মুনীরা বশীর
প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২৫ ১৪:০৮ পিএম
‘ঈদমেলা’ চিত্রকর্মটি শিল্পী মুর্তজা বশীর ১৯৫৬ সালে ইতালিতে বসে এঁকেছিলেন
চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীরকে চিনি আমার মায়ের যত্নশীল স্বামী এবং আমাদের তিন ভাইবোনের স্নেহশীল বাবা হিসেবে। তার অনেক চিত্রকর্ম আমার আর সুজাতের সংগ্রহে আছে। বাবার প্রতিটি সিরিজের একটি করে চিত্রকর্ম আমার বোন যুথী, ভাই যামী এবং আমার সংগ্রহে আছে। বাবার কাজ ছাড়াও অনেক দেশি-বিদেশি চিত্রশিল্পীর চিত্রকর্ম আমার বাসায় আছে। আমার কাছে চিত্রকর্মগুলো মানসিক স্বাস্থ্য ও সামগ্রিক সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বাবার এতগুলো চিত্রকর্মের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী উপন্যাস মৃত্যুক্ষুধার ‘রুবি’ এবং ‘ঈদমেলা’ আমার মনে এত বেশি প্রভাব ফেলেছে যে, তা সহজে ভোলা যায় না বা স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা যাচ্ছে না।
১৯৮৯ সালের শেষের দিকে একটি বহুজাতিক কোম্পানি তৎকালীন বাংলাদেশ টোব্যাকো বর্তমানে ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো তাদের বর্ষপঞ্জির জন্য বাবা বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী ১২ জন লেখকের বিখ্যাত উপন্যাসের ১২টি নায়িকার চিত্রকর্ম এঁকেছিলেন। বাবাকে উপন্যাসগুলো পড়তে হয়েছিল এবং ১২টি নায়িকার চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে রীতিমতো গবেষণা করতে হয়েছিল। ১২টি নায়িকার মধ্যে ছিল কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী উপন্যাস মৃত্যুক্ষুধার নায়িকা রুবি। উপন্যাসটি কাজী নজরুল ইসলামের বাস্তব অভিজ্ঞতাপ্রসূত। কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী নয় বলে মৃত্যুক্ষুধার নায়িকা রুবিকে বাদ দিতে হয়। বাবার বাসায় আমরা ‘মুর্তজা বশীর ট্রাস্ট’ করেছি। আমি, আশফাক এবং আসাদ ভাই রুবিকে পেয়েছিলাম বাবার প্রস্থানের পর, বাবার বাসায় কাজ করতে গিয়ে। আসাদ ভাই বললেন, যুই আপা ‘রুবি’ আপনি রেখে দেন। সেই থেকে রুবি আমার সঙ্গে। বাবা রুবি পেইন্টিংটি কাউকে দেননি বা বিক্রি করেননি। বাবা কি বুঝতে পেরেছিলেন অদূর ভবিষ্যতে তার মেয়ের জীবনের সব রঙ মুছে সাদা রঙই তার মেয়ের জীবনের রঙ হয়ে যাবে?
‘ঈদমেলা’ আমার কাছে এক আবেগের নাম। চিত্রকর্মটি আমি আগে দেখিনি। ২৭ জুন ২০২৫। রাজধানীর উত্তরার গ্যালারি কায়ায় শুরু হয়েছে প্রদর্শনী। সেখান থেকে আশফাক চিত্রকর্মটি ছবি তুলে আমার কাছে পাঠালেন। প্রথমেই আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলে ২৪ বছরের টগবগে এক তরুণের ছবি। যে দুচোখে স্বপ্ন নিয়ে বড় চিত্রশিল্পী হওয়ার বাসনায় নিজের দেশ, মমতাময়ী মা এবং রাশভারী বিদ্বান বাবাকে ছেড়ে উচ্চতর শিক্ষার জন্য বাবার অর্থে ইতালির ফ্লোরেন্স যান। আকাদেমিয়া দ্য বেল্লি আর্টিতে এক বছর চিত্রকলা এবং আরেক বছর ফ্রেসকো নিয়ে পড়াশোনা করেন। ফ্লোরেন্সে রেনেসাঁর ঐতিহ্য তাকে মানসিকভাবে প্রভাবিত করে। এ সময় অধ্যাপক কাপুকিনি ছিলেন তার শিক্ষক। তার কাজে ফিগারের সরলীকরণ ও ন্যূনতম রঙ ব্যবহারের শৈলী তাকে আকৃষ্ট করেছিল। ফ্লোরেন্সে তিনি পথে-প্রান্তরে দেখা সাধারণ মানুষের ছবি এঁকেছেন। অ্যাকর্ডিয়ান বাদক, জিপসির খেলা দেখানো, মা ও মেয়ের বাজার করে ফেরার দৃশ্য এঁকেছেন তিনি।
কিন্তু বাবার মনের গভীরে আঁকা ছিল তার পুরান ঢাকার চকবাজারের পৈতৃকনিবাস পেয়ারা ভবন। তার বাবা ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অবিভক্ত চব্বিশ পরগনা জেলার তার নিজ গ্রাম পেয়ারা নামে বাড়ির নামকরণ করেছিলে। আমি নিশ্চিত ঈদমেলা চিত্রকর্মটি বাবার মনে হারিয়ে যাওয়া পুরান ঢাকার স্মৃতি বহন করছে। সেই ঈদমেলা ফেরত এক কিশোর-কিশোরীর ছবি বাবা এঁকেছেন। বাড়ি ছেড়ে এক বাঙালি যুবকের হয়তো তার ফেলে আসা স্মৃতিকে স্মরণ করতে কাজটি করেছিলেন। তারা মেলা থেকে কাঠের ঘোড়া এবং পুতুল নিয়ে বাড়ি ফিরছে। আমরা বড় হয়েছি পুরান ঢাকায় চকবাজারে আমার দাদাবাড়িতে। আমরা চাচাতো ভাইবোনরা মিলে ছোটবেলায়ও চকবাজারে ঈদের মেলাতে যেতাম। কাঠের ঘোড়া এবং পুতুল আমরা খেলতাম। ছেলেটির মাথায় যে টুপি পরা, আমার বাবারও কিশোরবেলায় এমন টুপি পরা একটা ছবি আছে। বাবার কাছ থেকে শুনেছি তখনকার দিনে পুরান ঢাকার অভিজাত ঘরের ছেলেরা এমন জরির কাজ করা টুপি পরত।
চিত্রকর্মটি যে পাব, তা একেবারে অপ্রত্যাশিত। ‘ঈদমেলা’ চিত্রকর্মটি ছবি তুলে আমার কাছে পাঠান। মেয়ে হিসেবে নিজের সংগ্রহে রাখার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা এ মুহূর্তে সম্ভব নয়। হাতে পেলে হয়তো আবেগে কেঁদে ফেলব। বাবার যুবক বয়সের অনুভূতি অনুভব করব। এটি তার নিরীক্ষাধর্মী কাজ। কোথায় কোন রঙ বসবে, দেখবেন কাজটির মধ্যে তার নির্দেশনা দেওয়া আছে। গ্যালারি কায়াকে ধন্যবাদ ড্রয়িংটি প্রদর্শিত করার জন্য।