× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অকালবোধনের কাল

জুয়েইরিযাহ মউ

প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৫:৪১ পিএম

অলংকরণ : অরণী হোসেন অথৈ

অলংকরণ : অরণী হোসেন অথৈ

শরতের সাথে মেঘ আর আকাশের সম্পর্কের কথা বলাটা খুব ক্লিশে ব্যাপার। তবু শরৎ মনে এলেই আমার আকাশভর্তি মেঘ, ছাড়া ছাড়া মেঘ মনে আসে। মনে আসে অবনীর কথা।

বলতে ইচ্ছে হয়Ñ

বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস

এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে

পরাঙ্মুখ সবুজ নালিঘাস

দুয়ার চেপে ধরেÑ

‘অবনী বাড়ি আছো?’ Ñশক্তি চট্টোপাধ্যায় 

শেষ শরতে ফুটতে থাকা ফুল ছাতিম আমার তেমন প্রিয় নয়। তবু ছাতিমের ঘ্রাণ এই শহরের কোনো রাস্তায় আমাকে পেয়ে বসলে আমার নিজেকে মাতাল মাতাল লাগে।

আর কাশফুলকে বরাবরই আমার শৈশব-কৈশোরে দেখা মায়াবড়ির বিজ্ঞাপনের ইমেজ মনে হয়, মাথায় ঘোরে ‘যেন কাশফুলের নরম ছোঁয়া’। বরঞ্চ শরৎকে আমার দুর্গা প্রতিমার মুখজুড়েই বেশি প্রিয় মনে হয়। অকালবোধনের কাল যে শরৎ!

শরতে জেগে ওঠে পালপাড়া, ধুম পড়ে যায় শরৎ আসার আগে থেকেই প্রতিমা বানানোর। মাটির গন্ধ, প্রতিমা-শিল্পীদের রাত জেগে গড়ে তোলা দেবী প্রতিমূর্তি। মাঝে মাঝে আড্ডা, হাসি-গান। মাঝে মাঝে এই শরতেও বৃষ্টি চলে এলে তাদের মুখ হয়ে যায় কালো, ম্লান... এইসমস্ত নিয়ে আমার কাছে শরৎ জেগে থাকে।

প্রতিমা বানানো দেখতে এইবার দেওভোগ আখড়ায় গিয়ে পৌঁছলাম, প্রতিমাশিল্পী সঞ্জয় আমাদের সাথে গল্প করতে করতে প্রতিমায় মাটি লেপে দিচ্ছিলেন। তেরো-চৌদ্দ বছরের বাচ্চারা আশপাশে হৈ-হুল্লোড় করে বেড়াচ্ছিল। সঞ্জয় বলছিলেন তার বাপ-ঠাকুর্দার কথা, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রতিমাশিল্পী হয়ে ওঠার কথা। এর ফাঁকেই আমি বাচ্চাদের সাথে কথা বলছিলাম, ওদের চোখেমুখে পুজোর আগমনী আনন্দ যেন ঝলকে উঠছে।

আমাদের সন্তানেরা বড় হতে হতে আদতে কার কাছে কী কী শিখছে শিখবে আমরা তার কতটুকুই বা জানি! দেশের কাছেই বা কী শেখে আমাদের সন্তানেরা? শারদীয় দুর্গোৎসবই বাঙালির সবচে বড় উৎসব এই শরৎকালে, অথচ সে উৎসব ঘিরে এমন অসম্মানের জোয়ার কোথা থেকে আসে সে তো জানাই থাকে আমাদের।

আমি চোখ ফেরাই, মন ফেরাই। কেউ খড় দিয়ে গড়ে তুলছেন আকৃতি, কেউ জলে ভিজিয়ে নিচ্ছেন মাটি, কেউ কেউ অনেক কাজের চাপ কাটাতে একটু বসে জিরিয়ে নিচ্ছেন চা-সিগারেট খাওয়ার অবসরে। বাচ্চারা দৌড়ে বেড়াচ্ছিল খানিক আগে, ধীরে ধীরে তারা বাড়ি ফিরেছে বাসার বড়দের ডাকে, ব্যাপক অনিচ্ছা সত্ত্বেও।

এমন করে রাত বাড়ছে শরতের, এমন করেই এই বাংলায় রাত বাড়ে... ‘হাজার বছরের পুরনো সেই রাত’...

শরতের রাত আমার শিউলিফুলের ঘ্রাণের মতনও মনে হয়। যেমন ঘ্রাণ থাকে কোথাও বুকের বোতামে, কারও চুলে, করতলে। একটা কাতুয়া থেকে খসে পড়া শিউলি-ডিজাইনের বোতাম থেকে সেই ঘ্রাণের শুরু। কোনো এক শরৎকালে। এরপর সেই ঘ্রাণ ভেসে বেড়াতে থাকে স্মৃতিতে যুগের পরে যুগ। খোলা নৌকোয় শুয়ে শরতের যৌথ-আকাশ দেখতে দেখতে যখন হাওরের হাওয়া আর জল ছুঁয়ে থাকে, তখন ছোপ ছোপ সাদা কিংবা ধূসর মেঘ থাকে আকাশে।

একটা নীল নদীর প্রান্তে যেখানে দাঁড়ালে মনে হয় আকাশ আর দিগন্ত এক হয়ে গেছে জলের গভীরে সে ঠিক ততদূর বিস্তৃত। ততটাই গভীর। ততটাই মগ্ন থাকা চলে এই শরতে! আর সে চাইলেই জুটে যায় বেগুনী পালক... তামার মুদ্রা... ঝরনার জল... মুশকিল আসানের তন্তর-মন্তর... শরৎ এমনও। এমন স্মৃতিময়!

নাতিশীতোষ্ণ সন্ধ্যা আসে শরতে শহরের টঙ-চা ঘরে। হেঁটে যাওয়া পথেদের পাশে পড়ে থাকে ছিন্নমূল মানুষের কুড়ানো পলিথিন। ছোট ছোট কয়েকটি মুখ, রুক্ষ-শুষ্ক... আর মিমের চায়ের দোকানের বেঞ্চ থেকে দেখা যায় ভ্যানের সারিগুলো যেন ওপারের কোন্‌ দূরে। চাঁদ বুকে নিয়ে অন্ধকারে ভেসে ওঠে চমৎকার আকাশ। নীল-সাদা-ধূসরের কী দারুণ সংযোগ! আইল্যান্ডে দাঁড়িয়ে বটের ঝুরির ফাঁক গলিয়ে দেখা যায় মেঘ আসছে, যাচ্ছে, ভাসছে ভাসছে। আর চাঁদ সরে সরে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে কোথাও।

আমাদের স্বপ্নগুলো কেমন হয়! কিংবা অস্থিরতাগুলো! শরতের একেকটা সকাল আর দুপুর যেখানে উজ্জ্বল রোদ ধরে রাখে... যেখানে চড়ুই পাখি জানালার পাশে কিচিরমিচির... সেই সমস্ত আবহে বসে কেন ভেসে যাবে ঘর আলুথালু চেহারায়... পিঁপড়েভর্তি বিছানায়.... লেপ-তোশক-বালিশ-কাঁথা-বইপত্তর-মোবাইল ছড়ানো ছিটানো এক জঞ্জালে ভেসে গিয়ে গিয়ে তুমুল ইচ্ছে কেন জেগে থাকবে ক্যাফেইন আর নিকোটিনের?

শরৎ এমন, উৎসবের, মেঘের, খানিকটা জলের আর মাদকতার। শরৎ এমন রুমে ঝুলিয়ে রাখা একটা লালচে রাশিয়ান ছাতার যেখানে শরৎ আসে ‘বেবি লেটো’ নামে। যে ছাতা উপহার দিয়ে যান এমন কেউ যিনি দুর্দান্ত গাইতে পারেন রাগ-ভৈরবী। রাশিয়া আমার যাওয়া হয়নি, দেখা হয়নি বেবি-লেটোর কাল। তবু কোনো কফিশপে শরতের আকাশ দেখতে দেখতে কারও ভ্রমণের গল্প শুনতে শুনতে আমার দেখা হয়ে গেছে অদেখা এক দেশ, অদেখা কোনো বেবি-লেটোর কাল!

শরৎ তাই আমার কাছে অকালবোধনের আমেজ, শিউলির ঘ্রাণ, মেঘ, ঘোরগ্রস্ত চাঁদ আর রাশিয়ান ছাতা।  


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা