মাসুদুজ্জামান
প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০২৫ ১৮:১২ পিএম
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই। প্রতিকৃতি : জয়ন্ত সরকার
বিশ্বজুড়েই নোবেল সাহিত্য পুরস্কার নিয়ে সাহিত্যের পাঠকদের মধ্যে এক ধরনের কৌতূহল আছে। এবারও এই কৌতূহল দেখা গেছে। ইউরো-মার্কিন পত্রপত্রিকাগুলোতে এ নিয়ে বেশ জল্পনাকল্পনা ছিল। কে পেতে পারেন, তাই নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে নানান লেখা। বাংলাদেশের পাঠকদের মধ্যেও নোবেল সাহিত্য পুরস্কার নিয়ে মন্তব্য ও আলোচনা দেখা গেছে সোশ্যাল মিডিয়াতে। সালমান রুশদি থেকে হারুকি মুরাকামি, এ রকম অনেকের কথাই বলা হচ্ছিল। বাংলাদেশের পাঠকদের কাছেও এরা দুজন বেশ পরিচিত। কিন্তু ইউরোপে বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাঠক ও সমালোচকদের কাছে নোবেল প্রাপ্তির দিক থেকে কে এগিয়ে, সে খবর এখানে খুব একটা পৌঁছায় না। ফলে ওই অঞ্চলের লেখকদের নিয়ে বিশেষ কোনো আলোচনা হতে দেখা যায়নি। তবে বাংলাদেশের পাঠক ও পত্রপত্রিকার চোখ ছিল নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের দিকে। সব জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে এবার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন হাঙ্গেরির কথাসাহিত্যিক ও লেখক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই।
নোবেল পুরস্কার কমিটি তাকে পুরস্কার দিতে গিয়ে যে প্রশংসাবাচক বিবৃতি দিয়েছে তাতে বলেছে, ক্রাসনাহোরকাই এমন একজন লেখক ‘যার অবশ্যম্ভাবী ও দূরদর্শী সাহিত্যকর্ম মহাপ্রলয়ঙ্করী ধ্বংস ও ভয়ের মধ্যেও শিল্পের শক্তিকে সমুন্নত রাখে।’
ক্রাসনাহোরকাইয়ের রচনা নানা দিক থেকে অভিনব ও গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমে তার এই পুরস্কার পাওয়া নিয়ে তেমন কোনো বিতর্ক হয়নি। পুরস্কার ঘোষণার আগে থেকেই পাঠক ও সমালোচকরা ভবিষ্যদ্বাণী করছিলেন যে, অন্য আরও দু-একজনের মতো ক্রাসনাহোরকাইও এবার নোবেল পুরস্কার পেতে পারেন। ঘটলও তাই। গত কয়েক বছর ধরে তার লেখালেখির সূত্রে তিনি পুরস্কারটা পেতে পারেন, এমন কথা বলা হচ্ছিল বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়।
ক্রাসনাহোরকাই লেখালেখি করেন তার হাঙ্গেরীয় মাতৃভাষায়। সাহিত্যে আবির্ভাব ঘটে ১৯৮৫ সালে। সে বছর প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস ‘সাতানট্যাঙ্গো’। সহজ বাংলায় বললে শয়তানের ট্যাঙ্গো নাচ। এই উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র পরিচালক বেলা টার একই নামে ৭ ঘণ্টার একটা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। চলচ্চিত্রটি এর গল্প ও নির্মাণের জন্য প্রশংসিত হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পশ্চিমের পাঠকরা সর্বপ্রথম তার সাহিত্য সম্পর্কে অবহিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
