আল মাহমুদের অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার
নাজমুস সায়াদাত
প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৫ ১৬:২৮ পিএম
আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৫ ২০:০৫ পিএম
কবি আল মাহমুদ।
শব্দ সুষমার কবি আল মাহমুদ। তার লেখা কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, ছড়া, প্রবন্ধ আত্মজীবনীসহ বিভিন্ন রচনায় পাওয়া যায় পূর্ববাংলার সোঁদা মাটির ঘ্রাণ। বাংলা কবিতার অন্যতম এই নৃপতির ডিকটেশনের জন্য ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারির ৭ তারিখ রাতে উপস্থিত হয়েছিলেন নাজমুস সায়াদাত। কবি তখন ডিকটেশনের মাধ্যমে ‘জীবন যখন বাঁক ঘোরে’ নামের আত্মজীবনী লেখার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এ গ্রন্থটি রচনার প্রাক্কালে কবির সঙ্গে সায়াদাতের চলছিল দীর্ঘ আলাপচারিতা। দীর্ঘদিন তা অপ্রকাশিত ছিল। সেই কথোপকথনের অডিও ক্লিপটি ধানসিড়ির দপ্তরে পৌঁছায়…
নাজমুস সায়াদাত : দীর্ঘদিন পর আজকে তো বইমেলায় গিয়েছিলেন। প্রোগ্রাম কেমন হলো মাহমুদ ভাই।
আল মাহমুদ : বইমেলায় আমাকে যে নিয়ে গেল ওইটা? মোড়ক উন্মোচনের অনুষ্ঠান। আহা! কী বলব। আমি সেখানে বসেছিলাম। দুনিয়ার যত মেয়ে আছে। তারা আইসা হাজির। আমার পাশে বসবে আর ছবি তুলবে। খুবই ভিড় করছিল আমাকে ঘিরে। এমনি ভালোই হয়েছে কিন্তু। ভালোই লাগছে।
না সা : অনেক দিন পর গেলেন তো। এজন্য ভিড় ছিল। আর মাইকে ঘোষণা দিতে বলছিলাম মাহমুদ ভাই মেলায় আসবেন।
আ মা : আচ্ছা। আচ্ছা।
না সা : এজন্য আপনাকে ঘিরে ধরেছে। অনেক মিডিয়া ছিল।
আ মা : মিডিয়া টিডিয়া জানি না। তবে অনেক মেয়ে ছিল। একজন আবার পরিচয় দিল সে আমার নাতনি। তো আমি জিজ্ঞেস করলাম। বলল, তার বাড়িও নাকি ব্রাহ্মণবাড়িয়া। যাই হোক ভিড়ের মধ্যে অত তো খোঁজ নিতে পারিনি। মোটামুটি যা হয়েছে। অনেক মেয়ে ছিল আমাকে ঘিরে।
না সা : যার বইয়ের মোড়ক উন্মোচনÑ উনিও মেয়ে। আপনার তো কোনো কষ্ট হয়নি।
আ মা : না। তেমন কষ্ট হয়নি। তবে ওখানে বসে থাকা একটা বিড়ম্বনা না! কষ্ট হবে কেন। আগে তো কতই গেছি। এই প্রথম আমি বহুদিন পরে বাংলা একাডেমিতে গেলাম। বাংলা একাডেমির ডিজি শুনলে আফসোস করবেন।
না সা : মাহমুদ ভাই। আপনার সঙ্গে দেখা সাক্ষাতের পাশাপাশি আমরা গল্প করে সময় কাটাচ্ছি। পত্রিকা বারবার চাপ দিচ্ছে। ‘জীবন যখন বাঁক ঘোরে’ এটা শুরু করবেন কবে। কালকেও ফোন দিয়েছিলেন লেখা শুরু হয়েছে কি না?
আ মা : ঠিক আছে। ঠিক আছে। একটা সিগারেট খেয়ে নিই।
না সা : আজকে অল্প কিছু লিখি। এক পৃষ্ঠা লিখতে পারলে ওনাদের কাছ থেকে আমি টাকাটি নিতে পারব। প্রত্যেক কিস্তিতে এক হাজার টাকা দেবে পত্রিকা। পঞ্চাশ কিস্তির জন্য পঞ্চাশ হাজার টাকার চুক্তি হয়েছে।
আ মা : কে দেবে এই টাকা?
