× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

‘বিদ্রোহী’ ও ‘গতিবাদ’

ড. হাফিজ রহমান

প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৫ ১৬:২৭ পিএম

‘বিদ্রোহী’ ও ‘গতিবাদ’

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যে যে ‘বিদ্রোহী’ কবি হিসেবে পরিচিত, তার শক্তিশালী দলিল হচ্ছে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। এই কবিতায় বিশেষ লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো গতিবাদ। গতিবাদ মানে কেবল শারীরিক গতি নয়; বরং চিন্তা, ভাষা, আবেগ এবং প্রতিক্রিয়ার মধ্যে এক ধরনের চলমান ও পরিবর্তনমুখী শক্তির প্রকাশ। এই কবিতায় ভাষার যে গতিময়তা, তা বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক নতুন ধারার সূচনা। তাই কবির ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় গতিবাদ এক অনন্য বৈশিষ্ট্য, যা কবিতাটিকে প্রাণবন্ত ও শক্তিশালী করে তুলেছে। কবি নিজেকে তুলনা করেছেন ঝড়, আগ্নেয়গিরি, বজ্র, রুদ্র, চণ্ডী, জিব্রাইলের পাখা, শিবের চুল, উচ্চেঃশ্রবা, বোররাক প্রভৃতি প্রাকৃতিক ও পৌরাণিক শক্তির সঙ্গে। এখানে কবি যেন নিজেকে এক অপ্রতিরোধ্য শক্তির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করছেন। আমি ভেঙে করি সব চুরমার! এই পঙ্‌ক্তিতে ধ্বংসের মধ্য দিয়ে নতুন কিছু গড়ার গতিশীল চিন্তা প্রকাশ পেয়েছে। 

শব্দ চয়ন, ছন্দ ও ক্রিয়াপদ ব্যবহারে কবি ব্যাপক শক্তির চলমানতা সৃষ্টি করেছেন, যা অন্যায়, জুলুম ও অন্যসব স্থবিরতার বিরুদ্ধে বজ্রনিনাদে গর্জে ওঠে। তাই ‘বিদ্রোহী’ কেবল একটি কবিতা নয়, বরং এটি এক চলমান বিপ্লবের কাব্যিক রূপ। বিদ্রোহী কবিতায় ব্যবহৃত শব্দঝড় গতিবাদের এক শক্তিশালী প্রকাশ। এই কবিতার ভাষা ও ভাব একদমই স্থির নয়। এটি যেন একটি চলমান ঝড়। কবি নিজেই বলেন, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর। এখানে কবি নিজেকে ঝড়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা কখনও থেমে থাকে না। ঝড়ের মতো বিদ্রোহী চেতনাও ছুটে চলে বাধার পরোয়া না করে। এটি শুধু প্রতীকী নয়, কবিতার ছন্দ, শব্দ চয়ন এবং বাক্য কাঠামোতেও সেই গতিময়তা লক্ষ করা যায়। কবি বারবার ব্যবহার করেছেন শক্তিশালী ক্রিয়াপদ। যা বিদ্রোহের আবেগ জাগিয়ে তোলে। এ যেন কেবল কবিতা নয়, অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে চলমান এক বিপ্লবের স্লোগান। এই গতিবাদ শুধু কবির ভাষা ও শব্দে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তার চিন্তাধারার ভেতরেও প্রবাহিত। তিনি বিশ্বাস করেন, স্থবিরতা মানেই মৃত্যু, আর গতি মানেই জীবন। তাই তিনি নিজেকে ‘সৃষ্টি ও ধ্বংসের যমজ সন্তান’ বলেন, যেখানে ধ্বংসও এক ধরনের গতি, যা নতুন কিছুর জন্ম দেয়। কবির ভাষায়, ‘আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদচিহ্ন!’ এই লাথি দেওয়ার প্রতীকী চিত্রটিও গতি নির্দেশ করে। এ ধরনের ক্ষোভ প্রকাশ মূলত স্থিরতার বিরুদ্ধে এক কার্যকর প্রতিবাদ। ছন্দ ও রিদমেও নতুন মাত্রা এনেছেন। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রতিটি চরণ যেন তালের ওপর তালে ধাক্কা দিচ্ছে। এটি কেবল ছন্দময় নয়, একেবারে আন্দোলনময়। এই কবিতার শব্দরা দাঁড়িয়ে থাকে না। ছুটে চলে, ঝাঁপিয়ে পড়ে, ভেঙে ফেলে। গতিবাদ শুধুমাত্র আবেগ নয়। এটি একটি দর্শন। এ কারণেই ‘বিদ্রোহী’ কবিতা এক ধরনের চেতনাগত গতির সংগীত, যেখানে কবি একজন ব্যক্তিনির্ভর বিদ্রোহী নন, বরং সময়ের চেতনায় চলমান এক মহাবিপ্লবী। কাব্যের প্রতিটি স্তরে প্রবল গতিশক্তির সঞ্চার স্বতঃস্ফূর্ত ও সর্বত্র বিস্তৃত। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় সুচয়িত গতিময় শব্দ-বাক্যের অসাধারণ প্রাণচাঞ্চল্যে যা জীবনযুদ্ধের এক অসামান্য প্রামাণিক দলিল। ‘গতিই জীবন, স্থিতিই মরণ’Ñ এমন দার্শনিক সত্যকে বিকশিত করতেই কবিতার বাণীতে ছন্দের দোলাচলের অন্তরালে ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় গতির বিষয়টি সহজ-সারল্যে প্রকাশিত। কবিতাটির সূচনাতেই গতির বিষয়টি ব্যাপক ও সুবিস্তৃতরূপে ধরা পড়ে।

‘বিদ্রোহী’ কবিতার গতিবাদ

বাংলা সাহিত্যে গতিবাদের বিষয়টি অতি পুরাতন। চর্যাপদেও গতির প্রচ্ছন্ন প্রকাশ দেখা যায়। ‘উঁচা উঁচা পাবত তঁহি বসই সবরী বালী//মোরঙ্গ পীচ্ছ পরহিন সবরী গীবত গুঞ্জরী মালী।’ এই পদটিতে শবরী বালিকার চারপাশে আকাশ-বাতাস, পাহাড়-পর্বত, সবুজ-শ্যামল বৃক্ষ-তরুলতার সৌন্দর্য-শোভা, সোনালি রোদের প্রতিফলন, পাহাড়ি প্রকৃতির অনন্যসাধারণ রূপ চিত্রের মতো মূর্তিমান। এই যে পাহাড়-পর্বতে আরোহণ-অবরোহণ এসব গতির প্রতীকী প্রকাশ। এরপর বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগেও কিছু লেখাতেও সুস্পষ্ট গতিবাদের প্রমাণ পাওয়া যায়। 

‘বিদ্রোহী’ ও গতিবাদের সম্পর্ক 

‘বিদ্রোহী’ কবিতা ও গতিবাদের সম্পর্ক সুনিবিড়। এই কবিতায় শুধু দূরত্বের ভিত্তিতে নয়; বরং অন্তর্গতভাবে প্রত্যেকটি চরণে গতির বিষয়টি স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর। এই ভাব ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটিরও একেবারে অজ্ঞাত নয় : এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী,/আর হাতে রণ-তূর্য! বিদ্রোহাত্মক তীব্র গতিবেগই বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেছে কবিতাটিতে। নজরুলের কবিতায় গতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়নি এবং রবীন্দ্রনাথের মতো গতির একটি মূর্তি কল্পনা করা হয়নি। কিন্তু শব্দ-ঝংকার ভাব-সম্পদে এবং গতি-মুখরতায় একটি সম্পূর্ণাবয়ব রস-ঘন চিত্রে প্রতিটি রেখার টানে রূপায়িত হয়ে উঠেছে। ভার ও গতিবেগ যেন পূর্ববর্তী স্থান অপেক্ষা ক্রমোর্ধ্ব স্তরে আরোহণ করেছে; এ যেন ক্রমোচ্চ পর্বতে উঠবার ঘাঁটিগুলো অতিক্রম করে শিখরের দিকে জয়যাত্রা। সর্বত্র চলার সুর বর্ণিত হওয়া ছাড়াও কখনও কখনও ভাষার অপরিমেয় শক্তি ছন্দে দোলার সৃষ্টি করে গতির রূপ ফুটিয়ে তুলেছে। যেমনÑ ‘আমি চল-চঞ্চল, ঠমকি’ ছমকি’/পথে যেতে চকিতে চমকি’/ ফিং দিয়া দিই তিন দোল!/আমি চপলা-চপল হিন্দোল।”

গতিবাদ ব্যাখ্যায় সমগ্র কবিতার মর্মার্থ, বাক্যগত এবং কখনও কখনও শব্দগত বিষয়টি প্রণিধানযোগ্য। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় এই ৩ প্রকারের বিষয়ই বর্ণিত। কবিতাটিতে ব্যবহৃত শব্দমালা গতির পরম উদাহরণ। তা ছাড়াও বাক্যে প্রযুক্ত হয়ে এই সমস্ত শব্দ অধিকতর ব্যঞ্জনাময় হয়েছে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় ব্যবহৃত পৌরাণিক শব্দগুলো সবিশেষ গতিবাদকে প্রতিনিধিত্ব করে। যেমন : চন্দ্র- জন্মের পর পরই ত্রি-চক্র রথে চড়ে পৃথিবী পরিক্রমণ করে ও আলো/জোস্না বিলাতে থাকে। চন্দ্রগ্রাস হলেও রাহুমুক্ত হতে পারে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় মানব-বীর চন্দ্রের চেয়েও অধিক শক্তিশালী হিসেবে চিত্রিত। অর্থাৎ মানুষ বিপদগ্রস্ত (মানুষ বিপদগ্রস্ত হওয়া অর্থ বাইরে থেকে বিপদের বল নিশ্চল মানুষকে জাগিয়ে তোলে) হলেও সেই ভয়ংকর বিপদ থেকে দুর্দমনীয়ভাবে ফিরে আসে। বীরকে গ্রাস করা যায় না। গ্রাস করলেও হজম করা যায় না। 

ভীম মহাবলবান। ধর্মপরায়ণ। বাহুযুদ্ধ, গতিবেগ ও ব্যায়ামে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। কুন্তী ও বায়ুর মিলনে ভীমের জন্ম। পুরাণে ভীমকে নিয়ে এমনি কাহিনী প্রচলিত আছে। তবে কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় ‘আমি ভীম ভাসমান মাইন’ ব্যবহারের মাধ্যেমে কবি বীরকে অমর, অক্ষয় ও চিরশক্তির আধার প্রবল গতিসম্পন্ন এক অতিপ্রাকৃত দানবের ছবি এঁকেছেন। এই বিষয়গুলো কত সুন্দর করে ধীরে ধীরে গতিশক্তির চরমে আরোহণ ‘বিদ্রোহী’ কবিতায়। ‘আমি দুর্বার’ দিয়ে গতির সঞ্চার করে শেষ হলো ‘আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর’ মতো উচ্চগতির এক প্রলয়ংকরী ঝড়বেগের মধ্য দিয়ে। এখানে আরোহণ চরণের থেকেই প্রবল ধাক্কা লক্ষ করা গেল, যা শেষ হলো বিপুল ও ব্যাপক শক্তিসম্পন্ন বৈশাখী ঝড়ের গতির শীর্ষ আরোহণে। তারপর সুচিন্তিতভাবে অবরোহণ হলোÑ ‘আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী-সুত বিশ্ব-বিধাতৃর!’ পঙ্‌ক্তির মধ্য দিয়ে। এটাই ‘বিদ্রোহী’ কবিতার বিশেষ গতিতত্ত্বের অনন্য বৈশিষ্ট্য। 

ব্যোমকেশ শিবের চুল। ব্যোম-আকাশ। আর কেশ-চুল। একবার শিবঠাকুর স্বর্গ থেকে গঙ্গায় লাফিয়ে পড়েন, তখন তার চুল সমস্ত আকাশ ছেয়ে ফেলে। অর্থাৎ, অসীম সাহসিকতা ও মানুষের দুর্বার গতির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এমন ধারণার অবতারণা। তা ছাড়া গঙ্গার তীব্র জলধারার সঙ্গে ব্যোমকেশের তুলনায় সহজেই প্রমাণিত যে, প্রকৃত বীর তীব্র খরস্রোতা স্রোতঃস্বিনীতেও লাফিয়ে পড়তে পারেন। সাধারণত উচ্চ থেকে লাফিয়ে নিচে পড়া একটি চূড়ান্ত দুঃসাহসিক কাজ। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় এমনই বীরের ছবি উদ্ভাসিত যে, বীর আলোর গতির চেয়েও তীব্র গতিতে ধাবমান। অন্যায় প্রতিরোধক বীর এমনই দুরন্তগতির চিরন্তন প্রতীক। এ ছাড়াও গঙ্গোত্রী, দ্বাদশ-রবি, প্রভঞ্জন, রুদ্র ঝড়- এই সমস্ত পুরাণিক শব্দ প্রয়োগ প্রকৃতই কবিতাটিকে করেছে গতিশক্তির আকর। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় গতিবাদ হলো কবির বিদ্রোহী মনোভাবের শক্তিশালী রূপ। এখানে গতি এসেছে ধ্বংস ও সৃষ্টির দ্বন্দ্বে। প্রচণ্ড শক্তি, প্রতিবাদ এবং চলমান রূপান্তরক হিসেবে। এটি শোষণের বিরুদ্ধে ক্রিয়াশীল বিদ্রোহ। কবির বিদ্রোহী কবিতায় প্রতিটি পঙ্‌ক্তি যেন চলমান আগ্নেয়গিরি। এখানে গতিবাদ মানে কেবল গতি নয়, বরং শক্তির বিস্ফোরণ, প্রতিবাদের ধ্বনি, সমাজ পরিবর্তনের জন্য অদম্য এক শক্তি। এটি ভাষা, ভাব, ছন্দ ও চেতনার প্রতিটি স্তরে উপস্থিত। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সাহসী ও পরিবর্তনমুখী কবিতার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে শুধু নতুন ভাষা যোগ করেননি, একটি চলমান সাহসী চিন্তাধারার পথও তৈরি করে দিয়েছেন। সেই পথে আজও আমাদের সাহিত্য ও সমাজ এগিয়ে চলছে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা