মোহাম্মদ আসাদ
প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০২৫ ১৬:১৭ পিএম
হামিদুজ্জামান খান ইউরোপ-আমেরিকার ভাস্কর্য দেখেছেন। কোরিয়ার সিউল অলিম্পিক পার্কে রয়েছে তার ভাস্কর্য। ভাস্কর্য পার্কের কনসেপ্ট তার সেখান থেকেই। তিনি সব সময় ভাবতেন একটি ভাস্কর্য পার্ক করার। সাভারের একটি জায়গা রয়েছে তার। সেখানে ভাস্কর্য পার্ক করার চেষ্টা করেছিলেন। রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে চিন্তা করে সেটা আগায়নি। এশিয়ান বিয়েনালে শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অনেকের ভাস্কর্য নিয়ে একটি ভাস্কর্য পার্ক তৈরি করেছিলেন। এ দেশের শিল্পীদের বাধার মুখে সেটা ভেস্তে যায়। শেষ পর্যন্ত ‘হামিদুজ্জামান স্কাল্পচার পার্ক’ বা হামিদুজ্জামান ভাস্কর্য পার্ক গড়লেন গাজীপুর কড্ডায় সামিট পাওয়ার প্লান্টের ভেতর। একটি ম্যুরাল বা দেয়ালচিত্রকে কেন্দ্র করে এই ভাস্কর্য পার্কের সৃষ্টি। দেয়ালচিত্রটি দৈর্ঘ্যে ও উচ্চতায় যথাক্রমে ৪০০ ফুট বাই ২৩ ফুট। এটি এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সব থেকে বড় দেয়ালচিত্র। বহিরাঙ্গনে এত বড় দেয়ালচিত্র দেশে তো নেই, দেশের বাইরেও আছে বলে জানা নেই।
২০১৮ সালের আগস্ট মাস। স্যার নোটিস দিলেন গাজীপুরে একটি দেয়ালচিত্র করছেন সেখানে যেতে হবে। হামিদুজ্জামান খানের সফর সঙ্গী হওয়া অনেক আনন্দের। আমরা সকালেই গিয়ে পৌঁছলাম স্পটে। ৪০০ ফুট দেয়াল বিশাল একটি ক্যানভাস। তার ওপর এমএস লোহা, স্টিল এবং পাথরের অনেক নকশা। আছে নানা আকৃতির বৃত্ত। এই নকশাগুলোর নিচে একটি স্টিল পাইপ দিয়ে যুক্ত করলেন। দেয়ালের রঙ দেখ কাজটা একটুও ভালো লাগছিল না। পরে দেয়ালে দিল সাদা রঙ লাগিয়ে। অসাধারণ হয়ে উঠল দেয়ালচিত্রটি।
হামিদুজ্জামান খান ১৬ ফুট, ২০ ফুট ছবি এঁকেছেন অনেক। তার চেয়েও একটু বড় আকারের কাজ করার ইচ্ছা ছিল বহু দিনের। এই দেয়ালটা পেয়ে তার স্বপ্ন পূরণের একটা স্পেস পেলেন। তিনি বহুদিন ধরেই বহিরাঙ্গনে স্কাল্পচার গড়ে স্পেস চেঞ্জ করার কাজ করে চলেছেন। বাড়ির সামনে বা বাগানে একটা ভাস্কর্য থাকলে সে জায়গার চেহারাটাই বদলে যায়। বিশাল এই ম্যুরালের কর্মযজ্ঞ প্রাথমিকভাবে শেষ করতে সময় লেগেছে এক বছর। এক সময় হামিদুজ্জামান খানের মনে হলো এবার একটা পূর্ণতা এসেছে। সবাই পছন্দ করছে। ২০২০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পার্কটির উদ্বোধন করেন। উদ্বোধন হলেও প্রতিনিয়তই সেখানে বসিয়েছেন নতুন নতুন ভাস্কর্য। মৃত্যুর আগেও কয়েকটি ভাস্কর্য বসিয়েছেন। কয়েকটির কাজ রয়েছে অসমাপ্ত। তার সহধর্মিণী আইভি জামানও ভাস্কর। আশা করি তিনি তার এই অসমাপ্ত কাজ শেষ করবেন।
সুন্দর এই পার্কের ল্যান্ডস্কেপটা কিন্তু প্রথমে এমন ছিল না। উঁচু-নিচু মাটি, বালি এখানে-ওখানে পড়ে ছিল। দেয়ালেরও অনেক পরিবর্তন করতে হয়েছেন। ৪০০ ফুট লম্বা দেয়ালের মাঝে মাঝে পিলার দিয়ে খোপ খোপ ছিল। তিনি সেই খোপ ভরাট করে দিয়ে প্লেন একটা দেয়াল বানিয়ে দিতে বললেন। আর ওপরে জানালায় রঙিন কালার কাচ ছিল সেটা বাদ দিয়ে সাদা কাচ লাগিয়ে দিতে বললেন। ইঞ্জিনিয়ার বলল, এটা সম্ভব, কিন্তু দেয়াল মোটা হয়ে যাবে। খরচ বাড়বে। কর্তৃপক্ষ বলল, খরচ যা-ই হোক, দেয়াল স্ট্রেট করে দেন। এই দেয়ালটি ক্যানভাসে রূপান্তর করতে দেয়ালের পুরুত্ব। দাঁড়াল ১৫ ইঞ্চি। ৪০০ ফুট এই দেয়ালটি প্লাস্টার করে দেওয়ার পর এটা নিয়ে ভাবতে শুরু করলেন হামিদুজ্জামান খান। ৪০০ ফুটের এই দেয়ালের উচ্চতা ২৩ ফুট। মধ্যখানে একটা জানালা আছে আড়াই ফুটের। ৪০০ ফুটের বিশাল এক দেয়াল তাকে ক্যানভাস হিসেবে দেওয়া হলো। এই বিশাল দেয়াল ধরে একটা নকশা করে সামিট গ্রুপের কর্ণধার আজিজ খানের কাছে নিয়ে গেলেন। ডিজাইনটি দেখেই তিনি বললেন, হ্যাঁ, এটাই তো চেয়েছিলাম। হামিদুজ্জামান খান কাজ শুরু করলেন। কোনোরকম রঙ ছাড়া একটি দেয়াল তখন। সেটার মধ্যেই কাজ শুরু করেছিলেন। এখানে বিষয় করে এনেছেন ইন্ডাস্ট্রি ও আর্ট। ইন্ডাস্ট্রির আলাদা কিছু ফর্ম আছে। সেগুলো ইন্ডাস্ট্রির রিপ্রেজেন্ট করে। পার্কটা করা হয়েছে যেখানে সেটা একটা বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী ইন্ডাস্ট্রি। ইন্ডাস্ট্রির মেশিনপত্রের মূল অংশটিই চাকা। মেশিন চালু করলেই চাকা ঘুরতে থাকে। চাকা ঘুরলেই উৎপাদন। উৎপাদন মানে উন্নয়ন, এগিয়ে যাওয়া। বিদ্যুৎ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ হলো টারবাইন। সেটার ফর্মও চাকার মতোই। তিনি এই দেয়ালটিতে চাকা, টারবাইন দিয়ে সাজিয়েছিলেন। নানা আকারের চাকা। কোথাও বড়, কোথাও ছোট। নানা শেপের সেসব চাকা। কোথাও আবার চাকার অংশবিশেষ। এই চাকাগুলো কোনোটা মার্বেল পাথরের, কোনটা স্টেইনলেস স্টিলের, কোনোটা সাধারণ লোহার। কোনোটা আবার পাথরের ভেতর অন্যরকম পাথর কেটে বসানো। চাকাগুলো পুনঃপুন ব্যবহার করে ইন্টারেস্টিং করা হয়েছে। আরো বড় বিষয় হলো কাজটিতে অনেক স্পেস আছে। বিদ্যুৎ কী? একটি গতি, সব সময় চলমান। নিচে একটা স্টিলের পাইপ দিয়ে লাইন বানিয়ে সাবজেক্টগুলোকে একটার সঙ্গে আরেকটার সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে পেইন্টিংয়ের রীতিগুলো ব্যবহার করার চেষ্টা করেছি। এটা সফলভাবেই করেছি। যেখানে কাজ করেছি, সেখানে মাটি তিন ফুট নিচে ছিল। সেটা ভরাট করা হয়েছে। এখানের কাজ করে যখন এগিয়েছে, যখন গাছ লাগানোর সময় হয়েছে, তখন তিনি এদিক-সেদিক কিছু ভাস্কর্য বসিয়েদিলেন। আরও একটি দেয়াল ছিল ২০০ ফুট। সেখানে কাজ করার পর জায়গাটা বড় হয়ে গেল। এরপর একদিন আজিজ খানকে বললেন জায়গাটা সুন্দর হয়েছে, এটাকে সামিট স্কাল্পচার পার্ক করে দেন। এই দেশে তো স্কাল্পচার পার্ক নেই। এটা সুন্দর একটা স্কাল্পচার পার্ক করা যাবে। দুদিন পর হামিদুজ্জামান খানকে ডেকে বললেন, আমি ডিসাইড করেছি, এটাকে হামিদুজ্জামান স্কাল্পচার করা হবে। এটাতে অফিসের লোকজনও অবাক হয়ে গেল। অবাক হলাম হামিদুজ্জামান খানও। আবার আনন্দে আত্মহারা হলেন তিনি। তার সারা জীবনভর দেখা স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। একজন আজিজ খানের এই বিশাল মনের পরিচয় পেলেন। তারপর ভাস্কর্য বসানো শুরু করলেন। নতুন নতুন জায়গা তৈরি হচ্ছে। সেখানেই বসানো হচ্ছে ভাস্কর্য। উদ্বোধন করার পরও নতুন অনেক স্কাল্পচার বসানো হচ্ছে। আসলে এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া ছিল। এটার কাজ চলতেই ছিল। দেয়াল এলাকা ছাড়িয়ে পুরো পাওয়ার প্লান্টের ভেতরে ভাস্কর্য ছড়িয়ে দিয়েছিল, বড় স্কেলের ভাস্কর্য এগুলো। কোনো কোনোটার ওজন তিন-চার টনের ওপরে। ২০ ফুট উঁচু মোটা শিট দিয়ে তৈরি। এই কাজগুলো বসানোর পর পার্কের চেহারা অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল। এগুলো কিছু রঙ করা হয়েছে। কিছু আছে লোহার প্রাকৃতিক রঙেই। সেগুলোর ওপর লেকার দিয়ে ফিক্সড করে দেওয়া হয়েছে। প্যানডেমিকের মধ্যেই পার্কের মূল কাজটা হয়েছিল।
এই ভাস্কর্য পার্কটি নির্মাণে হামিদুজ্জামান খান যা চেয়েছিল তাই হয়েছে। আজিজ খান একজন শুধু বড় ব্যবসায়ী নন, তিনি শিল্পের সমঝদার, একজন ভালো মানুষ। তিনি শিল্পকে ধারণ করে জীবনযাপন করেন। এই পার্ক ভালোবাসেন সামিটের প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারী। সে কারণে সবখানেই পার্কটি রয়েছে সুন্দরভাবে। সামিট পরিবারের সবাই ভালোবেসে আগলে রেখেছেন এই পার্কটিকে। এভানেই বেঁচে থাকবেন শিল্পী ও ভাস্কর হামিদুজ্জামান খান।
হামিদুজ্জামান খান কাজ করেছেন শিল্পকলার প্রায় সব মাধ্যম নিয়ে। অসামান্য কাজ করেছেন তিনি ভাস্কর্যে। জলরঙ, তেলরঙ, অ্যাক্রিলিক, স্কেচ সব মাধ্যমে কাজ করছেন সমান তালে। হামিদুজ্জামান খান ১৯৪৬ সালের ১৬ মার্চ বৃহত্তর ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জ জেলায় সহশ্রাম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। হামিদুজ্জামান ১৯৬৭ সালে বাংলাদেশ কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটস (বর্তমান চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে চারুকলায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭০ সালে আগস্ট মাসে বাংলাদেশ কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটসে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন শিল্পী হামিদুজ্জামান খান। ১৯৭৬ সালে বারোদা মহারাজা সাহজিরাও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারুকলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। সে বছরই বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত প্রথম ‘জাতীয় ভাস্কর্য প্রদর্শনী’-তে শ্রেষ্ঠ ভাস্করের পুরস্কার লাভ করেন। একই বছর শিল্পী ও ভাস্কর আইভি জামানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৮১ সালে বঙ্গভবনে ‘পাখি পরিবার’ শীর্ষক ভাস্কর্য এবং সিলেটের জালালাবাদ সেনানিবাসে ‘হামলা’ শিরোনামে ভাস্কর্য স্থাপন করেন। ১৯৮২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ গ্যালারিতে প্রথম একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৮২-১৯৮৩ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের স্কাল্পচার সেন্টার স্কুল থেকে মেটাল কাস্টিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৮৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল অলিম্পিক পার্কে স্থায়ীভাবে ‘স্টেপস্’ শিরোনামে ভাস্কর্য স্থাপন করেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া আশুগঞ্জে সার কারখানায় ‘জাগ্রতবাংলা’, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সংশপ্তক’, ঢাকা সেনানিবাসে ‘বিজয় কেতন’, মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংক ভবন প্রাঙ্গণে ‘ইউনিটি’, কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে ‘ফ্রিডম’, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘স্বাধীনতা চিরন্তন’, আগারগাঁওয়ে সরকারি কর্মকমিশন প্রাঙ্গণে ‘মৃত্যুঞ্জয়ী’, মাদারীপুরে ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’ হামিদুজ্জামান খানের অন্যতম বহিরাঙ্গণ ভাস্কর্য। ২০১৮ সালে গাজীপুরের কড্ডায় সামিট পাওয়ারপ্লান্টে হামিদুজ্জামানের কর্মজীবন ও তার শিল্পসাধনার প্রতি সম্মান জানিয়ে ‘হামিদুজ্জামান ভাস্কর্য পার্ক’ নামে একটি ভাস্কর্য উদ্যান প্রতিষ্ঠিত হয়। ১০০টি ভাস্কর্য নিয়ে গড়ে উঠেছে ভাস্কর্য পার্কটি। দিন দিন সেখানের ভাস্কর্য সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এরই মধ্যে তিনি একক প্রদর্শনী করেছেন ৪৭টি।
হামিদুজ্জামান বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত প্রথম ‘জাতীয় ভাস্কর্য প্রদর্শনী’-তে শ্রেষ্ঠ ভাস্করের পুরস্কার লাভ করেন ১৯৭৬ সালে।