রফিকুন নবী
প্রকাশ : ৩১ মে ২০২৫ ১৮:৩৮ পিএম
চিত্রকর্ম : সমরজিৎ রায় চৌধুরী
বছরে আমাদের জন্যে দু’টি আনন্দের দিন ধার্য রয়েছে। দু’টিই খুবই স্পেশাল। স্পেশাল বলছি, কারণ দু’টিতেই মানুষের চাল-চলন, খরচ-খরচায় দিলদার হয়ে যাওয়া, ভ্রমণপিপাসু ভাব ধারণ, সাজ-পোশাকে প্রতিযোগী হয়ে পড়া ইত্যাদি বহুদিকের দরজা খুলে যায়।
তো দিন দু’টি স্পেশাল হওয়ার প্রয়োজনীয় বহুদিকেও স্পেশাল কথাটি ব্যবহৃত
হতে থাকে। যেমনÑ স্পেশাল বাজার, বিশেষ-বিশেষ স্পেশাল পণ্য, অনলাইনে দাম নিয়ে স্পেশাল
অফার, মোবাইলে স্পেশাল সুবিধা, পত্রপত্রিকার ঈদ-স্পেশাল লেখা লিখিয়ে স্পেশাল সংখ্যা
প্রকাশ, ভ্রমণে সুযোগ-সুবিধা দিয়ে ঈদ-স্পেশাল রেলগাড়ি, ভাঙাচোরা ঝরঝরে প্রায় অকেজো
যানবাহনগুলিকে সারাই করে ঈদের জন্যে স্পেশাল করে তোলা, যানবাহনের টিকিটে স্পেশাল মূল্য
হাঁকানো। ঈদের দিন স্পেশাল অতিথিদের নিমন্ত্রণ করা, স্পেশাল রান্নায় স্পেশাল আইটেমের
খানাদানার ব্যবস্থা। টিভি চ্যানেলগুলিতে স্পেশাল অনুষ্ঠানাদির আয়োজন। বেতারগুলোতেও
তাই। তা ছাড়াও ঈদ উপলক্ষে ঈদগাহ তৈরি, ইমাম সাহেবদের ঈদ-স্পেশাল বিশেষ বয়ান, রাজনীতিবিদদের
ঈদ-স্পেশাল বক্তৃতা ইত্যাদি কতো কি না রয়েছে।
এসবই আসলে স্পেশাল দু’টি ঈদের স্পেশালিটি। আসলে দিন দু’টি উপলক্ষে
যে আনন্দের আবহ তৈরি হয় সমাজ সংসারে, তাও স্পেশাল। তবে আনন্দের আতিশয্যের ব্যাপারটিতে
দু’টি ঈদের বৈশিষ্ট্য দু’রকমের। রমজানে মাসব্যাপী রোজাদারদের ইফতার আর সেহরিতে স্পেশাল
কিছু আইটেমের ব্যবস্থা রাখতে সাধ্য অনুযায়ী স্পেশাল ভাবনা থাকে। এই ঈদে স্পেশালভাবে
খরচ করার স্পেশাল জামাকাপড় কেনার স্পেশাল অভ্যাস রপ্ত হয়।
কোরবানির ঈদে অবশ্য আরও কিছু যুক্ত হয়। রমজানের ঈদে সমাজের প্রায়
সব অংশের মানুষ সাধ্য অনুযায়ী নিজ নিজ স্পেশালিটি তৈরির মাধ্যমে আনন্দ উপভোগ করে, কিন্তু
কোরবানির ঈদে ভাগ আছে। তবে সব চাইতে যেটা লক্ষণীয় তা হলো ঈদ-স্পেশাল সাহস।
ঈদ এলেই মানুষের হাবভাব বদলে যায়। তা সে রমজানের ঈদ হোক বা কোরবানির।
দুঃসাহসী হয়ে ওঠে। এটাকে দস্তুরই বলা যায়। সব বয়সিদের মধ্যেই সঞ্চারিত থাকে এই সাহসীপনা।
সামর্থ্য থাকুক বা না থাকুক, সাধ্যাতীত দেদার খরচ করার সাহসে পেয়ে
বসে। চাকুরেরা বেতন-বোনাস জমানো পুঞ্জি খরচ করতে কুণ্ঠাবোধ করে না। খরচের জন্যে দু’হাত
খুলে যায় অবলীলায়।
আজকাল গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ কাজকর্মের জন্যে শহরগুলোতে এসে থাকে।
বিশেষ করে রাজধানী শহরটিই এজন্য সর্বাধিক পছন্দের। শহরের কোলাহলময় অবস্থাটিতে অতিষ্ঠ
জীবনটি থেকে বাঁচতে, ফ্রেশ অক্সিজেন নিতে খানিকটা হলেও বা ক’দিনের জন্য হলেও দেশের
বাড়িতে যাওয়ার সুযোগটি হাতছাড়া করে না। শহরকে প্রায় খালি করে চলে যায় সবাইÑ যার যার
গন্তব্যে। এই পর্বটিকে অর্থাৎ এই পর্যায়টির ভ্রমণ পর্বটিতে সবাই দারুণ সাহসী ভূমিকায়
অবতীর্ণ হন। জীবন বাজি রাখা পণ-প্রতিজ্ঞা বা ইচ্ছাকে প্রশ্রয় দেন অবলীলায়। এই ইচ্ছা
পূরণ স্বাচ্ছন্দ্য, বেঁচেবর্তে নির্বিঘ্নে হলে তো প্রতি ঈদে কর্মস্থলে যে ফিরে আসা
তাকে আমার এক বন্ধু বলেন ‘পুনর্জন্ম’। বিশেষ করে দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফিরলে এই ব্যথা
আরও সমীচীন বলে ধর্তব্যে নেওয়া যায়। তো সবই দুঃসাহসী ব্যাপার। প্রতি ঈদের জন্য এই সাহস
সঞ্চিত হয়ে থাকে। সারা বছর কাজের চাপে সাহসটি উধাও হয়ে থাকে। মনের, মগজের আড়ালে-আবডালে
লুক্কায়িত থাকে। সাহস বলে কোনো দিক স্বভাবে রয়েছে কি না বোঝার উপায়ই থাকে না। যেমন,
ধরা যাক রাস্তায় চলার সময় দেখা গেল পথে কিছু লোক কাউকে ধরে বেদম পেটাচ্ছে। এমনটায় থামাতে
পুষে থাকা প্রতি ঈদে বেরিয়ে আসা সাহসটা সাধারণ সময়ে দৃশ্যমান হয় না।
যাইহোক কোরবানির ঈদÑ আনন্দের ব্যাপারে যে ভাগ আছে সেই কথায় আসি বরং।
আসলে কোরবানিতে গরু-ছাগলরা এই ভাগটি তৈরি করে ফেলে। বনেদি ধনিকদের বনেদি, বড়সড় আর দামের
স্পেশাল গরুর দিকে ধাবিত হতে দেখা যায়। উচ্চ মধ্যবিত্তদের সামর্থ্য অনুযায়ী মাঝারি
অথচ স্বাস্থ্যবান গরু পছন্দ। তবে এই গ্রুপের মানুষদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকে বেশি
বলে অনেক সময় খরচের বরাদ্দটা সাধ্যাতীত করারও প্রবণতা থাকে কখনও কখনও। যারা শুধুই মধ্যবিত্ত
অর্থাৎ যাদের ইচ্ছা থাকলেও ওপরে ওঠা হয় না, তাদের চয়েস যেনতেন-প্রকারেণ অবস্থায় আটকে
থাকে। যেকোনো একটা হলেই হলো ধরনের প্রচেষ্টা চলে। সে রকম গরুর মধ্যে ভালোমন্দ খোঁজার
চেষ্টাও অবশ্য থাকে।
এইভাবে কোরবানির ব্যাপারে বিভাজন রয়েছে। একই কারণে ছা-পোষা নিম্ন
মাধ্যবিত্তজনরা পছন্দ করেন ‘ভাগে’ থাকতে। মানে ভাগীদাররা নাজুক পকেটের হলে মোটামুটি
সহনশীল গরুতে কখনও ৭ ভাগ করে ৭ জনে কোরবানিতে মনোযোগী হন। আবার অবস্থাবুঝে কখনও-বা
৫ ‘ভাগে’ যান। অবশ্য নিম্ন মধ্যবিত্তের কারও কারও খাসির দিকেও চোখ থাকে। উচ্চরা গরুর
সঙ্গে খাসিতেও চোখ রাখেন।
এই প্রসঙ্গে নিম্নবিত্তদের মধ্যেও কোরবানির ইচ্ছা হতে দেখা যায়। তারা
খাসিতেই তুষ্ট থাকার চেষ্টা করে। একেবারে বিত্তহীন যারা ওপরে বর্ণিতদের ওপরে নির্ভর।
তবে তারা বৃহৎ গরুওয়ালাদের ব্যাপারে নির্ভীক থাকতে সাহস পায় না হেতু, বাকিগুলোর সহানুভূতি
প্রাপ্তির প্রচেষ্টায় থাকে।
তো কোরবানির ঈদে মাংস নিয়েই চিন্তাভাবনা প্রাধান্য পায়। গরু-খাসির
চেহারা মাপ এবং ওজন নিয়ে সব ক্ষেত্রের মানুষদের কমপক্ষে দিন বিশেকের চর্চা চলে। দামে
হারজিৎ নিয়েও কথা হয়। কেউ কেউ দেশ ছাড়িয়ে আরবের দিকেও তাকান। মরুভূমির জীবজন্তুর প্রতি
টান অনুভব করেন। তাতে উট-দুম্বা ইত্যাদিও কোরবানি দিয়ে থাকেন।
এই সবকে নিয়েই ঈদের আনন্দ অপরিসীমতা লাভ করে। সাথে অবশ্য সামাজিক
বৈষম্যও নজরে পড়ে। তবে সব চাইতে গুরুত্বের দিক হলো ঈদ নিয়ে ঘটে যাওয়া স্পেশাল সব ঘটে
যাওয়া দুর্ঘটনা। আর ঈদ যত নিকট আসতে থাকে কোরবানি নিয়ে সর্বস্তরের মানুষদেরও গরু কেনা,
খাসি কেনা নিয়ে শলাপরামর্শ করতে নৈকট্য বৃদ্ধি। পশু বিক্রেতাদের সঙ্গে, সহায়কদের সঙ্গে,
অন্যান্য ক্রেতার সঙ্গে, কসাইদের সঙ্গে কথা বলায় শ্রেণিবৈষম্যের ব্যাপার থাকে না। ক্রেতা-বিক্রেতাদের
মধ্যে চলে দামে ঠকে যাওয়া, জিতে যাওয়ার লড়াই। ক্রেতাদের মধ্যে চলে ম্যানেজ করে দাম
বলার ধরন। অর্থাৎ দামে জিতেছে এটা বোঝাতে কম দামে কেনা বলার চল যেমন আছে দেখা যায়,
তেমনি তাক লাগানোর জন্যে বেশি দাম বলারও প্রবণতা দেখা যায় পথেঘাটে।
মোটকথা, ঈদকে সামনে রেখে বেশ কয়েকদিন দুনিয়ার অন্য অনেক ভাবনা আড়াল
হয়ে যায়। এমনকি ঈদের ছুটির আগে গরু-ছাগল সম্বন্ধীয় ব্যস্ততা কিন্তু ঈদ শেষে ছুটিতে
শহর-টু-গ্রাম, গ্রাম-টু-শহর করে ছোটাছুটির ব্যস্ততায় রাজনীতি নিয়েও কারও কোনো হেলদোল
থাকে না। অতএব রাজনীতির মাঠও বিশ্রামে থাকে। মানুষের ভাবনাজুড়ে, আলাপ-আলোচনাজুড়ে থাকে
শুধু পশুর হালচাল নিয়ে কথা। কথা হয় গরুর হাট নিয়েও। হাটে কার কী অভিজ্ঞতা হলো, কে
কেমন বিপদে পড়েছে, কার কেমন মজার ঘটনা, এসবও প্রাধান্য পায়।
নিজের অভিজ্ঞতাতেও তেমন কিছু ঘটনা নেই তা নয়। বন্ধুদের ব্যাপারেও
তাই। এ রকমের কয়েকটি উদাহরণ উল্লেখ করছি। যদিও সেসব পুরোনো, অনেক আগের। কিন্তু আমি
ওই অভিজ্ঞতাকে জীবনের স্পেশাল কিছু জ্ঞান করি।
অনেক বছর আগের ঘটনা। গাবতলির গরুর হাটে গিয়েছিলাম সঙ্গী-সাথী নিয়ে।
আমরা সবাই ছিলাম গরুর অংশীদার। অর্থাৎ ভাগের সদস্য। সাধ্য অনুযায়ী ছোটমোটো হাড় জিরজিরে
একটা গরু কিনতে পেরেছিলাম আমরা। একই রকম হাড্ড্সিার একটি লোক এসে বলেছিল যে, গরুটিকে
বাসায় পৌঁছে দিবে। গরুটির পিছে পিছে মাত্রই হাঁটা শুরু করেছি। হঠাৎ কাছাকাছিতে কে যেন
বলে উঠল টোকাই গরু, টোকাই …’। শুনে মনে মনে খুশি
হয়েছিলাম এই ভেবে যে আমার দেওয়া নামটি জনপ্রিয় হচ্ছে।
তখন গাবতলির ওদিকটায় জলাশয়। শ্যামলী-আদাবর সবই বন্যার পানিতে থৈ থৈ
অবস্থায়। নদী, বিল, খানাখন্দ সবই মিলেমিশে একাকার। বলা বাহুল্য, তখন বাঁধ তৈরি হয়নি,
ইমারতাদি ছিল না, লোকালয়ও সৃষ্টি হয়নি। বন্যাও ছিল বিপজ্জনক। তো হঠাৎ আমাদের হাড্ডিসার
গরুটি ততোধিক হাড্ডিসর্বস্ব বাহকটির হাত ফসকে দৌড়ে গিয়ে পানিতে গিয়ে রীতিমতো ইংলিশ
চ্যানেল পাড়ি দেওয়া সাঁতারু ব্রজেন দাসের ফলোয়ার হয়ে গেল। মুহূর্তে অপর পারের বসিলার
দিকে যাত্রা শুরু করল। আমাদের কাছেই ছিলেন শিল্পীবন্ধু এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা মহিউদ্দিন।
তিনি চিৎকার করে উঠলেন : রনবীর গরু পলাইল, পলাইল। যাহোক পানিতে ঝাঁপ দেওয়া সহকারীর
প্রাণপণ সাঁতরে গরুটিকে ধরে আনতে প্রায় আধঘণ্টা লেগেছিল।
মায়া লেগেছিল খুব। গরুর জন্যও লোকটির জন্যও। সঙ্গীদের বলেছিলাম গরুটিকে
কোরবানি না দিতে। কিন্তু সঙ্গীদের একজন ছিলেন খুবই ধর্ম অন্তঃপ্রাণ। তিনি বলেছিলেন
যে পশুর প্রতি যত মায়া জন্মে সেটিকে কোরবানি দেওয়াটা আসল। ওই ঘটনাটি আমার বিশেষ স্পেশাল
অভিজ্ঞতার বলে মনে করি আজও।
আর একবার হাটের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ বিশাল রাঙ্গা চোখওয়ালা
এক রাগী গরু হুড়মুড় করে এসে আমার পায়ে পাড়া দিয়ে ছুটে গিয়েছিল। আর তার সেই হাঁটার কারণে
আমার হাঁটা বন্ধ ছিল প্রায় দিন পনেরো। আসলে সেদিন মুহূর্তে পা ফুলে একেবারে ধাড়ি ইঁদুরের
পিঠের মতো হয়ে গিয়েছিল। ভুগেছিলাম মাসখানেক। ঈদের আনন্দ চুপসে গিয়েছিল বেমালুম। তো
এইটিকেও আমার ঈদ-স্পেশাল ঘটনা বলে থাকি। আসলে ঈদ এমনিতেও স্পেশাল। এবার আমার এক সঙ্গীর
কথা বলি। ইনি ঈদ এলে গরুর হাটে যেতে পছন্দ করেন। একবার বিপদে পড়েও হাটে যাওয়ার আনন্দ
থেকে সরে যাননি। তিনি বেশ রসিক লোক।
তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বেশ রস মিশিয়ে প্রায়ই বলে থাকেন। বলেছিলেন, ‘বুঝলেন,
একবার মোহাম্মদ আলীর ঘুষি খেয়েছিলাম। এমনি এমনি ঘুষি নাÑ হাজার কেজি ওজনের! ঘুষি মানে
গুঁতা! বিশাল এক গরুর ষণ্ডামার্কা চেহারাটার মাত্র কাছাকাছি গেছি, হঠাৎ ধাঁই করে নিমেষে
এক গুঁতা। শিং দুটি ছিল না বলে রক্ষা। সেই মাথার ঢুঁ-টি এমন ওজনের ছিল যে কোঁকাইয়া
বইসা পড়ছিলাম। এখনও সবাইরে কই, Ñঢুঁ-তো না যেন মোহাম্মদ আলীর বক্সিং ছিল ওইটা।’ এই
ঘটনাও তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া স্পেশাল হিসেবে গণ্য।