সাক্ষাৎকার
প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০২৫ ১৮:৫৩ পিএম
হাসান হাফিজ। প্রতিকৃতি: খলিল রহমান
কবি, গদ্যকার, শিশুসাহিত্যিক ও সাংবাদিক হাসান হাফিজ। তার জন্ম ১৯৫৫ সালের ১৫ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের এলাহিনগর গ্রামে। সত্তর দশকের এই সাহিত্যিকের এবার ছিল ৭১ তম জন্মদিন। এ দিনকে কেন্দ্র করে লেখকের মুখোমুখি হয়েছিলেন ধানসিড়ির পক্ষ থেকে দীপান্ত রায়হান
দীপান্ত রায়হান : আপনার সাংবাদিকতার জীবন শুরু হয়েছিল দৈনিক বাংলা দিয়ে, ১৯৭৬ সালে। প্রায় পাঁচ দশক ধরে যুক্ত আছেন সাংবাদিকতার সঙ্গে। শুরুর সময়ের সাংবাদিকতার প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বর্তমান সময়ের সাংবাদিকতার পরিবেশের যে পার্থক্য, আপনার চোখে সেটা কেমন?
হাসান হাফিজ : এখন আমরা প্রযুক্তিগতভাবে অনেক উন্নতি করেছি, কিন্তু দুঃখজনকভাবে দায়িত্বশীলতা ও নৈতিকতার দিক থেকে পিছিয়ে পড়েছি। আগে সংবাদপত্রের সংখ্যা ছিল কম, টেলিভিশন বলতে ছিল কেবল বাংলাদেশ টেলিভিশন। এখন হাতে হাতে মোবাইল ফোন, সারা পৃথিবী আমাদের মুঠোয়। কিন্তু এর ফলে তথ্যের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে।
সব তথ্যই সঠিক নয়, কারণ এখন কেউই সেন্সরবিহীনভাবে যেকোনো কিছু লিখে দিতে পারে। এর ফলে বিভ্রান্তি ছড়ায়, যা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য বিপদ ডেকে আনে। সামাজিক বিভাজন, বিদ্বেষ, হিংসাÑ এসবের মূলেও এই দায়িত্বহীনতা কাজ করে।
আমাদের দেশে শিক্ষিতের হার কম, আর প্রকৃত শিক্ষিত মানুষ তো আরও কম। শিক্ষা কেবল সার্টিফিকেট নয়, মানুষের ভেতর মানবিকতা, ভদ্রতা ও সচেতনতা তৈরি করাই শিক্ষা। কিন্তু আমরা সেদিকে পিছিয়ে আছি। আজও দেশে হানাহানি, হিংসা, নারী নির্যাতন, দুর্নীতি, বৈষম্য, লুণ্ঠন চলছে।
তবু মানুষকে স্বপ্নবান হতে হবে, আশাবাদী হতে হবে। দায়িত্বশীলতা ও শুদ্ধতার চর্চা যদি আমরা পুনরায় জাগিয়ে তুলতে পারি, তাহলে মিডিয়ার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে মিডিয়াকে বিশাল দায়িত্ব নিতে হবে। মানুষকে সংগঠিত করতে হবে, জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। জুলাইয়ের চেতনা ও ছাত্রগণের অভ্যুত্থানের যে স্পিরিট, সেটাই আমাদের ধারণ করতে হবে।
আপনি তো অনেক শাসক ও রাষ্ট্রপ্রধান দেখেছেন। অতীত ও বর্তমানের বাস্তবতায় রাষ্ট্র কর্তৃক গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? এখনকার পরিস্থিতিতে একজন সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে কতটা নিরাপদ মনে করেন?
হাসান হাফিজ : সত্যিকার অর্থে সাংবাদিক কখনোই পুরোপুরি নিরাপদ নয়। শুধু সময়ের ধরনটা বদলায়, কিন্তু চাপের রূপ একই থাকে। সামরিক শাসন হোক বা গণতান্ত্রিক সরকার; সব সময় সাংবাদিকদের নানা চাপের মধ্যে কাজ করতে হয়। সাংবাদিক হত্যা হয়েছে, মব হামলার শিকার হয়েছি আমরাও।
সাংবাদিকতার কাজটাই ঝুঁকিপূর্ণ। সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে গিয়ে অনেক সময় জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিতে হয়। তবে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে, দেশপ্রেম ও কর্তব্যনিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করাই আমাদের কর্তব্য। সাংবাদিকতার মানে শুধু খবর পরিবেশন নয়Ñ এটা সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি অঙ্গীকারও বটে।
ইদানীং আমরা দেখছিÑ লেখক, কবি ও সংস্কৃতিকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামছেন না। কেন এমন হলো বলে আপনি মনে করেন?
হাসান হাফিজ : দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরশাসনের সময় যারা সুবিধাভোগী ছিলেন, তারা নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে গিয়ে অন্যায়ের সঙ্গেও আপস করেছেন। সুশীল সমাজের একটা অংশ নীরব থেকেছে, দায়িত্ব পালন করেনি। ফলে আমরা একধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটে পড়েছি।
তবু আমি আশাবাদীÑ সময়ের প্রয়োজনে আবারও ঐক্য গড়ে উঠবে। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মানুষ যদি একত্র হতে পারে, তাহলে অন্যায়, বৈষম্য ও অবিচারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব।
আপনারা চাঁদের হাট নামের একটি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন, যেটি তরুণদের দেশপ্রেম ও সংস্কৃতিচর্চায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। এখন সেই সংগঠনগুলোর কার্যক্রম প্রায় বিলুপ্ত। এর প্রভাব কীভাবে দেখছেন?
হাসান হাফিজ : এটা সমাজের বিবর্তনেরই ফল। এখন তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষে সবকিছু বদলে গেছে। বই পড়া, সিনেমা দেখাÑ সবই এখন মোবাইলের স্ক্রিনে। কিন্তু এই সুবিধার মধ্যেও একটা বড় ক্ষতি হয়েছেÑ আমরা বইবিমুখ জাতিতে পরিণত হচ্ছি।
পাঠচর্চা ছাড়া মানুষ আলোকিত হতে পারে না। মানবিক মূল্যবোধ গড়ে ওঠে বইয়ের মাধ্যমে। গার্ডিয়ানদের দায়িত্ব ছোটবেলা থেকেই শিশুদের বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করা। ভালো সাহিত্য না পড়লে তারা বিশ্বসাহিত্যের ঐশ্বর্য উপলব্ধি করতে পারবে না।
তরুণদের আমি দায়ী করব না। তারা আমাদের আশা জাগিয়েছে। সুশৃঙ্খলভাবে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন করেছে, অহিংসভাবে স্বৈরশাসনের পতন ঘটিয়েছে। এখন অভিভাবকদের দায়িত্ব, তাদের সঠিক পথে চালিত করা। ভালো বই, ভালো সিনেমা, ভালো সঙ্গই পারে নতুন প্রজন্মকে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে।
আপনার শৈশব বা কৈশোরে এমন কয়েকটি বইয়ের কথা বলুন, যেগুলো আপনাকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল।
হাসান হাফিজ : অনেক বই-ই প্রভাব ফেলেছে। ছোটবেলায় পড়েছি শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, রূপকথার বই। বিশেষ করে ‘মনির পাহাড়’ সোভিয়েত ইউনিয়নের অনুবাদ গল্প। এটি আমাকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিল।
রুশ সাহিত্য খুব সমৃদ্ধ গোরকি, তলস্তয়, দস্তয়েভস্কির বইগুলো পড়েছি। এসব বই আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। শিশু বয়সে ভালো বই না পড়লে বড় বয়সে সেই প্রভাব আর আসে না। তাই ছোটবেলা থেকেই পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
৫ আগস্টের পর যে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে গেল, তার পর আপনি বাংলাদেশ প্রেস ক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন। সাংবাদিক সমাজ নানা সংকটে আছে। স্বল্প বেতন, পেশাগত অনিশ্চয়তা, সামাজিক অস্বীকৃতি। এই বাস্তবতায় আপনার পরিকল্পনা কী?
হাসান হাফিজ : জাতীয় প্রেস ক্লাব সরাসরি বেতন বা চাকরির বিষয়ে কাজ করে না। এটা মূলত সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক প্লাটফর্ম। তবে মিডিয়া কমিশন ও সংস্কার কমিশন যে সুপারিশ দিয়েছে, তা নতুন সরকার বিবেচনা করবে বলে আশা করি।
একই সঙ্গে আমাদের স্বীকার করতে হবে সাংবাদিকতার নামে অনেক ক্ষেত্রে অসাংবাদিকতাও হচ্ছে। দায়িত্বহীনতা, যোগ্যতার অবমূল্যায়ন, অপতথ্য প্রচারÑ এসব রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
আমরা চাই, সাংবাদিক সমাজ যেন ঐক্যবদ্ধ হয়, মানবিক ও গণমুখী পরিবেশ গড়ে তোলে। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সাংবাদিকদেরও ভূমিকা রাখতে হবেÑ আস্থা, শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে।
আপনার প্রথম কবিতা প্রকাশের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাই।
হাসান হাফিজ : আমি তখন স্কুলে পড়ি, ক্লাস এইটে। গ্রাম থেকে ইত্তেফাকের ‘কচি কাঁচার আসর’-এ একটা কবিতা পাঠিয়েছিলাম। রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই সেটা ছেপেছিলেন। ভাবুন তো, গ্রাম থেকে লেখা পাঠিয়ে ঢাকায় ছাপা হওয়া, সেটা কি আনন্দের ব্যাপার!
বন্ধুদের দেখিয়েছি, গর্ববোধ করেছি। সেই উত্তেজনা আজও মনে আছে। তখন গ্রামে বিদ্যুৎও ছিল না, ডাকযোগেই যোগাযোগ হতো। সেই ছোট্ট বয়সের আনন্দই আমাকে লেখার জগতে টেনে এনেছে।
এখন আমার বয়স সত্তরের বেশি, দুই শতাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে। তবুও লেখার আনন্দ আগের মতোই রয়ে গেছে। আমি যদি একজন মানুষকেও অনুপ্রাণিত করতে পারি, তার মনে শুভবোধ জাগাতে পারি; তাহলে সেটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
আপনি একাধারে কবি, শিশুসাহিত্যিক ও সাংবাদিক। এই তিনটি পরিচয়ের মধ্যে কোনটি আপনাকে সবচেয়ে বেশি সংজ্ঞায়িত করে?
হাসান হাফিজ : আসলে তিনটি পরিচয়ই একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সাংবাদিকতা আমাকে দিয়েছে বাস্তবতার মাটি, শিশুসাহিত্য দিয়েছে সরলতার আলো, আর কবিতা দিয়েছে কল্পনার ডানা। আমি বিশ্বাস করি, একজন ভালো সাংবাদিকের মধ্যে কবি থাকা দরকার, আর একজন শিশুসাহিত্যিকের মধ্যে থাকা দরকার সাংবাদিকের মতো তীক্ষ্ন পর্যবেক্ষণশক্তি।
তবে যদি একটিকে বেছে নিতে হয়, আমি বলব আমি মূলত একজন কবি। কারণ কবিতার ভেতরেই আমার চিন্তার জন্ম, আমার ভাষার স্রোত আর আমার মানবিকতার উৎস।
বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যের বর্তমান ধারা আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
হাসান হাফিজ : আমাদের শিশুসাহিত্য একসময় খুব সমৃদ্ধ ছিল। এখন বই প্রকাশের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু মানের দিক থেকে কিছুটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
এখনকার শিশুসাহিত্য অনেক সময় অতিমাত্রায় শিক্ষণমূলক হয়ে যায়। তাতে শিশুর আনন্দ, বিস্ময়, কল্পনা অনুপস্থিত থাকে। শিশুর কল্পনাশক্তিকে জাগিয়ে তুলতে হবে, তার পৃথিবীকে বোঝার আনন্দ দিতে হবে।
শিশুদের বইতে উপদেশ নয়, রূপকথা চাই; ভয় নয়, কৌতূহল চাই। শিশুকে মানুষ বানাতে হলে তার ভেতরে বিস্ময়ের বীজ বপন করতে হবে।
আপনার কবিতায় প্রায়ই দেখা যায় সমাজ, সময় ও মানুষ নিয়ে এক ধরনের আক্ষেপ এবং আশা মিলেমিশে থাকে। কবিতা কি আপনার কাছে প্রতিবাদের ভাষাও?
হাসান হাফিজ : অবশ্যই। কবিতা কেবল সৌন্দর্যের প্রকাশ নয়, এটি প্রতিবাদেরও ভাষা।
আমি বিশ্বাস করি, সত্যিকারের কবি কখনও নীরব থাকতে পারে না। সমাজে অন্যায়, বৈষম্য বা অন্ধকার দেখলে তার বিবেক নাড়া দেবেই।
কবিতা মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়, ঘুমন্ত মানবিকতাকে জাগায়। তাই আমি কবিতাকে দেখি একধরনের সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে।
সাংবাদিকতা ও সাহিত্যÑ দুই ক্ষেত্রেই আপনি দীর্ঘদিন কাজ করছেন। এই দুইয়ের মধ্যে সম্পর্কটা আপনি কীভাবে দেখেন?
হাসান হাফিজ : সাংবাদিকতা হচ্ছে সময়ের দলিল, আর সাহিত্য হচ্ছে সময়ের আত্মা।
সাংবাদিকতা দিনে দিনে ইতিহাস রচনা করে, সাহিত্য তা সময় পেরিয়ে চিরকালীন করে তোলে।
আমি সব সময় বলি, একজন সাংবাদিক যদি সাহিত্য না বোঝে, তবে তার সংবাদে প্রাণ থাকে না; আর একজন সাহিত্যিক যদি সমাজ না বোঝে, তবে তার লেখায় বাস্তবতা থাকে না।
তাই আমি দুই ক্ষেত্রকেই একে অপরের পরিপূরক মনে করি।
শেষ প্রশ্ন: এই দীর্ঘ সাহিত্য ও সাংবাদিকতার জীবনের দিকে ফিরে তাকালে, আপনার সবচেয়ে বড় তৃপ্তি আর অপূর্ণতা কী?
হাসান হাফিজ : তৃপ্তি এই যে, আমি এখনও লিখতে পারছি, নতুন প্রজন্মের সঙ্গে কথা বলতে পারছি।
আমার কবিতা বা শিশুসাহিত্য যদি কোনো পাঠকের মনে আলোর রেখা ফেলতে পারেÑ এটাই আমার সাফল্য।
অপূর্ণতা একটাইÑ যতটা দিতে চেয়েছি, ততটা দিতে পারিনি।