সমালোচকেরা উল্লেখ করেছেন, উপন্যাসটি উত্তর-আধুনিকতাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা। এর বর্ণনা কাঠামোতে রয়েছে ট্যাঙ্গো নৃত্যের মতো ছয়টি ধাপ। ট্যাঙ্গো নাচের ছয় ধাপে একবার এগিয়ে যেতে হয়, আরেক ছয় ধাপে পিছিয়ে আসতে হয়। মাঝখানে থাকে বিন্দু বা শূন্যরেখা। পা ও শরীরের গতি এভাবেই ব্যবহার করতে হয় এই নাচে। ক্রাসনাহোরকাইও এই রীতির অনুসরণে লিখেছেন সাতানট্যাঙ্গো শীর্ষক উপন্যাস। এর প্রতিটি অধ্যায়ে আছে এক-একটি দীর্ঘ অনুচ্ছেদ। এই অনুচ্ছেদগুলোর গদ্যে ভাষিক বিরতি নেই; অর্থাৎ পূর্ণ যতিচিহ্ন নেই। দীর্ঘ বাক্যের দ্বারা অনুচ্ছেদগুলো গঠিত।
গল্পের বেশিরভাগ ঘটনা ঘটে হাঙ্গেরির একটা জরাজীর্ণ গ্রামে বা এস্টেটে। জায়গাটি অনামা একটি শহরের কাছে অবস্থিত। এর বাসিন্দারা বাইরের পৃথিবী থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন।
সাতানট্যাঙ্গোর প্রধান চরিত্র ইরিমিয়াস। সে একজন প্রতারক। একজন ত্রাণকর্তার ছদ্মবেশে তিনি ওই গ্রামে আসেন এবং বাসিন্দাদের কষ্টার্জিত সমস্ত অর্থ তাকে দিতে বাধ্য করেন। তিনি তাদের কাছের অন্য একটি পরিত্যক্ত গ্রামে যেতে রাজি করান। এর পর তিনি তাদের সেই শহরে নিয়ে আসেন এবং সেখান থেকে তাদের সারা দেশে ছড়িয়ে দেন।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসে জ্যাকব সিলভারম্যান ২০১২ সালে বইটির একটা সমালোচনা লিখেছিলেন। তিনি উপন্যাসটি মানুষের বেঁচে থাকার তীব্র উদ্বেগ, সময়ের স্থির হয়ে থাকা, মানবিক সংকট, ক্ষয় ও সর্বনাশের অনুভূতি জাগ্রত করে বলে উল্লেখ করেছেন। গল্পটির দৃষ্টিকোণ এবং সময়কে এড়িয়ে আখ্যানকে অস্পষ্ট করে তোলা হয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ানে থিও টেইট উপন্যাসটির প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন উপন্যাসটি ‘স্বতন্ত্র, আকর্ষণীয় দৃষ্টিভঙ্গির গভীর অনুভবের আখ্যান।’ তিনি এই উপন্যাসে লক্ষ্য করেছেন ফ্রাঞ্জ কাফকা এবং স্যামুয়েল বেকেটের প্রভাব।
২০১৩ সালে ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে উপন্যাসটি ২০১৫ সালে ম্যান বুকার আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করে। এই উপন্যাসের সূত্রে তিনি বিশ্বপরিচিতি অর্জন করেন।
ক্রাসনাহোরকাইয়ের পরবর্তী প্রকাশিত উপন্যাস দ্য মেলানকলি অব রেজিস্ট্যান্স। উপন্যাসটি হাঙ্গেরীয় ভাষায় লেখা, প্রকাশিত হয় ১৯৮৯ সালে। এটি ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে বেরয় ১৯৯৮ সালে। অনুবাদক ছিলেন বিশিষ্ট কবি ও অনুবাদক জর্জ সিজার্টেস।
উপন্যাসটি একটি অস্থির শহরে স্থাপিত রহস্যময় সার্কাসের গল্প নিয়ে লেখা। এই সার্কাসের সঙ্গে ছিল একটা তিমি। কাহিনীটা অনেকটা হরর মুভির মতো। মহাবিপর্যয়কর পরিবেশে গল্পটি এগোতে থাকে। সহিংসতা, অরাজকতার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটেছে উপন্যাসটিতে। এর কেন্দ্রে রয়েছে ভালুস্কা নামের একটি চরিত্র, যে অরাজকতার মধ্যেও শৃঙ্খলার কথা বললেও তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বেলা টার এই উপন্যাসকে নিয়ে যে মুভি নির্মাণ করেন, ক্রাসনাহোরকাই তার চিত্রনাট্য লিখেছিলেন।
উপন্যাসটি সামাজিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হওয়া একটা সমাজের রাজনৈতিক রূপক। নৈরাজ্য দমন করতে সেনাবাহিনীও সফল হয়নি। হাঙ্গেরির ওপর চাপিয়ে দেওয়া সর্বগ্রাসী রাজনৈতিক মতাদর্শের চিত্র হিসেবে উপন্যাসটিকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। এই কাহিনির খলনায়ক মিসেস এজটারকে সর্বগ্রাসী মতাদর্শের সমালোচনা হিসেবে পড়া যায়।
২০১১ সালে দ্য নিউইয়র্কারে জেমস উড লিখেছিলেন : ‘দ্য মেলানকোলি অফ রেজিস্ট্যান্স হলো সর্বনাশের একটি কমেডি। একজন ঈশ্বর আছেন এখানে। কিন্তু তিনি শুধু ব্যর্থই হননি বরং পরীক্ষিতও হননি। এতে ঐতিহ্যবাহী সামাজিক উপন্যাসের উপাদান রয়েছে।’ উড আরও বলেছিলেন, ‘দ্য মেলানকোলি অব রেজিস্ট্যান্স একটি হতাশাবাদী বই। বিপ্লবের সম্ভাবনা সম্পর্কে বিদ্রূপাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে লেখা। কমেডির আনন্দ এবং প্রতিরোধ দুই-ই আছে এই উপন্যাসে।’ তিনশ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসটি লেখা হয়েছে একটিমাত্র বাক্যে। বিরামচিহ্নিত চেতনাস্রোতের বিস্ময়কর প্রকাশ ঘটেছে উপন্যাসটিতে।
‘যুদ্ধ এবং যুদ্ধ’ উপন্যাসটি হাঙ্গেরীয় ভাষায় ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত হয়। এটি একজন হাঙ্গেরীয় ব্যক্তিমানুষের গল্প, যে গল্পে একটি লোক রহস্যময় একটা পাণ্ডুলিপির প্রতি আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। নিউইয়র্ক সিটিতে ভ্রমণ করার সময় সে এই পাণ্ডুলিপিটি ইন্টারনেটে পোস্ট করার সিদ্ধান্ত নেয়। জর্জ সির্তেসের ইংরেজি অনুবাদে ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার নামে উপন্যাসটি ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয়।
উপন্যাসটি সম্পর্কে ২০১১ সালে দ্য নিউইয়র্কারে জেমস উড লিখেছিলেন : ‘এতে স্থান পেয়েছে সবচেয়ে গভীর অস্বস্তিকর কিছু ঘটনা। একজন পাঠক হিসেবে উপন্যাসটি সম্পর্কে এই হচ্ছে আমার অভিজ্ঞতা। উপন্যাসের শেষে, আমার মনে হয়েছিল, সাহিত্য আমাকে ‘যুদ্ধ আর যুদ্ধ’-এর দ্বারা আক্রান্ত হওয়া মনের কাছাকাছি পৌঁছে দিয়েছে। ভয়াবহ যন্ত্রণায় আক্রান্ত হয়েছি।’
ক্রাসনাহোরকাইয়ের পরবর্তী উপন্যাস ‘সেইয়োবো দেয়ার বিলো’ প্রকাশিত হয় ২০০৮ সালে। এই আখ্যানে বিভিন্ন সময় এবং স্থানের শিল্পীদের কাজের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। এতে পাঠক খুঁজে পাবেন কিছু ঐতিহাসিক ব্যক্তি এবং কাল্পনিক ঘটনাকে। প্রাচ্যের বৌদ্ধ দর্শন এবং এশিয়ার শিল্প ভাবনার কথা রয়েছে এই উপন্যাসে।
উপন্যাসের একটি অধ্যায়ে জাপানি দেবী সেইয়োবোর আবির্ভাব ঘটে। সতেরটি অধ্যায়ের মধ্যে ক্রম হিসেবে বিষয়ভিত্তিক যোগসূত্র দেখা যায়।
২০১৪ সালে ইংরেজিতে উপন্যাসটি অনুবাদ করেন ওত্তিলিয়ে মুলজেট। অনুবাদগ্রন্থ হিসেবে পুরস্কারও অর্জন করে।
ঔপন্যাসিক এতে দীর্ঘ বাক্য ব্যবহার করেছেন। বাক্যগুলো পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা অবিচ্ছিন্নভাবে বিস্তৃত। প্রতিটি পর্ব মাত্র কয়েকটি বাক্যে সীমাবদ্ধ। কিছু অধ্যায়ের পরিসর বেশ ছোট। আপাতদৃষ্টিতে গল্প থেকে বিচ্ছিন্ন। উদাহরণস্বরূপ, দ্বিতীয় অধ্যায়টি ইতালীয় ভাষায় সম্পূর্ণ ফাঁকা একটা ক্রসওয়ার্ড ধাঁধা দিয়ে শুরু হয়, এর পরে একটি অস্ট্রেলীয় ত্বকের যত্ন নেওয়া কোম্পানির ওয়েবসাইটের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। আছে বুদ্ধের মূর্তি সম্পর্কে একটি অধ্যায়। অধ্যায়টি শুরু হয় ‘আমাদের প্রভু, যিশুখ্রিস্টের বৃহত্তর মহিমার জন্য’, এ রকম বাক্য দিয়ে।
২০১৩ সালে সমালোচক জেসন ফারাগো উপন্যাসটি সম্পর্কে লিখেছিলেন : ‘এই গল্পগুলির বিস্তৃতি অসাধারণ, কিন্তু লেখক তার পাণ্ডিত্যকে লঘুভাবে ব্যবহার করেন। উপন্যাসটি ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়, পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লেখা হয় যতক্ষণ না প্রতিটি অধ্যায় প্রায় অসহনীয় তীব্রতা অর্জন করে। এই উপন্যাস থেকে বোঝা যায়, ক্রাসনাহোরকাই সমকালীন সাহিত্যের অন্যতম সাহসী এবং দৃঢ়চেতা লেখক। এই বইটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী। মহান শিল্পের দাবি মিটিয়েছে উপন্যাসটি। যদি পাঠক এটি পড়বার জন্য তৈরি রাখেন তাহলে শ্রমসাধ্য সৌন্দর্যের উপলব্ধি ঘটবে।’
একই বছর স্কট এসপোসিতো দ্য ওয়াশিংটন পোস্টে বইটির পর্যালোচনা করে লিখেছিলেন : আমরা দেখতে পাই যে ক্রাসনাহোরকাইয়ের প্রাথমিক উপন্যাসগুলোর জমাট অন্ধকার মহান শিল্পের ছায়ায় এই পর্বে পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে। বইটি এমন এক সময়ে মহান আধ্যাত্মিক শিল্পকর্ম হয়ে উঠল যখন আমাদের পৃথিবী স্পষ্টতই ক্ষমা প্রার্থনা, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির প্রতি ঝুঁকে পড়ে মোহিত। এসপোসিতো আরও বলেন এখানে উন্মত্ত মনোলোগ থেকে শুরু করে শান্ত চিন্তাভাবনা, বিচ্ছিন্ন তৃতীয় ব্যক্তির চতুর ব্যবহার, এমনকি স্পেনের আলহামরা প্রাসাদের ওপর একটি প্রবন্ধমূলক অধ্যায় রয়েছে। এর প্রতিটি অংশ সম্পূর্ণ এবং নিজস্ব শর্তে সন্তোষজনক।
লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের ‘ব্যারন হেনখেইম হোমকামিং’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ২০১৬ সালে। যথারীতি হাঙ্গেরীয় ভাষায় লেখা। প্রকাশের পরে এটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন ওত্তিলি মুলজেট। অনূদিত উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ২০১৯ সালে। উপন্যাসটিতে লেখক একটি পরীক্ষামূলক কাঠামো ব্যবহার করেছেন। পূর্ণপৃষ্ঠা দীর্ঘ বাক্য এবং খণ্ডিত না করে অনুচ্ছেদের ব্যবহার ঘটিয়েছেন ক্রাসনাহোরকাই।
মুলজেটের অনুবাদটি অনুবাদ সাহিত্যের জন্য ২০১৯ সালে ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড পুরস্কার জেতে। উপন্যাসটি ২০১৭ সালে এগন পুরস্কারও জিতেছে।
গল্পটি শুরু হয় একজন সংগীত পরিচালকের একটি দার্শনিক মনোলগ দিয়ে। গল্পের বাকি অংশের সঙ্গে, যা সরাসরি সম্পর্কিত নয়।
৬৪ বছর বয়সি হাঙ্গেরীয় অভিজাত ব্যারন বেলা হেনখেইম একজন সরল ও অদ্ভুত প্রকৃতির মানুষ। আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসে জুয়ার এক বিশাল ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে তার শহরে ফিরে আসেন। এতদিন তিনি নির্বাসনে ছিলেন। তিনি আশা করেন তিনি তার শৈশবের প্রণয়ী মারিকার সঙ্গে পুনরায় মিলিত হতে পারবেন। তবে তার আগমনের কথা শুনে শহরবাসী বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তার প্রচুর সম্পদ রয়েছে এবং তিনি তা শহরে দান করবেন।
একটি গুরুত্বপূর্ণ উপপ্লট আছে একজন অধ্যাপককে কেন্দ্র করে, যিনি দর্শনে আগ্রহী এক সন্ন্যাসী। তিনি একজন নব্য-নাৎসি বাইকার গ্যাংয়ের সদস্যকে হত্যা করে পালিয়ে যান। আরেকটি উপপ্লট আছে শহরের রাজনীতি এবং একটি স্থানীয় সংবাদপত্র নিয়ে।
একটি পত্রিকার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ক্রাসনাহোরকাই হেনখেইম উপন্যাসটি সম্পর্কে বলেছিলেন এটি তার পূর্ববর্তী উপন্যাসগুলোর প্রলম্বিত গানের সুর। প্যারিস রিভিউয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে এর ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন : ‘আমি হাজার বার বলেছি, আমি সবসময় কেবল একটি বই লিখতে চেয়েছি। আমি প্রথম বই নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলাম না, সে কারণে দ্বিতীয়টি লিখেছিলাম, দ্বিতীয়টিতেও আমি সন্তুষ্ট ছিলাম না, তাই তৃতীয়টি লিখেছিলাম, ইত্যাদি। এখন, ব্যারনের সঙ্গে আমি যে একটি গল্প বলতে চেয়েছিলাম তা শেষ করতে পারি। এই উপন্যাসের মাধ্যমে আমি প্রমাণ করতে পারি, আমি সত্যিই জীবনে কেবল একটি বই লিখেছি। সব মিলিয়ে আমার একটাই বই। সাতানট্যাঙ্গো, দ্য মেলানকলি রেজিট্যান্স এবং ওয়ার অ্যান্ড ওয়ারের মতো ব্যারনের গল্পটিও হাঙ্গেরির একটি ছোট্ট শহরে ঘটেছে। প্রতিফলিত করছে জিউলাকে।
এই উপন্যাসটির ভাষাভঙ্গিও পরীক্ষামূলক কাঠামো ব্যবহার করে রচিত। এখানেও পূর্ণ-পৃষ্ঠা দীর্ঘবাক্য এবং অখণ্ড অনুচ্ছেদের ব্যবহার ঘটেছে।
উপন্যাসটি ২০১৯ সালে ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়। অনুবাদক যথারীতি ওত্তিলি মুলজেট।
একজন সমালোচক সাতানট্যাঙ্গো উপন্যাসের সঙ্গে এই উপন্যাসটি তুলনা করে লিখেছেন, ‘এই উপন্যাসের ঘূর্ণি দস্তইয়েফস্কির গদ্যরীতির সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে। এখানে তার গদ্যরীতি শীর্ষ স্পর্শ করেছে। যথারীতি আছে অন্তহীন প্রবহমান বাক্য এবং অবিচ্ছিন্ন অনুচ্ছেদের সঙ্গে অভ্যস্ত পাঠকদের জন্য চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এই প্রচেষ্টাটি অনবদ্য।
প্যারিস রিভিউতে ডাস্টিন ইলিংওয়ার্থ উপন্যাসটির প্রশংসা করে লিখেছেন, ‘ব্যারন হেনখেইম হোমকামিং সমসাময়িক সাহিত্যের অন্যতম সেরা রচনা। ক্রাসনাহোরকাইয়ের টেট্রালজি। উপযুক্ত শিলালিপি। এখনই আমাদের সেরা জীবিত লেখকদের পঙ্ক্তিতে তার স্থান নির্দিষ্ট হয়ে গেছে।
ওয়ার্ল্ড লিটারেচার টুডেতে অ্যান্ড্রু সিঙ্গার উপন্যাসটির একটি মিশ্র পর্যালোচনা হাজির করেন। তিনি এর গদ্য কাঠামোর সমালোচনা করেছেন এবং উপসংহারে বলেছেন, ‘এই রচনায়, আশ্চর্যজনকভাবে জ্ঞানের শিক্ষা লুকিয়ে আছে; সমগ্র রচনাটি অলস ভঙ্গিতে লেখা বলে মনে হচ্ছে। অনেকটা খসড়ার মতো।’
‘আকাশের নিচে ধ্বংস ও দুঃখ’, বাংলায় ক্রাসনাহোরকাইয়ের পঞ্চম উপন্যাসটির নামের বঙ্গানুবাদ হতে পারে এমন। হাঙ্গেরীয় ভাষায় লেখা ‘ডেস্ট্রাকশন অ্যান্ড সরো বিনীথ দ্য হেভেনস্’ হাঙ্গেরীয় ভাষায় প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। ইংরেজিতে ওত্তিলি মুলজেটের অনুবাদে প্রকাশিত হয় ২০১৬ সালে।
এই উপন্যাসের কথক লাজলো স্টেইন। ধ্রুপদি চীনা সংস্কৃতির উদাহরণ খুঁজতে এবং সমসাময়িক চীনা সমাজ কীভাবে সংগীতের সঙ্গে সম্পর্কিত তা বোঝার জন্য চীন ভ্রমণ করেন।
লস অ্যাঞ্জেলেস রিভিউ অব বুকস পত্রিকায় মাইকেল লাপয়েন্টে লিখেছেন, মিশেল ডব্লিউ. জি. সেবাল্ডের লেখার ভস্ম ক্রাসনাহোরকাইকেও আকর্ষণ করে। অপ্রত্যাশিতভাবে মাইকেল হুয়েলবেকের প্রভাবও লক্ষ্য করা যাবে। মানব অভিজ্ঞতার পবিত্র রাজ্যে পরিভ্রমণ করেছেন এর লেখক। পাবলিশার্স উইকলি বইটিকে ‘মাঝে মাঝে হতাশাজনক কিন্তু প্রায়শই চমকপ্রদ ভ্রমণধর্মী স্মৃতিকথা’ বলে অভিহিত করেছে।
এই হচ্ছে লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের লেখালেখির বিবরণ। খুবই উচ্চাভিলাষী, চিত্তাকর্ষক ও অভিনব। বিশেষ করে তার বর্ণনারীতি, অধ্যায় বিন্যাস, অথবা সামগ্রিক ভাষিক নির্মাণ নিঃসন্দেহে আলাদা। প্রথাগত রীতিকে তিনি একেবারেই গ্রহণ করেননি। এ কারণেই বলা যায়, ইউরো-মার্কিন সাহিত্য ভুবনে তিনি স্বতন্ত্র একজন কথাসাহিত্যিক হিসেবে সমাদৃত হয়ে থাকেন। এরই পুরস্কার হিসেবে তিনি এবার নোবেল জয় করলেন।