× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বর্ষায় হয়ে উঠি জলের সন্তান

দ্রাবিড় সৈকত

প্রকাশ : ২৭ জুন ২০২৫ ১৬:০১ পিএম

বর্ষায় হয়ে উঠি জলের সন্তান

অঝোর ধারায় বর্ষার জলে বাংলার মানুষ যেন নিজেরাই গলে গলে মিশতে থাকে মাটির প্রাণে। বর্ষা আসার আগে মাটির প্রাণ ফুঁড়ে বের হয়ে আসে জলের আকুতি, এক জলের প্রার্থনা। আর সেই ডাকে সারা দিয়েই আকাশ উপুড় করে নেমে আসে বৃষ্টির অবিরল ধারা, ঝমঝম শব্দে ঝরে পড়ে মেঘের সমস্ত সঞ্চয়। এই বর্ষা কেবল ঋতু নয়, এটি এক আত্মার ডাক, এক গভীর সাংস্কৃতিক ভাষা, যার শরীর জলের নির্মাণ, আর হৃদয় বাংলার মানুষের। বাংলায় বর্ষাকাল মানুষের স্মৃতি ও সৃষ্টির কোমল পাগলামিতে ভরপুর। বাংলা ভাষায় সম্ভবত এমন কোনো লেখক কবি শিল্পী পাওয়া যাবে না, যিনি বর্ষা ও বৃষ্টির জল নিয়ে মেতে ওঠেননি। মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জয়নুল, জীবনানন্দ, সুকান্ত থেকে শুরু করে আধুনিক কবিতার শহর-সচেতন লেখকেরাও বর্ষার এক অনিবার্য রূপে আক্রান্ত। কেবল শিল্প-সাহিত্যেই নয়, বর্ষা আসলে বাংলার প্রতিটি মানুষের মনে, কাজে ও সংসারে গেঁথে আছে এক আত্মীয়ের মতো। বাংলায় এমন কোনো মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যিনি বর্ষা নিয়ে কোনো না কোনোভাবে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েননি। তো দেখা যাচ্ছে বাংলা এবং তার মানুষজনের সঙ্গে বর্ষা ও মেঘ-বৃষ্টি নানাভাবে এক আত্মার বন্ধন সৃষ্টি করেছে। এই বন্ধনের সঙ্গে মানুষের জীবন এবং ভাবনা সবকিছুই জড়িয়ে আছে। ফলে বাংলার শিল্প-সংস্কৃতি-দর্শন-অর্থনীতি-রাজনীতি সবকিছুর সঙ্গে বর্ষার অবদান বিচিত্র পন্থায় সংলগ্ন থেকেছে। আমরা যখন বর্ষা ও বৃষ্টি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছি অর্থাৎ আধুনিকতার চাপে যখন বৃষ্টিকে উৎপাত ভেবেছি, বর্ষাকালকে ভেবেছি দুর্যোগের কাল। জলাবদ্ধতা, যানজট, অফিসমিস ইত্যাদির খপ্পরে পড়ে ভেবেছি বর্ষা আর ভাব-বিভঙ্গের উৎস নয়, বরং বাস্তবের ঝঞ্ঝাট হয়ে উঠেছে। এমন বিবিধ চাপে আমরা ধীরে ধীরে বর্ষার বৃষ্টিকে মনে করেছি বিপদের বাৎসরিক উপদ্রব। তখন থেকেই আমাদের প্রাকৃতসত্তার সঙ্গে ক্রমাগত উত্থিত হয়েছে অপরিচয়ের দেয়াল, এই বিচ্ছিন্নতা কালে কালে অলঙ্ঘনীয় হয়ে উঠেছে। এটি কেবল সম্পর্কহীনতার অনুভব নয়, এটি আমাদের চেতনার অপসারণ। বর্ষার সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা মানে প্রকৃতির সঙ্গে, শরীরের সঙ্গে, এমনকি ইতিহাসের সঙ্গে এক অন্তর্গত সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলা। বিজ্ঞানীরা বলেন, আমাদের ব্যবহৃত জলের বয়স ৪৪০ কোটি বছর পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ যে জলে আপনি এখন মুখ ধুচ্ছেন, আমরা যে জল পান করি, সেটিই হয়তো কোনো এককালে ডাইনোসরের পিপাসা মিটিয়েছে, প্রাচীন বনস্পতির পাতায় বসে সূর্যের সঙ্গে করেছে ভাব বিনিময়, বা বরফ হয়ে মেরু অঞ্চলে ঘুমিয়ে ছিল লাখো বছর! বর্ষার বৃষ্টি তাদের ফিরিয়ে এনে আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা হাওয়া-রোদের ভরসায় জল-ডাঙ্গায় খেলা করা একদল জল-কল্লোল। এই বাংলা বৃষ্টি-জলের সুরে ও সংগীতে সহস্র তারে বাঁধা। এই ধ্রুপদী জলই বর্ষার বৃষ্টিতে আমাদের ছুঁয়ে যায় প্রত্ন সময়ের বার্তা নিয়ে। শরীর ও প্রকৃতি উভয়েই এক সজীব জলাশয়, যেখানে জল কেবল উপাদান নয়, চেতনার বাহক। এই প্রবাহ জীবনের ভাষা, শরীরের অভ্যন্তরীণ সংগীত। বর্ষা সেই সংগীতকে বাইরের প্রকৃতিতে অনুরণিত করে তোলে। আমরা যেন বৃষ্টি-জলের একটি বৃহৎ ছন্দের অংশ, ভরা বর্ষায় জলযাত্রার স্পন্দিত পরশে জেগে ওঠা জলেরই সন্তান। মানুষের শরীরের প্রায় সত্তর ভাগ জল, সেই অর্থে আমরা নিজেরাই এক একটি জলাধার। আমাদের কোষে, রক্তে, স্নায়ুতে, এমনকি হাড়েও জল রয়েছে। এই জল ছাড়া কোনো শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া সম্ভব নয়, রক্ত চলাচল, হরমোন পরিবহন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, কোষের ভেতর রাসায়নিক বিক্রিয়া, সবকিছুর মূলে রয়েছে এই তরল উপাদান। শুধু তাই নয়, শরীরের মধ্যে থাকা এই জল অবিরাম প্রবহমান একটা জীবন্ত জলচক্র। অনেকটা পৃথিবীর জলচক্রের মতোই, যেখানে বাষ্পীভবন, সংবহন, মেঘ ও বৃষ্টি মিলিয়ে এক চিরন্তন প্রবাহ ঘটে। মানুষ যখন ঘামে, শ্বাস নেয় বা কাঁদে সেখানেও জল কথা বলে। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের অঞ্চল বাংলা, মেঘ-বৃষ্টির মুখর বর্ষা এখানে আদিকাল থেকে বাস করে। বাংলার সবচেয়ে পুরাতন অধিবাসীদের কাতারে বৃষ্টির স্থান প্রথম কয়েকজনের মাঝেই। বৃষ্টিকে পাঠের মাধ্যমে তাই বাংলাকে পড়া যায় অতি নিগূঢ়ভাবে, অন্য কোনো ভাষায় বাংলাকে এত গভীর করে পড়া যায় না হয়তো। বাংলার মস্তকজুড়ে সগৌরবে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শিখর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে হিমালয় পর্বতমালা, যার ছত্রছায়ায় মেঘ ও বৃষ্টির এতো আত্মীয়তা বাংলা ভূমির সঙ্গে। হিমালয় থেকে বার্তা নিয়ে আসা অসংখ্য নদী-নালা, খাল-বিল, হাওড়-বাঁওড় হয়ে এই জলস্রোতে গিয়ে মিশে যায় বঙ্গোপসাগরের অসীম জলধারায়। এই যে হিমালয় ও সমুদ্রের সংযোগ তাদের মধ্যমণি বাংলার ভূমিতে তুমুল বৃষ্টির জল মানুষের সহগামী। এখানে মানুষ ও জলের ভাগ্য একই বর্ণের কচিপল্লবের ভাষায় এবং মায়াবী সবুজ পাতায় রচিত হয়। হিমালয় ছেড়ে আসা জলের ধারা পুরো বাংলায় জালের মতো পেতে আছে তার পাললিক আঁচল, বৃষ্টির আদুরে ডাকে এখানে শস্য-শিশুরা তরতর করে বেড়ে ওঠে, কৃষাণ-কৃষাণী বুলিয়ে দেয় স্নেহের পরশ। জীবন জীবিকা প্রেম বিরহ বৃষ্টির সঙ্গে নানা মুদ্রায় জড়িত তাই বাংলার প্রতিটি অণু-পরমাণু, কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ তাই লিখতে পারেন, ‘তুমি যদি বনস্পতি তবে প্ররোচনা দাও বৃষ্টি হোক/বনভূমি, বৃক্ষময় হাত তবে প্রসারিত করো,/ মেঘের জরায়ু ছিঁড়ে নামুক জলের শিশু/’ গ্লানিময় পৃথিবীকে সজীব প্রাণোচ্ছল করে তুলতে বৃষ্টির জল নেমে আসে মাটির হৃদয়ে। আমরা প্রাণ খুলে বৃষ্টিতে ভিজি, নিজেদের যাবতীয় পঙ্কিলতা ধুয়ে যায়, বনস্পতির মতো প্ররোচনা দিই বৃষ্টি হোক, ঝমঝম করে আকাশ নেমে আসুক এই নশ্বর শরীরে।  

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা