× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রঙ আধিক্যের কাল এবং আমাদের আকাল

হাসনাত মোবারক

প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:২২ এএম

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৮:০৫ পিএম

চিত্রকর্ম : বনানী সিমলাই

চিত্রকর্ম : বনানী সিমলাই

নরম রোদের ডানায় ভর করে হেমন্ত এসেছে এই বাংলায়। শিশির ঝরা নিশিতে হেমবর্ণ এই হেমন্তে প্রকৃতি যেন সেজে উঠেছে বর্ণ ও বিভায়। শরৎ শেষের জলদ বাতাস আর কামরাঙা রোদের নাচনে মাঠে মাঠে দুলছে আমন ধান। এই ঋতু মূলত রঙ আধিক্যের কালÑতিন দশক আগেও আমাদের অঞ্চলের মানুষের কাছে এই সময়টুকু ছিল আকাল। কার্তিক-অগ্রহায়ণ। এই দুই মাস নিয়ে হেমন্ত। মরা কার্তিক। এক কার্তিকে বেঁচে উঠলে হাঁপ ছেড়ে উঠত। অর্থাৎ সামনের বছর পর্যন্ত বাঁচার স্বঘোষিত নিশ্চয়তা! মরা কার্তিক। বাপ মরলে কুলা দিয়ে ঢাকতে হয়। সে এক নিদারুণ কাল ছিল।

সেই ফিরিস্তি একটু পরে দিব। ভাগ্যিস আশীর্বাদস্বরূপ উদ্ভাবিত হয়েছিল উচ্চফলনশীল ও উন্নত জাতের ধান, যা চাষাবাদ করে খেয়ে বেঁচেবর্তে আছি। আমাদের কাছে ধানের ভাত যে কী পরিমাণ দুর্লভ বস্তু! তার কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরি। ১৯৯৫ কি ৯৬ সাল। আমাদের বাড়ির পশ্চিম পাশে খাঁ বাড়ির মেয়ের বিয়ে। তখনও আমাদের পা পড়েনি টাউন বন্দরে। বরযাত্রী এসেছেন দূর শহর থেকে। কী সুন্দর পোশাক পরা অতিথিরা। পরিপাটি। তাকিয়ে বিস্মিত। খাবার পরিবেশনের জন্য টেবিল চেয়ারের চল তখনও হয়নি। সেই বিয়েতেও অতিথিদের নিমন্ত্রণ খাওয়াতে মাটিতে পাতা হয়েছিল চট-পাটি। বরসহ অন্যান্য পোশাকে কেতাদুরস্ত অতিথিদের জন্য সেই বিছানার ওপরই পাতা হয়েছিল ফুলপাখি সমেত দস্তরখানা। শুধু তাদের জন্য টিনের প্লেট, যা সেই সময়ের জন্য সেরা সমাদর। গ্রামের লোকদের জন্য কলার পাতা।

সেদিন আমরা পত্রপট সামনে নিয়ে বসে আছি। উদরপূর্তি হবে। অপেক্ষা করছি। হারুন মামা আমার সমবয়সি। আমি তার সার্বক্ষণিক সাথী। মামাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ সে। তাই সে একটু বেশি চটপটে। সমবয়সিরা তার কাছে যেকোনো বিষয়ে দ্বারস্থ হতো। ওই বিয়ের দাওয়াতেও মামাভাগ্নে বসেছি একসঙ্গে। পাতের কাছে যখন পরিবেশনকারী এলেন, মামা বলে উঠল, ‘এ্যা আমি খাবো লয়। আমাক ধানের ভাত দ্যান। এতা তো দৈনিকই বাড়িত খাই।’ মামার ওই কথার প্রেক্ষিতে পরিবেশনকারীর মনের অবস্থা বোঝার বয়স তখনও আমার হয়নি। পোলাওর পরিবর্তে ভাত খেতে চাওয়া মামার কিঞ্চিৎ ভ্রম ছিল। সে ভুল করেনি। আমাদের গ্রামের নাম চিনাধুকুড়িয়া। চিনা ফসল উৎপাদনে বিখ্যাত সে গ্রাম। চলনবিলের দক্ষিণ-পূর্ব ঘেঁষা জনপদ। আমন ধান বানের জলে ভেসে গেলে বিকল্প হিসেবে রবিখন্দে চিনা ফলাতো কৃষকরা। চিনার চাল যারা খেয়েছেন, তাদের কাছে বিষয়টি সহজে অনুমেয়। হুবহু রান্না করা পোলাওর সঙ্গে সাদৃশ্য রয়েছে চিনার ভাতের। তৃণজাতীয় এই উদ্ভিদ। দেখতে সুন্দর। কোমল মিহি। পাকার আগে মনে হবে ঘাস। সেই ঘাসের বিচি সিদ্ধ করা চালের ভাতে বছরের প্রায় আট মাস কাটাতে হতো। দুই থেকে তিন মাস কোনো মতে চলতো আমন, আউশের ভাতে। বাদবাকি সময়টুকু তিনবেলা আহারে এক-আধটু জুটত ধানের ভাত। তাই ফকির-মিসকিনের ভিক্ষার ব্যাগেও উঠত চিনার চাল। তাতে ফকিরদেরও অবশ্য গোস্বা ছিল ঢের। এক ফকির তো একবার বলেই বসলেন, ‘ মা রে মনে আর কয় না এই গড়ান মাইরা উইঠা ঝোলা ফাঁক কইরা চাইড্ডা চিনার চাইল লেই।’ এ অঞ্চলের বসতভিটাগুলো সমতল ভূমি থেকে দশ-বারো হাত উঁচুতে। তাই গড়ান ঠেলতে অনভ্যস্ত জুয়ান লোকই হাঁপিয়ে ওঠে। আর ফকিররা তো শারীরিকভাবে এমনিতেই দুর্বল।

