× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

দৃশ্য-অদৃশ্যের অন্তরালে

পিন্টু ভৌমিক

প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:১৩ পিএম

দৃশ্য-অদৃশ্যের অন্তরালে

সব যন্ত্রণার নিচে গভীর কোনো ক্ষত থাকে। মৃত নদীরাও রেখে গেছে নির্বাক কিছু চিহ্ন। অবাধ প্রবাহের দায়ে গৃহবন্দি নদীগুলো জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে স্থির, অসহায়। কী অসম্ভব এক দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকে আমাদের হাঁসগুলো। আমাদের সমৃদ্ধ বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ বিষে ভরে ওঠে, প্রাচীন বৃক্ষরাজি, উঠান, আঙ্গিনা রোদে পুড়ে ধূসর হয়, পরিযায়ী পাখিরা ফিরে যায় জলের জন্য হাপিত্যেশ করে। অবলা প্রাণীগুলো ছায়ামায়াহীন পথের ধারে লম্বা জিভ বের করে অসীম শূন্যতায় চোখ মেলে দেয়। এই সব দৃশ্য এবং অদৃশ্য ভাবনা অপসারণে তুমুল বাদ্য-বাজনায় আমরা ব্যাঙের বিবাহ সম্পন্ন করার সন্তুষ্টি বুকে ধারণ করি আর প্রবল বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা উন্মোচন করে সমস্ত প্রাণিকুলের জন্যে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রচনাকল্পে মেঘেদের শরণাপন্ন হই। তবুও নিষ্ঠুর প্রকৃতি আমাদের আহ্বানে কানে তুলো গুঁজে রাখে। দূর দিগন্ত থেকে স্বপ্নবাজ মেঘগুলো ভয়ংকর শব্দ চাতুর্যে গ্রাম লোকালয়ে আমাদের ক্ষুধা, তৃষ্ণা, বিশ্বাস মাড়িয়ে উড়ে যায়। মেঘ-রোদের চতুরতায় আমাদের স্বপ্নভঙ্গ হয়। বর্ষায় মেঘগুলো দল বেঁধে আসে। বানে ভাসিয়ে পূর্বের দায় শোধ করে যায়। তবুও আমরা এগিয়ে যাই তোমাদের অপরিমিত আহ্বানে। দূরে কোথাও আলোর রেখা জেগে ওঠে। কঠিন পাথর খুঁড়ে খুঁড়ে সহস্র বছরের যূথবদ্ধ যাপনচিত্র নির্মাণ করি, ইস্পাতশপথে যূথবদ্ধ হই, নিজেদের মধ্যে আদি অকৃত্রিম সখ্য গড়ে তুলি, তারপর এক অনিঃশেষ যাত্রায় সামিল হয়ে যাই। দীর্ঘ যাত্রায় মনে হয়, আমরা এক অনাদিকালের হাত ধরে হেঁটে চলেছি আর আলোক রেখা আমাদের থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। কিছুই আভাসিত হয়নি বলে এই পথ ফেলে গেছে কতশত স্বজন। আমাদের প্রতিভাবান দলনেতার মুখেও এখন দ্বিধা আর বিষাদের সুর ঝরে পড়েÑ আরও একটু এগিয়ে চলো, হয়তো কাছেই আমাদের ‘প্রশান্তির আলোকধারা’ কিন্তু আমরা দেখি আমাদের দৃষ্টি থেকে আলো ফুরিয়ে যাচ্ছে, দিগন্ত থেকে নেমে আসা কালো আঁধারে আমাদের মুখগুলো ঢেকে যাচ্ছে ক্রমশ। দিশাহারা আমরা শেষমেশ প্রাচীন জনপদের এক বয়স্ক ব্যক্তির দ্বারস্থ হই, শ্রদ্ধায় অবনত আমরা আমাদের গন্তব্যের কথা বলি। লোকটির নিভে যাওয়া চোখ প্রসারিত হয়Ñ এই পথ খুব ভুল পথ গো, এই যাত্রা কেবল মহা অন্ধকারের দিকে। দূরে ঘন বন থেকে অদ্ভুত রহস্যময় এক ছায়া এসে পড়ে আমাদের চোখে। সেদিকে তাকিয়ে খুব ভয় হয়। লোকটিকে বলি- এই পথ কী নিরাপদ নয়? হিংসার বন্যপ্রাণী নাকি অদৃশ্য কিছু...যা আমাদের থামিয়ে দিতে পারে! লোকটি যেন আমাদের বিদ্রুপ করেÑ কোন দেশের মানুষ গো তোমরা? জগৎ সংসারের ভাউ বোঝ না! বন্যপ্রাণী কোনোদিন মানুষ খায়? আমরা পরস্পর মুখের দিকে তাকাই। লোকটি বলে চলেÑ তোমরা ওদের সব বিনাশ করেছে, খারার কেড়ে নিয়েছো, তো ওরা কী করবে? আমাদের মহান দলনেতার দিকে তাকিয়ে তার বর্ণনা আরও দীর্ঘ হয়Ñ আচ্ছা বলতে পারো, এই পৃথিবীতে মানুষ যত মানুষকে মেরেছে দুনিয়ার তাবৎ বন্যপ্রাণী কী তার এক আনাও মেরেছে? এ পথে মানুষের ভয় গো, কেবল মানুষের হাতে মানুষের প্রাণ সংহারের ভয়। আমাদের প্রতিদিনের গড়ে ওঠা নিবিড়, সব শোক-তাপ প্রসঙ্গহীন সন্ধ্যার মতো ভেঙে পড়ে। আমরা সাময়িক বাকরুদ্ধ হই, মনে হয় লোকটির গহিন একজোড়া চোখের ভেতর আমরা একে একে তলিয়ে যাচ্ছি। যূথবদ্ধ মানুষ এই ভুল পথের মূল কারিগরের সন্ধানে তৎপর হয় কিন্তু তাকে আর হাতের নাগালে পাওয়া যায় না। সে সরে গেছে অন্য পথে, আর এক কারিগর সেজে।

আমরা প্রতিদিন ভয়ানক ধ্বংসস্তূপের দৃশ্য দেখি। বীভৎস ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠেছে একদল মানুষ। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপাপড়া শিশুরা হাত বাড়িয়ে দেয়, ওদের চোখে জল গড়িয়ে পড়ে, দেহগুলো রক্তাত্ত, ছিন্নভিন্ন। নিজ ভূমি জ্বলে-পুড়ে নিঃশেষ হয় সাজানো বসতি। নিরুপায় অগণিত নির্বাসিত চোখ আশ্রয় খোঁজে, খাদ্য চায়, নিরাপত্তা চায়। ওদের আর্তনাদে পৃথিবীর আলো-অন্ধকার প্রকম্পিত হয়, তবুও সভ্যতার ধারক-বাহকের দাবিদাররা দেহ গুটিয়ে বসে থাকে। আমাদের উচ্চকণ্ঠ তারা কানে তুলতে নারাজ। এতে বাণিজ্য বিভ্রাটের ঝুঁকি তৈরি হয়। এসব বিধ্বস্ত শিশুদের উদ্ধার, সহায়তার কাজ, মানবিক কার্যক্রমের আওতাভুক্ত হবে কি নাÑ এর ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ কী এই নিয়ে বিশ্ব দরবারে টানা তর্ক-বিতর্ক চলে। মানুষের আর্তচিৎকারে পৃথিবী ভারী হয়ে ওঠে। ভারী বাতাসে আনন্দ-উৎসব খেলাধুলা, বংশ বিস্তার সব এগিয়ে চলে সমান্তরাল, আতশবাজিতে পৃথিবীর আকাশ রঙিন হয়ে ওঠে, আমরা এই সব রঙিন দৃশ্যে আরাম বোধ করি এবং ক্ষুধা-তৃষ্ণা, মৃত্যু, শোক দূরে সরিয়ে বৃহত্তর আধুনিক নগর সম্প্রসারণ পরিকল্পনার নকশা দেখি। স্থানীয় অধিবাসীদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের সংবাদটি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। পূর্বপুরুষের বসতি রক্ষার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে ওরা প্রতিরোধ গড়ে তুলে। শান্তি প্রস্তাবে স্থানীয় জনতার সায় নেই। অবিরাম রাস্তা অবরোধ, মিছিল মিটিং চলে। স্থানীয়দের ভেতর থেকে নেতৃত্ব গজিয়ে ওঠে। জনতার ন্যায্য দাবির সমর্থনে নেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতি, সাক্ষাৎকার গ্রহণে সংবাদকর্মীদের দেহে ঘাম ঝরে। এসব উন্নয়নবিরোধী অপতৎপরতা প্রতিহত করতে আমাদের নগর কর্তৃপক্ষ অদৃশ্য যাদুর কাঠির শক্তিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এদের কৌশলী সক্রিয়তায় হঠাৎ গজানো নবীন নেতৃত্ব আরও বৃহত্তর পরিসরে নিজেদের নেতৃত্ব এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখে। পুনর্বাসনের বরাদ্দকৃত অর্থে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও অর্থবিত্ত সংগ্রহে মনোযোগী হয়। দিশাহারা মানুষগুলো শেষেমেশ নিজেদের হার মেনে নেয়। নগর সম্প্রসারণের পথ নিষ্কণ্টক হলে দূর দেশে আধুনিক নগরায়নের টাটকা অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য কর্তাগণের ভ্রমণ বাজেট প্রবল করতালির মধ্যে রোচিত হয়। 

এত কিছুর পরও আমাদের প্রিয় শিক্ষক যৌবনে দেখা সমতার সমাজ নির্মাণের স্বপ্ন আগলে রাখে। সে যৌবনে দেখা স্বপ্ন তার শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখতে চায়। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সে যৌবনেই একবার কারাবাস যাপন করেছে। পাঠের অবসরে প্রিয় শিক্ষক চলতি উন্নয়নের আড়ালের গল্প শোনায়Ñ পৃথিবীর সম্প্রসারণবাদীরা ঋণ সহায়তা, প্রযুক্তি চালান করে উন্নয়নের নামে আমাদের এমন এক গোলক ধাঁধায় বেঁধে ফেলছে, এর ফলে আমাদের নিজস্ব চিন্তাশক্তি স্থবির আর প্রযুক্তির অধিনস্ত হতে বাধ্য হচ্ছে। সবাই সবাইকে পরাস্ত, ধ্বংস করার মহাগোপন প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। আমরা ভয়ানক এক নিঃশেষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। বক্তব্যের ফাঁকে শিক্ষক তার পুরু লেন্সের ভেতর লক্ষ্য করেন তার শিক্ষার্থীরা এসব আলোচনায় মোটেও মনোযোগী নয়। শিক্ষক ব্যথিত হন। তার মনে গভীর আতঙ্ক তৈরি হয়। সময়টা বোধকরি হাতছাড়া হয়ে গেছে। এখান থেকে ফেরানোর কৌশল তার নিজেরও জানা নেই। তার নিজের পরিবারের ভেতরেই সম্পর্কগুলো কেমন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। মানুষের স্পর্শ থেকে যন্ত্রের স্পর্শে ঝুঁকে পড়ছে মানুষ। তারপরও তার দৃঢ় বিশ্বাস এই স্বপ্ন কখনোই নিঃশেষ হতে পারে পারে না। এসব সাময়িক। কোনো ব্যবস্থাই চিরকালীন নয়। সময় পরিস্থিতিতে পরিবর্তীত হয় মাত্র। কিন্তু স্বপ্ন আজন্ম, চিরকালীন; যা একজন থেকে সহস্রজনের মধ্যে বিস্তৃত হয়।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা