সুদীপ্ত সালাম
প্রকাশ : ৩১ মে ২০২৫ ১৮:১৪ পিএম
আগাথা ক্রিস্টির ক্যামেরায় অ্যাসিরীয় ভাস্কর্যের ছবি
আগাথা ক্রিস্টি (১৮৯০-১৯৭৬) নিজের একটি রহস্যময় জগৎ তৈরি করেছিলেন। তিনি নেই, কিন্তু তার সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে সেই জগৎ এখনও অটুট। আমরা চাইলেই সেই কুয়াশাচ্ছন্ন ও আলো-আঁধারি জগতে ঢুঁ মেরে আসতে পারি। ক্রিস্টির তৈরি জগতের সঙ্গে ক্যামেরার বেশ মিল রয়েছে। ক্যামেরা আসলে কী? একটি ‘অন্ধকার কক্ষ’ (ক্যামেরা অবস্কিউরা)। এই ঘরের মেঝেতেই আলো ও আঁধার খেলা করে, খেলার ছলেই তারা তৈরি করে আলো-আঁধারি আলোকচিত্র। আগাথা ক্রিস্টি সৃষ্ট সাহিত্যজগতের সঙ্গে ক্যামেরার নীতির মিল থাকুক আর না থাকুক, ‘অপরাধের রানী’র জীবনের সঙ্গে কিন্তু ক্যামেরা জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে।
আগাথা ক্রিস্টি সর্বকালের
সেরা লেখকের একজন। রহস্য ও খুনের কাহিনী নির্মাণে তার জুড়ি ছিল না। অনবদ্য সেসব সাহিত্যকর্মের
জন্যই তিনি অমর হয়ে আছেন। তার জন্ম ১৮৯০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর, যুক্তরাজ্যে ডেভনের টোরকি
শহরে। পড়ালেখা করেছেন ঘরেই, মায়ের কাছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নার্স হিসেবে দায়িত্ব পালন
করেছেন, তখন থেকেই লেখালেখির নেশা তাকে পেয়ে বসে। ১৯২০ সালে প্রকাশিত হয় আগাথার প্রথম
উপন্যাস ‘দ্য মিস্টিরিয়াস অ্যাফেয়ার অ্যাট স্টাইলস’। উপন্যাসটি ছয়টি প্রকাশনা সংস্থা
থেকে ফেরত এসেছিল।
সারা জীবনে তিনি ৬৬টি
গোয়েন্দা উপন্যাস, দেড়শরও বেশি ছোটগল্প এবং ২০টি নাটক রচনা করেছেন। তার সৃষ্ট তুমুল
জনপ্রিয় গোয়েন্দা চরিত্রগুলোর মধ্যে হারকিউল পোয়ারো ও মিস মার্পল অন্যতম। হারকিউল
পোয়ারো এতটাই বিখ্যাত ও প্রভাবশালী চরিত্র ছিল যে, কল্পজগতের এই চরিত্রের মৃত্যুর পর
‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’-এ শোক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল! যাহোক। ১৯৫২ সালে প্রকাশিত তার
‘দ্য মাউসট্র্যাপ’কে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে মঞ্চস্থ হওয়া নাটক। ৮৫
বছর বয়সে ১৯৭৬ সালের ১২ জানুয়ারি অক্সফোর্ডশায়ারে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার সম্মানে
গোলাপের একটি প্রজাতির নাম রাখা হয় তার নামে। জীবদ্দশায় তার প্রায় ৩০ মিলিয়ন বই বিক্রি
হয়েছিল!
লেখালেখির পাশাপাশি
শাস্ত্রীয় সংগীত এবং ফটোগ্রাফির প্রতি ছিল তার ভীষণ আগ্রহ। ক্যামেরার লেন্সের মাধ্যমেও
তিনি পৃথিবীটাকে ভিন্নভাবে দেখতে চেয়েছিলেন। আগাথা ১৯১৪ সালে কর্নেল আর্চিবল্ড ক্রিস্টিকে
বিয়ে করেন। ১৯২২ সালের প্রায় পুরোটা সময় তিনি স্বামীর সঙ্গে বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। তখন
তার সঙ্গী ছিল একটি ক্যামেরা। সেসময় লেখা চিঠিপত্রে তার উল্লেখ আছে। যেমন চিঠি থেকেই
জানা যায়, একবার ট্রেন ভ্রমণের সময় তার ক্যামেরাটি চুরি হয়ে যায়, সময় নষ্ট না করে আগাথা
আরেকটি ক্যামেরা কেনেন; কোনোভাবেই যাতে ভ্রমণ-স্মৃতি সেলুলয়েডে বন্দি করা থমকে না
যায়। ১৯২৮ সালে আর্চিবল্ডের সঙ্গে তার বিবাহবিচ্ছেদ হয়।
১৯৩০ সালে তিনি বিখ্যাত
প্রত্নতত্ত্ববিদ ম্যাক্স ম্যালোয়ানকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর থেকেই তারা একসঙ্গে বহুবার
প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযান ও অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়তেন। ইরাক, সিরিয়া, মিসরসহ মধ্যপ্রাচ্যের
নানা প্রাচীন সভ্যতার খোঁজে দীর্ঘ সময় তারা কাটাতেন। এই ভ্রমণ থেকেই বেরিয়ে আসে পুরাতাত্ত্বিক
প্রেক্ষাপটে রচিত তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘ডেথ অন দ্য নাইল’ ও ‘মার্ডার ইন মেসোপটেমিয়া’
ও ভ্রমণকাহিনী ‘কাম, টেল মি হাউ ইউ লিভ’। শুধু তাই নয়, এই ভ্রমণেই ক্যামেরার সঙ্গে
আগাথার সম্পর্ক আরও নিবিড় হয়।
তার স্বামী দলবল নিয়ে
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের কাজ করতেন আর আগাথা সেসব কাজের
ছবি ক্যামেরায় ধারণ করতেন এবং নথিপত্র সামলাতেন। আগাথার নাতি ম্যাথিউ প্রিচার্ড (আগাথা
ও কর্নেল আর্চিবল্ডের কন্যা রোজিলিন্ড হিকসের ছেলে) বার্তা সংস্থা এপিকে জানিয়েছেন,
শীতকাল এলেই আগাথা ও ম্যালোয়ান ইরাক অথবা সিরিয়ায় চলে যেতেন। ফিরতেন মে অথবা জুনে।
এই অভিযানকে আগাথা লেখালেখির মতোই গুরুত্ব দিতেন। আগাথার প্রধান কাজ ছিল খননকাজের ছবি
তোলা। ষাট বছর বয়সি আগাথা ইরাকে যখন ছিলেন তখন কোডাক ফিল্ম ডেভেলপে টাইগ্রিস নদীর পানি
ব্যবহার করতেন বলে জানিয়েছেন ম্যাথিউ।
আগাথা নিজেও সেসব দিনের
কথা বর্ণনা করেছেন তার ভ্রমণকাহিনীতে। তিনি লিখেছেন, ‘আমি এখন বেশ ব্যস্ত। খনন করে
পাওয়া মাটির পাত্র মেরামত করার পাশাপাশি ছবিও তুলতে হচ্ছে, আমার জন্য একটি “ডার্ক রুম”
তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। ডার্করুম তো নয়, যেন মধ্যযুগের ‘লিটল ইজ’ (জেলখানা)। যেখানে
না ঠিকমতো দাঁড়ানো যায়, না যায় বসা! আমি হাত-পা গুটিয়ে ভেতরে ঢুকি, হাঁটু গেড়ে,
মাথা নিচু করে ছবি ডেভেলপ করি। সেখান থেকে বের হলে দম প্রায় বন্ধ হয়ে আসে গরমে, আর
সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারি না। তবুও এই দুঃখ-কষ্টের কথা বলতে আমি বেশ আনন্দই পাই, যদিও
আমার এখানকার দর্শকরা দুঃখ-কষ্ট নিয়ে আগ্রহী নয়; তাদের পুরো মনোযোগ ছবির নেগেটিভগুলোর
দিকে, ফটোগ্রাফার নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই।’ আরও লিখেছেন, ‘অনেক ছবি তুলতে এবং
ডেভেলপ করতে হচ্ছে। ভীষণ গরম পড়েছে, ডার্করুম থেকে বেরিয়ে নিজেকে দেয়ালে লেগে থাকা
ছত্রাকের মতো লাগছে।’ এই কথাগুলো ফটোগ্রাফির প্রতি তার নিষ্ঠা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
আগাথা ক্রিস্টি শুধু
নিজেই ক্যামেরা ব্যবহার করেছেন, তা নয়। ফটোগ্রাফির প্রতি তার ভালোবাসার প্রভাব আমরা
লক্ষ করি তার গল্প-উপন্যাসেও। তার গোয়েন্দাদের অপরাধ তদন্তে ফটোগ্রাফকে বেশ গুরুত্ব
দিতে দেখা যায় (যেমনÑ ‘ফাইভ লিটল পিগস’ উপন্যাসে একটি পুরোনো ফটোগ্রাফ গোয়েন্দা হারকিউল
পোয়ারোকে রহস্য উন্মোচনে ভীষণভাবে সাহায্য করে)। এই প্রসঙ্গে ‘ফিলেমেল কটেজ’ গল্পটির
কথা বলা যায়। এ গল্পে ক্যামেরা ও ফটোগ্রাফি মনস্তাত্ত্বিক ও প্রতীকী ভূমিকা রেখেছে।
গল্পে দেখা যায়, অ্যালিক্স মার্টিন অনেকটা তাড়াহুড়ো করে জেরাল্ডকে বিয়ে করেন। বিয়ের
পর সে বুঝতে শুরু করেন, তার স্বামী তাকে হত্যার পরিকল্পনা করছেন। জেরাল্ডের দাবি, তিনি
একজন শখের আলোকচিত্রী। তিনি বাড়ির একটি অংশে ডার্করুম স্থাপন করেন। সেই ঘরে কারও যাওয়ার
অধিকার নেই, এমনকি তার স্ত্রীরও যাওয়া নিষেধ। আর এ কারণে অ্যালিক্সের সন্দেহ দানা বাঁধতে
থাকে। ওই ডার্করুমই গোপনীয়তা ও রহস্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। এই গল্পে আগাথা ডার্করুমকে
ধীরে ধীরে সত্য উন্মোচনের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ডার্করুমে তো তাই হয়, অন্ধকারে
একটু একটু করে ফুটে ওঠে ছবি!
আর ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার
অব দ্য সিনিস্টার স্ট্রেঞ্জার’ গল্পে ক্যামেরাকে অপরাধের মাধ্যম হিসেবে দেখানো হয়েছে।
এই গল্পে দেখা যায়, রবিনসন দম্পতির বাড়িতে আছে ডার্করুম এবং ফটো এনলার্জারসহ বিভিন্ন
ক্যামেরা সরঞ্জাম। এই দম্পতি আসলে গুপ্তচর, যারা গোপন সরকারি দলিল ও মানচিত্রের ছবি
তুলে পাচার করে।
শাস্ত্রীয় সংগীত, ফটোগ্রাফি
ও প্রত্নতত্ত্বের সঙ্গে আগাথা ক্রিস্টির সংযোগ নিয়ে খুব একটা আলোচনা হয় না। ছবি তোলার
মাধ্যমে তিনি শুধু প্রাচীন ইতিহাসের গল্পই বলেননি, বিশ্ব প্রত্নতত্ত্বের পঠন-পাঠনেও
রেখেছেন বিশেষ অবদান। এজন্যও তার ফটোগ্রাফিযাত্রা নিয়ে আলোচনা হওয়া ভীষণ জরুরি।