খান মাহবুব
প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৫ ১৬:২১ পিএম
কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
চিরসবুজ ও চিরবিপ্লবের কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তার বিপ্লবী চরিত্রের স্ফুরণ ঘটে মূলত ১৯২০ সালে সৈনিক ব্যারাক করাচি থেকে কলকাতায় ফিরে। ওই বছরেই বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় ‘ব্যথার দান’ গল্প প্রকাশ পায়। নজরুল বন্ধু মুজফ্ফর আহমদ বলেন, ‘ব্যথার দান’ পড়ে আমরা তখনও বুঝেছিলাম এবং এখনও বুঝতে পারছি যে রুশ বিপ্লব ও লাল ফৌজের প্রতি নজরুলের একটা আকর্ষণ জন্মেছিল।’
ব্যথার দান গল্প হলেও তার মধ্যে দেশপ্রেম, আন্তর্জাতিকতা, দ্রোহ এবং বিপ্লবের বীজমন্ত্রে ভরপুর ছিল।
১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষদিকে কলকাতায় কোনো এক বর্ষণমুখর রাতে নজরুল রচনা করেন তাঁর কালোত্তীর্ণ কবিতা ‘বিদ্রোহী’। বিদ্রোহীর চিরবিপ্লবী রূপই নজরুলকে চিরস্থায়ী বিপ্লবীর তকমা এনে দিয়েছে। বিদ্রোহী রচনার আগে-পরের সময়টা ছিল ভারতের মুক্তিসংগ্রামের অগ্নিগর্ভ সময়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ১৯১৯-এ সমাপ্তের পর ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ক্রমবর্ধমান। এই বাতাবরণে ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটিতে রচিত হলে বাঙালির হৃদয়ের পুঞ্জীভূত ব্রিটিশবিরোধী ক্ষোভ। ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটির সুরের সঙ্গে একাত্মভাবে মিলিত হলো। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার বিপ্লবী রূপ যেন ভারতের আপামর জনতার চোখেমুখে। শুধু ভারতীয় নয় তাবৎ বিশ্বের অত্যাচারী উৎপীড়ক শক্তির বিরুদ্ধে নির্যাতিতদের পাশে এসে দাঁড়াবার কবিতা।
নজরুলের চিরবিপ্লবী রূপের স্বরূপ কাব্য সাধনার শুরুতেই ঝলক দিয়েছে। তাঁর জীবন শিশুকাল থেকেই ছিল দুখের দহনের মোড়কে মোড়ানো। কর্মজীবনের প্রভাতবেলায় নজরুল দ্রোহের যেদিক উন্মোচন করেছিলেন সে পথেই হেঁটেছেন আজীবন। প্রতিটি কর্মে ও বিশ্বাসে নজরুল সংস্কারকের ভূমিকায় উপস্থিত হয়েছেন। তিনি শুধু বাণী বর্ষণেই থেমে যাননি, সুরের ঝংকার থেকে স্লোগানের ধ্বনির বিচ্ছুরণ ঘটিয়েছেন। তাঁর রচনায় ভিন্ন ভাষার সম্ভার থেকে যে শব্দ কিংবা যে উপমা দিয়েছেন তার মধ্যেও বিদ্রোহের বার্তা দৃশ্যমান। তিনি ইন্দ্রের বাহন, বাণ ও ত্রিশূলের কথা এনেছেন। মুসলিম জাত শব্দ ‘তাজি’ ব্যবহার করেছেন, যার অর্থ ‘বেগবান তেজস্বী ঘোড়া’Ñ এসব বিষয়েও তাঁর গতির ও তেজের স্বাক্ষর মেলে।
তার বিপ্লবী চেতনার সন্ধানে আমরা ‘বিদ্রোহী’ রচনাকে অনেকেই মান্য করি; কিন্তু বালক ও কিশোর বয়সেই নজরুল চেতনায় বিপ্লবের বারুদের গন্ধ মেলে।
১৯১৫ সালে নজরুল শিয়ারসোল রাজ হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। স্কুলের শিক্ষক নিবারণচন্দ্র ঘটকের যুগান্তর দলের সদস্যদের ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে নজরুল অনুপ্রাণিত হন। নিবারণচন্দ্র ঘটকের ব্রিটিশদের দ্বারা পাঁচ বছরের জেলের শাস্তি নজরুলকে দারুণভাবে আহত করে। সেই দ্রোহী চরিত্রের কারণেই নজরুলের ‘কুহেলিকা’ উপন্যাসে বিপ্লবী শিক্ষক প্রমত্ত চরিত্রে এই নিবারণচন্দ্র ঘটকের প্রভাব ছিল।
অনেকে বলেন নজরুল-মানসের বেদিমূল তাঁর সৈনিকজীবনে অঙ্কুর। কিন্তু বিপ্লবী ও সাম্প্রদায়িক চেতনার নজির নজরুলের ভাব লেটো দলের গানের গীতির মধ্যেও মেলে।
স্বদেশের প্রতি প্রেম ও স্বদেশকে মুক্ত করে সুরক্ষা দিতে চিরকাল নজরুল মগ্ন ছিলেন। সেই মগ্নতার ঘোর দোলা দিয়েছিল কিশোর বয়সে। স্কুল জীবনেই নজরুলের কচি মনে ইংরেজবিদ্বেষ ও সন্ন্যাসীর প্রতি ভক্তি লক্ষ করেছিলেন বন্ধু শৈলজানন্দ। স্বল্প কর্মকালে নজরুল সৃষ্টির বিষয়-বৈচিত্র্য বিস্ময় জাগায়। অনেকেই বলেন, নজরুলসংগীত প্রেমে ও কামে ঋদ্ধ। কিন্তু নজরুলসংগীতের মাধ্যমে যে বাণী নিঃসৃত তার ভেতর মুক্তির বারতা এতটুকু কম নয়। নজরুলসংগীত ভাবপ্রধান, নাকি বাণীপ্রধান, নাকি সুরপ্রধানÑ এ তর্কের বাইরে রেখে নির্দ্বিধায় বলা যায়Ñ নজরুলের গান, সুর, তাল, লয় কিংবা রাগ-রাগিণীতে মানসম্পন্ন আরবি-ফারসির সমন্বয়ে ও উপমায় ভরপুর এক অপূর্ব ভান্ডার। এই ভান্ডারের দেশমাতৃকা ও মানবমুক্তির বার্তা মেলে।
আর নজরুলের প্রবন্ধে বিপ্লবী চেতনার স্ফুরণ নামলিপিতেই হাজিরা দেয়। যুগবাণী (১৯২২), রাজবন্দীর জবানবন্দী (১৯২৩), দুর্দিনের যাত্রী (১৯২৬), রুদ্রমঙ্গল (১৯২৭), ধূমকেতু (১৯৬০) নাম দিয়েই পরিচয় জানান দেয়।
নজরুল সকল সৃষ্টির মাঝে একটা সুস্পষ্ট বাণী দিতেন। এই বাণী স্বচ্ছ ও সুস্পষ্ট। কবির বিবেচনায় ধর্মের, জাতির, বর্ণের কোনো বেড়াজাল ছিল না। এজন্য সবাইকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে সামাজিক রেনেসাঁসের কথা বলতেন। তার বিপ্লব কেবল বক্তব্যে নয়, একটা যুগ পরিবর্তনের বিষয় ছিল এর ভেতর। নজরুলের উন্মেষকালে কবিতার অনুভব স্তোত্র এবং ভাবানুষঙ্গই ছিল কবিতা আস্বাদনের প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি। কবিরা শব্দ প্রয়োগের দিকে বেশি দৃষ্টি দিতেন। ছন্দ ও চিত্রকল্প নিয়ে বেশি ডুবে চিন্তা করতেন। একটা বিষয় সে সময়ের প্রাগ্রসর পাঠকরা অনুভব করতেন কবিদের রক্ষণশীল ও অনুবর্তনকারী মানসিকতা। উপমার ব্যঞ্জনও যেন একটা গণ্ডির ভেতর ঘুরপাক খেত। নারীর চোখ, চুল, বাহু ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোর উপমা ঘুরেফিরে চলছিল একই ঘেরাটোপে। কিন্তু নজরুল যেন কবিতার পুরো ছক পালটে দিলÑ জমিন ‘গঠন’ শৈলী, উপমা, রূপকল্প সবটাই। নজরুলের সৃজনে পুরাণ, বাইবেল, কুরআন সব তুলে এনেছেন। ইস্রাফিল, জিব্রাইল, পরশুরাম, চেঙ্গিসসহ নানা উপকরণ। কবিতার শব্দ চয়নে তৎসম, তদ্ভব ও বিদেশি শব্দের সমন্বয়। সব মিলিয়ে নজরুল যেন সমকালীন নতুন যাত্রী মহাকালের দিকনির্দেশক।
বস্তুত নজরুলের হুজুগে প্রবণতা বেশি ছিল। তার সমকালে তরুণের কোনো হুজুগ থেকে নজরুল দূরে থাকেননি।
‘পরোয়া করি না, বাঁচি কি না বাঁচি’ যুগের হুজুগ কেটে গেলে নজরুলের উচ্ছ্বাস বাঙালির হৃদয়ে মিশিয়েছিল নতুন দ্রবণ। বাঙালি যেন নজরুলকে উপজীব্য করে নবনিশান হাতে যাত্রায় নতুন অভিযাত্রী দল। নজরুল ১৯২৫-এ মাতেন স্বাধীনতাকামী ‘লেবার স্বরাজ পার্টি’র কাজে। সম্পাদনা করেন ‘লাঙ্গল’ নামীয় ক্ষুরধার পত্রিকা। শুধু দেশের মুক্তি নয়, মানুষের মুক্তির ভাবনায় যুক্ত হয়। নজরুল জন্ম দেন ‘সাম্যবাদী’, ‘কৃষকের গান’। নজরুলের রচনার ভেদ-বৃত্তান্ত যদি ফিরে দেখি তবে সহজেই অবলোকন করি কবিতা, গান, নাটক ও প্রবন্ধের মধ্যে কোনো না কোনো ফরম্যাটে নজরুল সমাজব্যবস্থার চালচিত্রে ভেঙে গড়ার তাগিদ দিয়েছেন এবং তাতে বিপ্লবের তাত মাখা। প্রবন্ধ যেহেতু তত্ত্ব ও তথ্যনির্ভর এবং উদ্দেশ্য থাকে পাঠকের জ্ঞান-সীমাবদ্ধ এবং মানসিক ভাবালোকের সমৃদ্ধিসাধন, তাই নজরুল প্রবন্ধ রচনায় তার বক্তব্যের গহিন গাথনে নিজের চিন্তার ক্যানভাস রচনা করেছেন। সেটাকে নজরুলের দর্শন বললেও বোধকরি বাড়িয়ে বলা হবে না।------
নজরুল যে গতানুগতিক ছিল না সে কথা আলাদা করে বলবার প্রয়োজন নেই। কাব্যরচনায় নব-নারী, প্রকৃতির মধ্যে কেবল নিবিষ্ট থেকে যাননি। নজরুল চেয়েছিলেন অত্যাচারী, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে, জাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে বৈষম্য কমাতে সামাজিক নির্যাতন ও ধর্মান্ধতা দূর করতে। মানুষের মধ্যে নীচুতা-দীনতা ও ক্ষুদ্র মানসিকতা দূর করিয়ে মানুষের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড় করাতে।
নজরুলের বিপ্লবী দৃঢ় উচ্চারণের ফলকথা হচ্ছে নজরুল সৃষ্টি বাজেয়াপ্ত, নিষিদ্ধ ও প্রচারে বাধা নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। জেল-জুলুম হুলিয়াও নজরুলের জন্য লাগাতার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
নজরুলের বিপ্লবের বজ্রকঠিন রূপ নিপীড়নের মাধ্যমেও রদ করা যায়নি। ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ রচনার জন্য ১৯২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি ১ বছরের কারাদÐ হয় নজরুলের। জেলজীবনে তাকে প্রথম শ্রেণির কয়েদির মর্যাদা আদালত কর্তৃক মঞ্জুর হলেও ইংরেজ প্রশাসকরা তা পালন করেননি। বরং অত্যাচারের স্ট্রিম রোলার চালায়। সাধারণ কয়েদি তো বটেই, নজরুলের হাতে পায়ে ডান্ডাবেড়ি পরানো হয়, লোহার থালায় অতি নিম্নমানের খাবার দেওয়া হয়। নজরুল অনশন শুরু করেন। অনেকেই তার পথ অনুসরণ করেন। ৩৯ দিন অনশনের পর মাতৃসম বিরজা দেবী নজরুলের অনশন ভাঙান।
দেশবন্ধু চিওরঞ্জন দাশ, বিপিনপাল, সুরেন্দ্রনাথ, সুভাষ বসু কাজীর বিদ্রোহী তাপের খবর জানতেন। ব্রিটিশবিরোধী ভ‚মিকা মূল্যায়নে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং নজরুলকে আমলে রেখেছেন। আর নেতাজি সুভাষ বসু নজরুলের সংর্বধনায় ১৯২৯ সালে অ্যালবার্ট হলে বলেছিলেন“আমরা যখন যুদ্ধে যাব তখন কাজীর গান গাইব।”
নজরুল তাঁর কর্মকালব্যাপী ছিল রাজনৈতিক সচেতন। তাঁর মানস, ভাবসম্পদ, চৈতন্যভিসা জনগণকেন্দ্রিক। উপনিবেশবাদী ইংরেজদের বহুরৈখিক উৎপীড়নে ভারতীয়রা ভীরু দুর্বল হয়ে পড়েছিল। হতাশাক্লান্ত পরাধীন ভারতবাসী জাগরণের পতাকা উড্ডীন করেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি তাঁর সেই সমাজের প্রতিনিধি যারা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে পর্যদুস্ত। রাজশক্তির শোষণ বঞ্চনা থেকে মুক্ত করতে ভারতীয় সমাজের প্রান্তিকের একজন হয়ে গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন নজরুল।
নজরুলের বোধ ও সৃজন অপরিমেয় এবং শিল্পবোধের বাটখারা দিয়ে না মাপা যায় না। তার চেতনা তীক্ষè ও সূচনাএ ক্ষেত্রে নজরুল চলেছেন নিজের বিশ্বাসের শিরদাঁড়ায়। সর্বভারতীয় নেতা গান্ধীজি প্রবর্তিত মিনমিনে অহিংস-অসহযোগ আন্দোলনের লক্ষ্যের গন্তব্যে নজরুলের ভরসা ছিল না। এ জন্য লেখেন“স্বরাজ-টরাজ বুঝি না, কেননা ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশীদের অধীনে থাকবে না।”
নজরুল প্রলয়লংকরী উচ্চারণরণ দুঃসাহসী নয় কল্পনা সীমাকেও অতিক্রম করে লিখেন
‘যারা তেত্রিশ কোটি মানুষের অন্ন কেড়ে খায় সেই শোষক
সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শক্তির সর্বনাশ যেন হয়।’
কবির শিল্পসিদ্ধি ও সৌন্দর্য প্রকাশ স্বতঃস্ফ‚র্ত ও প্রাণময় বলেই তাঁর সৃষ্টি কবিতা হয়ে ওঠে প্রাণের দাবিতে ইস্পাতের মতো তীক্ষè। সৃষ্টিধর্ম উল্লাসে ভরা যৌবনের মতো তরঙ্গিত।
নজরুল মানসের সর্বময় বৈশিষ্ট্য ছিল কোনো ধরনের বিরূপতা তাঁকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধংদেহি অবস্থা থেকে নিবারণ করতে পারেনি। এটাই তো নজরুল চরিত্রের চিরবিপ্লবী রূপের সাক্ষ্য।
১৭৫৭-এ পলাশির আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য ১৯০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়। বাংলায় শুরু হয় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন। বণিকদণ্ড হয়ে আসা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রাজদণ্ড হয়ে পাথরের মতো বসল বাংলার মানুষের বুকে। তারপর শুরু হলো সরাসরি ব্রিটিশরাজের শাসন। ১৮৮৫ সালে গঠিত হলো ভারতের প্রথম বৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠন জাতীয় কংগ্রেস, ১৯০৫-এ হলো মুসলিম লীগ। কিন্তু এ দুটি সংগঠনের নেতৃবর্গই ব্রিটিশদের কাছে যেন শুধু আবেদন আর নিবেদন নীতিতেই অনড় রইল। এ সময় ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন করতে যে দুইজন প্রথম এগিয়ে আসেন তাঁরা হলেন নেতাজি ও নজরুল। কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকা ধূমকেতু প্রথম আত্মপ্রকাশ করে ১১ আগস্ট ১৯২২ সালে। এই পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় নজরুল অকুতোভয়ে স্বাধীনতার দাবি ঘোষণা করে লিখলেন,
... সর্বপ্রথম ‘ধূমকেতু’ ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। স্বরাজ-টরাজ বুঝি না, কেননা ও কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশীয় অধীনে থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসনভারসমস্ত থাকবে ভারতীয়দের হাতে। তাতে কোন বিদেশীদের মোড়লীর অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না।
(সূত্র: মুকুর সর্বাধিকারী, ‘সাংবাদিক নজরুল’, বিশ্বনাথ দে (সম্পা.) নজরুল স্মৃতি, কলকাতা, অনির্বাণ প্রকাশনী, ১৯৫৭, পৃ. ২৯
নজরুল নিঃসন্দেহে আমাদের জাতীয় জাগরণের অগ্রদূত। কারণ, আমরা আজ যে স্বাধীনতা লাভ করেছি তার মূলে ছিল আমাদের মধ্যেকার সামগ্রিক জাতীয় চেতনা এবং এই চেতনা জাগরণের অন্যতম নায়ক নজরুল। তাঁর কৃতির কারণেই বাংলার জনমানস সকল পরাধীনতার জিঞ্জির টুটবার জন্য প্রস্তুত হয়েছিল। তাই বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় জাগরণের অগ্রদূত। জীবনের প্রারম্ভকাল থেকে তাঁর মনে-প্রাণে বিপ্লব ও বিদ্রোহ কামনা করেছেন। প্রতিরোধ ব্যতীত স্বাধীনতা ও মুক্তিলাভ সম্ভব নয়, এরূপ ধারণা তাঁর জীবন-দর্শনের অন্তর্গত।