× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বর্ষার অন্তহীন পাঠশালা

শিবলী মোকতাদির

প্রকাশ : ২৭ জুন ২০২৫ ১৫:৫৮ পিএম

বর্ষার অন্তহীন পাঠশালা

বর্ষাকে বুঝতে হলে এক দৌড়ে গ্রীষ্মের দুয়ার খুলে খানিকটা দাঁড়াতে হয়। কলাগাছের কাঁধে শুকনো পাতার মতো, পোড়া পোড়া, মৃতপ্রায়। কেমন রুক্ষ আর ফাটা ফাটা। কাঠকুড়ানির দল কখন এসে নিয়ে যায় তাদের ধূসর জীবনের সঙ্গী করে? সংখ্যালঘু প্রেমের মতো টেরই পাই না আমরা। এত তাপ, এত দ্রোহ! মনে হতো কে যেন সকল বৃষ্টিকে বন্দি করে রেখেছে আকাশে। ভীষণভাবে টানে ভূমির চৌচিরগুলো। কেমন জ্যামিতিক! প্রান্তিক গ্রামে আসন্ন ঝড়ের হুমকি দিয়ে যায় উদাসী পাগল মেঘের দল। খেয়াল করলে বোঝা যায়, ভবঘুরে হাওয়ায় কীভাবে উড়ে আসে বিদেশি বইয়ের পাতা! আদরে বাঁদর হওয়া ঘুড়িগুলো কেটেকুটে কোথায় চলে যায়!

হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকাল। মৃদুমন্দ বাতাসে গগন-বিহারী ইউক্যালিপটাস তার সুগন্ধ ছড়াল। কালো কালো মেঘের সঙ্গে মেষসকল ডাকতে লাগল। দূর থেকে ছুম-ছুম ঘুঙুরের শব্দ কানে দোলা দিচ্ছিল। নিমেষেই পথ হতে সব পথিক যেন হাওয়া হয়ে গেল। আর অচিরেই কীরূপ ঝামার মতো ঝমঝমাইয়া বৃষ্টি নামল। সময় গেল থমকে। চোর আসে তো কনে পালায়, বর আসে তো পুলিশ হাঁপায়! বৃষ্টি পড়ছে গোয়ালাদের বস্তিতে। শক্ত সরল চওড়া কাঁচা রাস্তা বৃষ্টিতে চেয়ে আছে নববধূর দৃষ্টিতে। বহুদূরগামী। মাটির রক্তিম বিস্তার। জন বিরল। 

বর্ষাটা এমনইÑ ঝক্কি নিয়ে একটানা ঝরায় তুমুল বৃষ্টিপাত। সারাদিন মেঘ ও রোদ্দুরের হারজিতের খেলা চলে। ছাতা আর মাথা ভিজে একাকার। বিলের পাশ দিয়ে বিবিধ বিষয় নিয়ে বৃষ্টি পড়ছে দূরে ছয়ফুলদের বাড়িতে। বৃষ্টি পড়ছে মাটিতে, শান-বাঁধানো পুকুর ঘাটে। ভিজে লেপ্টে থাকা শাড়ির আঁচলে বৃষ্টির ফোঁটা নিয়ে চতুর পায়ে চলে গেল জনৈক রমণী। সাহাদের বাড়ি পেরিয়ে মরা খালে দোদুল্যমান সাঁকো। বৃষ্টি পড়ছে সেখানে। জ্যৈষ্ঠের তাপপ্রবাহকে কবজা করে বৃষ্টি নিয়ে এসেছে শীতলতা। কেমন কায়দা করে দুপায়ের ওপর দুটো হাত টানটান করে রেখে বৃষ্টি পড়া দেখছে অবনিবাবু। মুখে তার ভুবনমোহিনী হাসি। কাজ নেই, আনমনে হুঁকো টানবে সেখানেও বাগড়া দিচ্ছে বৃষ্টির ছাট। ওদিকে দড়িছেঁড়া কারও একটা গরু লতিয়ে-ওঠা কুমড়ো গাছের লতা টেনে খাচ্ছে। দেখলাম, আমেদ আলীর বড় বউ বোধ করি কাজে অবহেলার জন্য তার শিশুটিকে লক্ষ্য করে সমানে খেউড় আউড়ে চলেছে। বৃষ্টির দাপটে বোঝার উপায় নেই, কথা নেই, কর্ম নেই পাতের পান্তায় ঘোর লেগে ঘটাচ্ছে বৃষ্টি-ভাতে উৎপাত।

চারদিকে গরিব গেরস্ত ঘরÑভেসে গেল বুঝি বৃষ্টিতে বাল্যকাল। যাচ্ছেÑ শত কোটি কীট, বিবিধ কষ্টের পাতায় মোড়ানো সংবেদী ওগো শাল! বৃষ্টিতে সব ছারখার। ভেজার ভয়ে দৌড়চ্ছে ভক্ত ও সন্ন্যাসী, তাদের দৃষ্টি হচ্ছে আঁকাবাঁকা। বৃষ্টি পড়ছে তিরের মতো তেরসা হয়ে ঝরে পড়ছে ফুল, ঝরে পড়ছে ঝরার আগে হলুদ রঙের পাতা। কাম বলছে প্রেম, একটুখানি তাকা। এত যে বৃষ্টি তবু ভয় হয়, যদি আর কোনোদিন বগুড়াতে বৃষ্টি না হয়! নীরবে নিঃশব্দে হে ছাতা! কত আর আগলে রাখব তোমাকে? স্বাস্থ্যকর্মীকে ধোঁকা দিয়ে তুমিও হারাবে না নিশ্চয়?

বৃষ্টি থেকে গা বাঁচাতে, তিলক জ্যাঠার উঠোনে ঠাঁই নিয়েছে শামসুল মাস্টার। তার নাতি বিমলের ঘরে, দেয়ালে পিন দিয়ে গাঁথা একটি মথ। পতঙ্গটি মৃত, ছবি দেখে সেটা বুঝতে কোনোই অসুবিধা হচ্ছে না। কিন্তু মথের এই প্রাণহীন নিস্পন্দতাই ছবিটির শেষ কথা নয়। অন্য দুটি উপাদান দেখে বেদনার্ত হয় হৃদয়। মনে আঘাত পেলে বনে বৃষ্টিতে ভিজতে হয়। ঋতুর নিমিত্তে ঢোকে মাস, সেই টানে ভেজা এই আষাঢ়ে হাওয়া বইছিল অকারণে সারাটা সময় বৃষ্টিবাহিত তোমার বিবাহদিনে। বৃষ্টির জন্য যেতে হবে সবুজের বিশ্রামে। সেখানে সকল বৃক্ষ উল্লসিত হয়ে এক সুরে ডেকে ওঠেÑ জননীর মতো, সখার মতো, প্রেমিকার মতো। তার লয় ও বিলয়ে আমরা বড়ই উদাসীন। দুঃখ হয় সে আজ শহরে উপেক্ষিত, অরণ্যে কর্তিত। 

বৃষ্টি পড়ছে, টানা গদ্যেÑমাঝারি থেকে তীব্রতর! তোমার মিষ্টিমুখর কুপ্রস্তাবগুলো ড্রেন থেকে ডোবালয়ে ভেসে গিয়ে জমা হচ্ছে সমুদ্রের নোনাজলে। সাগরে হাঙর থাকেÑ এই ভয়ে ভ্রমণে বাগড়া দিয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছো বৃষ্টিব্রত শালপাতার ঘরে। শাণিত বিদ্রূপে ঝরে পড়ছে সকল বৃষ্টি সৎ কদমের ডালে। ওগো প্রস্তাব, মুচকি হেসে বলো তাকেÑ ভয় নেই, পুরনো প্যান্টের চেন টেনে সে যেন আমার নতুন ছাতার নিচে আসে। গুঁড়ো গুঁড়ো চুম্বনকণা ছড়িয়ে পড়ুক রাগে ও পরাগে সৃষ্টি হোক বৃষ্টির বরকতেÑ সেই পদ্য প্লাবিত অক্ষরে!

অতীতকে ভুলে যাওয়াই মানুষের স্বভাব। সে বাঁচে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে। প্যাঁক-কাদার মধ্যে ক্লান্ত শরীরটাকে টেনেহিঁচড়ে জোর কদমে বাড়ির দিকে এগোচ্ছে ভিজে চুপসে যাওয়া হাটুরেরা। মাঝে মাঝে ভেঙে পড়ছে ভয়ার্ত গাছের ডাল, নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। এমন সময় হঠাৎ, একেবারে হঠাৎই, বৃষ্টিবাহিত হয়ে ভেসে আসে সুর, হালকা বাঁশি আর মাউথঅর্গানের যুগলবন্দি। সংগীত! আহা, আরও একবার সংগীতের ধ্বনি। স্মৃতির পর্দায় কী যেন একটা ভেসে উঠতে চায়। আমাদের অন্তহীন হতাশা আর অসহায়তার মধ্যে চেতনার অবশ শরীর ভেদ করে কী যেন একটা বিঁধে যায় মনের গভীরে। আশ্চর্য এক অনুভূতি। বড় যন্ত্রণা আর আকুলতার অনুভূতি। যেন পালিয়ে গেলাম, উধাও হয়ে গেলাম। গ্রাম-প্রদেশে এমন বৃষ্টির সংগীত! যখন হতাশা আর লাঞ্ছনাবোধ অস্তিত্বের এমনি এক তলদেশে আমাদের নিয়ে গেছে, যখন দুর্দশার অনুভূতি এমনই তীব্র যে বৃষ্টির সুরের সঙ্গে সঙ্গে জেগে ওঠা বোধ যন্ত্রণা হয়ে ওঠে, অসহ্য যন্ত্রণা, যন্ত্রণার কষ্ট যেন শারীরিক হয়ে ওঠে। 

মেঘের মন ছিঁড়ে সারাদিন অঝোরে ঝরতে থাকে বেদনার বৃষ্টিফোঁটা। গরিব গ্রাম্য-গ্রাম যৌবনের জোশ নিয়ে হেসে ওঠে জীবাশ্মের হাসি। মাঠে কাজ নেই, তা বলে নিস্তার নেই এক দণ্ড, খড়ের দাওয়ায় বসে অলস বৃষ্টিবাহিত হাওয়ায় কারণে-অকারণে দড়ি পাকাচ্ছে মকবুল কাকা। প্রচণ্ড প্রিয় পাট-পচার গন্ধে ম-ম করছে চারদিক। প্যাঁচপেঁচে কাদার মধ্যে সাইকেলের বেল বাজিয়ে নিবারণ কাকা চলে যাচ্ছে সরু রাস্তা ধরে। সকল সারল্য ভেসে গিয়ে জমা হচ্ছে করতোয়ার গর্ভে। যেন শূন্য খোপে বসা পায়রার পালক আমি। আমার ছোট ছোট চোখদুটো স্থির হয়ে আছে। পাট এসে নিখুঁত শব্দের মতো দড়িতে পরিণত হচ্ছে। এ কেমন ইঞ্জিনিয়ারিং? আহা! বৃষ্টি পড়ছে টানা গদ্যে মৃত মেঘের ভেতরে!

বৃষ্টি-বাদলার দিনে যাত্রাতে কত যে শিক্ষালাভ হয়! সঞ্চিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে উপচে পড়া মলের গন্ধকে ডায়ভার্ট করে আমরা মনকে বোঝাইÑ তুমি যাচ্ছ বিয়ে বাড়িতে, তীর্থ ও সৌন্দর্যের টানে। যদিও এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে সৌন্দর্য উপভোগের স্পৃহা দিন দিন কমে যাচ্ছে মানুষের। হয়তো ভোগের বাসনা বৃদ্ধিই এর কারণ হতে পারে। যেমন তুখোড় তেমনি এক সময় বৃষ্টির ধারা পাতলাও হয়। ভগ্ন-হৃদয়ে পথিক ফের উঠে আসে কাঁচা-পাকা সড়কের সংযোগস্থলে। সেখানে বড় বড় শিরীষ গাছের ছায়ার নিচে গোলাকার বেদির মতো বসার জায়গা। কালের কোলাহলে আর বৃষ্টির দাপটে তাদের জীর্ণদশা। 

এদিকে সন্ধ্যাও হয় হয়। আঁধারে পথ চিনবে কি না এমত দ্বন্দ্বে সাহস করে যেই না পথে পা রেখেছে অমনি আঠাল কাদায় পুরো চিৎপাট হয়ে হড়কে পড়ে এক হাঁটু কাদার মধ্যে। চারদিকে কেবলই মাদার গাছ। এ কেমন ধারা! অসময়ে রক্তাক্ত লাল ফুলে রঞ্জিত হয়ে আছে তারা। পথিকের হাতে অভিন্ন আনারস। অন্য হাতে মৃগেল মাছ। সমস্তযোগে বলতে গেলে একপ্রকার কাদায় হাবুডুবু খাবার জোগাড়। ভাগ্যিস আঁধার ছিল প্রকৃতিব্যাপী। নইলে লজ্জায় চমকে উঠে চিরতরে তার চরিত্র হারাত। কাদাপানিতে মাছ থাকল মাছের মতো আনারস তার রসসমেত ছিটকে জানি কোথায় গেল! যত ক্ষণস্থায়ীই হোক, সুখ কি সয়, মৃত্যুর শিবিরে? কথাটা পৌঁছে গেল দিক হতে দিগন্তে। 

বৃষ্টি পড়ছে নিরাকারে, অবজেকশন ইগনোর করে সংবিষ্ট সবুজের সংসারে, পর্দার ফাঁক গলে উঁকি দিচ্ছে কাম, কৃতাঞ্জলি। বৃষ্টি পড়ছে তির্যক তিরাকারে। মহুয়া পাতায় লিখে রাখা অবসাদলিপি বারবার পড়ি আর মনে মনে ভাঁজ করে রাখি। আহা! এসেছি এই রাতে কামিনী ফুলের লোভে, মেঘনাদ পড়াতে পড়াতে কখন হয়েছি উদাস চশমাটা খুলে...। বৃষ্টির বদনাম ছিটকে ছিটকে আসে গন্ধরাজ চুলে। বৃষ্টি পড়ছে হাড়ের অভ্যন্তরে, শিরা ষড়ৈশ্বর্যে, নির্দোষ নারীত্বে বৃষ্টি জমছে শড়ির সবুজে। অলক্ষ্যে ভেঙে পড়ছে সব, ভেসে যাচ্ছে তাসের ফোঁটা। ডানার উত্থান, সুচাল অহং, ধীরে ধীরে আলগা হচ্ছে ডাকাতিয়া ডিফেন্স। মর্মে মেটাচ্ছে মেধাজীবী সর্বহারার দায়, বৃষ্টি পড়ছে প্রশ্নাতীত ধনতান্ত্রিক ধারায়। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা