× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শামসুর রাহমানের কবিতা

ডানা মেলে অসীমে

আনজীর লিটন

প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৫ ১০:৫৬ এএম

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৫ ১৭:৫১ পিএম

শামসুর রাহমান, ২৩ অক্টোবর ১৯২৯-১৭ আগস্ট ২০০৬। প্রতকিৃতি: অরণী হোসেন অথৈ

শামসুর রাহমান, ২৩ অক্টোবর ১৯২৯-১৭ আগস্ট ২০০৬। প্রতকিৃতি: অরণী হোসেন অথৈ

সেদিন ছিল মেঘলা দুপুর। ছোট বোনটার জন্য হু হু করে কেঁদে উঠল মন। গুটিবসন্ত রোগে বোনটা মারা যায়। ওর প্রতি ছিল ভীষণ মায়া। বোনটার কথা ভাবতে ভাবতে কী মনে হলো, বসে পড়লেন খাতা-কলম নিয়ে। একটা কবিতা লেখা হলো। মাকে শোনালেন। কবিতা শোনার পর মা খুব কাঁদলেন। কাঁদলেন কবি নিজেও। সেই থেকে কবিতা হয়ে উঠল প্রাণের স্পন্দন। বলছিলাম আমাদের সবার প্রিয় কবি শামসুর রাহমানের কথা।

বাংলা কবিতাকে তিনি দিয়েছেন স্বর্ণালি সৌন্দর্য। নগরজীবনের রূপময় আলোয় কবি নিজেকে উজ্জ্বল করেছেন তার কবিসত্তা দিয়ে। কবিতার এই ছন্দভূমিতে তিনি বঞ্চিত করেননি শিশু-কিশোরদেরও।

কৈশোর পেরিয়ে ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। সে সময় পাঠ করলেন কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতাসহ বাংলা ভাষার খ্যাতিমানদের কবিতা। এই তালিকায় বিশ্বসাহিত্যের কবিদের কবিতাও ছিল। সূচনা পর্বে প্রভাবিত হয়েছেন জীবনানন্দ দাশকে ঘিরেই। মুগ্ধতার সঙ্গে পাঠ করতেন সুধীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব বসুকেও। পশ্চিমের কবিদের মধ্যে ডব্লিউ বি. ইয়েটস, এলিয়ট, বোদলেয়ার কিংবা এজরা পাউন্ড, পল এলুয়ার শামসুর রাহমানকে দারুণভাবে টেনেছেন কবিতার পথে। কবিতা থেকেই কবিতার জন্ম হয়Ñ এ কথা তিনি বিশ্বাস করতেন। তাদের কবিতা পড়তে পড়তে মনের মধ্যে ছন্দ লাফাতে লাগল। এই ছন্দের সাগরে ডুব দিয়ে তিনি তুলে আনলেন বাংলা কবিতার হীরার টুকরো। এই হীরার টুকরোগুলো একেকটি কবিতার পঙ্‌ক্তিমালা। কবিতার সঙ্গে নিজের জীবনকে জড়িয়ে নিলেন। হয়ে উঠলেন বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। 

কবিতা-ছড়ার পাশাপাশি গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ লিখেছেন। গান ও নাটক লিখেছেন। স্মৃতিকথা লিখেছেন। তার কবিতা থেকে অনেক গান হয়েছে। তার লেখার মধ্যে আছে দেশকে ভালোবাসার কথা। মানুষকে ভালোবাসার কথা। আমরা বারবার ছুটে যাই কবি শামসুর রাহমানের কাছে, তার কবিতার কাছে।

তিনি কেবল আধুনিক কবিতার নির্মাতা নন, তিনি চিরজাগরূক মানবসত্তার কণ্ঠস্বর। তার কবিতা নাগরিক বোধ, প্রেম, প্রতিবাদ ও স্বাধীনতার গীতধ্বনিতে সমৃদ্ধ। তার কাব্যিক যাত্রা এখানেই থেমে থাকেনি বরং তিনি আধুনিকতার প্রাচীর ভেঙে পৌঁছেছেন এমন এক চেতনার জগতে, যেখানে মানুষই সত্য। মানুষের জন্যই তার কবিতা আজও প্রাসঙ্গিক, আজও জাগ্রত।

শামসুর রাহমানের কাব্য বলয়ে থেকেই স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা কবিতার কবিতাকর্মীরা ছুটেছেন নতুন কবিতা, নতুন ভাবনা অন্বেষণে। তারা প্রথা ভাঙার স্লোগান সামনে নিয়ে এলেও কার্যত সফল হতে পারেনি। মুক্ত হতে পারেনি কবি শামসুর রাহমানীয় আবেশ ও প্রভাব থেকে। তার প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে (১৯৬০) এবং নিরালোকে দিব্যরথ (১৯৬৮) বাংলা কবিতায় নতুন প্রত্যাশার জন্ম দেয়। সেই থেকে কবি শামসুর রাহমান তার কবিতার পঙ্‌ক্তিমালায় তুলে ধরলেন জীবনের ছাপ। দেশের প্রতিটি ঘটনাই হয়ে উঠল তার কবিতার অনুষঙ্গ। মায়ের মৃত্যু, সন্তানের মৃত্যু, বন্ধুর প্রেম, বন্ধুর প্রতারণা যে কিছু স্পর্শ করেছে, অন্তরে নাড়া দিয়েছে তাই উঠে এসেছে কবিতায়। সংগ্রাম-মিছিল, রাজনৈতিক সংকট আর জীবনযাপনে ঘাত-অন্তর্ঘাতসমূহ কবিকে নতুন করে প্রভাবিত করতে লাগল। তৈরি করে দেয় এক স্বাতন্ত্র্যবোধ।

একটা স্বাতন্ত্র্য ভাবধারায় তার কবিতা নির্দেশনা দেয় এই জনগোষ্ঠীর ভাষা ও মাতৃভূমির প্রতি মমতা প্রকাশের অনুভূতি। অবিশ্বাস্য রকম পঙ্‌ক্তিমালায় শামসুর রাহমানের কবিতায় পাই ‘কবর খোঁড়ার গান’ কিংবা ‘এই মাতোয়ালা রাইত’-এর মতো ভিন্নস্তরের কবিতা। কিংবা আসাদের শার্ট, বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী, বর্ণমালা, নিজ বাসভূমে, বন্দী শিবির থেকে, দুঃসময়ের মুখোমুখি, ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা’র মতো কাব্যগ্রন্থ। কবি আল মাহমুদের লোকজধারার কবিতার বিপরীতে কিংবা সোনালী কাবিন-এর বিশালতার পাশে শামসুর রাহমান নগরচেতনায় রচিত করেন কাব্যরূপ। সদ্য স্বাধীন দেশের রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে নগর চেতনার চূড়ান্ত উন্মেষ ও প্রভাব পড়তে থাকে তার কবিতার ওপর। আর তাই তো নিঃসন্দেহে শামসুর রাহমানের কবিতার জ্বর ও উত্তাপ নগর সংস্কৃতি ও কবিতার দ্যোতক হিসেবে ভাবলে তা বাহুল্য মনে হবে না। বাংলা কবিতা স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠায় তিনি জোর কণ্ঠে বলেছেন, বাংলাদেশের কবি হিসেবে আমাদের নিজস্বতা, আমাদের স্বাতন্ত্র্য, আমাদের পৃথকত্ব, আমাদের অস্তিত্ব জাহির করতে হবে। কবিতা যদি ভালো হয় তাহলে গদ্যের দাপট থাকলেও কবিতা থাকবেই। এ কবিতার মধ্য দিয়ে শামসুর রাহমান হয়ে উঠেছেন নগরজীবনের কবি। তিনি খুঁজেছেন নগরবাসীর অন্তর্গত নিঃসঙ্গতা, প্রতিরোধ ও জাগরণে ভাষা এবং ভালোবাসা।

শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ টিএসসি, মধুর ক্যান্টিন, রাজপথ, রবীন্দ্র-নজরুল উৎসব, জয়নুলের চিত্রকর্ম, নূর হোসেনের ঝাঁঝালো বুক এবং বাংলাদেশের প্রকৃতি ও নদী প্রবাহ উপজীব্য করে বাংলা কবিতার ভুবনে শামসুর রাহমানের ঢাকামুখী চেতনা সর্বত্র সঞ্চালিত হয়েছিল।

বাংলা ভাষার প্রিয় এই কবি শুধু বড়দের জন্য লেখেননি, দারুণ মমতা দিয়ে লিখেছেন ছোটদের জন্যও।

বাংলাদেশের শিশু-কিশোর সাহিত্য দীর্ঘপথ পেরিয়ে একটা অবস্থান তৈরি করেছে। আলোকিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বিষয়-বৈচিত্র্য এবং আঙ্গিকের নতুনত্বে এ দেশের শিশু-কিশোর রচনাগুলো বাঁকবদল করেছে। প্রকরণগত নিষ্ঠার সঙ্গে কাব্যরচনায় যেসব কবি শিল্পগুণের বিভায় আলো ছড়িয়েছেন, শিশু-কিশোরদের জন্য কলম ধরেছেন। তাদের একজন কবি শামসুর রাহমান। দশকওয়ারি নানা তত্ত্ব-বিশ্লেষণে শামসুর রাহমানকে যেভাবে চিত্রিত করা হয়েছে সেখানে তার রচিত শিশু-কিশোর রচনা অনেকটাই অনালোচিত হয়ে আছে।

প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের ১৪ বছর পর প্রকাশিত হয় শিশু-কিশোরদের জন্য বই এলাটিং বেলাটিং (১৯৭৪)। তিনি লিখলেনÑ

আমার ছড়ার এ-বই পড়তে দেব কাদের?

এ-বই পড়ার মতো সময় আছে যাদের,

তাদের, তাদের, তাদের।

যারা জোছনা রাতে দেখে পরীর নাচ,

যারা জানলা দিয়ে দেখে সোনার গাছ,

যারা হয়রে মাঝি নায়ের মতো চাঁদের,

আমার ছড়ার এ-বই হাতে দেব তাদের,

তাদের, তাদের, তাদের।

(ছড়ায় এ-বই)

এমন কবিতার মধ্য দিয়ে শিশু-কিশোর কবিতায় দিলেন নতুন অবয়ব। শামসুর রাহমান শিশু-কিশোর সাহিত্যে এক নতুন মাত্রা যুক্ত করেছেন। দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধ জাগাতে কবির ছড়া-কবিতা ব্যাপক শিক্ষণীয় এবং নান্দনিক উপস্থাপনাও বটে, যা আধুনিক বাংলা শিশুসাহিত্যকে করেছে বর্ণিল এবং উপভোগ্য।

সামাজিক অসংগতি এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে লেখা শিশু-কিশোর উপযোগী তার রচনাগুলোতে কিছু কিছু চরিত্র বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছে। আবার কখনও-কখনও কবি তার কল্পনাশক্তি দিয়ে নতুন ব্যঞ্জনা তৈরি করেছেন। ব্যাপক মুগ্ধতা ছড়িয়ে কবি শামসুর রাহমান আমাদের উপহার দিয়েছেন ছড়া-কবিতার বই গোলাপ ফোটে খুকির হাতে (১৯৭৭), ধান ভানলে কুঁড়ো দেব (১৯৭৭), রামধনুকের সাঁকো (১৯৯৪), লাল ফুলকির হুড়া (১৯৯৫), নয়নার জন্য (১৯৯৭), সবার চোখে স্বপ্ন (২০০৭), তারায় দোলনায় দীপিতা (২০০৩), চাঁদ জেগেছে নদীর বুকে (২০০৪), আমের কুঁড়ি জালের কুঁড়ি (২০০৪), নয়নার জন্য গোলাপ (২০০৫), ইচ্ছে হলো যাই ছুটে যাই (২০০৫), হীরার পাখির গান (২০০৬), শামসুর রাহমানের হস্তাক্ষরে ছড়া ও কবিতা (২০০৬)। ধ্রুপদি সাহিত্যের প্রতি যে টান আমরা অনুভব করি, সেই ধ্রুপদি সাহিত্যকে শিশু-কিশোরদের সাহিত্য থেকে আলাদা করা যায় না; বরং শিশুসাহিত্যের মোড়কে ধ্রুপদি সাহিত্য রচিত হলেও তা বড়দেরও বারবার টেনেছে। কবি শামসুর রাহমানের তেমন একটি বই স্মৃতিকথার গদ্য স্মৃতির শহর (১৯৭৯)।

ছোটদের কাছ তার রচনাগুলো বড় হয়ে ওঠার প্রেরণা জোগায়। মানুষ ও প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শেখায়। ছোটদের-বড়দের সবার প্রিয় একটি কবিতাÑ

স্বাধীনতা তুমি

রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান।

স্বাধীনতা তুমি

কাজী নজরুল ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো

মহান পুরুষ, সৃষ্টিসুখের উল্লাসে কাঁপাÑ

স্বাধীনতা তুমি

শহীদ মিনারে অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল সভা

স্বাধীনতা তুমি

পতাকা শোভিত স্লোগান-মুখর ঝাঁঝালো মিছিল।

‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতায় তিনি স্বাধীনতাকে কেবল রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন আত্মার জাগরণ হিসেবে। ‘বন্দী শিবির থেকে’র আর্তনাদে তিনি হয়ে উঠেছেন জাতির ভাষ্যকার। তার কবিতা কেবল প্রতিবাদের নয়, এ যেন জীবনের সংগীত। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনি আধুনিকতার রূপ ও রঙ ব্যবহার করেছেন কিন্তু তার ভেতরে মিশিয়ে দিয়েছেন মানবতাবাদী প্রাণ। এখানেই তিনি আধুনিকতার গণ্ডি ছাড়িয়ে হয়েছেন মানুষের কবি। যে কবিতা আমাদের ভাবায়, জাগায়, আবার ভালোবাসতে শেখায় সেটাই শামসুর রাহমানের কবিতা। তিনি আধুনিকতার কবি নন শুধু, তিনি সময়কে জয় করে চিহ্নিত করেন প্রিয় স্বদেশভূমি।

এই জনপদের মানুষ, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির আচার-রীতি কবি শামসুর রাহমানের আরাধনা। ফুল-পাখি-পতঙ্গ, প্রাণী, গুলতা, বৃক্ষ, নদী, প্রান্তর, ফসলের ক্ষেত, গান, চাঁদ, সূর্য, তারা এসবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে চিনিয়েছেন কবি। আর এই ছন্দময় কবিতার পঙ্‌ক্তি দিয়ে তৈরি করেছেন সৌন্দর্যবোধ তথা জীবনবোধ। এই জীবনবোধের নাম দেশাত্মবোধ। 

নিঃসঙ্গ শেরপা, কবিতার ঘোড়সওয়ার, বাতিঘর, কবিতার বরপুত্রÑ এ রকম যে বিশেষণেই কবি শামসুর রাহমানকে দেখি না কেন মোদ্দাকথা একটাই, তা হচ্ছেÑ কবি শামসুর রাহমান কল্লোল যুগ পেরিয়ে আসা নতুন শতকের বাইনোকুলার; যেখানে চোখ রেখে পরবর্তী প্রজন্মের কবিরা খুঁজে দেখে বাংলা কবিতার গতিপথ।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা