মাসুক হেলাল
প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৫ ১১:৫৪ এএম
আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৫ ১১:৫৯ এএম
বুলবুল চৌধুরী, ১৬ আগস্ট ১৯৪৮-২৮ আগস্ট ২০২১। প্রতিকৃতি : মাসুক হেলাল
বুলবুল চৌধুরী। বুলবুল ভাইয়ের বিখ্যাত বই ‘টুকাকাহিনী’। হুমায়ুন ফরীদি বুলবুল ভাইয়ের লেখার খুব ভক্ত ছিলেন। বুলবুল ভাইকে বাসায় দাওয়াত দিয়ে খাওয়াতেন। কোনো গল্প পছন্দ হলে বলতেন, ‘বুলবুল এই গল্পের কপিরাইট আমি নিলাম।’ বলে একমুঠো টাকা দিতেন বুলবুল ভাইকে।
১৯৭৯ সাল। আমি চারুকলায় পড়ি। বুলবুল ভাই ও আবু সাইদ জুবেরী মিলে ‘কথাসাহিত্য’ বলে একটা ট্যাবলয়েড পত্রিকা বের করতেন। পত্রিকাটির গদ্য লেখকদের ছিল। রাহাত খান ছিলেন সভাপতি। আঁকাআঁকি ও পেস্টিংয়ের কাজটা আমি করেছিলাম। এভাবেই আমার বুলবুল ভাই, জুবেরী ভাইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া। প্রায় চল্লিশ বছর হেয় গেল।
আমি তখন প্রায়ই ড্রয়িং করি কমলাপুর স্টেশনে, সদরঘাটে। রাতে কমলাপুর স্টেশনে অসংখ্য লোক শুয়ে থাকত। আমি রাত ১২টা-১টা পর্যন্ত স্টেশনে থাকতাম। হঠাৎ হঠাৎ দেখতাম, একটু দূরে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছেন বুলবুল ভাই। কখনও কখনও কবি আহসান হামিদ। আহসান হামিদ তখন দৈনিক সংবাদে কাজ করেন। শীতের রাত। গায়ে চাদর। কাটাকাটি করা গল্পের খসড়া বগলে নিয়ে ঘুরছেন বুলবুল ভাই। বলেছিলাম, ‘এত রাতে এখানে কী করেন বুলবুল ভাই?’ তার উত্তর, ‘মানুষ দেখি।’
বুলবুল ভাইয়ের এক বন্ধু ছিলেন হেলাল ভাই। হেলাল ভাই আত্মহত্যা করেছেন।
নারিন্দায় হেলাল ভাইয়ের ‘প্যাপিরাস’ নামে একটা প্রেস ছিল। সেখান থেকে অনেক লিটলম্যাগ বের হতো। বুলবুল ভাই প্যাপিরাসে তার বই, লিটলম্যাগের কাজে যেতেন। এখানে আড্ডা দিতেন ‘অন্ধ তীরন্দাজ’-এর লেখক কায়েস আহমেদ। এ ছাড়া আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শওকত আলী। তারা ছিলেন বুলবুল ভাইয়ের জগন্নাথ কলেজেরে শিক্ষক। বুলবুল ভাইকে খুব গুরুত্ব দিয়ে কথা বলতেন তার শিক্ষকরা।
বুলবুল ভাই, কবি আবুল হাসন একসময় কাজ করছেন টিপু সুলতান রোডের বিখ্যাত ‘ঝিনুক’ সিনেমা পত্রিকায়। এখনও বুলবুল ভাই হাঁটতে হাঁটতে বন্ধু আবুল হাসানের গল্প করেন।
বুলবুল ভাই বেলা নামের এক সুন্দরী যৌনকর্মীর ঘরে বসে লেখালেখি করতেন। আমরা এটা জানতাম। আামর বন্ধু গল্পকার সেলিম রেজা ও আমি সেটা দেখার জন্য একবার বহু কষ্টে কান্দুপট্টিতে হাজির হই। আমাদের শার্টের বোতার গলির দুই পাশ থেকে টেনে টেনে ছিঁড়ে ফেলে যৌনকর্মীরা। সেদিন বুলবুল ভাইকে পাইনি। কিন্তু কথাসাহিত্যের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির ছবি দেখেছি, বেলা বাঁধিয়ে রেখেছে ঘরে।
বেলা জানিয়েছিল, সমরেশ বসু, রাহাত খান ও বুলবুল চৌধুরী তার প্রিয় লেখক।
খবর পেয়ে বুলবুল ভাই পরদিন হাজির। বগলে ছবি নিয়ে লাজুক হেসে বলেন, ‘সর্বনাশ! কী করছেন মিয়া, চিনলেন কেমনে!’
বুলবুল ভাইকে অনেক জায়গায় অনেক প্রেস ব্যবসা করতে দেখেছি। গোপীবাগ, স্বামীবাগে। একবার দয়াগঞ্জ রেললাইনের পাশে বুলবুল ভাইয়ের প্রেস ছিল তখন। বুলবুল ভাইয়ের পার্টনার লম্বা সুলতান। এক সন্ধ্যায় সেলিম রেজা, গল্পকার আবু সাঈদ জুবেরী, মাহাবুব কামরান ও আমি হাজির হই সেখানে। আমাদের বিনয়ী বুলবুল ভাই রাত ৯টা বাজতেই বাংলা মদের ব্যবস্থা করলেন। পাশে সুলতানের দোতলা বিল্ডিংয়ের ছাদ। খাওয়া-দাওয়া হচ্ছে। রাত বাড়ছে। কেউ একজন নিচে নেমেছেন প্রস্রাব করতে। গেছে তো অনেকক্ষণ, সে আসছে না। তাকে খুঁজতে আরেকজন নিচে নামল। মোটামুটি নেশায় চুর সবাই। আমিও ভাবলাম, কি হলো, ওরা ফিরছে না কেন? সিঁড়ি দিয়ে নামতেই কেউ একজন আমায় চেপে ধরে, ‘চুপ, দেখ!’ আমার পিছু পিছু বুলবুল ভাই। তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে ‘দেখেন’। মোটা পাওয়ারের চশমা বুলবুল ভাইয়ের। এক হাত দূরেও ভালো কিছু দেখেন না, অন্ধকারে কী দেখবেন! উঠানে বেড়া দেওয়া কুয়ার পাড়ে একটা তরুণী নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কুয়া থেকে পানি তুলে কেউ একজন তার শরীরে ঢালছে। সেলিম আমাকে বলল, ‘ভালো কইরা দেখো মিয়া ড্রয়িংটা, তোমার কাজে লাগব।’
বুলবুল ভাই ফস করে সিগারেট জ্বালিয়ে বসেন। ‘কে কে ওখানে?’ আমরা সিঁড়ি দিয়ে ছাদের দিকে দৌড়াতে থাকি। ওই লোক আমাদের পিছু পিছু উঠে। পিস্তল হাতে প্রথমে আমাদের বেঁধে ফেলে। ইংরেজিতে গালাগাল দিচ্ছে। বারবার বলছে আমাদের পুলিশে দেবে।
তিনি অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা। বুলবুল ভাই বারবার বিনয়ের সঙ্গে বলছেন, ‘আমরা এমন মানুষই না চাচা, চাচিরে এমন অব্স্থায় দেখব।’
আমরা পিছমোড় বাঁধা অবস্থায় উবু হয়ে বসে আছি। চাচা ঘুরে ঘুরে বলছেন, ‘এজনই হাবিলদার কবি নজরুল বলেছেন…।’
বুলবুল ভাইয়ের কয়েকটা স্কেচ করেছিলাম। একটা বুলবুল ভাই নিয়ে গেছে, আর দুয়েকটা ধ্রুব এষের কাছে আছে। করোনার জন্য দেওয়া গেল না।