ইসমত শিল্পী
প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:০৩ পিএম
আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:১৪ পিএম
চিত্রকর্ম : অরণী হোসেন অথৈ
‘এই পৃথিবীর রণ রক্ত সফলতা সত্য; তবু শেষ সত্য নয়।’ Ñ এভাবেই জীবনানন্দ দাশ বলেছেন। তার ‘সুচেতনা’ কবিতার এ বাক্যটি পড়ার পর মাথা ঝিম ধরে আসে। ওই একই কবিতায় তিনি আবার লিখলেন, ‘পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন;
মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীরই কাছে।’ এই পৃথিবীর কাছে আমরা আক্ষরিক অর্থেই ঋণী। তাই তো এখনও প্রত্যাশা করিÑ রক্ত, অস্থিরতা এবং প্রতিহিংসার বিপরীতে একটু শান্তি নামুক পৃথিবীর বুকেÑ আমাদের হৃদয়ে।
শান্তি শব্দটির ভেতরে যতটা স্নিগ্ধ, কোমলতা লুকিয়ে রয়েছে কিন্তু এর প্রাপ্তিটা ঠিক ততটাই কঠিন। মানবসভ্যতার ইতিহাসের প্রতিটি মোড়ে যুদ্ধ, দখল, বিভাজন, প্রতিশোধের আগুনে জ্বলে উঠেছে পৃথিবী। অথচ এই সমস্ত অন্ধকারের মাঝেই কিছু মানুষ, কিছু মন, শান্তির মশাল তুলে ধরেছে।
প্রযুক্তি এনেছে গতি কিন্তু কেড়ে নিয়েছে স্থিরতা। রাজনীতি শিখিয়েছে বিভক্ত হতে, ভুলিয়ে দিয়েছে ঐক্যবোধের স্বর। ধর্ম, জাতি, মতÑ এইসব পরিচয়ের আড়ালে মানুষ মানুষকে ভুলে যাচ্ছে। অথচ শান্তির সপক্ষে দাঁড়ানো মানে এই ভুলে যাওয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করা। শান্তি মানে সহানুভূতির পুনরুদ্ধার, মানুষের ভেতরকার মানুষকে জাগিয়ে তোলা।
নিজের ভেতর থেকেÑ যখন মানুষ নিজেকে স্থির করে, নিজের রাগ, হিংসা, অহংকারকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। শান্ত মানুষই পারে পৃথিবীতে শান্তি ছড়াতে। যে মানুষ অন্যের কষ্ট বুঝতে পারে, অন্যের ব্যথায় নিজের অংশ খুঁজে পায়, সে কখনও যুদ্ধ চায় না। সে বোঝে, প্রতিটি গোলা, প্রতিটি গুলি, প্রতিটি রক্তবিন্দু মানুষেরই রচিত এক ব্যর্থতার গল্প।
মানুষের চেতনা সময়ের সঙ্গে বদলায়। প্রতিটি যুগ, প্রতিটি প্রজন্ম তার অভিজ্ঞতা দিয়ে নতুন করে শেখেÑ কোনোটা টিকে থাকে, কোনোটা হারিয়ে যায়। আমার নিজের চেতনা, জীবন ও লেখার অভিজ্ঞতা থেকেও একটিই সত্য ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়েছেÑ শান্তি ছাড়া কোনো উন্নয়ন, কোনো সভ্যতা, কোনো মানবতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সময় যতই বদলাক, এই সত্য অপরিবর্তনীয়।
জীবনের দীর্ঘ পথে আমি দেখেছিÑ অশান্তি প্রথমে জন্ম নেয় মানুষের ভেতরে। বাহ্যিক সংঘাত তার পরিণতি মাত্র। মানুষ যখন নিজের ভয়, লোভ, ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তখনই তা সমাজে, রাষ্ট্রে, এমনকি পরিবারেও অশান্তির রূপ নেয়। শান্তির প্রথম পাঠ শুরু হয় আত্মজিজ্ঞাসা থেকে। নিজের ভেতরের অন্ধকার চিনে নেওয়া এবং সেটাকে আলোকিত করার চেষ্টাÑ এটাই শান্তির প্রকৃত যাত্রা।
লেখক হিসেবে আমি শান্তিকে দেখি এক অন্তর্লীন সুর হিসেবে। ‘তুমি মানুষ, তুমি আলো।’ এই আলোকরেখাই আমার কাছে শান্তির প্রতীক। কারণ আমি বিশ্বাস করি, মানুষ কেবল যুদ্ধ করে টিকে থাকে না, মানুষ টিকে থাকে ভালোবাসায়, বোঝাপড়ায়, ক্ষমায়।
আজ পৃথিবী যতই বিভক্ত হোক, আমি জানিÑ শান্তি এখনও মানুষের সম্ভাবনা। আমরা যদি ভাবি, এই সম্ভাবনাকে বাঁচিয়ে রাখব কথায়, আচরণে, শব্দে। শান্তি মানে নিস্তব্ধতা নয়, এটি এক দৃঢ় ঘোষণাÑ আমি জীবনকে ভালোবাসি, আমি মানুষকে ভালোবাসি, তাই আমি শান্তির সপক্ষে।
বিশ্বাস করি, শান্তি কোনো নিষ্ক্রিয় অবস্থান নয়; এটি এক সক্রিয় বোধ। এটি মানবিক সাহসের প্রকাশ। যখন কেউ অন্যের কথা শুনতে শেখে, বিরোধ মেটায় তর্ক নয়, বোঝাপড়ার মাধ্যমেÑ তখনই শান্তি বাস্তবে রূপ নেয়। আমার কাছে শান্তি মানে, জীবনকে এমনভাবে দেখা যেখানে প্রতিটি প্রাণের অস্তিত্বের প্রতি সম্মান আছে। এটি কেবল রাজনৈতিক বা সামাজিক স্লোগান নয়, এক দৈনন্দিন জীবনবোধ।
যুদ্ধ, হিংসা, নিপীড়নের ইতিহাস যতবার লেখা হয়েছে, ততবারই তার বিপরীতে একটি মাত্র কণ্ঠ উঁচু হয়েছেÑ শান্তির কণ্ঠ। আমি সেই কণ্ঠে নিজের শব্দ মেলাতে চাই। কারণ আমি বিশ্বাস করি, শব্দেরও দায়িত্ব আছে। একটি সংলাপ, একটি কবিতা, একটি গল্প যদি কোনো মানুষের ভেতরে বোঝাপড়ার আলো জ্বালায়Ñ সেই মুহূর্তেই শান্তির জয় ঘটে।
সময় ও বাস্তবতার নিরিখে বুঝেছি, শান্তি কোনো দূরের স্বপ্ন নয়, এটি প্রতিদিনের চর্চা। যেমন সকালের সূর্য প্রতিদিন ওঠে, তেমনি মানুষের ভেতরেও প্রতিদিন নতুন করে শান্তির সূর্য উঠতে পারেÑ যদি আমরা তা জাগিয়ে রাখি সহানুভূতি, সংলাপ ও ভালোবাসার চর্চায়।
‘শান্তি হলো এমন এক আলো, যা কারও হারানোর পরও নিভে যায় না; বরং বেঁচে থাকা মানুষদের ভেতরে এক নীরব প্রতিজ্ঞায় পরিণত হয়।’
আমার দৃষ্টিতে, শান্তি কেবল এক রাজনৈতিক শব্দ নয়, এটি মানবতার নৈতিক কেন্দ্র। মানুষ হিসেবে, লেখক হিসেবে, সময়ের সন্তান হিসেবে বলতে চাইÑ শান্তির সপক্ষে থাকা মানে জীবনের সপক্ষে থাকা। কারণ শান্তি ছাড়া জীবন কখনও পূর্ণ হয় না।