রেজাউল করিম রনি
প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:৩৯ পিএম
চিত্রকর্ম: কাজী সালাউদ্দিন আহমেদ
শান্তির আলোচনায় যুদ্ধ যত দিন প্রাসঙ্গিকভাবে আলোচনায় আসবে তত দিন আমরা খোদ শান্তিকে আলাদা করে বুঝতে পারব বলে মনে হয় না। যখন কোনো বিষয়কে অন্য কোনো বিষয়ের সাপেক্ষে আমাদের বুঝতে হয় তখন সেই বিষয়ে আমাদের পরিপূর্ণ জ্ঞান হয় না। তাই যুদ্ধকে শান্তি দিয়ে বা শান্তিকে যুদ্ধ দিয়ে বা যুদ্ধের সাপেক্ষে বুঝবার বিপদ অনেক। তার পরেও আমাদের চলতি জ্ঞানকাণ্ডে শান্তিকে যুদ্ধের আলোকে বিবেচনা করা হয়। যুদ্ধের অনুপস্থিতিকেই অনেক সময় শান্তি মনে করা হয়, অন্তত সেই সব এলাকায় এমনটা ভাবাই স্বাভাবিক, যেখানে কথায় কথায় যুদ্ধ নেমে আসে।
আমরা আগে যুদ্ধের বিষয়ে কয়েকটি কথা বলে নিতে চাই। যুদ্ধেরও অনেক ডাইমেনশন থাকে। যদিও যুদ্ধের কোনো গভীরতা থাকে না। শান্তির অনেক গভীরতা থাকে। অনেক প্রভাব থাকে। আর ধ্বংস ছাড়া যুদ্ধের আর কোনো প্রভাব থাকে না। আর মানুষের অক্ষমতার প্রকাশই যুদ্ধ। যখন জ্ঞান, প্রজ্ঞা এগুলো কাজ করে না তখনই যুদ্ধকে কেউ দরকারি মনে করতে পারে।
যুদ্ধের আগাম ব্যাকরণ যুদ্ধের মাঠে অনেক সময়ই হুবহু কাজ করে না। তবে যুদ্ধ যেমন হোক। যতই ডাইমেনশনাল হোকÑ শুধু মৃতরাই যুদ্ধের শেষটা দেখে থাকে। আর শান্তির শুরুটা দেখে থাকে জীবিতরা। ধারণাগত দিক থেকে শান্তিকে একটা অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে পাঠের বিপদ আছে। এনফোর্স সাইলেন্স ইজ নট পিস। স্বৈরাচারী অত্যাচার বা কঠোর নিয়ন্ত্রণের ভয়ে সবাই চুপ মেরে যাওয়াকে শান্তি বলে না। যেমন বিগত হাসিনার আমলে বিনা হট্টগোলে ভোট ডাকাতির নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে মিডিয়াতে উপস্থাপন করতে আমরা দেখেছি। আমরা কাশ্মিরে দেখেছি ঘরে ঘরে ভারতীয় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস পৌঁছে যাওয়ার পরে পুরো কাশ্মিরকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর কোনোটাই শান্তির বার্তা দেয় না। সমষ্টিগতভাবে শান্তির বিষয়টি নির্ভর করে স্বাধীনতার ওপর। মানে রাজনৈতিক স্বাধীনতা যদি না থাকে তা হলে একটি সমাজে শান্তি থাকে না। স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িত দায়িত্বশীলতা এবং দায়িত্বশীলতাহীন স্বাধীনতা জঙ্গলের শাসন ফিরিয়ে আনে।
অন্যদিকে ব্যক্তি-মানুষের জীবনে শান্তির বিষয়টি নির্ভর করে যার যার পারসেপশনের ওপর। যার যেমন বুঝ তার সুখ সেই মতন। আধুনিক প্রতিযোগিতামূলক জীবনে শান্তির সুযোগ নেই। প্রচণ্ড দৌড়ের মধ্যে মানুষকে বাস করতে হয়। নিজের জীবনের মর্মকে উপলব্ধি করবার মতন অবসর মানুষের জীবনে নেই। বসনার কারাগারে বন্দি মানুষ শান্তির জন্য অনেক কৃত্রিম উপায় বের করে নিয়েছে। শান্তির আশায় বিশাল বাণিজ্য গড়ে উঠছে। কিন্তু মানুষের জীবনের শান্তি হলো তার ট্রু এসন্সকে সে বুঝতে পারছে কি না এবং সেই অনুযায়ী একটা জীবনযাপন করতে পারছে কি না। আমাদের যার যা প্রবণতা সেই মতন জীবনযাপন করার সুযোগ থেকে আমরা বেশিরভাগ মানুষ বঞ্চিত। পরিবার, সমাজ ইত্যাদির দিকে তাকিয়ে আমরা আমাদের জীবনযাপনের প্রক্রিয়া ঠিক করি। বেশিরভাগ সময়ই আমরা অন্যের জীবন যাপন করি। নিজের জীবনটা যাপন করাতে পারা এবং নিজের কাছে ট্রুথফুল থাকতে পারাই শান্তির জীবন।
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে হায়েনা হাসিনা শান্তিতে নোবেল পাইতে চাইছিল। এখন নাকি ট্রাম্পকে শান্তিতে নোবেল দেওয়ার কথা উঠছে। ড. ইউনূস যদি শান্তিতে নোবেল না পেতেন তা হলে নাকি তাকে এতটা আক্রোশের শিকার হতে হতো না। হাসিনার ঈর্ষার কারণ হয়েছিল এই শান্তির নোবেল।
অন্যদিকে ইসলাম মানে শান্তি। এই শান্তিকে অশান্তি দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে। আমাদের দেশেও ইসলামকে নিয়ে অশান্তি তৈরি করতে চেষ্টা করা হয়। হাসিনা জঙ্গিবাদের নাটক আমদানি করেছি। এখন কিছু কিছু দল রাজনৈতিক ঘুটি হিসেবে ইসলামকে ব্যবহার করার পথে হাঁটছে। শান্তির ধর্মকে নিজেদের ফায়দা হাসিলের জন্য ব্যবহার করতে চাই অবশ্য জনগণ বারবার তাদের প্রতিহত করেছে। অতীতেও এমনটা দেখে দেছে। যারা ইসলামকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে তাদের পরিণতি ভালো হয় নাই।
আধুনিক জাতি-রাষ্ট্র গঠনের পরে যুদ্ধের সক্ষমতা আপনার শান্তিতে থাকার গ্যারান্টি হিসেবে কাজ করে। উদাহরণ হিসেবে ভারত-পাকিস্তান দুটি দেশের কথা বলা যায়। এদের একজন যদি পারমাণবিক শক্তির অধিকারী না হতো তাকে সহজেই পারমাণবিক শক্তিধর দেশটি ডমিনেট করত। এদের দুজনের হাতে পারমাণবিক থাকার ফলে তারা মাঝে মাঝে যুদ্ধ যুদ্ধ রব করে কিন্তু পুরো স্কেলে যুদ্ধে নামে না। কেননা এটা হবে গোটা দুনিয়ার জন্য আত্মঘাতী। এই মারণাস্ত্র দুই দেশের সিকিউরিটি উপাদান হিসেবে কাজ করছে। মানে শান্তি বজায় রাখতে কাজ করছে।
আমাদের মতন দেশে শান্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা অতি জরুরি। কেননা সমাজিকভাবে যদি একটা শান্তিময় পরিবেশ তৈরি করা না যায় তা হলে সেই সমাজে চিন্তাশীলতার চর্চা করা মুশকিল হয়ে যায়। আমাদের সমাজ কতটা অস্থির তা বুঝতে সোশ্যাল মিডিয়ার দিকে তাকানো যেতে পারে। প্রতিনিয়ত কোনো না কোনো ইস্যু নিয়ে উত্তেজনা তৈরি করার মতন অবস্থা থাকেই। ইস্যুহীন একটা দিনও পার হচ্ছে না এবং এই ইস্যুগুলো জীবনে কোনো পজিটিভ প্রভাব রাখছে না। কিন্তু এগুলোতে আমরা দিনের পর দিন মজে থাকছি। সম্মিলিতভাবে কারও চরিত্র হননকে আমরা বিশাল রাজনৈতিক দায়িত্ব মনে করি। ভুয়া খবর মেনে আমরা মানসিক স্বাস্থ্যকে পঙ্গু করে ফেরি। এই যে রেন্ডমনেসের মধ্যে মেডিটেটিভ অবস্থা তৈরি করা সম্ভব হয় না। ধীরস্থির, ধ্যানী মানুষ এই রকম সমাজে তাই তৈরি হয় না। আমাদের সমাজে প্রচুর ফেসবুকার কিন্তু কাজের লেখক নাই। আমাদের সমাজে প্রচুর লোক জাজমেন্টার কিন্তু চিন্তা করতে পারে এমন লোক হাতেগোনা। আমাদের সমাজে পরিশ্রম করে অর্জন করার চেয়ে ধান্দা করে এগিয়ে যাওয়ার লোক বেশি, দেখানোপনার সংস্কৃতি প্রকটÑ সব মিলিয়ে এই সমাজ চরম অশান্তি কেওয়াজে ভরা। এখানে তাই বড় মানুষ তৈরি হওয়া খুব কঠিন। সামাজিক শান্তি একটি সমাজে মানুষের বিকাশের উপযোগী মানসিক স্বাস্থ্য ধারণ করতে পারে, যা সেই সমাজের অগ্রগতির জন্য জরুরি। অন্যদিকে সামাজিক অশান্তির মধ্যে মানুষের মর্যদাবোধ রক্ষা করা যায় না। অসম প্রতিযোগিতা ও ধান্দাই হয়ে ওঠে প্রধান চালিকাশক্তি। সেই সমাজে নৈতিক ভিত্তি তৈরি হয় না এবং এই ধরনের সমাজে বড় মানুষ তৈরি হয় না। কাজেই আমাদের যেকোনো মূল্যে সমাজকে রক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে। সবাই দেশ-রাজনীতি নিয়ে কথা বলি কিন্তু সমাজকে রক্ষা করা না গেলে রাজনীতি ঠিক করা যাবে না।
এই যে একটা শান্তিপূর্ণ গণঅভ্যুত্থান আমরা দেখলাম। এটা সমাজের একটা নৈতিক জাগরণের ফলেই সম্ভব হয়েছে। এটাকে ধরে রাখতে হবে। মানুষের প্রতি মানুষের যে মমত্ববোধ জেগে উঠেছিল এটাই আমাদের বড় অর্জন। এটাকে সমাজের সংস্কৃতিতে ধারণ করতে হবে। একটা প্রস্তাবের কথা বলে শেষ করি।
লুটপাটের এক খনির নাম ছিল ঢাকা ওয়াসা। এদের একটা পানি আছে। নাম শান্তি। অশান্তির দেশে পানির নাম রাখছিল শান্তি। এইটার নাম পরিবর্তন করে মুগ্ধ রাখা হোক।
এই গণঅভ্যুত্থানের সব অর্জনকে ধীরে ধীরে সমাজে বাস্তবায়ন করতে হবে।
ওয়াসার বোতলজাত পানির নাম হতে পারেÑ মুগ্ধ।
মুগ্ধের চেয়ে বড় ওয়াটার সাপ্লায়ার দুনিয়াতে বেশি আসে নাই। আর আসবে কি না জানি না।