কোরফ নামের এক ফকির ভিক্ষা মাগতে এসে গ্রামের একেক বাড়িতে একেক দিন খাবার খেতেন। খেয়ে উঠে বলতেন, ‘পেঁয়াজ পান্তা কোরফ ঠান্ডা।’

আমাদের চেয়ে আট-দশ বছরের বড় মহর আলী। তার সঙ্গেও জুড়ে আছে পেঁয়াজ-পান্তার একটি অম্ল-মধুর স্মৃতি। আমি তখনও কাঁচি ধরা শিখিনি। সে বছর নিচু জমিগুলোর ধান উত্তাল বন্যায় ভেসে গেছে। দক্ষিণে দিগন্তবিস্তারি পাথার। সেই ভূখণ্ডে তখনও আমার পা পড়েনি। গ্রামের উত্তরের উচু জমিগুলোতে আমন ধান টিকে ছিল। গ্রামের অনেকের মতো আমাদেরও ভাগ্যে প্রসন্ন ছিল। বিঘা দুই জমিতে আমন ধান টিকে ছিল। সেই জমির ধান কাটতে কামলা হিসেবে মহর ভাইকে নেওয়া হয়েছে। আরও দুই-চারজন ছিলেন হয়তো। প্রভাতি সূর্যের আলোয় দিগন্ত ঝলমল করছে। আলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চক চক করছে পাকা ধানের শীষ। এতো বছর পরও সেই দৃশ্য দিব্যি মনে আছে! কত সালের ঘটনা তা স্মরণে আনার চেষ্টা করেছি বহুবার। 

পুবের বেলা এসে যখন চোখে লাগছে ঠিক তখনই পাতিল ভর্তি পান্তা নিয়ে জমিতে পৌঁছেছি। সেই জমির দুই ধার ধরে বয়ে গেছে খাল। সেই অনুযায়ী কি এর নামকরণও খালমঠা! মাঠ থেকে মঠা। শ্রুতমধুর তাই! সে যাক। খাল থেকে হাত-পা ধুয়ে এসে সবাই সকালের পান্তা খেতে বসলেন। খেয়ে-দেয়ে ওঠার পর যে ভাত অবশিষ্ট ছিল, তা অনায়সে দুজনের এক বেলার আহার। মা-চাচিদের পাইট কামলার জন্য ভাত পাঠানোর সময় সাতকুল হিসাব করতেন। ভাত কম হলে মান যাবে। এই ভয়ে তাদের হাঁড়িতে খাবার থাকুক বা না থাকুক। চড়ার কামলার ভাত যেন কম না পড়ে। তাই সেদিনও দুজনের ভাত বেঁচে ছিল পাতিলে। মোহর ভাই আমাকে ডেকে বললেন, ‘এ রোনজু ভাই। যা বাড়িত থাইকা দৌড়া যায়া আরও দুইডা পেঁয়াজ আর কাঁচামরিচ লিয়া আয়। ধান কাটতে কাটতে দুই ভাই ভাতগুলোন খায়া লেবো নে।’ চড়া থেকে বেঁচে যাওয়া খাবার বাড়িতে ফিরে আনার রীতি ছিল না।

মাঠে যত ধান। তার চেয়েও বেশি গল্প তাদের পেটে। উদরে খাবারে কমতি ছিল। সেই না পাওয়ার বেদনাই বুঝি তারা নানান রকম রসিক ও চটুল গল্প বলে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতেন। তারা নিজেদেরকে কখনও ‘হাড়ে-হাভাতে’ মনে করতেন না। চড়া ভরা জমি তাদের। বিল ভরা মাছ। ফসল ভেসে গেছে। এসব হয়েছে প্রকৃতির খেলে। সাময়িক তাদের ফসলের ক্ষতি হয়েছে, যা ভাগ্যের ফের।

নিজেদের জমিতে কাজ না থাকলে তারা বৃহত্তর যশোর, রাজশাহী ও বৃহত্তর বগুড়া জেলায় দলবেঁধে ধান কাটতে যেতেন। সেখান থেকে অর্থকড়ি যাই কামাই করুক না কেনÑ তারা ফিরতেন গল্পের ঢালি নিয়ে। সেই গল্পগুলো শুনে বিস্মিত হতাম।

বড় হব। দূরদেশে ধান কাটতে যাব। পথঘাট চিনব। এক হেমন্ত আসে আর আমার চেয়ে বয়সে বড়রা রঙিন রূপবান গামছা কোমরে বাঁধে। অর্থাৎ ধান কাটতে যায়। তাদের ফেরার পথের দিকে তাকিয়ে থাকি।

বাইচের নৌকার আগা নায়ের মাঝি আলিফ হোসেন। সেও আমার বয়সি। কৈশোরে পা রাখার বেলাতে দলের সঙ্গে ধান কাটতে গেলো। সপ্তাহখানেক পর বাড়ির খানকা ঘর থেকে ভেসে এলো চেনা কণ্ঠের সুর। কিন্তু সে গানের কথাগুলো আমার কাছে নতুন। মা-চাচিদের খেদÑ ‘এই-রে পাজি আলিফ আইচে। পড়ালেহা বাদ দিয়া দ্যাশ-বিদ্যাশ ধান কাটপার গেছিল। হেই দ্যাশ থাইকা নতুন গান শিখা আইছে। আগে গজল কইত। এহন দেহো লিত্যি গান কয়।’

দুরন্ত আলিফ হোসেনের সেই গাওয়া গানে আমিও মুগ্ধ হই। বাম চোখ বন্ধ করে সে যখন গান ধরলোÑ হাইলা ছেরা হাল বয় ফুটবালুর চরে/হালখান ছাইড়া দিয়ে মই খান ধরে/হাইলা ছেরার গামছা বাতাসে উড়ে…।’

এর পরের বছর আলিফ ধান কাটতে গেল। সেখান থেকে ফিরে এসে গান ধরল Ñ ‘বৈদেশি পইরাদ রে বন্ধু টাকায় খাটো জন/ হায়রে বন্ধু টাকায় খাটো জন/ ধান কাটিতে আইসা আমার কাইটা গেলা মন/ হায়রে বন্ধু কাইটা গেলা মন…। কিঞ্চিৎ অবাক হয়েছিলাম এই গান শুনে। তাহলে আলিফ কি কোনো তরুণীর প্রেমে পড়ছে? এও কি সম্ভব! সেই গান বাস্তবে রূপ নিল আরও পরে। তা অবশ্য আলিফের বেলায় না। ঘটল তারই এক চাচার জীবনে। নাম নূর ইসলাম। সে পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে ধানের সিজনে যায় বগুড়ার শেরপুরের এক গ্রামে কামলা দিতে। সেই বাড়িওয়ালির মেয়ের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত প্রণয়ে আবদ্ধ হয়েছিল।

ফিরি হেমন্তের মাঠে। আমরাই শেষ প্রজন্ম। যাদের যথাকিঞ্চিৎ স্মৃতি রয়েছে সেই আমন ধান-গন্ধের দিনের। গরু দিয়ে ধান মাড়াই। রাত দুপুরে ঢেঁকিতে ধান ভানার ধাপুর-ধুপুর শব্দ শুনেছি। যে বছর আষাঢ়-শাওনে অকূল পাথারে একনাগাড়ে তুফান বইতো। অর্থাৎ দড় হওয়ার আগেই ধান ভেসে পাড়ে ভিড়তো। ডাগর ধান বিলপাড়ের বসতবাড়ি বাঁচানোর কাজে ব্যবহার করা হতো। আরও জোর বন্যা হলে কচি আমন তুলে ঘর-গৃহস্থের গরুর পায়ের নিচে বিছিয়ে দেওয়া হতো। ধানের ধাপ তুলে নিয়ে আসার অভিজ্ঞতাও হয়েছে দুই একবার। দিগন্তপ্রসারী মাঠ শূন্য পড়ে থাকত। অল্প কিছু উঁচু জমিতে ঢেউয়ের টিকে থাকতো। যৎসামান্য ফসল ঘরে তুলতে পারাটাই ছিল তাদের কাছে নিরতিশয়। অল্পতেই তুষ্ট হওয়ার ব্যাপারটি তাদের প্রকৃতিই শিখিয়েছে। সে কথা লিখব বলেই তিন দশক পর এখনও সেই গর্ভবতী ধানগন্ধের স্মৃতিতে আলোড়িত হই। সেই সোনালি ধানের উচ্ছ্বাস আর নাড়ার গন্ধ। মাটির জালাতে কয়েক জাতের আমন ধান বাড়িতে সংরক্ষিত ছিল। সেগুলোও নাম কি বাহারি ছিল। নাম ভুলে গেছি। তবে আমি প্রায়ই ছোট্ট গলা বাড়িয়ে ঢুকিয়ে দিতাম সেই মাটির পাত্রগুলোর ভেতরে। এক মুঠো ধান হাতে নিয়ে শুঁকতাম। এর পর হয়তো পিঠা-পায়েস পরবের কালে সেই ধানগুলো কুটতে হয়েছে।

ঘোর সন্ধ্যার আনাজপাতির গন্ধামাখা ভোজ। রোজকার আগুনজলের কর্মভাষায় সোপর্দ আমার মায়ের আঙুলে মিশে আছে হেমন্তের সবটুকু রঙ।

আমি ভাবি, চলনবিলের বিশাল প্রান্তরে বসে আছি এখনও। হেমন্তের হালকা হিম জড়ানো পথে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা