ধ্রুব এষ
প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৫ ১০:১৮ এএম
জীবনানন্দ দাশ , ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯-২২ অক্টোবর ১৯৫৪। প্রতিকৃতি: অরণী হোসেন অথৈ
বাট আই কুড হ্যাভ টোল্ড ইউ, ভিনসেন্ট
দিস ওয়ার্ল্ড ওয়াজ নেভার মিনট ফর ওয়ান অ্যাজ বিউটিফুল অ্যাজ ইউ। Ñডন ম্যাকলিন
ভিনসেন্ট বা জীবনানন্দ।
দুজন মানুষ এত একরকম কেন?
নিপীড়িত, নিষ্পেষিত, নির্যাতিত, অপমানিত।
সমকালীন সুশীল বনেদিরা এত অবজ্ঞা তাদের করেছেন!
‘বুড়ো বেশ্যার ঢং দেখে বাঁচিনে।’ বুদ্ধদেব বসুর বিখ্যাত খেদোক্তি। জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুর পর, শনিবারের চিঠির সম্পাদক, জীবনানন্দ দাশের কঠোর ক্রিটিক, জীবনানন্দকে ‘জীবানন্দ’ লিখতেন, সেই সজনীকান্ত দাসের প্রতি। সঙ্গত কি? মুমূর্ষু জীবনানন্দর চিকিৎসা থেকে সৎকারের ব্যবস্থা পর্যন্ত সজনীকান্ত তার সাধ্যমতো সহায়তা করেছিলেন। ভূমেন্দ্র গুহ তার বইতে লিখেছেন।
সজনীকান্তর সহায়তা নিতে প্রথম কিছু সংকোচ ছিল ভূমেন্দ্রদের। সারাজীবন জীবনানন্দকে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ নিন্দায় জর্জরিত করেছেন, ইনি কি সহযোগিতা করবেন আদৌ? সজনীকান্ত ভূমেন্দ্রদের সংকোচ দূর করে দিয়েছিলেন। জীবনানন্দর সঙ্গে কি তার ব্যক্তিগত শত্রুতা নাকি? যা লিখেছেন সেটা সাহিত্যজাত। মানুষ জীবনানন্দর সুচিকিৎসার জন্য যা প্রয়োজন, যতটুকু প্রয়োজন তিনি করবেন। করেছিলেন। বনেদি সুশীল বুদ্ধদেব বসু তাকে ফোঁড়ন কেটে কি ‘নিও খনা’ হয়ে থাকলেনÑ তা তো না।
আচ্ছা, বুদ্ধদেব বসুরা কোথায় ছিলেন জীবনানন্দ যখন একটা সামান্য চাকরির জন্য কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় ফ্যা ফ্যা করে ঘুরছেন? বনেদি সুশীল আরও অনেক লেখক তো ছিলেন। কেউ কিছু করলেন না। ‘বুড়ো বেশ্যা’ কারা আদপে?
ভূমেন্দ্র গুহের লেখা থেকে সুধীন্দ্রনাথ দত্তকে উদ্ধৃত করি। জীবনানন্দ দাশ স্মারকগ্রন্থ করবেন, অধ্যাপক সুধীন্দ্রনাথ দত্তর কাছে একটা লেখা চাইতে গিয়েছিলেন তরুণ ভূমেন্দ্র।
অধ্যাপক কী বাণী দিলেন?
বললেন, ‘যে কবিই না, তাকে নিয়ে আবার স্মারকগ্রন্থ কীসের?’
এই সুধীন্দ্রনাথ দত্ত কী কবিতা লিখেছেন?
একটি কথার দ্বিধা থরো থরো থরো থরো থরো থরো...!
আবৃত্তিকাররা গলা কাঁপিয়ে পড়ে মরে যাক।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ‘কবিতার ক্লাস’ বই লিখেছেন। সেই বইতে কী লিখেছেন? কেউ কেউ কবি নয়, সকলেই কবি। তা ঠিক। আমার বন্ধু খোকনও কবি। কবিতা লিখেছে :
ধর তক্তা মার পেরেক
গরুর গাড়ির ভাঙা বেরেক
বুদ্ধদেব বসু কী করেছেন?
মৃত্যুর পর জীবনানন্দ যদি দেখতেন, আরও কত করুণ দশা তার হয়েছে! সাহিত্যের লাশকাটা ঘরের ডোমদের হাতে তিনি পড়েছেন। বনেদি সুশীল ডোম সব। তার পাণ্ডুলিপি তারা সংশোধন করে পুস্তক প্রকাশ করে দিয়েছেন। ‘রূপসী বাংলা’ নাম সেই পুস্তকের প্রস্তাবিত বিকল্প নাম ছিল ‘বাংলার ত্রস্ত নীলিমা।’ বইয়ের সম্পাদক বুদ্ধদেব বসু ‘রূপসী বাংলা’ নাম বহাল রাখলেন। কেন? বিশ্বকবি, বিদ্রোহী কবির পর ‘রূপসী বাংলার কবি’ বানিয়ে দিলেন বাংলার ত্রস্ত নীলিমার কবিকে। বইটার নাম যদি ‘বাংলার ত্রস্ত নীলিমা’ থাকত! ‘আবার আসিব ফিরে’ একবার সেই পরিপ্রেক্ষিত থেকে পড়ে দেখেন। কিংবা ‘এই পৃথিবীতে এক স্থান আছে সবচেয়ে সুন্দর করুণ।’ কী আশ্চর্য পাঠান্তর ঘটে যায় দেখেন। সাতচল্লিশে দেশ ভাগ হয়েছে সাতান্নয় ‘রূপসী বাংলা’ প্রকাশিত হয়েছে, দশ বছরে রঙ, রূপ কিছু কি বদলে গিয়েছিল বাংলার ত্রস্ত নীলিমার? এই ধরনের জবরদস্তি প্রচুর হয়েছে। এখনও হচ্ছে। হুবহু ভিনসেন্টের মতো। পুনর্জন্ম বলে কি কিছু সত্যি আছে? পৃথিবীর রূপ দেখতে ভিনসেন্ট আবার জন্ম নিয়েছিলেন এই বাংলায়? ভিনসেন্ট ভ্যান গগ। জীবনানন্দ দাশ জনমেও সেই নক্ষত্রের রাত ছিল তার সঙ্গে। কমলা রঙের রোদ, ঘাস ছিল পৃথিবীর কিমাকার ডাইনামোর। নাহলে দুই সময়ের দুজন মানুষ এত এক রকম কী করে হন?
কোনোভাবে যদি সম্ভব হতো, জীবনানন্দর একটা পোর্ট্রেট আঁকতেন ভিনসেন্ট! পৃথিবীর সেরা পোর্ট্রেট হতো সেটা।
জীবনানন্দ দাশের ডাক নাম মিলু। ‘আবার আসিব ফিরে’। মিলু, আপনি ফিরবেন? আবার জন্মাবেন?
বাট আই কুড হ্যাভ টোল্ড ইউ, মিলু
দিস ওয়ার্ল্ড ওয়াজ নেভার মিনট ফর ওয়ান অ্যাজ বিউটিফুল অ্যাজ ইউ।