সোনিয়া আক্তার
প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৫ ১৪:০৫ পিএম
প্রথম মহাযুদ্ধের সমাপ্তি এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সূত্রপাতের মধ্যবর্তী সময়ে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) তার বিস্ময়কর কবিপ্রতিভা নিয়ে বাংলা সাহিত্যে আবির্ভূত হন। ইতোমধ্যে সংখ্যায়, বৈচিত্র্যে ও উৎকর্ষের দিক থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তখন রবীন্দ্রযুগের প্রতিষ্ঠা করেছেন। সে সময়ে অধিকাংশ কবি রবীন্দ্রনাথের মত ও পথ স্বীকার করে নিয়েছেন, তাদের কাব্য ছিল রবীন্দ্র-কাব্যের লক্ষণাক্রান্ত। সেই রবীন্দ্রযুগে যে কয়েকজন কবি স্বকীয় বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম তাদের অন্যতম। রবীন্দ্রকাব্য সাধনার এই মধ্যাহ্ন লগ্নে নজরুল-কাব্য এক পরম বিস্ময়কর সৃষ্টি। ভাব, বিষয়, আঙ্গিক এবং জীবন চেতনায় তিনি ছিলেন নতুন যুগের স্রষ্টা।
নজরুলের কাব্য বিশ্লেষণ করলে সেখানে দুটি আলাদা স্বতন্ত্র সুর পরিলক্ষিত হয়। একটি হলো প্রেমের সুর আরেকটি বিদ্রোহের সুর। নজরুল তার নিজের কাব্যের এই দুটি স্বতন্ত্র সুরকে প্রকাশ করেছেন এভাবে : ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতূর্য’। নজরুলের ‘বাঁশের বাঁশি’ ধারার কাব্যগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ ‘সিন্দু-হিন্দোল’, ‘দোলনচাঁপা’, ‘পুবের হাওয়া’, ছায়ানট’, ‘চক্রবাক’, ‘সন্ধ্যা’ প্রভৃতি। এই কাব্যগুলোতে নজরুলের প্রেমচেতনা ফুটে উঠেছে। অন্যদিকে ‘রণতূর্য’ ধারার কাব্যগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্যÑ ‘অগ্নিবীণা’, ‘সাম্যবাদী’, ‘বিষের বাঁশি’, ‘ভাঙার গান’, ‘সর্বহারা’ ইত্যাদি। এই শ্রেণির কাব্যগুলোতে নজরুলের বিদ্রোহী চেতনার স্বরূপ বিশেষভাবে বিধৃত হয়েছে।
নজরুলের প্রতিভা বিকাশের প্রথম পর্যায়ের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক আবহাওয়ার পর্যালোচনায় দেখা যায় এক অনিশ্চিত পরিবেশ, জাতীয় জীবনে তখন ঘন অন্ধকারের সমাবেশ আর প্রতিটি স্তরে নিপীড়িত জনগণের দীর্ঘশ্বাস দেশের বাতাস বিষাক্ত করছে। কাজী নজরুল ইসলাম এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা সাহিত্যে একটি নতুন সুর সংযোজন করলেন উৎপীড়িত জনগণের প্রতি সহানুভূতির মাধ্যমে। অকৃত্রিম সহমর্মিতা তার কাব্যে ও অপরাপর সাহিত্যসৃষ্টিতে সুস্পষ্ট হয়ে উঠল; সেই সঙ্গে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরের নির্ভয় উচ্চারণ বক্তব্যকে করেছে ব্যতিক্রমধর্মী ও শক্তিশালী। তার জীবন ও সাহিত্য একসূত্রে গাঁথা। তার অধিকাংশ কাব্যে স্বতন্ত্র কণ্ঠের বাণী প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীব্যাপী যে সামগ্রিক অবক্ষয় সূচিত হয় এবং ভারতের স্বাধিকার আন্দোলনের ফলে সমগ্র ভারতব্যাপী যে আলোড়নের সৃষ্টি হয় তার পটভূমিতে নজরুলের কাব্য রচিত হয়েছে। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তির প্রত্যাশায় সচেতন ভারতবাসী যখন অবতীর্ণ হয়েছে কঠিন সংগ্রামে, ঠিক তখনই নজরুল তার কাব্যে বিদ্রোহের সুরমূর্ছনা তুললেন :
‘বল বীর
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি আমারি নতশির ঐ শিখর হিমাদ্রির!’
সমগ্র জাতি মুহূর্তেই জেগে উঠল বিদ্রোহীর উচ্চকণ্ঠ আহ্বানে, ‘বিদ্রোহী কবি’ অভিধায় নজরুল হলেন অভিনন্দিত। বস্তুত ভাবপরিমণ্ডল, জীবনার্থ এবং প্রকরণ-প্রকৌশলে বাংলা কাব্যধারায় নজরুলের কাব্য এক সম্পূর্ণ মৌলিক সৃষ্টি।
শ্রেণিবৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায় নজরুল বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন যাবতীয় অপশক্তির বিরুদ্ধে, ধর্মীয় শোষণের বিরুদ্ধে এবং জীর্ণ-সনাতন মূল্যবোধের বিরুদ্ধে। কাজী নজরুল ইসলাম উপলব্ধি করেছিলেনÑ ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।’ মানবের মঙ্গলসাধনের জন্য তিনি লেখনী ধারণ করেছিলেন, যার ভিত্তি ছিল সাম্য ও সত্য। তাই তার সাহিত্যকর্ম সমাজসংস্কারের হাতিয়ার হয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছিল।
কাজী নজরুল ইসলাম সম্প্রদায় বিশেষের জন্য সাহিত্যসাধনা করেননি। সকল সম্প্রদায়-তথ্য সকল মানুষের জন্য তার উদার অন্তরের অপরিসীম সহানুভূতি উৎসারিত হয়ে উঠেছিল। সাম্যবাদের অনুপ্রেরণা ও মানবতাবোধ তার সাহিত্যের প্রধান উপজীব্য। তিনি সমাজের ভেতরে থাকা শ্রেণি-অসাম্য, ধনী-গরিব বিভাজন ও শ্রমজীবী মানুষের শোষণের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। তার কবিতায় শ্রমিক, কৃষক, মজুর ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মুক্তির স্বপ্ন ফুটে ওঠে। ‘দারিদ্র্য’ কবিতায় তিনি দারিদ্র্যকে হীন বস্তু নয়, বরং আত্মগৌরবের প্রতীক করে তুলেছেন।
নজরুল নারী-অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও অগ্রগামী ছিলেন। সমাজে নারীকে কেবল অবদমিত সত্তা হিসেবে দেখার বিপরীতে তিনি নারীকে স্বাধীন, সক্ষম ও সৃজনশীল শক্তি হিসেবে কল্পনা করেছেন। তার কবিতা ‘নারী’-তে তিনি নারীকে পুরুষের সমান আসনে প্রতিষ্ঠিত করে বলেছেনÑ
‘সাম্যের গান গাই-
আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই।’
ঔপনিবেশিক শাসনতন্ত্র, সেই সঙ্গে সমাজের সব রকম অন্যায়-অত্যাচারের-অবিচারের বিরুদ্ধে নজরুল ইসলাম বলিষ্ঠ বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। কবিহৃদয়ের অনির্বাণ বহ্নিজ্বালাই তার প্রধান অনুভূতি। তার গভীরতম চেতনায় যে ক্ষোভ, বঞ্চিতের প্রতি নিবিড় সহানুভূতি বজ্রাগ্নির মতো অসহনীয় উত্তাপে ফুটে উঠেছিল, তা প্রকাশ করার তীব্র আকুতিই তার কাব্যপ্রেরণার মূল উৎস। নজরুলের ভাষায়Ñ
‘আমি উন্মন মন উদাসীর,
আমি বিধবার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা-হুতাশ আমি হুতাশীর!
আমি বঞ্চিত ব্যথা পথবাসী চির-গৃহহারা যত পথিকের, আমি অবমানিতের মরম-বেদনা, বিষ-জ্বালা, প্রিয়-লাঞ্ছিত বুকে গতি
ফের!’
নজরুল ইসলাম যে মনোভাব তার কাব্যে প্রকাশ করেছেন তাতে প্রমাণিত হন তিনি প্রথমে সৈনিক, পরে কবি। এক সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন তার চোখে ছিল আর লেখাতে সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের সাধনা প্রকাশিত হয়েছে। তিনি কাব্যকে অবলম্বন করেছিলেন সংগ্রামের মাধ্যম হিসেবে। সে কারণে তার রচনায় সংগ্রামী মানসিকতার বলিষ্ঠ প্রকাশ ঘটেছে। তার সর্বস্বপণ ছিল দেশপ্রেম ও শোষণবিরোধিতা। কবির এ সংগ্রামী মনোভাবের অবসান ঘটবে সমস্ত শোষণের সমাপ্তিতে। তাই তিনি বলেছেনÑ
‘মহা-বিদ্রোহী রণক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে নাÑ
অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে নাÑ
বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত।’
বিশেষ সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে নজরুল ইসলামের বলিষ্ঠ মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছিল। সাময়িক প্রয়োজন মেটানোর দিকে তিনি সচেতন ছিলেন। তার মধ্যে চিরন্তন আবেদন কম বলে কারও কারও অভিযোগ রয়েছে। বাঙালির নিস্তরঙ্গ জীবনে আলোড়ন আনাতেই তার সার্থকতা বলে তিনি মনে করে বলেছিলেন, ‘বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই নবী।’ কাজী নজরুল ইসলামের কবিপ্রতিভার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কাজী আবদুল ওদুদ মন্তব্য করেছেন, ‘কবি নিঃসঙ্গ ব্যক্তি নন-কোন সমাজের বা জাতির তিনি প্রতিনিধি। নজরুল এ-যুগের বাঙালি জাতির প্রতিনিধিত্ব করেছেন প্রধানত জড়তার বিরুদ্ধে বারবার সংগ্রাম ঘোষণা করে ও নির্যাতিত জনসাধারণের পক্ষ সমর্থন করে; আর মুসলমান সমাজের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তাদের মনে নব নব আশা উদ্দীপনার সঞ্চার করে, বিশেষ করে বাংলার বা ভারতের আবহমান প্রাণধারার সঙ্গে তাদের প্রেমের নিবিড় যোগ স্থাপনের আহ্বান জানিয়ে।’
বাংলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলাম যে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের পরিচয় দিয়েছেন তা অন্যদের মধ্যে অনুপস্থিত। অবশ্য রবীন্দ্রনাথের মধ্যেও অন্যায়ের প্রতিবাদ আছে, অসত্যের প্রতি তিনিও ঘৃণা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু নজরুল ইসলাম যত বলিষ্ঠতা সহকারে তার এই মনোভাব প্রকাশ করতে পেরেছেন তা অন্য কারও মধ্যে পরিদৃষ্ট হয় না। আজহার উদ্দিন খানের মন্তব্য থেকে কাজী নজরুল ইসলামের প্রতিভার স্বরূপ অবহিত হওয়া যাবে। তিনি লিখেছেন, ‘বাংলা সাহিত্যে নজরুল ইসলামের আবির্ভাব বাংলার স্যাঁৎসেঁতে মাটি জলো বাতাস, ছায়াঘন নিকুঞ্জে দোয়েল শ্যামার কলতানের মধ্যে দৃপ্ত সিংহের ন্যায় গর্জনমদগর্বিত গজেন্দ্রের ন্যায় বিচরণ অপ্রত্যাশিত ও বিস্ময়কর। রবীন্দ্র যুগে শক্তিমান কবির সংখ্যা কম নয়। প্রকৃত প্রতিভার কবিও রয়েছেন অনেক, কিন্তু নজরুল ঠিক তাদের জাতের নয়। শীতলতার চেয়ে গ্রীষ্মের প্রখরতার তিনি বেশি পক্ষপাতী। বাংলাদেশের জ্যৈষ্ঠ মাসে যেরূপ গুমোট-গরম, সূর্যের উত্তপ্ত কিরণে যেমন চারদিকে ঝলসিয়ে ওঠে সেইরূপের সম্পূর্ণতা নজরুল-সাহিত্যে প্রতিভাসিত। আবার দারুণ গ্রীষ্মের মধ্যে যেমন মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয়ে ধরণীকে শীতল করে তারও সুর তার মধ্যে পাওয়া যাবে। তার প্রতিভাকে সমগ্রভাবে বুঝতে হলে তার কঠোর ও কোমলের, রৌদ্র ও জ্যোৎস্নার যথার্থ সমন্বিত রূপ আমাদের বুঝতে হবে। তার মানসে শক্তি ও সৌন্দর্যের যথার্থ মিলন ঘটেছিল বলেই তার পৌরুষ ছিল রুক্ষতাহীন এবং লাবণ্য হয়েছিল দুর্বলতাহীন।’
নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা আসলে বহুমাত্রিকÑ রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয়, সাহিত্যিক ও মানবতাবাদী। তার কবিতায় যেমন স্বাধীনতার ডাক শোনা যায়, তেমনি শোষিত মানুষের কান্না, ধর্মীয় সাম্যের গান ও নারী-মুক্তির স্বপ্নও ফুটে ওঠে। কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহ কোনো ধ্বংসযজ্ঞ নয়, বরং সৃষ্টিশীল মুক্তির সংগ্রাম, সমগ্র মানবতার চিরন্তন মুক্তিকামী কণ্ঠস্বর।