সাকিরা পারভীন
প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৫ ১৫:১৩ পিএম
চিত্রকর্ম: অরণী হোসেন অথৈ
বছরে এক জোড়া চামড়ার জুতা পাওয়া যেত। বাটার দোকান থেকে অধিকাংশ সময় মা বাকিতে কিনে দিতেন। দাম কত কম আর কতদিন টিকবে সেটার ওপর নির্ভর করত শান্তি। আমি অযথা অশান্তির কারণ হতাম বেশিরভাগ। এত সাধ করে কেনা জুতার ফিতে ছিঁড়ে যেত না হয় নতুন জামাটা পরার পরপরই কী বিচিত্রভাবে কড়াৎ করে ছিঁড়ে যেত। কোনো মায়া-দয়া নেই। চিনির বয়াম বের করতে গেলে বয়াম ভেঙে চিনি ছড়িয়ে যেত মেঝেময়; মা কিছু বলত না। পিঁপড়েদের খুব শান্তি হতো।
খুব ছোট্টকাল থেকে বাজারে যেতাম কেনাকাটা করতে। একদিন লক্ষ করলাম এক মুদি দোকানের সহকারী নাদুসনুদুস ছেলেটা যে টাকার জিনিস কিনি ভাঙা-ভাঙতি করে সেই টাকাই ফেরত দেয়। ছেলেটার শান্তি লাগত নিশ্চয়ই। আমার অশান্তি ...কী রে বাবা টাকা নেয় না ক্যান? নিশ্চয়ই কোনো ঘটনা আছে। গাছে পেয়ারা পাকা পাকা ভাব হলে একটা কামড় বসিয়ে দিয়ে আসতাম, যাহ্ বাবা বাদুড়ের অশান্তি বাড়ত। অঙ্কের খাতায় ছড়া কবিতা ছবি একে চুরি করে ছিঁড়ে ফেলতাম। কিছুদিন বাদে দেখা যেত মলাট ছাড়া খাতার ভেতরের অবস্থা নাজেহাল।
একবার হয়েছে কী। স্কুলে পরিদর্শক আসবেন। আমি গার্লস গাইডের লিডার। বিরাট তোড়জোড়, দৌড়ঝাঁপ...সবাইকে সমান করে স্বাগত জানাতে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছি ইত্যাদি। এর মাঝে কী কাজে একটা দৌড় দিলাম মাঠের মাঝখানে গত রাত্রের লুকানো বৃষ্টির কারসাজি...আমি চিৎপটাং...। হা হা হাসির রোল...কিচ্ছু হয়নি যেন এমন ভাব নিয়ে উঠে দৌড় দিলাম অ্যান্ড আবারও বল চলে গেলে মাঠের বাইরে আমি আবারও পড়ে গেলাম… ধুর...সবাই কত হাসল, ওদের কেমন শান্তি হলো আর আমি? আজও সেই ধবধবে শুভ্র সাদা জামায় কাদা মাখা দৌড় অপার আনন্দ দিয়েই চলেছে।
আরো আছে; দর্জি কাকুর দোকান থেকে টুকরো ছাট কাপড় মাথায় করে বেধে আনতাম। মুরগি পাখি গরু মানুষ রান্না বাড়ি সব কাজ শেষ হবার পর রাত জেগে চলত মায়ের সেলাই মেশিন। সেইসব টুকরো রঙিন কাপর জোড়া দিয়ে দিয়ে ছোট্ট ছোট্ট হাফপ্যান্ট, ফ্রগ কত কী বানাত মা। সবকিছুর মজুরি দশ টাকা। ওই নতুন ফ্রগটি কম দামে কিনে নিয়ে যেতেন কোনো না কোনো বাবা তার সন্তানের গায়ে ঈদের আনন্দ তুলে দিতে। আহা তাতে তিন দিকের শান্তি হতো। আব্বার বেতনের সঙ্গে যুক্ত হতো মায়ের আলাদা কিছু অর্থ, যাতে কেনা হতো আমাদের ছোট ছোট সুখ। দর্জি কাকু ফেলনা কাপড়গুলো থেকে পেতেন বাড়তি কিছু রোজগার আর ওই যে ছোট্ট মনিদের ফোকলা দাতের হাসি; মা-বাবার চোখে আনন্দের অশ্রুধারা।
সেইসব সুখ শান্তি পেরিয়ে আমরা বড় হয়ে গেলাম। আজ আমার এক ছোট ভাই তার এডিকশন থেকে মুক্ত থাকার এগারো বছর উদযাপন করছে। সেদিন বলল, জানেন আপা আমি তো এক ঘণ্টা পর পর নেশা করতাম। বিচিত্র নেশা… সেসবের নাম ঠিকানা বলল গড়গড় করে আর বলল এগারো বছর ধরে নেশাক্রান্ত মানুষদের ভালো রাখাটাই আমার প্রধান চ্যালেঞ্জ। কারণ এই কাজটা করে ও শান্তি পায়। ওর নাম সহিল রনি। রনি বলল, কেউ বুঝতেই চায় না নেশা একটা অসুখ। এই একটি অসুখের কারণে তার খুব শান্তি হয়। শান্তি হয় বলেই তো তিনি নেশা করেন। না করলে কষ্ট হয়। বিবিধ নেশার বিবিধ কষ্ট বিবিধ জটিলতা। কিন্ত একজন নেশাক্রান্ত মানুষের জন্য তার পরিবার-পরিজন আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব সবারই অশান্তি হয়। সেই অশান্তি তাকেও ভর করে, কষ্ট তারও হয়, তবু সে নিরুপায়...তবু সে আশা বাঁধে বুকে। আমরাও বুক বাধি। ক্রমাগত নিজের ক্ষতি করে সে এক অভাবনীয় শান্তির ভেতরে থাকতে চায়।
এ রকম শান্তির নমুনা আরও আছে। যেমন ধরেন আপনি প্রেমে পড়ে গেলেন। এতকিছু থাকতে ভাইরে প্রেমে না পড়লেই কী নয়। না। নয়। যাকেই জিজ্ঞেস করবেন সেই আপনাকে বলবে তার অনুভূতিটাই সেরা। তার বিসর্জনটাই সবচেয়ে। কিন্তু কনচেন দেখি, বিসর্জনের মহিমা ছাড়া দেবীর জন্য এত দরদ আসত ক করে। তাই ভাই আপনিও জানেন যে ওই নিবেদন আর বিসর্জন আর বেদনার ব্যাথা সইবেন বলেই আপনি নিজেই ডেকে এনেছেন ওই আরকি প্রেম-ভালোবাসা বিষয়ক শান্তির গীত। বেশি বলে কী হবে। এই যেমন ধরেন ‘মুক্তিরও মন্দিরও সোপানও তলে কত প্রাণ হলো বলিদান... লেখা আছে অশ্রুজলে...’ কত শত সহস্র লক্ষ কোটি বার গাওয়া হলো এই গান সে তো একটা শান্তিরই মহার্ঘ্য দূত, তাই তো?। আজও বাংলার আঠারো কোটি মানুষ মনপ্রাণ দিয়ে ত্রিশ লক্ষ শহীদের মহিমা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন সবাই। তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। আপত্তি হলো এই যে মানুষ দেশপ্রেম নামক একটি ধারণাকে সম্বল করে সমস্ত পৃথিবীকে অশান্তির ভেতরে ফেলে দিল সেটা। একে বলা হলো এটা তোমার দেশ, ওকে বলা হলো ওটা আমার দেশ। চলো যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা করি। যথার্থ দেশপ্রেমিক হলে তোমার কত সম্মান, তোমার মৃত্যু হবে বীরের মতন।
