তাসনুভা অরিন
প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৫:৪৩ পিএম
চিত্রকর্ম : হামিদুজ্জামান খান
ষড়ঋতুর দেশে প্রত্যেক ঋতুর জন্য দুই মাস বরাদ্দ থাকলেও বর্তমানে ঋতু বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। শীতে বৃষ্টি অথবা গ্রীষ্মে শীতের ছায়া। হাইব্রিড ঋতু কালচারের এই যুগে এক ঋতু আরেক ঋতুর ভেতর সৃষ্টি করছে নতুন আবহাওয়া, দ্যোতনা। তবে গ্রামবাংলার ঋতুচিত্রে এখনও শহুরে আঁচ লাগেনি। এখনও ছয় ঋতুর পালাবদলে উনিশ-বিশ হলেও গ্রামাঞ্চলে প্রতিটি ঋতুর নিজস্ব রূপ, গন্ধ আর বৈচিত্র্য আছে। তবে শহরের গল্পটা ভিন্ন। এখানে প্রকৃতি যান্ত্রিক সভ্যতার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে নিতে চিৎকার করে বলছেÑ ‘আমিও মানুষ হারিয়ে হারিয়ে মানুষ হয়ে উঠছি।’
প্রকৃতি কতটুকু স্বতন্ত্র এখানে, ভাবতে বসলেই সভ্যতার সংকট চোখে পড়ে। এখানে মানুষ প্রকৃতির মতো না, বরঞ্চ প্রকৃতি মানুষের মতো। অস্তিত্ব সংকট কেবল মানুষের না, প্রতিটি ঋতুরও আছে। এই দ্বন্দ্ব তাদের নিজস্বতা এবং বিপরীতমুখী সভ্যতার কারণে। হয়তো দেয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারে এই সংকট চোখে পড়বে না, তবে প্রতিটি ঋতুই দিনশেষে অনির্ণেয়, অনিশ্চিত। শহরে গ্রীষ্ম, বর্ষা আর শীত মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পেলেও টের পায় না শরৎ।
ভাদ্র আর আশ্বিন মাসের যুগলবন্দি শরৎ শুরু হয় তালপাকা গরমের ভেতর দিয়ে আর শেষ হয় আশ্বিনের কাশফুল উড়িয়ে। তারপর হেমন্ত হয়ে শীতের দিকে পৃথিবী যেতে থাকে আর কুয়াশায় মুড়িয়ে নেয় নিজেকে। আমাদের প্রাচ্যের প্রকৃতি চরমপন্থী না। এজন্য পাশ্চাত্যের মতো চার ঋতুতে শেষ হয় না, ছয় ঋতুর এই প্রাচ্যলীলা। এখানে গরমের সাথে সাথে বৃষ্টির প্রতিযোগিতা থামে না, আবার শীত তুষারে নাÑ কুয়াশার ভাবে ভরা। মূলত এই তিন ঋতুর পালাবদলের মাঝের সাময়িক বিরতিটুকুই যেন শরৎ। তাই শরৎ কিছুটা অগোচরে থেকে যায়, অন্তত শহরের হাইরেইজ অ্যাপার্টমেন্টগুলোর অলিগলি চিনে ঘরে পৌঁছতে পৌঁছতেই সে বিলীন হয়ে যায় না-হওয়া প্রেমের মতো অথবা ভেসে যায় তার মেঘ পালতোলা তরী, জানে আকাশে আর তাণ্ডব নেই, শাসন নেই, বৃষ্টি হয়ে ঝরার তাগাদা নেই। তাই বলা যায় ইচ্ছাবৃষ্টির বরদান পাওয়া সব জিপসি মেঘের আনকোরা গল্পের সম্ভার হলো এই শরৎ। তাই তাকে খুঁজে নিতে হয়; যেমন কবিতার লাইনের ভেতর কবিতা থাকে না, থাকে তার বোধের ভেতর, সেরকম লুকিয়ে থাকা ঋতুর গল্প শরৎ। তাই এই ঋতুকে খুঁজতে গিয়ে মানুষ কোথাও কোথাও নিজেকে পেয়ে যেতে পারে। কবি জন কিটস শরৎকে ‘Ode to Autumn’ কবিতায় বলেছেন ‘Season of mists and mellow fruitfulness,’
বসন্তের মতো এত কদর তার নেই, গান নেই, গুঞ্জন-ফিসফাস কিছুই নেই, কেননা সে নাকি রঙিন ফুলের সম্ভার না, অথচ সে কাশফুলের গান যা শুনতে চাইলে হাতের স্মার্টফোন আর ক্যামেরা বন্ধ করে, ঘাসে বসে কাশফুলের মাথায় দুলতে থাকা পাখির দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়, যেন পাখিটি উড়ে গেলেই তুমি শুনতে পাওÑ
‘অবশেষে জেনেছি মানুষ একা!
