মৃত্যুঞ্জয় রায়
প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:১৯ এএম
চিত্রকর্ম : মলয় বালা
হেমন্ত এসেছে আজ, হেমকন্যা হৈমন্তী নিয়ে এসেছে ঐশ্বর্যের পাত্র, ধন-ধান্যে পূর্ণ হয়েছে ফসলের মাঠ, হেমন্তের হলুদ রঙ ঝরছে সারা দিন মাঠের ওপর, রাতে বরফের মতো চাঁদ ঢালছে জ্যোস্নার ফোয়ারা, হিমেল কুয়াশায় মেখে শিশিরে সিক্ত হয়েছে তরুণ দূর্বাদল। লক্ষ্মীমন্ত এ ঋতুর অগ্রহায়ণে কেটে যায় কার্তিকের মঙ্গা। নবীন ধান্যে হয় নবান্নের উৎসব। তাই তো কবি কাজী নজরুল ইসলাম সবাইকে দিয়ে রেখেছেন অঘ্রানের সওগাতÑ
ঋতুর খাঞ্চা ভরিয়া এল কি ধরণীর সওগাত।
নবীন ধানের অঘ্রানে আজি অঘ্রান হলো মাৎ।
গিন্নিপাগল চালের ফিরনি
তশতরী ভরে নবীনা গিন্নী
হাসিতে হাসিতে দিতেছে স্বামীদের খুশিতে কাঁপিছে হাত।
শিরনি রাঁধেন বড় বিবি, বাড়ি গন্ধে তেলেস্মাত।
এ সওগাত পেয়েই কি কবি সুফিয়া কামালের মনে প্রশ্ন জেগেছিল যে, হেমন্তকে কে ডেকে নিয়ে এল? তার হেমন্ত কবিতায় তিনি সে প্রশ্ন রেখেছেনÑ
সবুজ পাতার খামের ভেতর
হলুদ গাঁদা চিঠি লেখে
কোন পাথারের ওপার থেকে
আনল ডেকে হেমন্তকে?
এ ঋতুতে প্রকৃতি ও মানুষের রূপবদল বড় অপূর্ব। দিগন্তবিস্তৃত মাঠজুড়ে কেবল হলুদ রঙের ধান আর ধান। দলে দলে মানুষজন সেসব ধান কাটে, আঁটি বাঁধে আর সেসব ধানের আঁটি বাগের দুপাশে দাঁড়িপাল্লার মতো ঝুলিয়ে বাগ কাঁধে বাড়ি ফেরে। কোথাও বা সেসব ধানের আঁটি বোঝাই গরুর গাড়ি মেঠোপথের ক্যাচর-ক্যাচর শব্দ তুলে গৃহস্থের বাড়ি বা ধানখোলার পথে চলে। গাড়িয়ালের মুখে থাকে ভাওয়াইয়া আর গরুদের তাড়ানোর আওয়াজ।
গৃহস্থের বাড়িতে ধান পৌঁছলেই শুরু হয় সেসব ধান মাড়াইয়ের কাজ। অতীতে ধান মাড়াইয়ের কাজ কৃষকরা করত গরুর পাল দিয়ে। গৃহস্থের মস্ত উঠোনজুড়ে থাকত ধানখোলা। উঠোনের মধ্যখানে একটা বাঁশের খুঁটি। খুঁটিকে কেন্দ্র করে বিছানো হতো ধানের আঁটি। খুঁটির সঙ্গে গরুর গলায় রশি দিয়ে বেঁধে দেওয়া হতো। ধানের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে গরুর সংখ্যা তিন থেকে পাঁচটা হতো। খুঁটিকে কেন্দ্র করে গরুর পাল ঘুরত আর গরুর পায়ের চাপে শীষ থেকে ধান আলগা হয়ে খড়ের নিচে জমা হতো। গরুর চোখে থাকত ঠুলি, কৃষকের হাতে থাকত লাঠি। কৃষকরা আগে এ পদ্ধতিতেই ধান মলত। একে বলা হতো ‘মলন’। ধান মাড়াইয়ের পরই গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে উঠত ঢেঁকিতে ধানভানার শব্দ। ঢেকুর ঢক ঢেকুর ঢক শব্দে মাতোযারা হয়ে উঠত সারা গ্রাম। হেমন্ত প্রকৃতিতে সেই গ্রামীণ জীবনের এক অপূর্ব ছবি ফুটে উঠেছে কবি জসীমউদদীনের কবিতায়Ñ
আশ্বিন গেল কার্তিক মাসে পাকিল ক্ষেতের ধান,
সারা মাঠ ভরি গাহিছে কে যেন হলদি কোটার গান।
ধানে ধান লাগি বাজিছে বাজনা, গন্ধ উড়ায় বায়ু
কলমি লতায় দোলন লেগেছে, ফুরাল ফুলের আয়ু।
গৃহস্থ, কৃষক-কিষাণীরা নতুন ধান পাওয়ার আনন্দে মেতে ওঠে, পালন করে নবান্ন উৎসব। সোনার ধান শুকিয়ে তা থেকে মাড়াই করে ঢেকিতে বা কলে ভানার পর প্রথম যে চাউল পাওয়া যায় সে চাউলের ভাত রান্না করে অনেকেই দেব-দেবীর উদ্দেশে নিবেদন করে। তাদের বিশ্বাস, যে চালের ভাত খেয়ে আমরা বাঁচব, দেব্তাকে সে চালের ভোগ না দিয়ে কেউ একটা দানাও মুখে তুলবে না। প্রথম কাটা গোছার ধান হলো ‘আগধান’। ওই গোছার চাল দিয়ে রাঁধা হবে দেবতার জন্য ‘আগভাত’। আর চালের গুঁড়ো খেজুরের জ্বাল দেওয়া রসে গুলে হয় ‘সিন্নি’ বা ‘শিরনি’। সিন্নি খেয়ে নবান্ন উদযাপন করা হয়। লোকবিশ্বাস যে, তাতে দেবতারা খুশি হয়ে আরও বেশি বেশি ধান পাওয়ার বর দেয়।
হেমন্তে গ্রামে আরেকটি দৃশ্য চোখে পড়ে। হেমন্তে গাছিরা কুয়াশা ভেঙে ধীরলয়ে হাঁটে, তর তর করে খেজুর গাছে ওঠে। গাছি ধারালো দা দিয়ে খেজুর গাছের মাথা চেঁছে রস নামানোর আয়োজন করে। হেমন্তের মাঝখান থেকেই শুরু হয় সেসব রস জ্বাল দিয়ে গুড় বানানোর মহোৎসব। গাঁয়ের অনেক গৃহস্থ বাড়ির উঠোনে বড় উনুন তৈরি করা হয়, তার ওপর তাপাল রেখে খেজুরের রস জ্বাল দেয়া হয়। রস জ্বালের ঘ্রাণে সারা গাঁ ম-ম করে ওঠে। একসময় রস ঘন হতে হতে হয় খেজুরের গুড়, শেষে জমে হয় পাটালি। একশ্রেণির মানুষ খেজুরের গুড় তৈরি ও গুড় বিক্রিকে বেছে নেয় পেশা হিসেবে।
নতুন ধান ও চাল ওঠার সঙ্গে সঙ্গে হেমন্তের হাত ধরে আসে শীতের আমেজ। গাঁয়ে গাঁয়ে শুরু হয় পিঠা-পুলি বানানোর ধুম। শহরেও হেমন্তের মানুষেরাও সে স্বাদ থেকে বঞ্চিত থাকে না। তাই শহরের পথে পথে শুরু হয় পিঠা বানানো ও বিক্রির আয়োজন। পথের ধারে ধোঁয়া ওঠা গরম গরম চিতোই পিঠা আর ভাপা পিঠায়।
হেমন্ত আসলে এক মজার ঋতু। এ ঋতুর মধ্যেই যেন লুকিয়ে রয়েছে বাঙালি জীবনের সার্থকতা। কথায় বলে ‘মাছে ভাতে বাঙালি’। কথাটা হয়তো এককালে ঠিক ছিল। এখন উল্টে ভাতে মাছে বাঙালি বললেই ভালো মানায়। কেননা, মাছের চেয়ে ভাতই আমরা বেশি খাই। কথায় কী আসে যায়? হেমন্ত তো সেই মাছ-ভাত খাওয়ারই ঋতু। বিল-ঝিল-হাওর-বাঁওড় এ সময় শুকাতে শুরু করে। আর সেসব শুকাতে থাকা জলাশয়ে ধরা পড়তে থাকে মাছ। হেমন্তের অনেক মানুষ সেসব মাছ ধরতে নেমে পড়ে বিলে-ডোবায়। নানা রকম দেশি মাছে বাজার ভরে যায়। আইড়, বোয়াল, চিতল, বাঘাইড়, পুঁটি, ট্যাংরা কত রকমের মাছ যে ধরা পড়ে। হাওর-বাঁওড়-বিলে তাই হেমন্তে দলে দলে ধান কাটার পাশাপাশি মাছ ধরতেও নেমে পড়ে। একদিকে স্বাদে ভরা নতুন চালের গন্ধমাখা ভাত, অন্যদিকে টাটকা দেশি মাছের ঝোল, খেজুর গুড়ের গহৃমাখা পিঠাপুলি। আহ্, কী যে অপূর্ব! পাহাড়ের জুমিয়ারাও হেমন্তে শেষ করে তাদের জুমের কাজ, জুমের ধান কেটে চলে চাল বানানোর প্রক্রিয়া। বিন্নিধানের পিঠাপুলিতে সেসব জুমিয়ার ঘরেও নামে খুশির বান।
বাংলার প্রকৃতিতে গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীতের মতো হেমন্তের উপস্থিতি ততটা সরব বা সুস্পষ্ট না হলেও কবি-সাহিত্যিকরা হেমন্তের রূপ-সুষমায় লীন হয়েছেন সেই প্রাচীনকাল থেকে। কবি কালিদাসের ঋতুসংহার কাব্যের চতুর্থ স্বর্গে তিনি মেতেছেন হেমন্ত বন্দনায়। সেখানে তিনি হেমন্ত ঋতুর বর্ণনায় এনেছেন শস্যের পরিপক্বতা, পদ্মফুলের ম্লান হওয়া, বিভিন্ন ফুল ফোটা, শিশির ঝরা ইত্যাদির কথা। মধ্যযুগের কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর কালকেতু উপাখ্যানে হেমন্তের কিছু নমুনা পাওয়া যায়Ñ
কার্তিক মাসেতে হয় হিমের প্রকাশ
যগজনে করে শীত নিবারণ বাস
মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলিতেও মেলে হেমন্তের পরিচয়, কৃষকদের নতুন ধান ঘরে তোলার আনন্দ। বৈষ্ণব পদকর্তা লোচনদাসের একটি পদে সে চিত্র ফুটে উঠেছেÑ
অঘ্রাণে নতুন ধান্য বিলাসে।
সর্বসুখ ঘরে প্রভু কি কাজ সন্ন্যাসে \
পাটনেত ফোটে ভোটে শয়ন কম্বলে।
সুখে নিদ্রা যাও তুমি আমি পদ তলে \
হেমন্তের কবি জীবনানন্দ দাশ তার ধূসর পাণ্ডুলিপি কাব্যের একটা কবিতায় লিখেছেনÑ
হেমন্তের ঝড়ে আমি ঝরিব যখন
পথের পাতার মতো তুমিও তখন
আমার বুকের পরে শুয়ে রবে? অনেক ঘুমের ঘোরে ভরিবে কি মন
সেদিন তোমার?
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও অসংখ্য গানে ও কবিতায় রয়েছে হেমন্তের স্বচ্ছন্দ বিচরণ। হেমন্তের মেঘমুক্ত আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ কুয়াশার আঁচল ভেদ করে বিশ্বকে উদ্ভাসিত করে তোলেÑ
হিমের রাতে ওই গগনের দীপগুলিরে
হেমন্তিকা করল গোপন আঁচল ঘিরে।
হেমন্ত প্রকৃতির এক চমৎকার বর্ণনা পাওয়া যায় কবি নজরুলেরও কবিতায়। হেমন্তের হিমেল হাওয়ার পরশ পেয়ে সূর্য আর চাঁদের কী অবস্থা হয় তা একটি লেখায় উঠে এসেছে, কী অসাধারণ সে চিত্রকল্পÑ
হেমন্তের ঐ শিশির নাওয়া হিমেল হাওয়া
সেই নাচনে উঠল মেতে।
টইটম্বুর বিলের জলে
ফাটা রোদের মানিক জ্বলে
চন্দ্র ঘুমায় গগন তলে
সাদা মেঘের আঁচল পেতে।
হেমন্ত আসে, হেমন্ত যায়। হেমন্ত মানেই আমরা এখন অনেকেই ভাবি, সে কেবল নবান্নের ঋতু। আসলে হেমন্ত প্রকৃতির এক বহুরূপী শ্রেষ্ঠ ঋতু। নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার ঋতু হলো হেমন্ত। কখনও ঝড়-মেঘ, কখনও কুয়াশা। সবুজ ধানক্ষেতগুলো ধীরে ধীরে সোনারঙে বদলে যাওয়া। অতিথি পাখিদের আগমন শুরু হওয়া। গাঁয়ে গাঁয়ে খেজুর গুড় আর পিঠের ঘ্রাণ। ঝকমকে তাজা মাছে সাজানো জেলেদের ডালা। কার্তিকের রাতে হিমঝুরি আর ছাতিমের ঘ্রাণে মাতাল হওয়া। ধানকাটা সারা হলে শূন্য মাছে কুয়াশায় ভেজা চাঁদ ওঠা। এইতো আমাদের অনেক রূপের হেমন্ত প্রকৃতি। এ রূপ দেখতে এই বাংলায় কবি জীবনানন্দ দাশ ফিরে আসতে চান বারবারÑ
‘আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরেÑ এই বাংলায়/
হয়তো মানুষ নয়, হয়তোবা শঙ্খচিল শালিকের বেশে
হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে,
কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঁঠাল-ছায়ায়।’
কিন্তু ভয় হচ্ছে, যেভাবে পৃথিবীর জলবায়ু বদলাচ্ছে তাতে আগামীতে আমরা আমাদের এই আপন হেমন্তকে খুঁজে পাব তো! এ পরিবর্তনে সাড়া দিচ্ছে সাগর, আসছে ঘূর্ণিঝড়ের বার্তা। কার্তিকেও ফুটছে কদম-বরুণ ফুলেরা। বৃষ্টিটা যাই যাচ্ছি করেও যাচ্ছে না। কার্তিকেও নেই সেই কুয়াশা আর হাওয়ার হিমেল প্রশান্তি। কখনও কখনও ধেয়ে আসছে পাহাড়ি ঢল, প্লাবনের অমোঘ দুর্গতি। তাই বোধহয় কবি অনীক মাহমুদ হেমন্তের ধ্রুপদী সৌন্দর্যের মধ্যেও দেখেছেন দুর্যোগের অশনি থাবা, ধনলক্ষ্মীর আশীর্বাদের বঞ্চনাÑ
হেমন্তের রুপালি শিশির এসে ধুয়ে গেছে প্লাবিত ঘাসের গালিচা,
এখানে পড়েনি তবু লক্ষ্মীর করুণা, দৌপদীর পদপাত,
জলমগ্ন ধানক্ষেতে বন্যার অমনি তাবা শেষ হয়ে গেছে,
খুশির চিবুক ছুঁয়ে এখনও আসেনি কোনো আগন্তুক
নবান্নের কাকভোরে উপদ্রুত হতে শূন্য পাত্র কাঁপে...