আমার প্রিয় বন্ধু শিমুলের ছোট তুখর পাইলট ভাই আদরের পলাশ বিমান ফাইটার বিধ্বস্ত হয়ে মারা গেলেন ২০১৮ সালে। ছিন্নভিন্ন দেহাবশেষ কিছুই পাওয়া যায়নি। কেবল পলাশের ক্যাপটি দেওয়া হয়েছিল তার বিধবা স্ত্রীর হাতে। ক্যাপটি বুকে জড়িয়ে বারবার পলাশের স্ত্রী বলছিলেন, আমাকে কাঁদতে বারণ করেছে পলাশ। বলেছে যদি আমি মরে যাই তুমি জানবে তুমি বীরের বউ। আমি বীরের বউ...আমি বীরের বউ…আর ওর চোখের জল মানছিল না কোনো বীরত্বের গান। কোনো সান্ত্বনাই শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি পলাশের মায়ের দীর্ঘশ্বাসের তুল্যমূল্য দামে। বিষয়টা হলো দেশপ্রেম সব থেকে দামি ওষুধ তথাকথিত শান্তি কেনার। এর পক্ষে-বিপক্ষে আপনার হাজারো মত থাকতেই পারে। তবে আমার কথা পরিষ্কার। কেননা তাতে শত সহস্র লক্ষ মানুষের মৃত্যুক্ষুধা ধর্ষণ যন্ত্রণা হাহাকারের চেয়ে অনেক বেশি দামে বড় আব্বারা শান্তির ব্যবসা চালাতে পারেন।
নানা রকম সংঘ হয় সংগঠন হয় পুরস্কার হয় ...তাতে সবার লাভ। লাভ আর লোভের হিসাবে শান্তিকে মেলাতে গেলে খুব বিপদে পড়তেই হবে। ক্ষমতা আর আধিপত্য বিস্তারের যে শান্তি তা আপনি আমি আমজনতা কমই বুঝব। অথবা বুঝলেও আমাদের তেমন কিছু করার থাকবে না। তবু আমরা ঠিকই অহংকারের সুরে বলব ‘আমি দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা, কারও দানে কেনা নয়...।’ অদ্ভুত না... সেই লোকটিও জীবনভর সবচেয়ে সুন্দরতম দেশপ্রেমের গানগুলো রচনা করে কী এক অজানা আশঙ্কার ভেতর দিয়ে কী এক বীভৎস অশান্তি নিয়ে চলে গেলেন পরপারে। তাই তো যায় সবাই। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের কথা বলছিলাম। ট্রেনের চাকায় কাটা পড়ে তার ছোট ভাইটিকেও প্রাণ দিতে হলো স্বাধীন বাংলায়।
এই তো সেদিন চলে গেলেন লালনকন্যা ফরিদা পারভীন। জীবনভর তিনি লালন সাইজীর বাণী ছড়িয়ে দিলেন লক্ষ কোটি মানুষের বুকের ভেতর। কত সুফি সাধক বাউল ফকিরের এই দেশে অর্থবিত্ত-প্রতিপত্তির ঘোর ছেড়ে জীবনব্যয় করে গেলেন শান্তি রচনায়। তার কতটুকু জানি আমরা অথবা মানি।
কবর থেকে তুলে এনে ক্ষয়িত-গলিত মৃতকে আঘাত করেও তো শান্তি পাচ্ছেন কেউ কেউ; নিশ্চয়ই কেউ না কেউ তাদেরকে এমত শান্তির পথ দেখিয়েছেন। তবুও তো ফুল ফোটে তবু পাখি গান গায় তবুও তো জ্যোৎস্না বিলায় অবিকল চাঁদ যেমন বিলিয়ে যাচ্ছেন অনন্তকাল ধরে। তবুও বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে ভিজে পুড়ে একাকার মানুষ অদেখা মনের সংযোগ খুঁজতে খুঁজতে পার করে দেয় এক একটা জীবন। পার করে দেন সুদীর্ঘকাল কাজী নজরুল কেবল ইশকের বরাত খুঁজতে খুঁজতে নীরবতাকে সঙ্গী করে আর তিনি বলে যান, ‘চাই না বেহেশত খোদার কাছে নিত্য মোনাজাত করে হায়, খোদারই প্রেমের শরার পিয়ে বেহুঁশ হয়ে রই পড়ে হায়।’ রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘আমি অকৃতি অধম বলেও তো মোরে কম করে কিছু দাও নি, যা দিয়েছ তারই অযোগ্য ভাবিয়া কেড়েও তো কিছু নাও নি...।’
কথায় কথা বাড়ে। শান্তি বিষয়ক লেখা শেষ করতে হবে। আপাতত ক্যানসারে আক্রান্ত আমার বন্ধু দুঃসাহসী রোদেলা নীলার কথা ভাবছি। ওর কেমোথেরাপি চলছে। কদিন ধরে কিছুই খেতে পারছে না। বমি হচ্ছে। ফেসবুকে লিখেছে গুঁড়া মাছের চচ্চড়ি আর মাষকলাইয়ের ডাল দিয়ে ভাত খেতে ইচ্ছে করছে। আহা ওর এইটুকু চাওয়া যদি পূরণ করতে পারতাম। বড় শান্তি পেতাম। কিন্তু মানুষ বড় অসহায়। শোনো না…আমাদের একটা টিয়াপাখি ছিল। আমাদের দ্বিতীয় সন্তান যেদিন চলে গেল মাবুদের কাছে... হাসপাতাল থেকে ফিরে বাড়িতে ফিরে পাওয়া গেল তাকে। তখনও গায়ে পাখা গজায়নি। কোত্থেকে উড়ে এসে পড়েছে বাসার নিচে। তারপর আমার বিশ্রাম আর ক্ষত সারাবার সঙ্গী হলো সে। ওর নাম ছিল হীরা। হীরা শিস দিত... টুকটুক করে হেটে বেড়াত আর ডাকত বাপ্পুউ...খুব মিষ্টি ছিল ওর ডাক। ও এসেছিল আমাদের পুত্র নক্ষত্রের ক্ষতি পুরণ করে মনের আর মগজের শান্তি ফেরাতে। সেজন্য অবশ্য তাকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়নি কোনো। কী আর করা। দুই মাস পর আমি অফিস শুরু করলাম। তখন খুব রাগ আর অভিমান নিয়ে সে চলে গেল। ফ্যানের পাখায় উড়ে মরে গেল নাকি আত্মহত্যা তার হিসেব করা হয়নি কোনো দিন। ওকে যথাযথ মর্যাদায় কবর দিয়েছিলাম, যেমন কবর দেওয়া হয়েছিল আমার দুটি সন্তানকেই। অপূর্ণ তবু ওইটুকু ওদের অধিকার আর আমাদের শান্তি।
বড় ভাইতুল্য জিয়া ভাই বলেন, মৃত মানুষের সঙ্গে বসবাসের আনন্দই আলাদা। ওনাদের কোনো চাওয়া-পাওয়া নাই। তাই তো। এভাবে তো ভেবে দেখিনি। কেবল দোয়া চান ওনারা।
আমার বন্ধু লুসি বলে রোজ সকালে উঠে দশজন মানুষের জন্য শুভকামনা করবি। ভালো লাগবে। তাই তো। ভালো লাগে।
নিজেই শিখিনি কিছু তবু মানুষের ছেলেমেয়েদের পড়ানো আমার পেশা। তার বদলে টাকা পাই। তার চেয়ে বেশি পাই শান্তি। ওদের বড় হওয়া দেখি, বেড়ে ওঠা দেখি, ভুল-ত্রুটি আনন্দ দেখি। ছোট ছোট চারাগাছ মহীরুহ হয়। ওরাও তখন ফুল দেয় গন্ধ বিলায়। তখন আমার খুব শান্তি হয়। একটা ছোট্ট ঘাসফুল, একটি সামান্য ঝরা পাতা, এক বিন্দু শিশিরের আস্ফালন, কফি কালার একটা বকুলের দানা, একটা রূপবতী প্রজাপতি, একটু একটু মায়া, যৎসামান্য প্রেম ও প্রার্থনা আমি কুড়োতে থাকি অনর্গল; কোনো না কোনো অজুহাতে জড়ো করি শান্তির সহস্র সারস সাদাকোর মতন। পারব না জেনেও সহজ মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখি শান্তির জন্যই। তোমরা ভালো থেকো। পৃথিবীটা শান্তিতে নেই। মেফিসটোফিলিসে ভরপুর।
কখন কী হয় কে জানে।
তবু তোমরা থেকো।
চেষ্টা করো।
শান্তির।