জেনেছি মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা!’
Ñপাখি হয়ে যায় প্রাণ, আবুল হাসান
এমনিতেই শরৎ কড়া মেজাজের কোনো ঋতু না, তারপর যদি সে হয় শহুরে শরৎ, তাহলে তাকে মানুষ খুঁজে পায় সোশ্যাল মিডিয়ায় কাশফুল ছুঁয়ে নীল অথবা সাদা শাড়ি পরা কারও প্রোফাইল পিক চেঞ্জ করা ছবির ভেতর দিয়ে। এ ছাড়া শহরে শরৎ কোথায়?
শরৎ মানে মেঘমুক্ত চাঁদের স্পষ্ট প্রকাশ, কাশফুল, কোবাল্ট ব্লু আকাশ আর ছাড়া ছাড়া মেঘ, যারা জমতে আর ঝমঝমিয়ে ঝরতে একদম ভালোবাসে না। তারপর শরৎ মানে তালপাকা গরম শেষে প্রথম শীতের ভাতের ধোঁয়া ওঠাÑ অল্প অল্প কুয়াশা। কিন্তু শরতের এই ক্ল্যাসিক রূপের বর্ণনার সাথে শহরের শরৎ মেলে না। আর মিলবে কী করে! চাঁদ, মেঘ, পাখি দেখতে আকাশ লাগে। যেখানে আকাশ অনেকগুলো ছেঁড়া ছেঁড়া দৃশ্য জুড়ে তৈরি হওয়া কোলাজ, সেখানে চাঁদ, চাঁদ কি তার পূর্ণিমা-খবর বলতে পারে? সম্ভব না।
যদিও শরৎ আসতে না আসতেই কাশফুলের ছবিতে ভরে যাওয়া নিউজফিড দেখতে দেখতে একসময় মনে হবে, আসছে যুগে প্রযুক্তি ঝরা পাতাকেও আর ঝরতে দেবে না, কাশফুল ফুটবে বারো মাস, শরৎ হবে ক্যালেন্ডারের মধ্য আগস্ট থেকে মধ্য অক্টোবর অবধি, ষাট দিনের একটি পরিক্রমা, যেন ঠিক ঋতু না, ঋতু পরিবর্তনের ট্রানজিশন পিরিয়ড।
কিন্তু আসলেই কি তাই?
কখনও এমন হয়েছে, নিজের ভেতর কেউ তোমাকে বলছে, ‘তুমি আর আগের মতো নেই’?
যেন নিজের ক্ষ্যাপাটে নিদারুণ রূপটা আচমকা মুখোশ খসে-পড়া মুখ। যা কিছু পাওয়ার জন্য মন ছিল টগবগে রেসের ঘোড়া, তাই অনায়াসে ছেড়ে দিতে চাইছে মন। মনে হবে পৃথিবীর আসন্ন অন্ধকার ঠেকানোর কোনো কৌশল সূর্য রাখে না। কিটসের মতো সূর্যকে তখন মনে হবে ‘maturing sun’ আর নিজেকে আচমকা তার ‘Close bosom-friend.’
নিজের অভিমানকে মনে হবে ভ্যপসা গরমে পানি ছেড়ে দেওয়া লবণ, যে এতদিন সমুদ্র ভেবে নিজেকেই পুষেছিল, লবণের খুঁড়িতে। নিজেকে ছেড়ে দিয়ে ফের মেনে নেওয়ার মতো শক্ত কাজটাও খুব সহজ মনে হবে, আশ্বিনের প্রথম শীত শীত অনুভবে। ঠিক তখন মনে পড়বে, কেউ কোথাও দাঁড়িয়ে ছিল ঘরপোষা বিড়ালের মতো, যাকে মনে হয়নি ঠিক কতটা প্রয়োজন। অথবা, ঘর হোক কিংবা বাহির, অন্যায় দেখলে তর্জনী উঁচিয়ে ছুটে যাওয়ার চেয়ে মন মেনে নিতে চাইবে সব, যেন অপমান সহ্য করতে পারাই সব অপমানের ঊর্ধ্বে উঠে যাওয়া।
আসা যাওয়া দুদিকেই খোলা রবে দ্বারÑ
যাবার সময় হলে যেয়ো সহজেই,
আবার আসিতে হয় এসো।
Ñদায়মোচন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ধীরে ধীরে ভালো লাগতে শুরু করবে স্টোয়িক দর্শন, পেন্ডুলাম আর কতক্ষণই বা দুলবে, স্থির হবে। যা পাওয়া হয়নি তার বোধ মিলিয়ে যাবে, যা পাওয়া হয়েছে তাও মনে হবে সবকিছু একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়ার ফল।
যদি এমন মনে হতে থাকে, যেন কিছুতেই কিছু আসে-যায় না, মনে হতে থাকে চারপাশ, সব থ্রিডি মুভির ট্রেইলার, তখন বুঝবেÑ হ্যাঁ, এই তো, এটাই শরৎ।
শহরে শরৎ আসে তাই মনে মনে।
শরতের নিজস্ব কোনো পাখি নেই, যেমন শীত কিংবা বসন্তের আছে। শ্যামা, শালিক, দোয়েল, বাবুইÑ সচরাচর যাদের দেখা যায়, তারাই থাকে। আশ্বিনের শেষের দিকে অতিথি পাখিরা একে একে আসতে থাকে, তখন শুরু হয় নতুন গল্পÑ রৌদ্র কুয়াশার রোম্যান্টিক চরাচর। কিন্তু শরৎ এমন না, কিছুটা দ্বৈত চরিত্রের, যেন এক মুহূর্তে সব চায়, পরমুহূর্তে কিছুই চায় নাÑ এমন এক শান্ত চড়ুই হয়ে শরৎ বসে জানালার গ্রিলে। ওর দিকে তাকালেই উড়ে যাবে ভেবে তুমি তাকাবে না তাকাবে না করেও তাকাবে আর উড়ে যাবার পর বুঝতে পারবে, শরৎ নিজেই একটা পাখি চরিত্র, ঋতুর রূপ ধরে, মানুষকে কিছু বলে, যা মানুষ বহুদিন শুনতে পায় নাই। কারণ অন্য কোনো ঋতু শোনার কান তৈরি করে না, দেখার চোখ তৈরি করে না, কেবল ছুটিয়ে নিয়ে বেড়ায়, তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়।
শরৎকে কেবল চাঁদ আর কাশফুলে বাঁধাই করে রাখায় শরৎ পাখির দারুণ অভিমান। সে তাই মানুষকে নিয়ে ছুটে যায় শহরের অবশিষ্ট জমিতে জন্মানো কিছু কাশফুলের কাছে। যেন মানুষ কিছু দেখে।
মানুষ মুগ্ধ হয়ে অথবা মুগ্ধ হবার ভান করে কাশফুল ছিঁড়ে নেয়, যেন সেগুলো মৃত রাজহাঁসের পালকÑ কিছু ঘরে নেবে; কিছু দেবে ফেলে, যেন তারা মানুষের মতো যারা দূর থেকে ভীষণ সাদা, কাছে আসতে আসতে ভেতরের দানা দানা ধূসরগুলো চোখে পড়ে। তাখন ‘পরানের গহিন ভিতর’ থেকে বাজতে থাকে ‘মানুষ এমন তয়, একবার পাইবার পর/ নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর।’ Ñসৈয়দ শামসুল হক
শরতের দাপট নেই, কিন্তু বোধ আছে যা মানুষের চিন্তার সাথে মিলে চাঁদের ঋতু করে ফেলে। অথচ চাঁদ কী এক ওভাররেটেড বিষয়, শহরের মানুষের কাছে। আর হবে না-ই বা কেন, ট্র্যাফিক জ্যাম ঠেলে ঘরে আসা অফিস করা মানুষের কাছে চাঁদের খুব পার্থক্য থাকে না, ইলেকট্রিক বাল্বের সাথে। শরতের চাঁদ বলে তাই আলাদা কিছু নেই। তাও কেউ কেউ শিশুর মতো দালানগুলোকে পর্দার মতো সরিয়ে সরিয়ে দেখে, মেঘের সব মাইন্ড গেইমিং শেষ। এখন সময় আপসের।