মনিজা রহমান
প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২৫ ১৪:১১ পিএম
কার ফোনে ঘুম থেকে তাড়াহুড়ো করে উঠেছিল আজ আর মনে নেই তাবাসসুমের।
Ñ ভাবি, টিভিটা অন করেন।
Ñ কেন, কী হয়েছে?
টিভির পর্দা ধোঁয়াচ্ছন্ন।
দূরে টুইন টাওয়ার থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। কী ঘটেছে?
তাবাসসুমের ভয় ভয় লাগে। এখানেই তো মনজুর কাজ করে।
কীভাবে আগুন লাগল? ওপরতলার মানুষরা কী করছে? নিজের কাছেই জিজ্ঞেস করে।
মনজুরকে ফোন করে।
হোঁচট খায়। ফোন যাচ্ছে না। ফোনে কোনো সিগন্যাল পাওয়া যাচ্ছে না। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। হঠাৎ একটি টাওয়ার ধসে পড়ল। বিশ্বাস করতে পারে না তাবাসসুম।
বিল্ডিংটা যেন সমুদ্রে তলিয়ে যাচ্ছে আর চারদিক থেকে ঢেউ রঙ ঢেউ ধোঁয়ার মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠে যাচ্ছে।
লাইভ টিভিতে এমন অভাবনীয় দৃশ্য আগে দেখেনি সে।
জানালা দিয়ে আংশিক দেখা গেলেও টিভির মতো পরিষ্কার নয়।
সকালে কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাওয়ার আগে অন্যদিনের মতো মনজুর তাবাসসুমের ঠোঁটে চুমু দিয়েছে। পেটে হাত বুলিয়ে দিয়েছে। প্রাজ্ঞর সাথে কথা বলেছে।
প্রাজ্ঞ পেটে। নয় মাস পেরিয়ে গেছে। ডাক্তারের পূর্বাভাস ঠিক হয়নি।
যেকোনো সময় পেইন উঠতে পারে। মনজুর বলে গেছে, দুপুরে চলে আসবে। বিকেলে ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্টে নিয়ে যাবে।
তাবাসসুমের সামনে দিয়ে একটা কিছু উড়ে গেল। মনে হলো কয়েক লক্ষ মৌমাছি তার মাথা ঘিরে ধরেছে।
মনজুর এখন কোথায়? ও কি ওই ধসে পড়া বিল্ডিংয়ে ছিল?
না না মনজুর নিশ্চয় অন্য বিল্ডিংয়ে। নিজেকে সান্ত্বনা দেয়।
টিভিতে বলল সব ট্রেন বন্ধ। প্যাথ ট্রেনও।
কে যেন নক করছে। মনজুর এসেছে? তাবাসসুম পাথর হয়ে থাকে। দরজা পর্যন্ত যাওয়ার শক্তি নেই।
তলপেটে প্রচণ্ড ব্যথায় ও প্রায় সংজ্ঞাহীন।
ডোর বেল বেজেই চলেছে। অবচেতনে বুঝতে পারেÑকারা যেন ভেতরে এলো। ওর নাম ধরে ডাকছে। কেউ বলছেÑ ভাবি।
মনজুর কাজ করত নর্থ টাওয়ারের ৯৭ তলায়। ওরা থাকে জার্সি সিটিতে দুই বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্টে। ট্রামে প্যাথ ট্রেনের স্টেশনে যায়। পরের স্টেশনই ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার। ঠিক নদীর ওপারে।
একটু পরেই অ্যাম্বুলেন্স তাবাসসুমকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। ডাক্তাররা সি সেকশন করে প্রাজ্ঞর জন্ম দিল। সনোগ্রামে দেখে মনজুর নাম দিয়েছিল প্রাজ্ঞ। তাবাসসুমের খুব পছন্দ হয়েছিল নামটি।
মনজুর আর ফিরে আসেনি। দেহাবশেষও পাওয়া যায়নি।
অনেক টিভি চ্যানেল আসছে। অনেক রিপোর্টার। তারা মনজুর সম্পর্কে জানতে চায়।
কী বলবে তাবাসসুম?
মনজুর চলে যাবে বলেই প্রাজ্ঞর আগমন?
নাকি মনজুর চলে গেছে বলেই প্রাজ্ঞ এসেছে?
সাংবাদিকরা জানতে চায় ১১ সেপ্টেম্বরের কথা।
তাবাসসুম ভাবে, মনজুরকে হারিয়ে সে প্রাজ্ঞকে পেয়েছে। তাহলে কি কিছু পাওয়ার জন্য কিছু হারাতে হয়? কাউকে পাওয়ার জন্যও কি কাউকে হারাতে হয়?
মনজুর চলে যাওয়ার পর তাবাসসুমের মাথায় অসম্ভব সব চিন্তা আসে।
ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় তাবাসসুমের খুব ভয় হতো। ও যেমন ছেলে চায় তেমন যদি না পায়? নিজেও কি জানত কেমন ছেলে সে চায়? কেমন ছেলে হলে যে ওর সারা জীবনের বন্ধু হবে?
তাবাসসুম দেখতে সুন্দর। ওর জীবনসঙ্গী যদি সুদর্শন না হয়? বুয়েট থেকে পাস করা মনজুরের সাথে যখন মা-বাবা-ভাইয়া বিয়ে ঠিক করেন তখন তাবাসসুম ওকে দেখেনি। মনজুর আমেরিকায়।
মূলত তখন থেকেই একধরনের অনিশ্চয়তা ওর ভেতরে গোপনে বেড়ে উঠতে থাকে। মনজুর সুদর্শনÑ একথা সে শুনেছে। ছবিতেও দেখেছে। ছবিতে ওর বিশ্বাস কম।
বাইরের সৌন্দর্যের মূল্য নিশ্চয় অপরিসীম কিন্তু ভেতরটা যদি কদর্য হয়? আবার এমনও তো হতে পারে, মানুষটার ভেতরটা সুন্দর, কিন্তু বাইরেটা বাস্তবে তেমন আকর্ষণীয় নয়!
তাবাসসুম ভাবে, সে কি তাকে খুব কেয়ার করবে? খুব আদর করবে? ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওর কথা শুনবে? মুভিতে চুমুর দৃশ্য এলে কি তাকে জড়িয়ে নিয়ে চুমু খাবে? রাস্তায় কি কোমর জড়িয়ে ধরে হাঁটবে? কফি খেতে খেতে কি বদলে নেবে কাপ? সব সময় কপাল কি কুঁচকে থাকবে? প্রতিদিন শাওয়ার নিতে আলস্য করবে না তো?
তাবাসসুম ভাবতে পারেনি তার চিন্তার সাথে এমন মিলে যাবে মনজুর। পারফেক্ট ম্যাচ বলতে যা বোঝায় ওরা যেন তাই। মনজুরকে মন বলে ডাকত তাবাসসুম। আর ওকে ডাকত সুমি বলে। না, সুমি মোটেও বিরক্ত হতো না মনের পাগলামিতে। পাঁচ বছরের যুগলজীবনে ওরা প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করেছে।
সুখের দিন আর কতই বা দীর্ঘ হবে!
মনজুর এলাহি আইটি ইঞ্জিনিয়ার। কাজ করত একটি ফিনান্সিয়াল কোম্পানির আইটি ডিপার্টমেন্টে। অফিস ছিল ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সাতানব্বইতম ফ্লোরে। সেই জন্যই ওরা বেছে নিয়েছিল জার্সি সিটি। প্যাথ ট্রেনে হাডসন নদী পার হলেই ম্যানহাটান। সকাল সাড়ে সাতটায় বেরিয়ে যেত কাজের উদ্দেশ্যে। কফিশপ থেকে কফি আর ক্রিমচিজ দেওয়া সিনামন বেগেল কিনে এলিভেটর ধরত। অফিসে বসে কম্পিউটার অন করে কাজ শুরুর আগে প্রথম কল দিত তাবাসসুমকে।
কয়েক রাত ঠিকমতো ঘুম হচ্ছিল না তাবাসসুমের। সকালের দিকে ঘুম আসে।
মঙ্গলবার মনজুর যখন বের হবে তাবাসসুম তাকে ডাকে। মনজুর বেডের কাছে গিয়ে বৌয়ের ঠোঁটে কপালে চুমু দেয়। তাবাসসুম ওর হাত নিয়ে প্রথমে নিজের গালে চেপে রাখে, তারপর সেই হাত ওর পেটের ওপর। পেটের ভেতর প্রাজ্ঞর নড়াচড়া অনুভব করে মনজুর। পেটের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে প্রাজ্ঞকে চুমু দেয়।
মনজুর কাজে চলে যাওয়ার পর তাবাসসুম ভাবছিল অতীতের কথা। তার বন্ধুদের অসুখী জীবনের কথা। প্রেমের বিয়ে মানেই সুখের এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। পরিবারের সকলের প্রতি তার আস্থা ছিল বলে বাবা-মা-ভাইয়া যাকে পছন্দ করেছে তাকে বিয়ে করে সে হারেনি। বিয়ের পরপরই তাকে নিউইয়র্কে নিয়ে আসে মনজুর। সময়টা কীভাবে যেন স্বপ্নের ঘোরে কেটে গেছে।
প্রাজ্ঞর জন্ম তাবাসসুমকে বাঁচিয়ে রেখেছে বললে ভুল হবে না। এমন জীবনসঙ্গীকে হারিয়ে সে হয়তো দিশাহারা হয়ে উঠত। এখনও কি ঠিক আছে? তাবাসসুম সব সময় ভাবে, মনজুর মরেনি। তা ছাড়া ওর তো ডেডবডি পাওয়া যায়নি। নিশ্চয় মনজুর একদিন ফিরে আসবে।
তাবাসসুম ভাবে, মনজুর হয়তো বাতাস হয়ে গেছে। বাতাস হয়ে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার যেখানে ছিল সেখানে ঘুরছে। হয়তো তাকে আর প্রাজ্ঞকে খুঁজছে। হয়তো তাদের না পেয়ে ওর বুক হু হু করে উঠছে।
তাবাসসুম কূলকিনারা পায় না। সন্ত্রাসীরা কেন এত মানুষকে হত্যা করল! কেন মনজুরও ওদের প্রতিহিংসার শিকার হলো? সত্যি সত্যি ও এখনও জানে না, কার ক্রোধে তারা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে এত মানুষের পরিবারকে স্বজনহারা করল?
দশ বছর পেরিয়ে গেছে। প্রাজ্ঞর চেহারায় স্পষ্টতর ছায়া মনজুরের। দিন যত যাচ্ছে মনজুরের অভাব ততই প্রকট হচ্ছে। সবকিছু শূন্য শূন্য লাগে। ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিভিন্ন জায়গা থেকে কয়েক মিলিয়ন ডলার পেলেও সবই অর্থহীন মনে হয় তাবাসসুমের। ঘটনার পরপরই জার্সি সিটি ছেড়ে সে লরেন্সভিলে চলে যায়। মাঝে মাঝে লোয়ার ম্যানহাটানে এসে দেখে যায় জায়গাটা। টুইন টাওয়ারের ভগ্নাবশেষ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। দুটির পরিবর্তে নতুন একটি ভবন দাঁড়াচ্ছে। ২০১৪-তেই উদ্বোধন হয়ে গেল নতুন ভবন। তাবাসসুম প্রাজ্ঞকে নিয়ে সেখানে যায়। একটি মেমোরিয়াল সরোবর বানানো হয়েছে। সরোবরের ওপরে কার্নিশে মার্বেলের ওপর খোদাই করে ২ হাজার ৭৫৩ জনের নাম লেখা। এদের প্রাণ বিসর্জন হয়েছে এই নির্মম সন্ত্রাসী আক্রমণে। MANZUR ELAHI লেখা নামের ওপরে কান্নায় ভেঙে পড়ে তাবাসসুম। প্রাজ্ঞ জড়িয়ে থাকে মাকে। ওর মনে হয় ‘মন’ নিশ্চয় এখানে আছে।
মেমোরিয়াল সরোবর সকলের জন্য খুলে দেওয়ার পর তাবাসসুম কেমন যেন হয়ে যায়। বারবার ছুটে যেতে চায় জিরো পয়েন্টে। ওর বদ্ধমূল ধারণা, মনজুর ওখানেই আছে। ওরা কেউ দেখতে পাচ্ছে না। নিশ্চয় মন তাদেরকে খুঁজছে। নদী পার হয়ে অতদূর যেতে পারছে না। তা ছাড়া মনের কাছে তো লরেন্সভিলের ঠিকানাও নেই।
তাবাসসুম ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের কাছে একটি উঁচু বিল্ডিংয়ে অ্যাপার্টমেন্ট কেনে। কর্নার অ্যাপার্টমেন্ট। দুইদিকের সম্পূর্ণ দেয়ালই কাচের। নতুন ওয়ান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার, সরোবর, পাখির ডানার মতো অকুলাস, হাডসন নদী সব দেখা যায়। দূরে স্ট্যাচু অব লিবার্টিও দেখা যায়। ব্যালকনিতে বসলে হাডসন থেকে হাওয়া এসে এলোমেলো করে দেয় ওর চুল। মনজুর থাকলে নিশ্চয় পাশের চেয়ারে বসে তাবাসসুমের ঘন কালো চুলে ওর আঙুলগুলোকে চিরুনি বানিয়ে খেলা করত। গ্রিবায় হালকা ম্যাসাজ করে দিত। দশ আঙুল নিয়ে খেলা করত।
তাবাসসুম যখন এসব কথা ভাবে তখন আবেশে চোখ বন্ধ হয়ে আসে। তার মনে হয় মনজুর যেন সত্যিই এই অ্যাপার্টমেন্টে চলে এসেছে। বেডরুমে থাকলে মনে হয় ও যেন লিভিংরুমে বসে টিভি দেখছে। লিভিংরুমে গেলে মনে হয় মনজুর এখন ব্যালকনিতে লম্বা হয়ে শুয়ে আছে ইনক্লাইনারে। ব্যালকনিতে দৌড়ে গেলে মনে হয় মনজুর নিশ্চয় বেডরুমে অটোম্যানে বসে গান শুনছে। জগজিৎ সিংয়ের গজল। ওর সেই প্রিয় গানÑ ‘ইয়ে দৌলাত ভি লে লো, ইয়ে সোহরাত ভি লে লো...’।
না কোথাও নেই। তাবাসসুম জানে মনজুর সব জায়গাতেই আছে, কিন্তু সে তাকে দেখতে পাচ্ছে না।
প্রাজ্ঞ বলে, মামি, ড্যাড কি সত্যিই বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে?
তাবাসসুম বিশ্বাস করে আত্মা কখনও মরে না, হারিয়ে যায় না। যে ওকে সবচেয়ে ভালোবাসত, মৃত্যুর পরে আত্মা তার আশপাশেই থাকে। এরই মধ্যে মাইকেল নিউটনের ‘জার্নি অব সৌল’ সে পড়ে ফেলেছে। আত্মা সম্পর্কে ওকে যে জানতেই হবে।
সরোবরের কাছে ও একটি প্রজাপতি দেখে প্রায়। তাবাসসুম ওখানে গেলেই প্রজাপতিটি ওর খুব কাছে চলে আসে। একদিন ওর কাঁধে এসে বসে। প্রজাপতিকে আদর করে দুই হাতের তালুতে রাখে। মুখের খুব কাছে নিয়ে আসে। কী অপূর্ব রঙবিন্যাস! কী শান্ত, সুন্দর। তাবাসসুম ভাবে, মনজুর কি প্রজাপতির রূপ ধরে এসেছে? ডাকে মন, মনজুর। প্রজাপতি উড়ে যায়। তাবাসসুম দেখে কোথায় যায়। পাখা মেলে উড়তে উড়তে প্রজাপতি MANZUR ELAHI নামের ওপর বসে। আশ্চর্য হয় সে।
এর অর্থ কী? প্রজাপতি কি মনজুরকে চেনে?
যতক্ষণ প্রজাপতি সেখানে বসে থাকল তাবাসসুমও দাঁড়িয়ে থাকল। প্রাজ্ঞও দাঁড়াল মায়ের পাশে।
প্রাজ্ঞ উচ্চতায় তার বাবার সমান। বাবার প্রায় হুবহু।
তাবাসসুম প্রাজ্ঞর দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে।
সে মনজুরকে খোঁজে প্রাজ্ঞর মাঝে।
পরদিন খুব সকালে মেমোরিয়াল সরোবরে গেল। একটু পরেই প্রজাপতিটি পাখায় ছন্দ তুলে মনজুরের নামের ওপর বসল। তাবাসসুম বুঝতে পারে না এর অর্থ। এটা কি বাস্তব, নাকি পরাবাস্তব তাও বুঝতে পারে না।
তাবাসসুম প্রতিদিন প্রাজ্ঞকে গল্প বলত ওর বাবার। ও যখন ছোট তখন দাদা-দাদিও ওকে তার ড্যাডির গল্প বলত। ড্যাডি সম্পর্কে ওর ভেতরে যে চরিত্রটি তৈরি হয়েছে এর সাথে বাস্তবের কোনো মানুষের মিল খুঁজে পায় না। মনজুর তার চোখে একজন স্বপ্নমানুষ।
প্রাজ্ঞ বড় হতে হতে জেনেছে নাইন/ইলেভেন নামক দিনটির সব ঘটনা। এখনও তার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়। নিরপরাধ মানুষ হত্যার এই ঘটনার সাথে সে কেবল হিরোসিমা-নাগাসাকির তুলনা করতে পারে।
কেন একদল মানুষ আরেকদল মানুষকে হত্যার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, কেন এত অস্ত্র, কেন এত যুদ্ধ, সে বুঝতে পারে না। প্রাজ্ঞ মনে করে মানুষকে হত্যার এবং আত্মরক্ষার জন্য যে বুদ্ধির এবং অর্থের অপচয় তা যদি মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হতো... ওর চিন্তা বাধা পড়ে।
প্রাজ্ঞর জন্ম এক চরম অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে। অনিশ্চয়তায় পৃথিবী কম্পিত।
এই কদর্য জগতের আলো দেখার আগেই সে অনির্বচনীয় আদর পেয়েছে বাবার। সে কথা সে জানে না। সে জানে সে তার পিতাকে হারিয়েছে জন্মের আগেই। মামই তার ড্যাড। মাম তাকে উজাড় করে দিয়েছে। প্রাজ্ঞর একমাত্র অপূর্ণতা তার পিতা। সে খুব কম কথা বলে। সৌম্য কান্তি। চেহারায় সকরুণ ছায়া, পরিশীলিত ব্যক্তিত্ব আর অসীম প্রজ্ঞার সংমিশ্রণ। হাই স্কুল গ্রাজুয়েশনে ভ্যালেডিক্টোরিয়ান হয়।
প্রিন্সটন, ইয়েল আর কলাম্বিয়া থেকে এক্সেপ্ট্যান্স চিঠি আসে। তাবাসসুম চায় প্রাজ্ঞকে কাছে রাখতে। প্রাজ্ঞ ভর্তি হয় কলাম্বিয়ায়। লিবারেল আর্টসে। সমকালীন রাজনীতি। পরিবর্তিত বিশ্বে অ্যান্টি-টেরোরিজম সম্পর্কে জানার আগ্রহ। টেরোরিজমের উৎসের গভীরে যেতে চায় সে। জানতে চায় বিশ্বশান্তি কতদূরে। মা তাকে অনুপ্রেরণা দেয়।
রাতে ঘুম আসছিল না তাবাসসুমের। আধো ঘুমে প্রজাপতিটা ঘুরে ঘুরে ওকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।
যখন ঘুম এলো, ঘুমের মধ্যেও প্রজাপতি এলো।
জগতের গ্লানি থেকে মুক্তি পেয়েছে তোমার মনজুর এলাহি ওরফে তোমার মন। ও বেঁচে গেছে। প্রাজ্ঞর মতো তরুণরা পরম্পরায়...। কিন্তু এই রকম মুক্তি কি কারও কাম্য হতে পারে?
ঘুম ভেঙে যায় তাবাসসুমের। উঠে বসে। রাত ফুরিয়ে যাচ্ছে। প্রাজ্ঞ তখন ব্যালকনিতে। হাডসন নদীর দিকে তাকিয়ে আছে।
কার কথা ভাবছে ও? ড্যাডির তো কোনো স্মৃতি নেই।
অন্যের কাছে গল্প শুনেও এক ধরনের স্মৃতি তৈরি হয়। হয়তো সেই স্মৃতি গভীর করুণ গাথা হয়ে প্রাজ্ঞর মন আবিষ্ট করে রেখেছে।
ড্যাডিকে খুঁজতে শূন্যে তাকিয়ে থাকে।
সকালে মেইলরুমে গিয়ে বড় সাদা এনভেলপ পায় তাবাসসুম। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে এসেছে। প্রাজ্ঞ এলাহি নামে। ঘরেই ছিল ও।
Ñ প্রাজ্ঞ তোমার মেইল। কলাম্বিয়া পাঠিয়েছে।
এনভেলপ দেখেই বুঝতে পারে প্রাজ্ঞ। খুলে দেখাল মাকে। তার পিএইচডির সার্টিফিকেট।
ওর প্রফেসর আলাদাভাবে অভিনন্দন জানিয়েছেন তার ডিসারটেশনের বিষয়টির জন্য। এই দোলাচল সময়ের জন্য নাকি এটি অতীব জরুরি একটি বিষয়Ñ লিখেছেন প্রফেসর। প্রাজ্ঞর গবেষণার বিষয় ছিল The Peace for the Next World Amid Labyrinth and Complexity : Path to Solutions.
তাবাসসুম জানত না প্রাজ্ঞ কী নিয়ে গবেষণা করছিল।
তার দুচোখ দিয়ে নেমে এলো অঝোর ধারায় জল।
হঠাৎ প্রাজ্ঞ এলাহি হয়ে গেল মনজুর এলাহি।