× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জুলাই বিপ্লব ও তার ঐতিহাসিক সিলসিলা

আসমা সুলতানা শাপলা

প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০২৫ ১৬:১২ পিএম

জুলাই বিপ্লব ও তার ঐতিহাসিক সিলসিলা

২০২৪ সালের জুন-জুলাই-আগস্ট মাসজুড়ে যা ঘটেছিল তাকে আমি অভ্যুত্থান নয় বিপ্লব বলতে চাই। রাষ্ট্রচিন্তকদের মতে, অবৈধভাবে নির্বাচিত সরকারকে তার বিরুদ্ধাচারণ করে দল বা কোনো গোষ্ঠীর দ্বারা ক্ষমতাচ্যুত করা বা জোরপূর্বক পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হলো অভ্যুত্থান। কখনও কখনও সামরিক বাহিনীর সদস্যরা রাষ্ট্রের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান ঘটায়, যা আমরা বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট এবং ১৯৯০ সালের ৩০ নভেম্বরে দেখেছি। দেখেছি অভ্যুত্থানের পর কীভাবে সামরিক অথবা বেসামরিক শক্তি ক্ষমতা দখল করে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিল। 

অপরদিকে শাসন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের জন্য একটা সমাজের শ্রেণি বা রাষ্ট্রের জাতিগত বা ধর্মীয় কাঠামোর দ্রুত ও মৌলিক রূপান্তরকেই বিপ্লব বলা হয়। এরিস্টটলের ‘দ্য পলিটিকস’ বলে, বিপ্লব একটা সমাজে বিদ্যমান শোষণমূলক জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা থেকে শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের লক্ষ্যে পরিচালিত হয়। এটা গণমানুষের দাবি ও স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে এবং নতুন সমাজের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর তৈরি করতে সাহায্য করে। বিপ্লব একটা দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের লক্ষ্যে ঘটিত হয়; যা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় ও রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে কাজ করে।

বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব তেমনই একটা স্বৈরাচারী শাসকের ফ্যাসিবাদী চরিত্রকে উৎখাত করার নিমিত্তে সংগঠিত আন্দোলন। সেখানে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূর্ণরূপ প্রতিফলন পাওয়া গেছে। ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক চর্চার মধ্যে এসে যায় জনগণের মানবাধিকার হরণ। তারা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে দরকার মতো অতিরিক্ত ক্ষমতা দেয় এবং তাদের বিরুদ্ধে কথা বলা পছন্দ করে না। দরকারে কথা বলার মুখ বন্ধ করতে যা যা সন্ত্রাস সম্ভব যেমনÑ গুম, খুন তার সবই করে। গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করে। নির্দিষ্ট দলের স্বার্থ রক্ষা করে এবং প্রহসনমূলক নির্বাচন করে; যার সবগুলোই এক দশক ধরে বাংলাদেশে চলে আসছিল। ফ্যাসিস্টরা সব সময় তাদের দ্বারা সংগঠিত সমস্যা আরেকজনের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে; যার জলজ্যান্ত প্রমাণ আমরা দেখেছি ২০২৪ সালের জুলাই মাসের ১৮ তারিখ আবু সাইদকে হত্যার মাধ্যমে। বিচারবহির্ভূত এই হত্যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্ব দেখেছে। অথচ ফ্যাসিস্ট সরকার পুলিশ কর্তৃক এই একস্ট্রা জুডিসিয়াল কিলিংকে পুলিশের হত্যা নয় বলে প্রচার করার জন্য প্রয়োজনীয় দলিল সংগ্রহ করতে চাপ প্রয়োগ করেছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাঁচবার পরিবর্তন করেছে এবং কর্তব্যরত ডাক্তারকে নানা প্রলোভন দেখিয়েছে রিপোর্ট বদলাতে। দেখেছি খুন করার পর ছাত্রদের লাশ পুলিশ কর্তৃক পুড়িয়ে ফেলতে। দেখেছি হেলিক্টার থেকে গুলি করতে। দেখেছি রাষ্ট্রের ছায়াতলে সরকারের নির্দেশে স্নাইপার ও ল্যাথাল উইপেন দিয়ে সাধারণ ও নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে হত্যা করতে। 

কিন্তু এই বিপ্লবকে কেবলমাত্র ২০২৪ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের নিরীখে একটা তাৎক্ষণিক উত্তেজনার পারগেশন ভেবে বিচার করলে ভুল হবে। কোনো পরিকল্পিতভাবে ডিজাইন করা রাজনৈতিক ঘটনা বলে একে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। যদি আমরা বাংলাদেশের অতীত আন্দোলনগুলোর বিষয়ে গভীরভাবে খেয়াল করি। 

১৯৬৯ সালের ছাত্র-জনতার অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে যে গণআন্দোলন ঘটেছিল তার কথা ভাবুন। তৎকালীন রাজনৈতিক দলগুলোর বদলে ছাত্র ঐক্যফ্রন্ট ছিল বেশি পরিমাণে শক্তিশালী-রাজনৈতিক জোট। সে আন্দোলনে কৃষক-শ্রমিকসহ সব ধরনের মেহনতি মানুষ যুক্ত হয়ে আন্দোলনটাকে এতটাই উচ্চপর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল, যাতে আইয়ুব খানের মতো শক্তিশালী একনায়ক টলে যেতে বাধ্য হয়েছিল। সংসদীয় রাজনীতির পথ বাদ দিয়ে ৬৯-এর গণআন্দোলনই অভ্যুত্থানের পথে এগিয়ে গিয়েছিল।

একইভাবে কোটা আন্দোলন বিরোধিতা করে ছাত্রদের আন্দোলন শুরু হলেও পরে হাসিনা পদত্যাগের এক দফার দাবিতে যতটা না রাজনৈতিক দলগুলো অগ্রগামী ছিল তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি পরিমাণে অংশগ্রহণ করেছিল সাধারণ মেহনতি মানুষ। ১৭ বছর যাবত এত এত গুম-খুন আর রাজনৈতিক দলন পীড়নের শিকার হয়েও বাংলাদশের প্রধান রাজনৈতিক দলটি যা করতে পারেনি, তাই করে দেখাল সাধারণ ছাত্র-জনতা ও তার কাতারে দাঁড়িয়ে প্রথমে মা-বাবা পরে শিক্ষক ও তার পর সমগ্র বাংলাদেশের সাধারণ শ্রেণি-পেশার সব মানুষ। তারই ফলে একজন ভয়ানক ও সশস্ত্র ফ্যাসিস্ট/মাফিয়া সরকার পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল।

৬৯-এর গণঅভুত্থানটা ছিল মূলত ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের একটা প্রস্তুতি। ৭১ নিয়ে আছে ইতিহাসের জটিল ধাঁধা। প্রচলিত বা মেকিং ইতিহাস জনসাধারণকে দূরে সরিয়ে রেখেছে অনেক দূরে। জনআকাঙ্ক্ষার খতম হয়েছিল ১৯৭২-এর সংবিধানের দ্বারা। স্বাধীনতার চেতনা ৭২-এর সংবিধানে ছিল না। কেবল মুজিব পরিবারকে দেওয়া হয়েছি শাসনের ভার। মুজিবুর রহমান তো পাকিস্তান ভাঙতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন অখণ্ড পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে যদিও সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে জয়ী হয়ে তার চাওয়াটা আমি মনে করি, ব্যক্তি মুজিবের পক্ষে স্বাভাবিক ছিল কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের আড়চোখ, অসম-বণ্টন, বঞ্চনার কুটিল ও জটিল সম্পর্ক। ফলে ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার যুদ্ধটা ছিল অনিবার্য। বাঙালি মুসলমানের বিরাট অংশের যুদ্ধ ছিল এটা। ১৯৭১ ছিল একটা জনযুদ্ধ। ২৩ বছরের দুঃশাসন যন্ত্রণা-বঞ্চনা, শোষণের বিরুদ্ধে গণজোয়ার গণজাগরণ। এখানেও ছাত্ররা অনেক বেশি পরিমাণে সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ ছিল। কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর ফ্যাসিস্ট সরকারের পূর্বসূরিদের কাজগুলো বিশ্লেষণ করলে ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবের সঙ্গে অনেক কিছুরই ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যাবে। 

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধেও পরের সংবিধানের চার মূলনীতি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাÑ এগুলো কি আপামর জনগণের মতামতের ভিত্তিতে ছিল? ছিল না। কোনো অভিভাবক কাউন্সিল গঠন হয়েছিল। না, হয়নি। ফলে চার মূলনীতির সঙ্গে ভারত ও আওয়ামী লীগের পরবর্তী রাজনৈতিক বন্দোবস্ত পাকা হয়েছিল। জনগণ অদরকারি হয়ে থাকল। সমাজতন্ত্রের আওয়াজ তুললেও সংবিধানে এ বিষয়ে কোনো উচ্চবাচ্য আওয়ামী লীগ সরকার করেনি। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা তো বটেই এমনকি আওয়ামী লীগ সমর্থক বুদ্ধিজীবীদেরও একটা দুরারোগ্য চিন্তাগত রোগ হয়ে থাকল এই যে, তারা বাংলাদেশকে ১৯৭৫ সালের পূর্ব ও ১৫ আগস্ট-পরবর্তী পর্যায়ে ভাগ করেন। তারা বলেন, উল্লিখিত সময়ে দেশের জনগণের অবস্থা ছিল সোনায় সোহাগা। দেশের সব রকম দুর্গতি তার পরের সময় দেখা গেছে। কারণ পরের পর্যায়ে নানা দুঃষ্কৃতির মধ্যে নিহিত আছে। এসব নিয়ে বহু লেখালেখি আছে, তা এই লেখায় তুলে ধরা সম্ভব না। কেবল এটুকু সাধারণ বিবেক বুদ্ধির জোরে বলতে পারি, ১৯৭১-এর যে চাওয়া তা পরের সময়গুলোতে পূর্ণাঙ্গভাবে পূরণ হয়নি। 

২০২৪ বিপ্লবের শুরুটা কেবল জুলাই থেকে বা কোটাবিরোধী আন্দোলনের জন্য রাজাকারের নাতিপুতি বলে ট্যাগ দেওয়ার মুহূর্ত থেকে বা আবু সাঈদকে প্রকাশ্যে নিরস্ত্র অবস্থায় গুলি করে মারার মধ্য দিয়ে তা ভাবলে ভুল হবে। এর সঙ্গে পূর্বক্তো রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের রয়েছে একটা গভীর সম্পর্ক। যতটুকু রাজনৈতিক বোধবুদ্ধি বা প্রজ্ঞা আমার রয়েছে তা থেকে বলতে পারি, শুরুটা আসলে হয়ে গেছে ১১-এ নির্বাচনে মানুষকে ভোট দিতে না দেওয়ার পরপরই। যদিও কথিত আছে ২০০৮ সালের নির্বাচনে মানে ওয়ান ইলেভেন ব্যর্থ হওয়ার পর আওয়ামী লীগকে আনার জন্য দিল্লির ষড়যন্ত্র ছিল, তখনও তবু যদি মনে করি সেটা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই হয়েছিল, কারণ তখন সদ্য বিতাড়িত চার দলিয় জোট সরকারেরও দুর্নীতির দায় ছিল। ফলে সেই নির্বাচনকে ভোটের নির্বাচন না হয় ধরলামই কিন্তু পরের নির্বাচন আসার আগেই আওয়ামী লীগ দুর্নীতির পাশাপাশি বিরোধী মত দমনে চরমপন্থা অবলম্বন শুরু করে দেয়। ক্ষোভ তো ১১-এর নির্বাচনের আগেই শুরু হয়ে গেছিল। জনগণের এসব ক্ষোভ-টোভ বাদ দিয়ে ২৪-এর বিপ্লব বোঝা যাবে না। কারণ তিলে তিলে বিচ্ছিন্ন কয়েকটা আন্দোলন পার হয়ে শেষমেশ এই বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে।

যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে শাহবাগ সৃষ্টি। যদিও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সব বাংলাদেশির চাওয়া ছিল, কিন্তু এর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। ফলে শাহবাগ ছিল তখন ক্ষমতার মব, যেখানে ক্ষমতার বাইরের বৃহৎ জনগণের একটা অংশ এতে জড়িতই ছিল না। আমরা জানি, বামবলয় ও আওয়ামী লীগের বলয়ে এই শাহবাগের মব তৈরি করে বিরোধীদের দমনের মিডিয়া সম্মতি তৈরি করেছিল। 

তার পর আসি বিডিআর হত্যাকাণ্ড। দেশপ্রেমিক সেনা অফিসারদের হত্যার পেছনে যে আর্মিকে মেরুদণ্ডহীন করা হয়েছিল, এটা দেশের মানুষ বুঝতে শুরু করে। তার পর আসি শাপলায় গণহত্যা। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ধর্মীয় গোড়ামির বিরুদ্ধে সব সময়ই সোচ্চার। তেমনই হুজুরদের ওয়াজের নামে নানা কুৎসার বিপক্ষে বাংলাদেশের মুসলমান সমাজ অবস্থান সুস্পষ্ট হলেও প্রকৃত আলেম-উলামার ওপর বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা তাদের জন্মগত ও পারিবারিক। ধর্মীয় অনুশাসন তেমন করে না মানলেও মোটাদাগে বাংলাদেশের মুসলমান সমাজ ধর্মপ্রাণ ও আলেম সমাজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। শাপলায় এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড আরও একবার সাধারণ বাংলাদেশি ছাত্র-জনতার মনের ভেতর এক প্রচণ্ড ক্ষোভের জন্ম দেয়; যা ধিকিধিকি জ্বলতে থাকে ১০-১১ বছর ধরেই। এ ছাড়া নিয়মিত রিজার্ভ চুরি, টেন্ডারবাজি, জেল, গুম, খুন, সংখ্যালঘু নির্যাতনের নাটক সাজিয়ে মুসলমানদের দোষী সাব্যস্ত করা, দাড়ি-টুপি পরা দেখলেই জঙ্গি ট্যাগ দেওয়াÑ এসব তো চলছিলই। ফলে গণঅভ্যুত্থানের আগেও আরও দুটা বিপ্লবের আলামত ঘটেও ঘটতে পারেনি। কারণ সেগুলোকেও পুলিশ-র‌্যাবের হত্যার মিশনে পরিণত করা হয়েছিল।

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত একদলীয় শাসন ব্যবস্থা ও এক ব্যক্তির শাসন থেকে জনগণের আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন না হওয়ার যে আক্ষেপ তা আরও জোরালো হলো ২০০৮ থেকে ২০২৪ জুলাই বিপ্লবের দিন পর্যন্ত। এই সময়টার একটা দলিল আপনাদের সামনে তুলে ধরতে পারলে খুব ভালো হতো। কিন্তু এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে অতটা সম্ভব না বিধায় খুব সংক্ষেপে আমি এখানে সেটা বোঝানো চেষ্টা করছি।

আওয়ামী শাসনামলে গত ১৫ বছরে শুধু সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের হাতে খুন হয়েছেন ৩৯ জন বাংলাদেশি ছাত্র-জনতা, যারা বেশিরভাগই উদীয়মান তরুণ যুবক। ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর শিবির সন্দেহে পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের দর্জি বিশ্বজিৎ দাসকে প্রকাশ্যে দিনের আলোয় নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হলো। নিরীহ বাংলাদেশবাসী গোপনে কাঁদল কী কাঁদল না, জানি না। কিন্তু ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রতি ক্ষোভের প্রজ্বলন বুকের ভেতর তীব্র হলো, তা বুঝতে আমাদের তখন বাকি থাকল না। ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ছাত্র আবরারের হত্যাকাণ্ডে নির্বাক বাংলাদেশ। সাধারণ বাংলাদেশিদের বুকের ভেতর আগুনের জ্বলন আরও তীব্রতর তখন। ফ্যাসিস্ট তা আঁচ করতে পারেনি। এগুলো শেষের ১০ বছরের কথা। তারও আগে ২০১০ সালে ছাত্রলীগের ভেতরের কোন্দলে আবু বকর খুন ও ছাত্রলীগের ১০ জন আসামিকে বেকসুর খালাস। ২০১২ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবায়ের আহমেদ, ২০১০ সালে চট্টগ্রামের রেলস্টেশনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মহিউদ্দিন কায়সারকে কুপিয়ে হত্যা, ২০১২ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালের শিবিরকর্মী মুজাহিদ ও মাসুদ বিন হাবিব হত্যা, ২০০৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে হল দখলের জেরে শিবিরের শরিফুজ্জামান নোমানী হত্যা, একই দিনে ১৫ আগস্ট টোকেন ভাগাভাগি নিয়ে নিজ দলের কর্মী নাসিরুল্লাহ নাসিমকে হলের দোতলার ছাদ থেকে ফেলে হত্যা, ২০১২ সালে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের গোলাগুলিতে আব্দুল্লাহ আহসান সোহেল ও রুস্তম আলী, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপে গোলাগুলিতে ১০ বছরের শিশু রাব্বি নিহত, ২০১৪ সালে দলের নেতাকর্মীদের হাতে নিহত আশরাফুল হক, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাহিম মাহফুজ, জাকারিয়া ও মিল্টন, ২০১২ সালে রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবদুল আজিজ খান, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুমন চন্দ্র দাস, ২০১০ সালে সিলেট এমসি কলেজের ছাত্র উদয় সিংহ দাস, ২০০৯ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের আবুল কালাম আজাদ, ২০২২ সালে ইফতার টেবিল বসানো নিয়ে নিউমার্কেটের দুই দোকানির ঝগড়ায় ছাত্রলীগের কর্মীরা যোগ হয়ে উত্তেজনা তৈরি করলে সহিংসতায় নাহিদ হত্যা, এমন অসংখ্য ছাত্র হত্যাকাণ্ড খেয়াল করলে দেখবেন একই সঙ্গে সাধারণ পথচারী কিংবা ছাত্র, শিবির এবং ছাত্রলীগের নিজেদের দলের কর্মী ও নেতা হত্যাকাণ্ডে এক ভয়ানক হত্যাযজ্ঞপুরী হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ। সঙ্গে র‌্যাবের ক্রসফায়ারের বিরোধী মতামতের খুন, বিএনপির নেতাকর্মীদের খুন, হত্যা, গুম, ইলিয়াসের নাটকীয় হত্যা ও তার পরিবারকে নাটকীয় সমবেদনা জানানো, বিএনপি নেত্রী বেগত খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ, মামলা, চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে না দেওয়া, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি বিষোদগার ও মামলা এত কিছুর পরও শেষ রক্ষা হয়নি। এসব ঘটনা যার প্রতিটি একেকবার করে সাধারণ ছাত্র-জনতার ভেতরে বুনে দিয়েছিল বিপ্লবের বীজ। তাই ঠিক ১৯৭১ সালে যেমন প্রশিক্ষিত ও সাঁজোয়া পাকিস্তানি আর্মির বিরুদ্ধে জয় হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের। সাধারণ জনগনের যুদ্ধ তেমনই ২০২৪-এ আমরা দেখেছি রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী, পুলিশ, ছাত্রলীগের আর্মড বাহিনীর বিরুদ্ধে আমাদের নিরস্ত্র সাধারণ ছাত্র-জনতার দুর্বার বিজয়। সাধারণ জনগণের এসব ক্ষোভ ও হারানোর শোক পরিণত হয়েছিল শক্তিতে। এটাই নিয়ম। জুলুম যখন মাত্রা অতিক্রম করে প্রচলিত রাজনৈতিক শক্তি বা দলগুলো বাইরে গিয়ে সাধারণ-জনমানুষের ক্ষোভ আর রাগ যখন একত্রিত হয়ে সমষ্টির শক্তিতে আবির্ভূত হয়; তখনই নেমে আসে ফ্যাসিস্টের পরাজয়, তা যত শক্তিশালীই হোক। আর এসবেরই অনিবার্য ফলস্বরূপ ঘটেছিল ২০২৪ এর অবিস্মরণীয় বিপ্লব। তাই বলি ২০২৪ বিপ্লবের সঙ্গে যেমন সমকালীন কোটাভিত্তিক মেধা ও চাকরিতে সুযোগের বিরুদ্ধাচারণের সম্পর্ক আছে; তেমনি এর ঐতিহাসিক সিলসিলাকেও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা