আইভি জামান
প্রকাশ : ২৭ জুন ২০২৫ ১৫:৫৬ পিএম
বৃষ্টি সে তো অপূর্ব সুন্দর একটা ব্যাপার। মানে বৃষ্টি যখনই হয়, তখনই আমরা আনন্দ পাই। আনন্দে মন নেচে ওঠে। আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝরলেই, প্রকৃতি প্রশান্তিতে ভরে ওঠে। সব মিলে বৃষ্টিকে আমরা খুব উপভোগ করি। যাপন করি। বর্ষার সময়ে সচল আকাশ-বাতাস। বৃষ্টি শুরুর আগে, মেঘ করে আকাশে। সেটাও দারুণ এক দৃশ্যকল্প। আমাদের যে ঋতুগুলো আছে, তার মধ্যে বর্ষাই আমি মনে করি সবচেয়ে সুন্দর। এ ঋতুটাকে আমরা উপভোগ করি।
আমরা ছোটবেলায় যে বৃষ্টি দেখেছি, এখনকার বৃষ্টি দেখে মনে হয় ‘বৃষ্টি’ হচ্ছে না। প্রকৃতি অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। আগে বর্ষার দিনের বৃষ্টি মানে টানা তিন দিন চার দিন অবিরাম ধারায় জল ঝরছে। একনাগাড়ে বৃষ্টি হচ্ছে তো হচ্ছে। থামার নামগন্ধ নেই। সে কী বৃষ্টির শব্দ। পথ-ঘাট একাকার হয়ে যেত। বৃষ্টিজলের স্রোতে ভেসে যেত সব। এখন তো সেই বৃষ্টি আর দেখি না। বৃষ্টি শুরুর আগে থেমে যায়।
বর্ষাতেই প্রকৃতি যেন সত্যিকারে প্রাণ ফিরে পায়। এ সময় গাছপালা এমন সুন্দর রঙ ধারণ করে। আপনাআপনি মুগ্ধকর দৃশ্য তৈরি হয়। অতিষ্ঠ গরমে যখন প্রাণ আইটাই। ঠিক তখনই প্রশান্তির পরশ বোলাতে উপস্থিত বর্ষা। এই ঋতু না এলে প্রাণ ফিরে পেতাম না। বর্ষা আছে বলেই আমরা বেঁচে আছি। সুস্থ আছি। গ্রীষ্মের পর কত যে গাছ গজিয়েছে। আমাদের বাসার ছাদের বাগানের কথাই বলি। সেখানে আমরা অবসরে বসি। গাছগুলো একদম বিবর্ণ কালার ছিল। কিন্তু যখনই বৃষ্টি হলো রাতারাতি পাতাগুলো সতেজ হয়ে উঠল। প্রকৃতির এ খেলাটা আমাকে খুব আনন্দ দেয়। বর্ষার নানান গুরুত্ব। এটি আমাদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ উপস্থিত হয়।
বৃষ্টি পতনের যে আওয়াজটা না, সেটি যেমন টিনের ঘরে যারা থাকে, তারা এক ধরনের আনন্দ পায়। আমরা নগরে বন্ধ বাড়িতে থাকি। এখানে টিনের চালাতে বৃষ্টির ঝমঝমাঝম শব্দটি পাই না। তবু বৃষ্টি নামলে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। বৃষ্টি দেখি। আগের দিনে শহরে বৃষ্টি হলে রাস্তাঘাটে কাদা, পানি জমত। ভেতরে-বাইরে সর্বত্র বৃষ্টির প্রভাব। পানি আর পানি। শহরে সেই দৃশ্যটি আর দেখা যায় না। তবে গ্রামে গেলে বর্ষার প্রকৃত রূপ পাওয়া যায়। যেখানে বিল, ঝিল, সেখানে বেশি বৃষ্টি হয়। বৃষ্টির কাছে যেতে হলে গ্রামে যেতে হবে। বৃষ্টিকে কেউ কেউ কষ্ট মনে করে। আমি কিন্তু তা ভাবি না। কষ্ট নয় বরঙ স্বস্থি। গাছপালা, পশুপাখি পানি পায়। খাল-বিল পানিতে ভরে ওঠে। সবকিছু ধুয়ে-মুছে সজীব হয়ে ওঠে।
বর্ষা মানে আকাশের রঙ বদলের খেলা। মেঘের সময় এক রঙ। বৃষ্টির সময় আবার রঙ। অনেক সময় বৃষ্টি নামার আগে ঘন অন্ধকারে চারপাশটা ছেয়ে যায়। যেন সন্ধ্যা নেমে আসছে। আসলে তখন কিন্তু দুপুরবেলা। ঘনঘোর বর্ষার রাত। টিনের চাল গড়িয়ে বৃষ্টি পড়ছে। বিদ্যুৎবিহীন রাত। গড় গড় শব্দে চাল গড়িয়ে জল পড়ছে। একটাবার অনুভব করুন। সব মিলিয়ে বর্ষাকাল খুব উপভোগ্য।
এখনকার বাচ্চারা বৃষ্টিকে বিরক্ত ফিল করে। তারা বাইরে যেতে পারছে না বলে। আটকে আছে। আমি মনে করি বৃষ্টি নামলে আনন্দ পাওয়া উচিত। বৃষ্টি আমাদের প্রকৃতির একটি স্বর্গীয় একটি দান। পৃথিবীর অন্য দেশে বাংলাদেশের বর্ষার যে ফিল সেটা কিন্তু নেই। সে সব দেশে, হয় খুব শীত, না হয় খুব গরম। কিন্তু আমাদের দেশে কিন্তু তা নয়। ঋতুর পরিবর্তন আমাদের একঘেয়েমি দূর করে। মনকে সচল রাখে। কথা হচ্ছে বৃষ্টি নিয়ে। সেটিই বলি। বৃষ্টি ভেতরে বাইরে সুর তোলে। মিউজিকের মতো। পৃথিবীর সেরা সুর যদি বলি, কমেই বলা হয়। সংগীত হিসেবে গণ্য করি। বৃষ্টির ফোঁটা যখন পানিতে পড়ে তখন একরকম আওয়াজ। টিনের ওপর পড়লে আরেক রকম দ্যোতনা। গাছের পাতা থেকে বৃষ্টি টুপটুপ করে ঝরে পড়ছে বৃষ্টির ফোঁটা। পানি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পড়ছে। কোথাও কলকল করে জল গড়িয়ে পড়ছে। ঝরনা ছেড়ে দিলে পানি যেমন গড় গড় করে পড়ে। বৃষ্টিটাও ঠিক তেমনই। ছোটবেলায় যখন বাসায় থাকতাম। বৃষ্টি দেখার জন্য চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতাম। এটি মূলত প্রকৃতির কত রূপ পর্যবেক্ষণের জন্য দাঁড়িয়ে যেতাম। মন শীতল হয়ে উঠত। আরাম পেতাম। এখনও চেষ্টা করি কোথায় বৃষ্টি দেখলে তাকিয়ে থাকি। অনুভব করি। দেখি প্রকৃতির অপার বিস্ময়। নগরের কোনো কোনো বাড়িতে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য আর্কিটেক্টরা তেমনভাবে ডিজাইন করেছেন। কাজেই বৃষ্টি আমাদের জন্য সৃষ্টিকর্তার এক অপার আশীর্বাদ।
এখন বৃষ্টিতে ভেজার সাহস করি না। বাচ্চারা বৃষ্টিতে ভিজতে ভয় পায়। আমরা যখন চারুকলায় ছিলাম। যেই বৃষ্টি এলো আমরা অমনি সবাই ভিজতে বেরিয়ে পড়লাম। চারুকলার গেটের বাইরে কখনও যেতাম না। ভেতরেই ভিজতাম। দৌড়াদৌড়ি। ছোটাছুটি। কী যে খুনসুটিময় সময়। আমার খুব মনে পড়ে চারুকলার ওই দিনগুলোর কথা। চারুকলার বৃষ্টি এলে বোঝা যেত। একদম চারদিকে বিশাল বিশাল গাছ। নির্জন। বৃষ্টি নামলে গাছ থেকে অনবরত ঝিরঝির করে পানি পড়ার শব্দে টের পেতাম। একদিন ভিজতে বের হয়েছি। নাজমা বেগম, সাকিনা হালিম, নিরু পারভীন, চম্পা বেগম, জয়া চাকমা, আফরোজা বেগম, ইরানি আহমেদ, ইরানি বেগমসহ আরও অনেকে। আমরা সবাই একই ইয়ারমেট ছিলাম না। সব ইয়ারের মেয়েরাই ভিজতে বের হতাম। আমরা যে আনন্দ করেছি। এখনকার মেয়েরা সেই আনন্দ পায় না মনে হয়! চারুকলার হোস্টেলে ছিলাম। বাবা-মা নেই কাছে। বৃষ্টির জলধারায় অবগাহন করতে বেরিয়ে পড়তাম। কোনোদিন আধা ঘণ্টা এক ঘণ্টা ভিজে হোস্টেলে ফেরত আসছি। এসে দেখি লাঠি হাতে বসে আছেন হোস্টেল সুপারের স্ত্রী। আমাদের তিনি লাঠি দেখিয়ে বললেন, এসো। মজা দেখাচ্ছি। শেষে অবশ্য গায় হাত তোলেননি। শুধু লাঠি দেখিয়ে বললেন, ‘আর যাবা কখনও। এই যে ভিজে ফিরে এলে। যদি অসুখ হয়। জ্বর হলে তখন বাপ-মাকে কী খবর দিবা।’ এ রকম কত কত স্মৃতি চারুকলার দিনগুলোতে। হোস্টেল সুপারের একটু বাধা তো ছিলই। তবে ওই শাসনটিও আমাদের কাছে আনন্দের ছিল। আর কোনো আনন্দ করছ, সেখানে যদি বাধা না আসে, প্রকৃত মজাটা তখন আর থাকে না। বাধা ডিঙানোর মধ্যেই একটা মধুর আনন্দ থাকে। এখনকার বাচ্চারা কিন্তু বৃষ্টি নিয়ে এত কিছু করবে না। খুব বেশি হলে তারা বৃষ্টির পানিতে একটু পা ভেজায়। বারান্দা দিয়ে হাত বাড়িয়ে জল ছুঁয়ে দেখে। কিন্তু আমাদের সময়ে বৃষ্টি নামলে ঘুরে আটকে রাখাার সাধ্যি কারÑ পুরো শরীর বৃষ্টির পানিতে ভেজাতাম। আরেকটা ঘটনা বলি। একবার মেঘনা নদীর ওপর দিয়ে আমরা ভ্রমণে যাচ্ছিলাম। হামিদুজ্জামান, হাশেম খান স্যারসহ বিখ্যাত শিল্পীরা। তখন আমি ভাবলাম। মেঘনা এসেছি। মেঘনার ওপর দিয়ে যাচ্ছি। আর মেঘনাকে ছুঁয়ে দেখব না! তা হয় নাকি। কিন্তু আমি তো সাঁতার পারি না। তখন একটা বয়া নিয়ে নেমে পড়লাম। আর উত্তাল মেঘনার জলরাশি। সেখানে অবশ্য সাঁতার জেনেও লাভ নেই। যাই হোক, বয়া নিয়ে মেঘনাতে নেমে পড়লাম। সাঁতরিয়ে দেখলাম। আমার ধারণা, এখনকার ছেলেমেয়েরা এত সাহস করবে না। তাদের প্রকৃতি নিয়ে এত মাতামাতি করতে দেখি না। কিন্তু আমরা প্রকৃতির সঙ্গে এত মিলেমিশে থাকতাম। কেননা প্রকৃতি ছাড়া কেউই যথাযথভাবে বেড়ে উঠতে পারে না।
আরেকটি ঘটনা খুব মনে পড়ছে। এত দ্রুত সব কিছু বদলে গেল। চোখের পলকে দৃশ্যগুলো বদলে গেল। আমি যখন ছোট ছিলাম। সেই স্মৃতিটাই এখন একটু বলি। আমরা থাকতাম বগুড়া শহরের মালতীনগরের একটি ভাড়া বাসায়। বাবা ডিস্ট্রিক্ট হেলথ অফিসার ছিলেন। বগুড়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়তাম, যা ‘ভি এম স্কুল’ নামে পরিচিত। ক্লাস ফাইভে কি সিক্সে পড়ি। করতোয়া তখন নদী অনেক দূরে ছিল। বৃষ্টির সময় ওদিকটায় দেখতে গেছি। বন্ধের দিনে বৃষ্টি হলো। আমরা বেরিয়ে পড়লাম। গাছের ডাল ভেঙে আমাদের গায়ে পড়বে, সেই ভয়ডর ছিল না। কয়েকজন মিলে ছুটে করতোয়ার পাড়ে গেলাম। এখন আমি গিয়ে আমার কৈশোরে দেখা সেই করতোয়াকে আর খুঁজে পাইনি। শুকিয়ে গেছে। ভরাট হয়ে চারদিকে বিল্ডিং উঠেছে। বসতি গড়ে উঠেছে। আগে করতোয়ার পূর্বপাড়ে আধা মাইল ফাঁকা ছিল। সবুজ আর সবুজ। সবুজ ঢেউয়ে ধানক্ষেতে নেচে নেচে উঠত। আমরা ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে নদীর পাড়ে পৌঁছেছি। বর্ষায় এই করতোয়ার কী যে সৌন্দর্য ছিল! বগুড়া শহর তখনও মফস্বল। গ্রামের মতোই। সবুজের ঢেউ ছড়ানো গ্রাম। প্রতিবেশীদের বাড়িতে আমরা যেতাম। তারা আসত। মিলেমিশে ছিলাম। দলবেঁধে নদীর পাড়ে যেতাম। বর্ষায় সেই নদীর আয়তন আরও বেড়ে যেত। কত যে পালতোলা নৌকা করতোয়ার বুকে ছুটে চলত। নানা রঙের পুরনো কাপড় জোড়াতালি দিয়ে বানানো পাল। দেখতে দারুণ লাগত। তার মধ্যে বৃষ্টি। বৃষ্টির ফোঁটা পানির ওপর পড়ছে। কী সুন্দর দৃশ্য। বৃষ্টি পানিতে পড়ার একরকম ছন্দ, আবার মাটিতে পড়ার আরেক ধরনের শব্দ। কাজেই বৃষ্টি থেকে প্রকৃতির কত রকম রূপ যে আছে তা আমরা দেখতে পাই। রাতে এক রূপ। দিনে আরেক রূপ। শুধু বর্ষা নয়, বাংলার প্রত্যেকটি ঋতুরই নিজস্বতা আছে। বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তাই আমাদের প্রত্যেকটি সন্তানেরই যেন বৃষ্টিমাখা একটা স্মৃতি থাকে। শৈশব থাকুক। কেননা মানুষকে সজহ হতে হলে অবশ্যই তাকে প্রকৃতিমগ্ন হতে হবে। বৃষ্টিতে ভিজলে মানুষের জীবনীশক্তি বেড়ে যায়। অনেক রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। মনটাও ভালো থাকে।
বাংলার প্রকৃতিতে গ্রীষ্ম, বর্ষা, স্নিগ্ধ শরৎ, হেমন্ত, নির্দয় শীত, বসন্ত। প্রত্যেকটি ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেতে থাকে রঙ। অর্থাৎ প্রকৃতি বলে দেয় এখন কোন ‘সময়’। এই রঙ বদলের খেলা দেখার জন্য প্রকৃতির কাছাকাছি যেতে হয়। প্রকৃতির তিনটি কালার খুব প্রভাব ফেলে, একটি হলো একদম সবুজ। ধানের গাছ যখন কচি থাকে। সেই রঙ আর কী! যেটি আমাদের পতাকার কালার। আরেকটি হলো হলুদ। যখন ধান পাকে তখন চারদিকে শুধু হলুদ আর হলুদ। আর বর্ষার রঙ হলো রুপার কালার। গ্রামে গেলে রঙের এ খেলাটি প্রকৃত অর্থে অনুভব করা যায়।