না সা : যারা ছাপাবে তারা।
আ মা : আরে নাম বলো না কারা দেবে টাকা? পত্রিকার নাম বলো।
না সা : এটা ইন্টারনেটভিত্তিক একটা পত্রিকা। নাম আই বার্তা ডট। পরে এটা বই আকারে হবে। এটার জন্যই মূলত লেখা।
আ মা : বই তো হবেই।
না সা : আবিদ আজম বলতেছেন, ভাই এটা লেখা হলে আমাকে দিয়েন। তিনি যে পত্রিকায় কাজ করে সেখানে ছাপবেন। আমি বলেছি লেখাই শুরু হয়নি। আর একজনের সঙ্গে চুক্তি হয়ে গেছে।
আ মা : আচ্ছা। তুমি তো আছই। তুমি যেখানে আছ। সেখানে আমার সন্দেহের কোনো কারণ নেই।
না সা : দোয়া করবেন। আজকে তো পত্রিকায় আপনার একটা লেখা ছাপা হয়েছে। এটা দ্বিতীয় পর্ব। পরে তৃতীয় কিস্তি। ওটাই শেষ। আপনার নামে একটা চেক হবে। পরে তুলে নিয়ে আসতে হবে।
আ মা : ‘পুত্রবধূ শামীমা আখতার বকুলকে উদ্দেশ করে হাঁক) এই আমাকে একটা সিগারেট দাও। কী চাও আর? এই মিয়া।
না সা : আপনার একটা ফাইল রেখেছিলাম। ওইটা দরকার। সাত দিন পার করলাম আপনার লেখাটি নিতে পারলাম না।
আ মা : তুমি সাত দিন পার করলা কেন? শেষ পর্যন্ত বইমেলায়ও গেলাম (হাসি, হে হে)।
না সা : হ্যাঁ। ভালো করছেন।
আ মা : লোকে কী বলে, ‘ওগো বনহংসিনী আমার’ নিয়ে।
না সা : এটা কালকে জানতে পারব। আজকে অন্য কাজে ব্যস্ত ছিলাম। লোকজনের সঙ্গে দেখা করতে পারিনি।
আ মা : তো লেখাটি কী বলো?
না সা : জীবন যখন বাঁক ঘোরে।
আ মা : ছবিটা কী?
না সা : এটা হলো মোটরসাইকেলের ওপর আপনার বসা একটা ছবি।
আ মা : বাহ! ছবিটা তো সুন্দর।
না সা : আপনি বিজয় না শুভম! (কবির নাতি)
শুভম : আমি শুভম। বিজয় তো রাজশাহীতে।
না সা : ওদের ওখানে নাকি মারা মারি হচ্ছে।
আ মা : (উদ্বিগ্ন কণ্ঠ) মারামারি হয়েছিল!
শুভম : হ্যাঁ।
আ মা : কোথায়?
শুভম : রাজশাহীতে।
আ মা : তো এখন ওর কী অবস্থা। আমার নাতির কী অবস্থা?
শুভম : আছে। মোটামুটি ভালোই আছে।
আ মা : মোটামুটি মানে কী! তার তো আলাদা জায়গায় থাকার কথা।
শুভম : হ্যাঁ। নিরাপদেই আছে।
আ মা : টেলিফোন করছিলা!
শুভম : হ্যাঁ। কথা হয়েছে। আমি মিডিয়াতে কাজ করতে চাই। ওনার সঙ্গে ডিরেক্টরদের ভালো পরিচয় আছে।
আ মা : (নাজমুস সায়াদাতের উদ্দেশে) আমার নাতির কথা শুনছ তো?
না সা : ইরানি বিশ্বাস নামের এক পরিচালক আছেন। আমার পরিচিত।
আ মা : চিনি আমি। ওকে নিয়ে আইসো।
না সা : আচ্ছা। ইরানির নাম সম্ভবত ইন্দ্রানী রানী বিশ্বাস।
আ মা : অনেক আগে কোনো একজন শিল্পীর নাম কিন্তু ছিল ইরানি। বাড়ি ছিল ইরানে। যেহেতু এরা অগ্নিপূজক ছিল। সেজন্য ইরানে থাকতে পারেনি। পরে চলে আসে ভারতে।
না সা : আবিদ আজমের সঙ্গে ইরানির পরিচয় আছে।
আ মা : (মাথা নাড়লেন) আবিদ আজমের কাছে আমার মূল্যবান একটা পাণ্ডুলিপি আছে।
না সা : ওটার কাজ শেষ হয়েছে। শেকড় নামে একটা পাবলিকেশন্স থেকে বের হবে। কবি কামরুজ্জামান এটার দায়িত্বে। এই প্রকাশনা থেকে আগেও আপনার বই হয়েছে। নতুন বইয়ের জন্য আপনাকে দশ হাজার টাকাও দিয়ে গেছেন।
আ মা : দশ হাজার টাকাও দিছে আমাকে!
না সা : হ্যাঁ। আপনাকে।
আল : ওহ। পরে আমার ছেলেকে দিয়েছি।
নাজ : টেনশনের কিছু নেই। সামনের সপ্তাহের মধ্যে বই বের হবে।
আ মা : আবিদ আজমের লিমিটেশন আছে এজন্য বললাম। আর তুমি যেহেতু আছ আমার চিন্তা নেই।
না সা : দোয়া করবেন মাহমুদ ভাই।
আ মা : বউ মা এদিকে আহো না। যদি হয়ে থাকে আমার বউমা জানবে।
শা আ : কী আব্বা বলেন।
না সা : সেদিন এক প্রকাশক কবিতার বইয়ের জন্য দশ হাজার টাকা দিয়ে গেলেন। সেটা জানতে চাচ্ছেন।
শা আ : সেদিন আপনাকে কবিতার জন্য দশ হাজার টাকা দিয়ে গেলেন। কামরুজ্জামান আর আবিদ আজম এসেছিলেন। তারা দুইজনেই এসেছিলেন।
আ মা : বউ মা ঠিক আছে তো।
শা আ : হা।
না সা : আপনার দুটি পুরাতন বই রিপ্রিন্ট হয়েছে। আজকে পত্রিকাগুলোতে তার নিউজ হয়েছে।
শা আ : আব্বা আপনার বিভিন্ন বই থেকে ২০০ কবিতা বাছাই করে জাকির আবু জাফর এক প্রকাশককে দিয়েছেন বই প্রকাশ করার জন্য। তারা ভালো টাকা দেবেন।
আ মা : বই বেরিয়েছে?
না সা : হ্যাঁ। আজকে বাজারে এসেছে। মাহমুদ ভাই পান নিয়ে এসেছি। খাবেন নাকি?
আ মা : না। এই ছবিটা কে গো। চিনতে পারছি না। বলো না।
না সা : আপনিই। একটা মোটরসাইকেলের ওপর বসা।
আ মা : ও। আচ্ছা।
না সা : আজকে একটা মজার ঘটনা ঘটছে।
আ মা : বলো। বলো। কী হয়েছে?
না সা : সন্দ্বীপের এক ছেলে কবিতার বই নিয়ে আসছে। সেই বইয়ের জন্য আপনার একটা মন্তব্য লিখে চাচ্ছেন। আমি পাণ্ডুলিপি রেখে দিয়েছি। বলেছি মান উত্তীর্ণ হলে আমি কবিকে বলব। তখন দেখা যাবে।
আ মা : ছেলেটা কী করে।
না সা : এক মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট। আমি বলেছি মন্তব্য লিখলে সম্মানি দিতে হবে।
আ মা : নিয়ে আইসো। লিখে দেব। তুমি খাও কী?
না সা : পান খাই।
আ মা : তুমি আবার পানও খাও। পান তো মুখে দাগ ভরে।
না সা : চুন ছাড়া পান খাওয়া ভালো।
আ মা : চুন ছাড়া পান খাওয়া যায় নাকি! আমার দাদি খেতেন পান। পানের জন্য এতই বেহুঁশ থাকতেন। ছেলে (আমার বাপ) একদিন পান না আনলে। আমার দাদি কী যে বকাবকি করতেন। বাপ আবার দৌড়ে যেতেন পানতে আনতে। (কিছু সময় চুপচাপ) ‘পান খাও পণ্ডিত ভাই। কথা কও ঠারে। এই পান জন্মালই কোন অবতারে।’
না সা : মাহমুদ ভাই, ‘জীবন যখন বাঁক ঘোরে’ আজকে আমরা শুরু করব।
আ মা : আজকে কতটুকু লিখেছ?
না সা : শুধু নামটুকু লিখেছি। আপনি নৌকার ওপর সহধর্মিণীকে নিযে যাচ্ছেন। এখান থেকে শুরু করতে চেয়েছিলেন। মাহমুদ ভাই ‘আত্মজীবনী’ যে পাঠক উপন্যাসের মতো পড়ে সেটা আপনার ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ দেখে বুঝেছি।
আ মা : ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ একটা রেয়ার বই। এটা আমি লিখেছি একদম ইউরোপিয়ান স্টাইলে। আরে বাপরে এই বইটি তৎকালীন সময়ে চার হাজার কপি মুদ্রণ হয়েছিল। ওই সময় কোনো বই এত কপি ছাপা হতো না। এক দেড় হাজার কপি ছাপা হতো। কিন্তু ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ চার হাজার কপি বই সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি হয়েছিল।
না সা : ওই বইটা প্রকাশের সময় বুলবুল সরওয়াররা ছিলেন। লেখা আছে মুদ্রণ তত্ত্বাবধানে তার নাম। আজম ওবায়দুল্লাহ, মতিউর রহমান মল্লিক, মাসুমুর রহমান খলিলি। এই পাঁচজনের নাম জানা যায়।
আ মা : হ্যাঁ। মনে পড়ছে। এরা ছিল।
শা আ : আব্বা এবার লেখা শুরু করেন।
আ মা : সিগারেট খেয়ে নিই। সিগারেটটা খেলে লেখা জমবে ভালো।
শা আ : না। সিগারেট খেয়েছেন মাত্র। আর না। দুই মিনিট পরে। শুরু না করলে দেব না।
আ মা : (পুত্রবধূকে উদ্দেশ করে) আরে ওরকম করো কেন। আমি লেখা শুরু করব। সিগারেট খেলে লেখা জমবে।
না সা : মাহমুদ ভাই। আমি বইয়ের নাম লিখে দিচ্ছি। আপনার নামটা লেখেন এই কাগজটিতে। সিগনেচারের নিচে তারিখটা দিয়েন। আজকের তারিখ (০৭-০২-২০১৪) শূন্য সাত শূন্য দুই দুই হাজার চৌদ্দ।
আল : (পুত্রবধূর উদ্দেশে) অস্থির হয়ে যায়। বেশি বিদ্বান হলে অসুবিধা। মাথা ঠিক থাকে না। মাথা থাকে একদিকে আর শরীর থাকে আরেকদিকে। (ঘরজুড়ে হাসির রোল বয়ে গেল) শোনো। আমার বউ মরে গেছে অল্প বয়সে। বাকি জীবন বই লইয়া কাটাইছি। অল্প বয়সে বউ আস সালামু ওলাইকুম বলে বিদায় হয়ে গেছে। (আবারও হাসি) (বউমাকে উদ্দেশ করে) তুমি এসব শোনো কেন। তুমি যাও গা।
আহারে বউ! কয় দিন আগে একটা টেলিভিশনের পর্দায় আমার বউরে দেখলাম। ওই যে আমার জীবনী নিয়ে একটা প্রতিবেদন করছে। ওইটা দেখলাম। কথাগুলো অনেক গুছিয়ে বলছে। আমি এখন অতটা বলতে পারব না। বউ বলছে ‘উনি তো কিছু করেন না। আমি করি।’ আমার কথা বলছে। কথাগুলো এত বিশ্বাস নিয়ে বলছে আমি মোলায়েম হয়ে চুপ করে বসে থাকলাম। ‘উনি তো কিছু করেন না। আমি করি।’ মানে আমি যে কিছু করি না। খালি সিগারেট খেয়ে ঘুরে বেড়াই। এটাই বোঝাতে চেয়েছে।
না সা : বাউণ্ডুলে। ভ্যাগাবন্ড।
আ মা : ভ্যাগাবন্ড বললে ভবঘুরে শব্দটি ঠিক আসে না। ভবঘুরে বলে একটা শব্দ আছে। দুনিয়া ঘুরে।
না সা : মাহমুদ ভাই আমাদের দেশে ‘বেদে’ বলে একটা সম্প্রদায় আছে।
আ মা : এখন কি আছে নাকি। এখন তো বেদে আর নেই। ‘বাবু সেলাম বারে বার, আমার নাম গয়া বাইদ্যা বাবু, বাড়ি পদ্মা পাড়…।’ এই সম্প্রদায় মনে হয় নেই আর। ‘মোরা পঙ্খী মারি, পঙ্খী ধরি/পঙ্খী বেইচা খাই/মোদের বাড়ি ঘর নেই।’ কথাটি তুমি মনে রাখছ।
না সা : সিনেমায় শুনেছি। আমাদের ছোটবেলায় ‘নয়া বাইদানি’ নামে একটা সিনেমা হয়েছিল। বেদেদের নিয়ে বিখ্যাত সিনেমা ‘বেদের মেয়ে জ্যোসনা’। আপনার ‘জলবেশ্যা’ গল্পটিও তো এদের নিয়ে লেখা।
আ মা : বিসমিল্লাহ। কোথায় থেকে যেন শুরু করতে চেয়েছিলাম। মনে করিয়ে দাও।
না সা : নতুন বিয়ে করে নৌকায় করে বউ নিয়ে যাচ্ছেন। এখান থেকে।
আল : আচ্ছা। লেখÑ আমি আমার বউকে নিয়ে তৎকালীন পরিচিত নায়রীর নৌকায় উঠলাম। মাঝি একজন ও তার একটি ছোট ছেলে নৌকার হাল ধরে চুপচাপ বসেছিল। নৌকার একদিকে যেখানে মাঝি নৌকা ঠেলত লগির ভর দিয়ে সেখানে একটা পর্দা টানানো ছিল। আমরা ভেতরে অর্থাৎ আমি ও আমার বউ চুপচাপ বসেছিলাম।
আমার বউ লম্বা ঘোমটা টেনে বসেছিল। আমি তার পায়ের নখগুলো মাত্র দেখতে পাচ্ছিলাম। সুন্দর ফরসা পা। তার মধ্যে মনে হয় ঈষৎ মেহেদির ছোঁয়া বেশ কিছুদিন আগে লেগেছিল। নখগুলো অত্যন্ত সুন্দর এবং যত্নে সমান করে কাটা। একটা কথা আছে না, ‘নখদর্পণ’। আমি সেই নখদর্পণের নিজের মুখ দেখতে প্রয়াসী হলাম। আমি অবাক বিস্ময়ে আমার বউয়ের ফরসা পায়ের দিকে তাকিয়ে আছি দেখে সে শাড়ি টেনে নখ ঢাকতে চেষ্টা করল। এতে অবশ্য আমার লাভই হলো। নখ ঢাকতে গিয়ে তার সুন্দর কোঁকড়ানো চুলের সিঁথি কাটা মাথা আমার দিকে ঝুঁকে পড়ায় আমি এক কেশবতী ঈষৎ কৃশকায়া নারীর মাথা দেখতে পাচ্ছিলাম। অবশ্য সে অত্যন্ত যত্ন করে তার মাথা ঘোমটায় আবৃত করে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছিল। ঘোমটা দিতে গিয়ে তার অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ উন্মুক্ত হয়ে আমাকে বুঝিবা বিদ্যুতের খেলা দেখাচ্ছিল।
আমি দেখছিলাম ঝিলিক মারা নারীর অনাবৃত স্বাস্থ্যের সুষমা। আমি লোভী লোক, লালসার আলস্যে অবগাহন করে যে সদ্য উঠে এসেছি। আর নারীকে সোজাসুজি দেখার অভিজ্ঞতা আমার থাকলেও এমন কাছে বসে এক স্বাস্থ্যবতী যৌবনে উদ্ভাসিতা যুবতীকে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ আমার অপেক্ষাকৃত কমই বলতে হবে। আমি দেখছি আর লোভে আমার শরীরে ধুকপুকানি শুনতে পাচ্ছি। হৃদপিণ্ড দুলছে যেন একটা পাকা আতাফলের মতো।
এই কি তবে সেই ফল, যার জন্য মানুষকে বেহেশত ছেড়ে মাটিতে নামতে হয়েছিল! আমি বুঝলাম আদম কতটা নিরাপদ ছিলেন। এই অমৃত ফলের দুলনি একবার যার চোখে লেগেছে সে তো অন্ধ উন্মত্ত দিশেহারা হবেই! তবে আমার মনে হয়েছিল আমি পাগল হয়ে গেলে সবই তো পণ্ড হবে। এ কারণে আমার সামনে যে নারীর চোখের পানি গণ্ড ভাসিয়ে নামছে তার নাভি সিক্ত হওয়ার আগেই আমাকে তার স্বীকৃতি আদায় করতে হবে। রস ঝরছে কিন্তু এই কামিনী বশ মেনেছে এমন কোনো লক্ষণ তো দেখতে পাচ্ছি না। আমি দেখছি ভাবছি আর নেমে যাচ্ছি অতল গহ্বরের দিকে। আমাকে আমি সংযত করার জন্য নিজের মনে বলে উঠলামÑ ‘তিষ্ঠ হে কবি, তিষ্ঠ ক্ষণকাল!’
এবার পড়ে শোনাও।
না সা : পড়ে শোনানো চলছে… কেমন হইছে লেখা মাহমুদ ভাই।
আ মা : তুমিই না বলবা। আমার বলা ঠিক আছে কি না।
না সা : মাহমুদ ভাই একদম ঠিক আছে। উঠি আজকে। বাসার গেট বন্ধ করে দেবে।
আ মা : আচ্ছা যাও।