নোশীন লায়লা
প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৫ ১২:২৯ পিএম
মা বেগম লুৎফুন্নেসা ও ভাগিতি নাশিদ কামালের সঙ্গে মুস্তাফা জামান আব্বাসী
খবরটা শুনে গভীর বিষাদে আচ্ছন্ন হয়ে উঠল মন। হারিয়ে গেলেন আমার অতিপ্রিয় একজন মানুষ বরেণ্য শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা জামান আব্বাসী (ডিসেম্বর ১৯৩৬-মে ২০২৫)। আমাদের দুই বোনকে যিনি দেখলেই দুহাত বাড়িয়ে পরম মমতায় মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন আর স্বতঃসিদ্ধ দরাজ কণ্ঠের জাদুতে ‘মা’ ডাক দিয়ে কত কথা যে বলতেন! ছোটকাল থেকে তাঁকে দেখে আসছি একই রকম। কখনও পারিবারিক কোনো অনুষ্ঠানে, কখনও তাঁর নিজ বাড়িতে, কখনও আমাদের বাসার কোনো উৎসবে, কখনোবা টেলিভিশনের কোনো শুটিংয়ে। তাঁকে দেখে তাঁর শিল্পীসত্তার বহুমুখী পরিচয়ে বরাবরই ঋদ্ধ হয়েছি। তার মতন ব্যক্তিত্ব এককথায় অসাধারণ, স্বতন্ত্র ও অনন্য।
আমার বাবার মতন মুস্তাফা জামান আব্বাসী আমার জীবনের অন্যতম অনুপ্রেরণা ছিলেন।
তাঁর সংস্কারমুক্ত আধুনিক রুচিশীল মনন, মুক্তচিন্তা, সাবলীল আচরণ, শৃঙ্খলাবোধ, নিষ্ঠা,
প্রজ্ঞাময় গবেষণা, বলিষ্ঠ লেখনী, নান্দনিক উপস্থাপনা, দরাজ কণ্ঠের গায়কিÑ সবকিছু টানত
আমাকে। ঝলমলে একজন মানুষ, বহুমুখী প্রতিভার আলোকে আলোকিত। যেকোনো অনুষ্ঠানে তাঁর আগমন
সবার মন জয় করে নিত তাঁর মিষ্টি হাসি আর জাদুমাখা কথার মেজাজে। খুব মনে পড়ে তাঁর সঙ্গে
আমার আব্বার সেই নিখাদ নির্ভেজাল আড্ডার দিনগুলো। আব্বার মুখে ছোটবেলা
থেকেই নানা গল্প শুনতাম আব্বাসী আঙ্কেল ও মির্ণা আপার (প্রখ্যাত শিল্পী ব্যক্তিত্ব
ফেরদৌসী রহমান) কথা, শুনতাম কালজয়ী শিল্পী আব্বাস উদ্দিনের কথা। তাই ছোটবেলা থেকেই
মুগ্ধতা নিয়ে দুই ব্যক্তিত্বকে দেখতাম। প্রতিবার আমাদের বাসায় এলে তাঁদের নতুন করে
আবিষ্কার করতাম। সমানতালে তাঁরাও আমাদের দুই বোনকে তাঁদের নিজের মেয়ের মতোই পরম স্নেহে
ভরিয়ে দিতেন। আমার কাছে এ এক পরম সৌভাগের ব্যাপার। সংগীত জগতের নক্ষত্র আব্বাসী আঙ্কেল
আর ফিরবেন না। ধীরে ধীরে ভালো মানুষগুলো জীবন থেকে বিদায় নিতে শুরু করেছেন। যেকোনো
মানুষের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে একাকিত্ব, অসুস্থতা, অভিমান। তিনি এভাবেই সবার
চোখের আড়ালে চলে গিয়েছিলেন। হাসপাতালে ভর্তি হলেন যখন, তখন আমার স্বামী হাসনাইনের কাছে সব সময় খবর দিতে আঙ্কেলের সহকারী সাইফুল। খবর পেতাম প্রতিনিয়ত। গতকাল (১০.০৫.২০২৫)
ভোর ছটা আঠারো মিনিটে সে-ই হোয়াটসঅ্যাপ আমাদের জানায়Ñ মুস্তাফা জামান আব্বাসী স্যার
কিছুক্ষণ আগে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
আব্বাসী আঙ্কেলের ‘ভরা নদীর বাঁকে’ অনুষ্ঠানটির কথা খুব মনে পড়ে। এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে
আমি যুক্ত হয়েছি আমার এইচএসসি পরীক্ষার পর থেকে। দীর্ঘ সময় চলাকালীন
এই অনুষ্ঠানটিতে বহুবার ডাক পেয়েছি তাঁর কাছ থেকে। আমাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির শেকড়
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দিতে এ অনুষ্ঠানের জুড়ি মেলা ভার। লোকসংগীতের চিরন্তন গানগুলোকে কিংবা যেসব গান রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে লোপ পেতে বসেছে,
সেগুলোকে ধুলোর আস্তরণ থেকে সরিয়ে বের করে এনে গাওয়াতেন ঢাকার সব শিল্পী দিয়ে,
এমনকি ঢাকার বাইরের নাম না জানা অনেক সুদক্ষ শিল্পীদের দিয়েও। প্রতিবার ‘ভরা নদীর বাঁকে’ তার জমজমাট সম্ভার ছড়িয়ে বসত। গানের অডিও
হয়ে যাওয়ার পর আউটডোর শুটিংয়ে পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে চলত আনন্দের আমেজ। আমি বহু অনুষ্ঠানে
যুক্ত হয়েছি। সবচেয়ে ভালো লাগত আব্বাসী আঙ্কেলের তথ্যসমৃদ্ধ সাবলীল উপস্থাপনা; যা দর্শক-শ্রোতাদের
আবেগ ছুঁয়ে যেত। উপস্থাপনার ভাষা ও ভঙ্গিতে কখনও কখনও মননশীল আলোচনায় মুগ্ধ হতাম আমি।
উঠে আসত গ্রামীণ জীবনশৈলী, গ্রামীণ উৎসব, জানা-অজানা গীতিকার-সুরকারদের সৃষ্টিশীল জীবন
ও কর্মের কথা। তাঁর গভীরপ্রসারী বর্ণময়তা আর ব্যঞ্জনাময় প্রকাশে বিভিন্ন ঘটনার টুকরো টুকরো মালা গাঁথতাম আমি, যা মনে গভীরভাবে দাগ কাটত। তাঁর উদাত্ত কণ্ঠের ভাটিয়ালি ও
ভাওয়াইয়া গানের টান, কণ্ঠের ভাঙা, চটকা গান কিংবা ইসলামি গান আমার মন কেড়ে নিত। যেকোনো
ঘরোয়া অনুষ্ঠানের মধ্যমণি হয়ে উঠতেন। জমিয়ে আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে উঠে আসত কিংবদন্তি শিল্পী
তাঁর বাবা আব্বাস উদ্দিনের কথা। কখনও দরদি গলায় ধরতেন তার বাবার কোনো গান কিংবা কোনো
গজল। কখনও গাইতে গাইতে ডুকরে কেঁদে উঠতেন। গভীর বোধের প্রতিফলনে তাঁর শিল্পরসিক মন
ক্ষণে ক্ষণে আনন্দিত হতো, একই সঙ্গে বেদনায় কাতর হতো। শুধু তাই নয়, একজন শিল্পী যখন
গান করতেন, তখন গলার স্বর কয়েক পর্দা চড়িয়ে বলে উঠতেনÑ ‘বাহ’ কিংবা ‘আহা’ জাতীয় শব্দ,
যা গায়নরত শিল্পীর মুড ও এনার্জি দুটোতেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলত। একজন গুণী শিল্পী আরেকজন
গুণী শিল্পীকে মূল্যায়ন করতেন এভাবেই। সে হোক ছোট কিংবা বড়, খ্যাত কিংবা অখ্যাত, ঢাকা
শহরের নামকরা কোনো শিল্পী কিংবা মফস্বলের অজপাড়া গাঁয়ের কোনো নাম না জানা গুণী মানুষ।
বটগাছের মতন ছায়া দিয়ে আগলে গুণী শিল্পীর কদর করতে জানতেন। সংগীতের সুরের মহিমা অতল
থেকে উপলব্ধি করতেন বলেই বেছে বেছে তাদের সংগীত পরিবেশনার সুযোগ করে দিতেন।
আমাদের বাড়িতে আমার ওস্তাদ কাদের জামেরীর প্রতিটি প্রয়াণ দিবসে মিলনমেলার আয়োজন হতো। সেখানে প্রতিবার উপস্থিত
থাকতেন শিল্পী মুস্তাফা জামান আব্বাসী, আসমা আব্বাসী, ফেরদৌসী রহমান, মালেকা পারভীন, হাসিনা মমতাজসহ আব্দুল লতিফ
ভাইয়া, খালেদা ফাহমী আন্টি, মুস্তাফা মনোয়ার আঙ্কেল, হেনা কবীর আন্টি, আখতার সাদমানী চাচা, আঞ্জুমান আরা আন্টি
প্রমুখ নামকরা সব
ব্যক্তিত্ব। সে এক অন্যরকম মিলনমেলা। ফেরদৌসী আন্টির নেশা ধরানো স্বাচ্ছন্দ্য
গায়কিতে বিভিন্ন রাগের খেয়াল, আমার পরিবেশিত ঠুমরি, আব্বাসী আঙ্কেলের গজল, হাসিনা ও
মালেকা আন্টির আধুনিক গানের অসাধারণ পরিবেশনায় কী যে এক মোহম পরিবেশের সৃষ্টি হতো,
বাড়িভর্তি সুর খেলা করত, সে স্মৃতি ভুলবার নয়। এ যেন সোনালি অতীতের সোনাঝরা সংগীত।
তাঁদের সবার কাছ থেকে অনেক কিছু জীবনে শিখেছি আর সংগ্রহ করেছি জীবনে ভালো মানুষ হওয়ার
রসদ। সেসময় নাশিদ কামাল আপাও মাঝেমধ্যে আসতেন। থাকতেন আমাদের পেছনের বাসায়। পণ্ডিত
যশোরাজ এলে তাঁর বাসায়ও একই ধরনের মিলনমেলা
বসত।
আমার চোখে দেখা, উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতায় অনুধাবন করা আব্বাসী আঙ্কেল কি-ই না করেছেন
জীবনে। পেশাগত ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্য রক্ষা করার মতন শিল্পবোধ তাঁর মধ্যে ছিল বলেই
একটা পরিপূর্ণ জীবন তিনি যাপন করে যেতে পেরেছেন। শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব,
ফিল্ম সেন্সর বোর্ডের দায়িত্বসহ নিখুঁতভাবে সামাজিকতা করেছেন, সংসার করেছেন, কর্মক্ষেত্র
সামলিয়েছেন, মেয়েদের মানুষ করেছেন, উপস্থাপনা, সংগীতচর্চা, ফোক মিউজিক রিসার্চ গ্রুপের
নেতৃত্ব ও গবেষণার পাশাপাশি দেশ ও বিদেশের নানা প্রান্তে গান গেয়ে শ্রবণে মুগ্ধতার
জাদু ছড়িয়েছেন এবং বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যর দ্যুতি ছড়িয়েছেন সংগীতপিপাসুদের মনে।
দক্ষ ডুবুরির মতো লোকসংগীতের সমুদ্র থেকে তুলে আনা নানা গীতিকার ও সুরকারের সৃষ্টির
মণিমুক্তা ছড়িয়েছেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। হাজার হাজার লোকগানের সংগ্রহ ছিল তাঁর
কাছে। তাঁর ‘ভরা নদীর বাঁকে’, ‘আমার ঠিকানা’ ‘আপন ভুবন’সহ ‘হিজল তমাল’ ও ‘বাঁশরী’
অনুষ্ঠান তৎকালীন সময়ে দর্শক-শ্রোতাদের কাছে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। তাঁর বাসাতে
বসে অসংখ্য লোকসংগীত তুলেছি আমি। তার মধ্যে দুটি গানের কথা খুব মনে পড়েÑ ‘আমায় এত রাতে কেনে ডাক দিলি’, আরেকটা তাঁর চাচা আব্দুল করিমের লেখা একটি গানÑ ‘কোন
বনে ডাকিল কোকিল রে’। তাঁর বৈচিত্র্যময় সংগীতজীবনের নানা মুহূর্তের সঙ্গী হয়ে থাকতেন
তাঁরই সহধর্মিণী লেখিকা ও শিক্ষিকা আসমা আব্বাসী। আসমা আন্টির সঙ্গে শেষ দেখা এক পরিবারিক
অনুষ্ঠানে। তখন আঙ্কেল সম্পর্কে তিনি বললেনÑ তোমার আঙ্কেলের অবস্থা বেশি ভালো না, কোথাও
বের হন না ইত্যাদি। অথচ তিনিই সবার আগে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। আজ দুজন মানুষই নেই।
তাদের সুখী জীবনের বিভিন্ন মুহূর্ত ফ্রেমবন্দি হয়ে থমকে আছে। তাঁদের দুজনের দুই কৃতী
সন্তান সামিরা ও শারমিনী আপাকে আল্লাহ তাদের বাবা হারানোর শোক সহ্য করার শক্তি দান করুন। আমাদের জীবনের সবই চলবে আগের নিয়মে। শুধু
রাতের সব কোলাহল যখন থেমে যাবে, ঘুমন্ত নগরীর ওপর চাঁদ নরম আলো ছড়াবে, ঝিকমিকিয়ে রাতের
তারারা আকাশে গল্প করবে একে অপরের সঙ্গে, সেই মুহূর্তে খুব কাছের মানুষ, খুব আপন কিছু
মানুষ এই চিরস্মরণীয় প্রাণকে উপলব্ধি করবে। পরম করুণাময় আল্লাহতায়ালার কাছে হাত তুলে
দোয়া চাইবেÑ হে দয়াময় আল্লাহ আমাদের এই মানুষটিকে পরপারে তুমি ভালো রেখো। তাঁর সমস্ত
গুনাহ তুমি মাফ করে দাও। তাঁকে তুমি জান্নাতুল ফেরদৌস দান কর। আমিন।