খালেদ হোসাইন
প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:১৬ এএম
জীবন সব সময় বিকাশমান। কিন্তু যেকোনো বর্তমানেই অবিচ্ছেদ্যভাবে মিশে থাকে অতিক্রান্ত সময়ের নানা চিত্রচিহ্ন। যেমন হেমন্ত ঋতু এলে আমার মনপ্রাণ ধেয়ে চলে যায় আমার শৈশবে। মৃদু ও লঘু এক ভঙ্গিতে। কিন্তু তাকে লঙ্ঘন করা যায় না।
আমি জন্মেছিলাম ফতুল্লায়। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের রাস্তার পাশে। আমাদের বাড়ির দুপাশে দুটি বিশাল মাঠ। উত্তরের দিকের মাঠটা বিশাল। এর পশ্চিম প্রান্ত মিশেছে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে। মাঝখানে গাছপালা নিয়ে একটি বাড়ি। বাড়ির সামনে পূব দিকে একটা খেজুর গাছ। ওটাকে বলা হতো ‘ছাড়াবাড়ি’। হেমন্তের প্রতিটা সকাল সেই বাড়িটাকে ঘিরে রাখতো রসুনের খোসার চেয়েও হালকা কুয়াশা। খুব রহস্যময় মনে হতো। বাড়ির দক্ষিণ দিকের মাঠটা ছিল ছোট। তার তিনপাশে খেতখোলা, পূবপাশে সেই সড়ক, পশ্চিমদিকে মাঠ থেকে একটু দূরে মসজিদ, গা ঘেঁষে ‘গায়েনপাড়া’। বিকালে পুরো এলাকাজুড়ে মেঘ ভেসে বেড়াত, পাহাড়ি অঞ্চলে যেমন দেখা যায়। মাগরিবের নামাজের পরে গায়েনপাড়া থেকে কুয়াশার সঙ্গে ভেসে আসত আধ্যাত্মিক সব গানের সুর। এখন আর সেসব নেই। উত্তরের মাঠটা রহস্যহীন ‘যমুনা অয়েল কোম্পানি, তার উত্তরপাশে মেঘনা পেট্রোলিয়াম’। দক্ষিণ দিকের মাঠ এখন দরদালানের নিচে এক প্রত্নতাত্ত্বিক স্মৃতি।
ষড়ঋতুর এই দেশে প্রতিটি ঋতুই স্বমহিমায় অস্তিত্বময়। স্বরে, সুরে, সৌরভে ও স্বকীয়তায় ভাস্বর। পঞ্জিকার সঙ্গে মিল থাকে না সব সময়, এ ওর জায়গা দখল করে নেয়, তবু তারা বর্ণে, গন্ধে, সরসতা বা রুক্ষতায় দৃঢ়ভাবে সমৃদ্ধ। এদের মধ্যে হেমন্ত ঝাপসা, শীতল, সমুদ্রে ভাসমান রহস্যময় এক জাহাজের মতো মনে হয় আমার। স্থির নয়, অস্থির নয়, মায়াবী বা মায়াবতী।
২. আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই ১৯৮২ সালে। কোনো এক হেমন্তে। অনাহত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে তখন তার রূপ মোহনীয়। প্রান্তিক গেট থেকে কলাভবনের দিকে হেঁটে যাই। ওখানে ভেতরে চলাচলের জন্য রিকশা বা অন্যকোনো যানবাহন ছিল না। সব পথঘাট সিরামিকে বিন্যস্ত। কুয়াশার ঈষদাভাসে দুপাশের বড় বড় গাছপালা কেমন যেন ঝিম মেরে আছে। যেন চিন্তামগ্ন বা সাধনালিপ্ত। প্রায় জনশূন্য পথে শাড়ি পরা একটি মেয়ে হেঁটে যাচ্ছে, মনে হয় দৃশ্যটাকে স্বর্গীয় করে তুলতেই।
চৌরঙ্গী পেরোতেই দুপাশে দুটি বড় লেক। যেন দুটি নিষ্পলক চোখ। যেন ‘নয়ন সরসী’। একটু সামনে গিয়ে বাঁ দিকে একটা পথ চলে গেছে, মনে হয় গভীর-নিবিড় কোনো অরণ্যের দিকে। পথের ওপাশে এক জলাশয়। অদূরেই একটি মাঠ অনন্তে গিয়ে মিশেছে। হৈমন্তী সৌরভ ও সুষমা সর্বাঙ্গে জড়িয়ে। এ রূপের কোনো তুলনা হয় না।
ভর্তি হওয়ার বেশ পরে তখনো এত দর-দালানের বাহুল্য অচিন্তনীয় ও অপ্রয়োজনীয় ছিল। একদিন দুপুরের পরে সালাম-বরকত হল থেকে হাঁটতে বেরিয়েছি। এখন যেখানে নতুন কলাভবন, তখন সেটা এটা জঙ্গলা বনভূমি। তারপরে সবুজ জলের বঙ্কিম একটা লেক। তা ওপারে বিশাল বিশাল বিচিত্র সব গাছ। উচ্চতার বৈচিত্র্য আছে, বিভিন্নতা আছে ডালপালার ধরন-গড়নেও। কিন্তু আমার মন কেড়ে নিল গাছেদের পল্লবরাজির বর্ণবৈচিত্র্য। শরৎ পেরিয়ে আসা সেই হেমন্তে কী অপরূপ সজল ও চিকচিকে একটি আভা। সবুজ রঙের যে এত শেড থাকতে পারে এর আগে তা বই-পুস্তকে পাঠ করলে এমন তীব্র ও কার্যকরভাবে মর্মে প্রবেশ করেনি। মনে হয়, সেইদিনই প্রথম অনুভব করলামÑ পৃথিবী মোটেও সাদা-কালো নয়, রঙিন, বিকিরণময় বর্ণচ্ছটা সর্বত্র। যেদিকে চোখ যায়, মনে সঞ্চারিত হয়ে যায় রঙ। মনে পড়ে যায় জীবনানন্দ দাশের ‘অনেক আকাশ’ কবিতাটিকে :
কেউ তারে দেখে নাই; মানুষের পথ ছেড়ে দূরে
হাড়ের মতন শাখা ছায়ার মতন পাতা লয়ে
যেইখানে পৃথিবীর মানুষের মতো ক্ষুব্ধ হয়ে
কথা কয়, আকাঙ্ক্ষার আলোড়নে চলিতেছে বয়ে
হেমন্তের নদী…
৩. বর্ষা এলে যেমন রবীন্দ্রনাথ, ঠিক তেমনইÑ এখন হেমন্ত এলে জীবনানন্দই আমাদের মনকে আচ্ছন্ন ও আবিষ্ট করে রাখে। বিচিত্র অনুভূতির বিবিধ লীলা-লাস্য মুদ্রিত হয়ে আছে তার সৃষ্টি-সাম্রাজ্যে। হেমন্তকে নিয়ে খুব নির্জন একটি স্বাক্ষর আছে তার :
তুমি তা জানো না কিছু, না জানিলে
আমার সকল গান তুবুও তোমার লক্ষ্য করে।
যখন ঝরিয়া যাব হেমন্তের ঝড়ে,
পথের পাতার মতো তুমিও তখন
আমার বুকের পরে শুয়ে রবে?
অনেক ঘুমের ঘোরে ভরিবে কি মন
সেদিন তোমার!
প্রণয় ও প্রত্যাশার এক দ্বন্দ্ব, জৈবনিক যে ছন্দহীনতা সৃষ্টি করে, তার এক কলজে-ছেড়া ইমেজ মর্মকে বেদনার্ত করে তোলে। বা মেঠো চাঁদকে যখন সম্বোধন করেন :
শস্য ফলিয়া গেছে, তুমি কেন তবে
রয়েছে দাঁড়ায়ে
একা একা! ডাইনে আর বাঁয়ে
খড়-নাড়া Ñপোড়ো জমি Ñমাঠের ফাটল,
শিশিরের জল!’
এই দৃশ্য, এই জনগ্রাহ্য চিত্র নিতান্তই হেমন্তের। ফসল কাটার পরে খড়-নাড়ার চিরন্তন বাস্তবতায় জণসিঞ্চন করে ‘শিশিরের জল’। বা ‘পেঁচা’ কবিতায় :
প্রথম ফসল গেছে ঘরে,
হেমন্তের মাঠে মাঠে ঝরে
শুধু শিশিরের জল;
অঘ্রানের নদীটির শ্বাসের
হিম হয়ে আসে
হিম হয়ে আসে
বাঁশপাতা Ñমরা ঘাস Ñআকাশের তারা!
হেমন্ত এবং ‘শিশিরের জল মনে পড়িয়ে দেয় সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘হৈমন্ত ‘কে :
বৈদেহী বিচিত্র আজি সংকুচিত শিশিরসন্ধ্যায়
প্রচারিল আচম্বিতে অধরার অহেতু আকূতি:
অস্তগামী সবিতার মেঘমুক্ত মাঙ্গলিক দ্যুতি
অনিত্যের দায়ভাগ রেখে গেল রজনীগন্ধায়।
ধূমায়িত রিক্ত মাঠ, গিরিতট হেমন্তলোহিত,
তরুণতরুণীশূন্য বনবীথি চ্যুত পত্রে ঢাকা,
শৈবালিত স্তব্ধ হ্রদ, নিশাক্রান্ত বিষন্ন বলাকা
ম্লান চেতনারে মোর অকস্মাৎ করেছে মোহিত।
হেমন্তের একটা অন্তর্ভেদী রিক্ততার রূপ আছে, বিবিক্ততার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে চেয়েছেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়Ñ
আমাদের পোস্টম্যানগুলির মতো নয় ওরা
যাদের হাত হতে অবিরাম বিলাসী ভালোবাসার চিঠি আমাদের
হারিয়ে যেতে থাকে।
আমরা ক্রমশই একে অপরের কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছি
আমরা ক্রমশই চিঠি পাবার লোভে সরে যাচ্ছি দূরে
আমরা ক্রমশই দূর থেকে চিঠি পাচ্ছি অনেক
আমরা কালই তোমাদের কাছ থেকে দূরে গিয়ে ভালোবাসা-ভরা চিঠি
ফেলে দিচ্ছি পোস্টম্যানের হাতে
হেমন্ত আর নবান্ন-উৎসব অভিন্ন সূত্রে গাঁথা। ফসল কাটার পরে ঘরে ঘরে যে উৎসব তাতে প্রাণের বন্যা বয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে অনিবার্য হয়ে ওঠেন কাজী নজরুল ইসলাম। ‘অঘ্রাণের সৌরভ’ কবিতায় গ্রামীণ প্রকৃতিক ও পারিবারিক আনন্দকে চিহ্নিত ও বিবৃত করে রেখেছেন তিনি :
ঋতুর খাঞ্চা ভরিয়া এল কি ধরণির সওগাত?
নবীন ধানের আঘ্রাণে আজি অঘ্রাণ হল মাৎ।
গিন্নি-পাগল চালের ফিরনি
তশতরি ভরে নবীনা গিন্নি
হাসিতে হাসিতে দিতেছে স্বামীরে, খুশিতে কাঁপিছে হাত।
জীবন ও জীবনের পারিপার্শ্বিক অনন্য এক ভুবনের দেখা পাই আমরা হেমন্তে। বাঙালি জীবনের এক বর্ণিল অধ্যায় হিসেবে এ ঋতু সন্দেহাতীতভাবে চিত্তজয়ী।