জাবেদ ইমন
প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৫ ১২:২১ পিএম
আপডেট : ১৭ মে ২০২৫ ১২:৩৩ পিএম
মুস্তাফা জামান আব্বাসী, প্রতিকৃতি: মাসুক হেলাল
সংগীতজ্ঞ মুস্তাফা জামান আব্বাসী মাওলানা জালালুদ্দিন রুমির ভীষণ ভক্ত। তাকে নিয়ে তিনি একটি বই লিখেছেন। নাম ‘রুমির অলৌকিক বাগান’। এই বইটির প্রকাশক হিসেবে তার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা। তার সঙ্গেপরিচয় করিয়ে দেন কবি আবু হাসান শাহরিয়ার। শাহরিয়ার ভাই তখন যুগান্তর পত্রিকায় কাজ করেন। তিনি আব্বাসী ভাইয়ের লেখার গুণমুগ্ধ পাঠক।
যুগান্তর ঈদসংখ্যায় ছাপা হয় হরিণাক্ষী উপন্যাস। পরে বই আকারে প্রকাশ করি আমার মুক্তদেশ প্রকাশন থেকে। পরে ‘রুমির অলৌকিক বাগান’ প্রকাশ করি। এই বইটি প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রথম দুই বছরে তৃতীয় মুদ্রণ ফুরিয়ে যায়। প্রথম মুদ্রণ শেষ হলে আমি লেখক সম্মানীর চেক নিয়ে যেদিন ওনার বাসায় যাই, চেক হাতে দিতেই প্রশ্ন করেন, এটা কিসের চেক, আমাকে দিচ্ছেন কেন? বললাম, আপনার লেখা রুমির অলৌকিক বাগানের লেখক সম্মানী। সেদিন চেক হাতে পেয়ে সেই চেকে প্রথমে চুমু খেলেন এবং পরবর্তীতে চেকটি মাথায় ছোঁয়ালেন। এমনটা দেখে প্রশ্ন করি, এমনটি কেন করলেন? উত্তরে তিনি বললেন, পত্রপত্রিকায় লিখে অনেক চেক পেয়েছি কিন্তু বই লিখে জীবনে এই প্রথমবারের মতো প্রকাশন থেকে চেক পেয়েছি, তাই। অবাক হয়ে বললাম, এর আগেও অমুক অমুক অনেক জনপ্রিয় প্রকাশনা থেকেও আপনার বই প্রকাশিত হয়েছে, এবং আপনার অনেকগুলো বইয়ের মুদ্রণ ও সংস্করণ হয়েছে। সেখান থেকে কোনো লেখক সম্মানী পাননি!
তিনি
বললেন, পেলে তো আর এটি প্রথমবারের মতো হতো না। এরপর তিনি খুশিতে আমাকে জড়িয়ে ধরেন,
কোলাকুলি করেন।
এর
পর আব্বাসী ভাইয়ের লেখা দশটি বই প্রকাশ করি। বইগুলো ছাপানো উপলক্ষে বহুবার ছুটে
গিয়েছি তার বাসায় বিপরীত ফ্লাটে থাকতেন আরেক কিংবদন্তি লেখক অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল
ইসলাম স্যার।
আব্বাসী
ভাইয়ের বাসায় গেলেই ওনার স্ত্রী লেখক অধ্যাপক আসমা আব্বাসী নিজ হাতে চা বানিয়ে নিয়ে
আসতেন আমাদের জন্য। হেসে হেসে কুশলাদি জিজ্ঞেস করতেন আমার ও আব্বাসী ভাইয়ের বইয়ের।
গানের পাশাপাশি বইয়ের প্রতিও এই পরিবারের সদস্যদের রয়েছে হৃদয়ের টান। ওনাদের ছোট
মেয়ে শারমিনী আব্বাসীও লিখতেন গল্প ও ফিচার, মাওলা ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে
তার লেখা অনেকগুলো বই।
অত্যন্ত
মনখোলা ও হাসিখুশিতে প্রাণবন্ত মানুষটি অতি দ্রুত আপন করে নেওয়ার অসাধারণ গুণ ছিল।
দেশি-বিদেশি বই সংগ্রহ ও পাঠাগার তৈরিতে ছিলেন মনোযোগী সংগ্রহী। পেশাগত জীবনে কিছুকাল
কাটিয়েছেন ইউরোপের দেশে। বিটিভিতে সংগীতানুষ্ঠান করাসহ সর্বশেষ ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির
সংগীত বিভাগ, আব্বাসউদ্দীন ও কাজী নজরুল ইসলাম ডিপার্টমেন্টের প্রধান। কবি কাজী নজরুল
ইসলামের জীবনী Kazi Nozrul Islam man and poet নামে লিখেছেন একটি ইংরেজি ভার্সনের বই।
সেই বইয়ের ছাপানোর দায়িত্বও পালন করেছি।
সংসারজীবনে
আসমা আব্বাসীকে অনেক বেশি ভালোবাসতেন। দুজন কোথাও গেলে একে অপরের হাত ধরে পথ চলতে দেখেছি
বহু অনুষ্ঠানে। ব্যক্তিজীবনে দুই কন্যা সন্তানের জনক-জননী ছিলেন আব্বাসী ও আসমা আব্বাসী
দম্পতি। বড় মেয়ে সামিরা আব্বাসী ও ছোট মেয়ে অ্যাডভোকেট শারমিনী আব্বাসী।
সামিরা
আব্বাসী আমেরিকা প্রবাসী। আব্বাসী ভাইয়ের বাসায় বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে আমার সাথে
সামিরা ও তার ১৪ বছর বয়সি ইংরেজি বইয়ের লেখক আরমানের সঙ্গে। সৌভাগ্যক্রমে
Strained window নামের সেই বইটির প্রকাশকও ছিলাম আমি।
তার
বাবার লেখা গানের বই আব্বাসউদ্দীনের গান বইটি তারা পারিবারিকভাবে চারটি মুদ্রণ ছাপিয়েছেন
এবং বাজারজাত করেছেন। পরবর্তীতে এই বইটি আর বাজারে পাওয়া না গেলে আমি একদিন ইন্ডিপেন্ডেন্ট
ইউনিভার্সিটির নজরুল আব্বাসউদ্দীন বিভাগে দেখা করতে গিয়ে আব্বাসী ভাইকে এই বইটি পুনরায়
ছাপানোর প্রস্তাব করলে তিনি জানান, এই বইটির গ্রন্থস্বত্ব তারা তিন ভাইবোন, যেহেতু
বইটির লেখক তার পিতা আব্বাসউদ্দীন। বইটি এতদিন যাবৎ কোনো প্রকাশনাকে ছাপাতে দেননি
তারা। আমি যদি ছাপাতে চাই, তাহলে তিনজনকে লেখক সম্মানী দিয়ে ছাপাতে রাজি হলে দেবেন
অন্য ভাইবোনদের সাথে আলাপ করে। পরবর্তীতে আমি মুক্তদেশ প্রকাশন থেকে এই বইটিও ছাপাই।
সর্বশেষ
২০২১ সালের করোনায় প্রথমবারের মতো আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি, পরবর্তীতে
কিছুটা সুস্থ হয়ে আবার স্ট্রোক করে বিছানায় শায়িত হয়ে পড়েন দীর্ঘমেয়াদিভাবে। ২০২৪
সালের ১ মে আমি শেষবারের মতো যাই ওনার গুলশানের বাসায়। তখন জানলাম কোনো গেস্ট অ্যালাউ
নন সংগীর বাসায়। পরবর্তীতে সংগীর কন্যা শারমিনী আব্বাসীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে আমাকে
পারমিশান দেন বাসায় দেখা করার। মুখে মাস্ক পরে উনার আলাদা সেবাকক্ষে গিয়ে দেখি উনি
বিছানায় শুয়ে আছেন। ক্ষীণ হয়ে আসছে স্মৃতিশক্তিÑ জানান শারমিনী। আমি সামনে গেলে বহু
কষ্টে বিছানা থেকে উঠে বসেন। কথা বলতে না পারলেও মাথা নেড়ে সম্মতি জানান আমাকে চিনতে
পারছেন তিনি। বেশ কিছুক্ষণ বিছানার পাশে বসে উনার বইপত্র নিয়ে আলোচনা হয় সংগীর কন্যার
সঙ্গে। অনুরোধ করেন, রুমির অলৌকিক বাগান বইটির নতুন মুদ্রণ ছাপানোর। করোনার পর থেকে
বইটির মুদ্রণ হয়নি আর। অবশেষে সংগীর অনুরোধে বইটির পঞ্চম মুদ্রণ ছাপানো হলেও সংগীর
পরিবারের হাতে এখনও বইটির কপি পৌঁছে দিতে পারিনি। যা এখনও আমাকে পীড়া দেয়।