হাতে চেপে ধরে। তার মনের মধ্যে তখনও দ্বন্দ্ব চলছে। জয়গুনের তওবা করায় আজ আর মৌলভী সাহেবেরও খেতে আপত্তি নেই। যদিও এক দিন জয়গুনের দেওয়া হাঁসের ডিম ফেরত দিয়েছিলেন। বলেছিলেনÑ ‘বেপর্দা স্ত্রীলোক আর রাস্তার কুত্তী সমান।’ অথচ সেই ইমাম সাহেবও আজ জয়গুনের বাড়িতে পেট পুরে ভাত খায়Ñ বিয়ের অল্প কিছুদিন পরেই মায়মুন শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরে আসে। তার বয়স কম হওয়া যেন তারই দোষ। অথচ যারা তাকে স্বামীর ঘর থেকে মধ্যরাত চিৎকার দিয়ে বের হয়ে আসছে বলে দোষ দিচ্ছে, তারা তাকে এত ছোট জেনেও বউ করে এনেছে। তিরিশ বছরের ছেলের জন্য দশ বছরের মেয়েকে বউ করে আনার মধ্যে তাদের দোষ নেই অথচ দশ বছরের বালিকায় দোষী। এই হচ্ছে সমাজের মানসিকতা। 

বেঁচে থাকার জন্য, প্রতিকূল গ্রামীণ পরিবেশে এ ছাড়া আর কীইবা করার ছিল জয়গুনের। নারী এবং অশিক্ষিত হয়েও সে প্রতিবাদী হয়েছে, জীবনের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। কেননা, এ সমাজ তার সন্তানদের দায়িত্ব নেবে না, সে নিশ্চিত জানে। জয়গুন বুঝতে পেরেছে, সমাজে প্রচলিত প্রথা নারীকে পর্দায় রাখতে শেখায় অথচ আত্মমর্যাদায় নারীকে বেঁচে থাকতে শেখায় না। সমাজপতি গদু প্রধান জয়গুনের বিহিত করতে উদ্যত হয়Ñ ‘সকলের অলক্ষ্যে সে মাথা নাড়ে আর বলেÑ তোরে শাসন করতে পারতাম না, আমার নাম গদু প্রধান। একটু সবুর কর।’ সূর্য-দীঘল বাড়ীতে আবার ভূতের উপদ্রব বাড়ে। সবাই বলে, জয়গুণ ‘সূর্য-দীঘল বাড়ী’র বড় বড় গাছগুলো বিক্রি করে দেওয়ায় ভূতেরা খুব ক্ষেপেছে। তাই এ বাড়িতে আর বসবাস করা যাবে না।

‘শফির মা আগে আগে গাঠরি-বোচকা বাঁধে। জয়গুন জিজ্ঞেস করেÑ বাড়ি ছাইড়্যা কই যাইবা?

Ñ আগেত সোনার মানিকগ লইয়া বাইর অ। খোদার এত বড় দুইন্যায় কি আর এট্টু জায়গা পাইমু না আমরা?’

ছেলেমেয়েদের হাতে ধরে জয়গুন ও শফির মা বেরিয়ে পড়ে।

পঞ্চাশের মন্বন্তরের পটভূমিতে উপন্যাসের শুরু হলেও সমাপ্তি এসেছে প্রচলিত প্রথা ও অন্ধ সংস্কারর সঙ্গে মানুষের, বিশেষ করে শক্তিধর মানুষের ইচ্ছার কাছে জয়গুনের আপাত পরাজয়ের মাধ্যমে। এ পরাজয় আসলে গদু প্রধানেরই পরাজয়। কেননা, গদু প্রধান শতচেষ্টা করেও জয়গুনকে তার নীতিবোধ থেকে এক চুলও টলাতে পারেনি। ষড়যন্ত্র করে নিজে ভূত সেজে জয়গুনকে বাড়ি থেকে উম্মূলিত করতে হয়তো পেরেছে, কিন্তু তাতে জয়গুনের নীতিই জয় লাভ করেছেÑ গদু প্রধানের নয়। 

অথচ জয়গুন ইচ্ছে করলেই গদু প্রধানের প্রস্তাবে সম্মত হয়ে অর্থনৈতিক অনটন থেকে মুক্তি পেতে পারত, কিন্তু তার অনাথ দুটি ছেলেমেয়ে কোথায় যাবে? এদের দায়িত্ব আর সমাজ নেবে না, নেবে না গদু প্রধানও। ফকির তার হাত ধারাকে স্বীকার করে নিলে অবলম্বন পেতে পারত। কিন্তু সেখানে তার ইজ্জত ও মর্যাদা হতো ভূলুণ্ঠিত। এই সমাজ কি তাই চায়? কোনো সুস্থ সমাজ কি তা চাইতে পারে? অথচ এই সমাজ জয়গুনের পর্দা না মানার কারণ খুঁজে দেখে না। দায়িত্ব নেয় না তার এবং তার অনাথ সন্তানের। এই সমাজই তাকে স্বামী পরিত্যক্তা করেছে, দুটো ছেলেমেয়ে হাতে ধরিয়ে দিয়ে ছেড়ে দেয় রাস্তায়। আবার পর্দা না মানার অজুহাতে করে ঘৃণা। করিম বকস (দ্বিতীয় স্বামী) তাকে পুনরায় ঘরে নেওয়ার প্রস্তাব দেয়। জয়গুন তা মেনে নিয়ে মুক্তি পেতে পারত, কিন্তু তত দিনে জয়গুনের মনে ঘৃণা ধরে গেছে। সে বলেÑ

‘যে থু একবার মাডিতে ফালাইছি তা মোখ দিয়া চাটতে পারতাম না’Ñ তার এই কথার মধ্যে যে ছাইচাপা আগুনের আভাস পাওয়া যায় তা মূলত তার অনমনীয় দৃঢ় চরিত্রের প্রতিভূ। এই কথার মধ্যে সমাজের প্রতি তার প্রচণ্ড ঘৃণা প্রতিফলিত হয়েছে। 

উপন্যাসের ‘ছয়’ অধ্যায়ে দেশবিভাগের স্পষ্টচিত্র পাওয়া যায়। ‘১৫ আগস্ট শুক্রবার ১৯৪৭ সাল। হাসু স্টেশনে গিয়ে দেখে নারায়ণগঞ্জের দিক থেকে রেল আসে। সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার ধ্বনিÑ ‘আজাদ পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ ‘কায়েদে আজম জিন্দাবাদ’ হাসু মিছিলের সঙ্গে মিশে যায়। মিছিল শহরের সব রাস্তায় ঘোরে। চিৎকার করে জানায় স্বাধীনতার বার্তা। এই স্বাধীনতার কথা শুনে জয়গুনের মনে আশার সঞ্চার হয়Ñ এবার হয়তো সাধারণ মানুষের অভাব কিছুটা কমবে। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি। কেননা তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না। ঈদের চাঁদ ওঠেÑ জয়গুনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। সে নামাজ সেরে তসবিহ নিযে বসে। তসবিহ জপা একসময় বন্ধ হয়ে যায়। তার মনে হয়, কেন? সে তো জীবনভর রোজা রেখেই চলেছে। মাঝেমধ্যে সারা দিন খেটেছে, একটা দানাও পড়েনি পেটে। রমজান মাসের রোজার চেয়েও যে ভয়ংকর এ রোজা। তবু তাকে তওবা করতে হয় সমাজপতিদের ইচ্ছায় ও চাপে। অথচ এ সমাজপতিরাই গ্রামের ফুড কমিটির সেক্রেটারি। ঈদের দিনে গরিবরা চিনির জন্য লাইন দিলে বলেÑ ‘কিরে লেদু, চিনি দিয়া কী করবি?’ তারপর তারা নিজেই নিজেই বলেÑ ‘ভাত জোটে না, চিনি খা। বাহার ব্যাটা। হেই যে মাইনষে কইছিলÑ ঘর নাই, দুয়ার দিয়া হোয়। লেদুর একটু সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। সে নিচু কণ্ঠে বলেÑ আমাগ মতন গরিব মাইনষের আবার ঈদ কী? ঈদ অইল আপানেগ নাইগ্যা, বড়মিয়া সাব। শুনে কাজী মোড়ল ভ্রুকুটি করে, সেক্রেটারিকে বলেÑ এ হারামজাদাকে এককণাও চিনিও দিতে পারবা না, কইয়া রাখলাম। গদু প্রধানের কথায় সমাজপতিদের প্রতিপত্তি আরও তীব্রভাবে প্রকাশ পায়Ñ আমার পাঁচ সের আগে রাইক্যা তারপর ভাগ করো। পাঁচ সের না পাইলে ফাডাফাডি আচে তোমার লগে। রেশনের চিনি, তাও সমাজপতিদের জন্য আলাদা ভাগ। অথচ এটা এসেছে গরিবদের জন্যই, কিন্তু গরিব তা থেকে হয় বঞ্চিত। সমকালীন সমাজকে এভাবে বিশ্লেষণ করেন আবু ইসহাক তার সূর্য-দীঘল বাড়ী উপন্যাসে।

মোদ্দাকথা, সূর্য-দীঘল বাড়ী উপন্যাসে জয়গুন একটি পরিপূর্ণ, প্রতিবাদী ও জীবনসংগ্রামের অকুতোভয় চরিত্র। যদিও উপন্যাসের শেষে আমরা তার আপাত পরাজয় দেখি, কিন্তু এটি আসলে তার পরাজয় নয়। প্রকৃতপক্ষে এ পরাজয় গদু প্রধানের। কেননা, সে অনেক চেষ্টা করেও জয়গুনকে তার দৃঢ় চরিত্র থেকে একচুলও নাড়াতে পারেনি। সুতরাং জয়গুনেরই বিজয় হয়েছে। 

উপন্যাসের হাসু চরিত্র প্রসঙ্গে বলা যাক। হাসু জয়গুনের প্রথম স্বামী জব্বর মুন্সির ছেলে। বয়স তার দশ-এগারো। তবু সে মায়ের সঙ্গে কাজে যায়। কোষা বেয়ে স্টেশনে যায় মা ছেলে। ট্রেনে করে চাল আনতে গেলে সে অপেক্ষা করে। বয়স অল্প হলেও সে স্টেশনে ট্রেন এলে কুলির কাজ করে দুই পয়সা আয় করে। বাজার করে, কখনও আন্ডা বিক্রি করে ছোট ভাই কাসুর জন্য খেলনা কেনে, মায়মুনের জন্য গয়না কেনে। কখনও এক টাকা দিনমজুরিতে কাজ করে। স্বল্প পরিসরে তার চরিত্র খুবই বাস্তবিক। দেশ যখন স্বাধীন হয়, সে মিছিলে অংশ নেয়। চাঁদতারাখচিত সবুজ পতাকা বাড়ির আমগাছের ডালে বাঁধে। সর্বোপরি সংসারের প্রতি ও বোন মায়মুনের প্রতি দায়িত্ব কর্তব্য এবং মমত্ববোধের পরিচয় রয়েছে তার চরিত্রে। 

মায়মুন জয়গুনের একমাত্র মেয়ে। তাকে বাড়িতে রেখে, তার মা এবং ভাই কাজে যায়। সে থালাবাসন, পাতিল ধোয়, কখনও গাছের শুকনো ডাল পেড়ে এনে লাকড়ির সংস্থান করে। অল্প বয়সেই তার বিয়ে হয়। স্বামী সোলেমান খাঁর তিরিশ বছরের ছেলে ওসমান। কিন্তু শ্বশুরবাড়ির ভাত তার কপালে জোটে না। প্রথমবারে গেলেই বয়স কম হওয়ার অপরাধে এবং স্বামীর ঘর করতে পারবে না বলে বিতাড়িত হয়। মায়মুন কোনো প্রতিবাদ করে না। কেননা, সে তখন কিছুই বোঝেনি। দশ বছরের বালিকা সে কী বুঝবে স্বামী আর সংসার? মায়মুনকে খাওয়ায়ে পরায়ে স্বামীর উপযুক্ত করতে আরও তিন বছর লাগবে। সেই পর্যন্ত অপেক্ষা করতে তার শাশুড়ি রাজি নয়। তা ছাড়া সূর্য-দীঘল বাড়ীর মেয়ে হিসেবে তার অপবাদও আছে। আর দশটা কিশোরীর মতো তারও খুব শখ হাঁস পোষা। হাঁসে ডিম পাড়লে মায়মুনই সবচেয়ে খুশি হয়। ডিম দুটি নিয়ে শফির মাকে দেখায়। জয়গুন যখন ডিম দুটি মসজিদে দিতে বলে তখন মায়মুন খুবই কষ্ট পায়। সে বলেÑ ‘আমরা খামু না?’ এই কিশোরী তার জীবনের কোনো সাধ-আহ্লাদ পূরণ করতে পারেনি। বিয়ের বয়স না হতেই বিয়ে এবং স্বামী না চিনতেই স্বামী-বাড়ি ত্যাগ, এটা তার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। 

শফি ও তার মা ‘সূর্য-দীঘল বাড়ী’র আরেক অংশীদার। সম্পর্কে শফি জয়গুনের ভাইপো। শফির মা ভিক্ষা করে। তার বয়স একটু বেশি। পান খায় ছেঁচে। শফির মা চরিত্রে কোনো দৃঢ়তা নাই। যদিও সে জয়গুনের সঙ্গে জীবনসংগ্রাম করে, কিন্তু তার মধ্যে কোনো মনোবল বা নীতিবোধ আমরা দেখি না।

গদু প্রধান। গ্রামের অবস্থাপন্ন গদু প্রধান! সংসারে তার তিনটি বউ। ছেলেমেয়ে নিয়ে বিরাট কারবার। তবু সে জয়গুনকে বিয়ে করতে চায়। প্রত্যাখ্যান হওয়ায় সে ঈর্ষিত হয়। তাই সুযোগ বুঝে জয়গুনের দুর্বল সময়ে উপস্থিত হয়ে তাকে তওবা করতে চাপ দেয়। তার ইচ্ছা ধর্মীয় বিধান হয়ে কাজ করে। মসজিদের ইমাম, গাঁয়ের মোড়ল সবাই তার কথায় সায় দেয়। বাধ্য হয়ে জয়গুন তওবা করে। বন্দি হয় ঘরে। তারপর জয়গুন যখন আবার পেটের দায়ে বের হয় তখন গদু সবার অলক্ষ্যে বলেÑ ‘তোরে শাসন করতে না পারলে আমি গদু প্রধান না, শুরু হয় সূর্য-দীঘল বাড়ীতে ভূতের ঢিল ছোড়া। এটা আসলে গদু প্রধানেরই কাজ।

করিম বকস্ : করিম বকস্ জয়গুনের দ্বিতীয় স্বামী, সে মোটামুটি সচ্ছল গেরস্ত। কিন্তু বড়ই বদমেজাজি। কাজের মধ্যে সে কোঁচ দিয়ে মাছ শিকার করে। সেটা তার নেশা। জয়গুনকে সে বিনা দোষে তালাক দেয়। নিষ্ঠুর দুধের শিশু কাসুকে রেখে দেয়। এই কাসুকে সে কোনো রকমে মার কাছে যেতে দেয় না। তার ভয়, মার কাছে গেলে কাসু আর ফিরে আসবে না। অবশ্য শেষ পর্যন্ত সে ধরে রাখতে পারেনি। 

অসুখের সময় জয়গুনকে আসতে হয় অসুস্থ কাসুর সেবার জন্য। তখন সে জয়গুনকে আবার বিয়ের প্রস্তাব দেয়। অথচ তার ঘরে বউ অঞ্জুমান আছে। করিম বকসের চরিত্রের মধ্যে নির্মমতা আছে। হাসু যখন ছোট ভাইয়ের জন্য খেলনা আনে এবং তাকে আদর করে দেয়। দেখে করিম বকস হাসুর ওপর চড়াও হয়। তাকে মারার জন্য তাড়া করে। শফির মা মায়মুনের বিয়ের প্রস্তাবের সময় করিম বকসকে আসতে বলে। যেহেতু মায়মুন তারই মেয়ে। কিন্তু করিম বকস আসে না। এ রকম নিষ্ঠুর পিতা জগতে আর হয় কি না সন্দেহ।

ঔপন্যাসিক এখানে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেছেন। কাহিনীর পটভূমি ও চরিত্রের সংস্থাপনে এই ভাষা বাস্তবিক ও যথাযথ হয়েছে। এ ছাড়া অনেক উপকথা, ছড়া, গান ব্যবহার করেছেন, যা গ্রামীণ জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, এতে কাহিনীর বিশ্বস্ততা বেড়েছে। সবচেয়ে বড় সাফল্য হচ্ছে, কাহিনী সংস্থাপনে ঔপন্যাসিক দক্ষতার পরিচয় দিতে পেরেছেন। জয়গুন চরিত্রে লেখকের দক্ষতা অপরিসীম এবং অন্যান্য চরিত্র চিত্রনেও তার নিপুণতা লক্ষণীয়। সব মিলিয়ে সূর্য-দীঘল বাড়ী বাংলা সাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। লালসালুর জমিলা, জননীর দরিয়া বিবি, সারেং বৌর নবিতুন-এর মতো সূর্য-দীঘল বাড়ীর জয়গুনও বাংলাদেশের উপন্যাস সাহিত্যের এক উজ্জ্বল চরিত্র। ঔপন্যাসিকের অসাধারণ সমাজবোধের পরিচয় পাওয়া যায় উপন্যাসটিতে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা