প্রবীর বিকাশ সরকার
প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৫ ১৬:২৭ পিএম
১৯৬১ সাল। জাগতিক পৃথিবীর ইতিহাসে একটি অনন্য ঘটনার বছর। এই বছর ছিল বহুমাত্রিক প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শততম জন্মবর্ষ। কবির শততম জন্মজয়ন্তী ভারত, পূর্ব পাকিস্তানসহ বিশ্বের অনেক দেশে যথাযোগ্য উদ্দীপনা ও মর্যাদায় উদযাপিত হয়েছিল। এশিয়ার অন্যতম প্রধান দেশ জাপানেও রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ ঘটা করে উদযাপিত হয়েছে প্রায় চার বছর ধরে লাগাতার পরিকল্পনা, অনুষ্ঠান, প্রদর্শনী এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে, এক কথায় যা ছিল নজিরবিহীন। আর কোনো দেশেই এমনটি দেখা যায়নি। এমনকি, রবীন্দ্রনাথের জন্মভূমি ভারতেও নয়। তার পূর্বপুরুষের মাতৃভূমি পূর্ব বাংলাতেও নয়ই! বরং পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রভক্তদেরকে রীতিমতো আন্দোলন করে দুঃসাহসের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রজন্মজয়ন্তী উদযাপিত করতে হয়েছিল বিজাতীয় উর্দুভাষী শাসকদের বিরুদ্ধে। এও নজিরবিহীন ঘটনা বাঙালি জাতির ইতিহাসে।
যেহেতু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপূর্ব থেকেই গভীরতম সম্পর্ক ছিল জাপানের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের, তাই জন্মজয়ন্তী উদযাপনের গুরুত্বই ছিল আলাদা। ১৯০২ সালে ব্রিটিশ-ভারতের রাজধানী কলকাতায় বিশ্ববিশ্রুত জাপানি মনীষী, শিল্পকলার ইতিহাসবিদ, সাহিত্যিক, শিল্পাচার্য ওকাকুরা তেনশিনের সঙ্গে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিচয় ও গভীর ঘনিষ্ঠতা হয়। ১৯০৩ এবং ১৯০৫ সালে আরও একাধিক প্রথিতযশা জাপানি চিত্রশিল্পী, জুদো ক্রীড়াবিদ, বৌদ্ধপুরোহিত পণ্ডিত যথাক্রমে য়োকোয়ামা তাইকান, হিশিদা শুনসোও, কাৎসুতা শোওকিন, সানো জিননোসুকে, কাওয়াগুচি একাই প্রমুখের সঙ্গে আন্তরিক হৃদ্যতা গড়ে ওঠে কলকাতায় ও শান্তিনিকেতনে। তিনি প্রবলভাবে জাপানের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। জাপানভ্রমণের জন্য একাধিকবার চেষ্টা-তদবির করে ব্যর্থ হন। তার সেই আশা পূরণ হয় ১৯১৬ সালে। ১৯১৬ থেকে ১৯২৯ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ মোট পাঁচবার জাপান ভ্রমণ করেন। এই একাধিক ভ্রমণের সময় তার অগণন ভক্ত তাকে নিয়ে মেতে ওঠেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত। তার কাব্যগ্রন্থ গীতাঞ্জলি ও দি গার্ডেনার, স্ট্রে বার্ডসহ অনেক কবিতা, নাটক ডাকঘর, ন্যাশনালিজম, অবসরের দর্শনসহ একাধিক প্রবন্ধ, জাপানে ও চীনে প্রদত্ত বক্তৃতাসমূহ, উপন্যাস চারুলতা, গোরা, শেষের কবিতা, নৌকাডুবি ইত্যাদি ইংরেজি থেকে জাপানি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। জাপানি গবেষকদের ভাষায় রবীন্দ্র বুম্ তথা রবীন্দ্র-আন্দোলন দেখা দেয় বুদ্ধিজীবীমহলে। এর মূলে রয়েছে ১৯১৩ সালে এশিয়া মহাদেশে প্রথম নোবেল পুরস্কার অর্জনের পটভূমি। শুধু জাপানেই নয়, কোরিয়া, চীন, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়, বার্মা, ইরান, ইরাক, হংকংসহ সমগ্র এশিয়া মহাদেশেই রবীন্দ্রনাথের ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল। কিন্তু নানা বিষয়ে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল এশিয়ার প্রথম শিল্পোন্নত রাষ্ট্র জাপানে।
১৯১৬ সালের ১১ জুন তারিখে কবি রবীন্দ্রনাথ টোকিও ইম্পেরিয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত ‘The Message of India to Japan’ বক্তৃতায় কঠোর সমালোচনা করেন জাপানের অতিরিক্ত পাশ্চাত্য অনুকরণ, কট্টর জাতীয়তাবাদ এবং সমরবাদী নীতির। ফলে তাকে একদল কট্টর জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ তথা বুদ্ধিজীবীদের কঠোর সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। অবশ্য এরপরই প্রভাবশালী মর্যাদাসম্পন্ন কেইওগিজুকু বিশ্ববিদ্যালয়ে “Spirit of Japan”শীর্ষক জাপানিদের আত্মশক্তি, সৌন্দর্যবোধ, ঐতিহ্যপ্রেম, শৈল্পিক সুরুচিবোধ নিয়ে এক অসামান্য বক্তৃতা করেন, এর ফলে ফুটন্ত উষ্মা, উত্তেজনা এবং বিরূপ প্রতিক্রিয়া অনেকটাই প্রশমিত হয়। ১৯৩৭ সালে জাপানের চীন আক্রমণ এবং যুদ্ধসংঘটনের তীব্র সমালোচনা করেন কবিগুরু। এই নিয়ে তারই ঘনিষ্ঠ বন্ধু জাপানের আন্তর্জাতিক কবি এবং কেইও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক নোগুচি য়োনেজিরোওর সঙ্গে সুতীব্র তিক্ত-তীক্ষ্ণ পত্রযুদ্ধের অবতারণা হয়েছিল। রাজনীতি ও সাহিত্যের ইতিহাসে এটা একটি বিরল ঘটনা। জাপানের অধীন অবিভক্ত কোরিয়া, তাইওয়ান এবং চীনের অন্তর্গত ভিন্নজাতির প্রদেশ মাঞ্চুরিয়ায় উপনিবেশ স্থাপন, যুদ্ধবিগ্রহ ইত্যাদি সম্পর্কিত প্রবল উষ্মা রবীন্দ্রনাথের থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি জাপানি জনগণের সহমর্মিতায় আদৌ কোনো বিরূপ ছাপ পড়েনি। জাপানে রবীন্দ্রনাথের জনপ্রিয়তায় ভাটা দেখা যায়নি। অতিরিক্ত সমরবাদী মনোভাবের কারণে জাপানকে কড়া মাসুল দিতে হতে পারে বলেও রবীন্দ্রনাথ সতর্ক করেছিলেন। ফলত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উগ্র এবং উদারপন্থি অনেক জাতীয়তাবাদী রবীন্দ্রনাথের ভবিষ্যদ্বাণীকে নীরবে স্বীকার করে নিলেও, নীরব যুক্তি-তর্ক থেমে থাকেনি। কেননা, রবীন্দ্রনাথ জাপানের সমরবাদের কঠোর সমালোচনা করলেও ১৯০৪-৫ সালে প্রবল প্রতাপশালী রুশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে মহাযুদ্ধে পরাজিত করার কারণে তিনি অপরিসীম আনন্দে উদ্বেল এবং আলোড়িত হয়েছিলেন। ক্ষুদ্র এক সংকর জাতির মাঝারি গোছের এক রাষ্ট্র জাপান পরাক্রমশালী শ্বেতাঙ্গ সাম্রাজ্য রাশিয়াকে পরাজিত করার জন্য ভূয়সী প্রশংসাও করেছিলেন। শুধু রবীন্দ্রনাথই নন, পরাধীন ভারতের উদীয়মান তরুণ স্বাধীনতাকামী বিপ্লবী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত এবং উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। ১৯২৪ সালে কবিগুরু জাপানে আশ্রিত তরুণ মহাবিপ্লবী রাসবিহারী বসুসহ তরুণ বিপ্লবীদেরকে উজ্জীবিত করেছেন স্বদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে লড়ে যাওয়ার জন্য। ওই সালেই এক বিরল সংবর্ধনা সভায় রাসবিহারী বসুর রাজনৈতিক আশ্রয়দাতা একচ্ছত্র প্রতাপশালী উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তোওয়ামা মিৎসুরুকে ধন্যবাদ প্রদান করেছেন ভারতীয় বিপ্লবীদেরকে সমর্থন ও সহযোগিতা করার জন্য অকুণ্ঠচিত্তে কবিগুরু। বলা বাহুল্য, রবীন্দ্রনাথের মধ্যে এসব বৈপরীত্য বা অন্তর্দ্বন্দ্ব ছিল। তথাপি, সবকিছুর ঊর্ধ্বে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন আধ্যাত্মিকতা, মানবতাবাদ, বিশ্বজনীনতা এবং শান্তিতে চিরকাল সুনিষ্ঠ ও বিশ্বাসীÑ আঞ্চলিক ও বিশ্বশান্তির প্রবক্তা ও প্রতীক। শান্তিনিকেতন তার সেই শান্তিরই স্বপ্নভূমি। এহেন কবি, ঋষিকবি, বহুমাত্রিক রবীন্দ্রনাথ এবং শান্তিনিকেতন হয়ে উঠেছিল বহু বিদগ্ধ জাপানি নাগরিকের কাছে আধ্যাত্মিক শক্তিসাধনার আরাধ্যস্বরূপ। তারই প্রতিফলন ঘটেছিল তার জীবদ্দশায় এবং মহাযুদ্ধের মাত্র ১৩ বছর পর জাপানে তার জন্মশতবর্ষ উদযাপনের ব্যাপক আয়োজনের মধ্যে।
১৯৫৭ সালেই স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে জাপানে আগমন করেন। টোকিও ছাড়াও প্রাচীন রাজধানী নারায় যান। আণবিক বোমায় বিধ্বস্ত হিরোশিমা শহরে বক্তৃতা করেন। এই ভ্রমণের সময় বিশিষ্ট জাপানিদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বলেন, আসন্ন রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে ভারত বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে যাচ্ছে। যেহেতু জাপান গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের প্রিয় দেশ তাই জাপানকেও অনুরোধ করছি বিষয়টি ভেবে দেখার জন্য। উপস্থিত বিভিন্ন স্তরের বিশিষ্ট জনদের মধ্যে ছিলেন প্রভাবশালী প্রবীণ ব্যক্তিত্ব শিমোনাকা ইয়াসাবুরোও। ১৮৭৮ সালে জন্ম শিমোনাকা একাধারে শিক্ষাবিদ, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা, জাপানের আধুনিক প্রকাশনা জগতের পথিকৃৎ, বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর শুভাকাঙ্ক্ষী ও তার রচিত গ্রন্থের প্রকাশক, রবীন্দ্রভক্ত, গান্ধীভক্ত, টোকিও ট্রাইব্যুনালখ্যাত বিশ্ববিশ্রুত বিচারপতি রাধাবিনোদ পালের ভাতৃপ্রতিম বন্ধু, প্যান-এশিয়ানিস্ট, জাপানে শান্তিবাদী আন্দোলনের অগ্রদূত, পাকিস্তান অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা এবং মৃৎশিল্পী। তিনি সঙ্গে সঙ্গে নেহরুর প্রস্তাবে সাড়া দিলেন এবং উয়েনো শহরস্থ বিখ্যাত টোকিও বুনকা কাইকান নামক মিলনায়তনে একটি সভা আহ্বান করলেন। তাতে বেশ কিছু সংখ্যক প্রবীণ রবীন্দ্রভক্ত অংশগ্রহণ করে মতবিনিময় করেন। পরের বছর শান্তিনিকেতনস্থ রবীন্দ্রভবনের কিউরেটর ক্ষিতীশ রায় কর্তৃক অনুরোধ আসে জাপানে। এই আবেদনে সাড়া দিয়ে ১৯৫৮ সালে শিমোনাকার উদ্যোগে তৎকালীন জাপানের প্রথম সারির নেতৃস্থানীয় ৪৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি সংস্থা গঠিত হয়। যাদের মধ্যে ছিলেন শিক্ষাবিদ, গবেষক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, চিত্রশিল্পী, শিল্পপতি, ধর্মীয় নেতা, রাজনীতিবিদ প্রমুখ। সংস্থার নাম, তাগো-রু কিনেন কাই অর্থাৎ ‘Tagore Memorial Association Japan’, এর নির্বাহী পরিষদের সম্মানিত চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন প্রভাবশালী শিক্ষাবিদ, সমাজসেবী, কাগজ ব্যবসায়ী, আধ্যাত্মিক সংস্কৃতি গবেষক, লেখক ও প্যান-এশিয়ানিস্ট ড. ওওকুরা কুনিহিকো। প্রথমদিকে তিনি ছিলেন না। তাকে অনুসন্ধান করে আমন্ত্রণ জানানো হয়। শিমোনাকা এমন একজনকে প্রত্যাশা করছিলেন যিনি গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং জাঁকজমকপূর্ণ উৎসবাকারে রবীন্দ্রজন্মজয়ন্তীকে পরিচালিত করতে পারবেন অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে, যাতে জাপানের মান-মর্যাদা সমুন্নত থাকে। জাপানে ঐতিহ্যগতভাবে শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অবহেলা-অবজ্ঞার কোনো স্থান নেই। আর নোবেলজয়ী বিশ্বমানব শান্তি, সংস্কৃতি ও শিক্ষার মূর্তপ্রতীক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলে কথা! বলা বাহুল্য যে, একেবারে যথার্থ ব্যক্তিকেই খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। কারণ, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ড. কুনিহিকোর গভীর এক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল ১৯২৯ সালে শেষবার কানাডা-আমেরিকা থেকে ভারতে ফেরার পথে জাপানে বিরতি গ্রহণের সময়। কবিগুরুর অবস্থানের উপযুক্ত আবাস হিসেবে বিপ্লবী রাসবিহারী বসু তার শুভাকাঙ্ক্ষী ধনাঢ্য ব্যক্তি ড. ওওকুরা কুনিহিকোর টোকিওর মেগুরোস্থ প্রাসাদোপম বাড়িটির কথা ভেবে কর্ণধারকে অনুরোধ করেছিলেন। ড. কুনিহিকো নোবেলজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথের নাম ভালো করেই জানতেন, কেননা এর আগে চারবার জাপানে আগমন করেছেন কবি এবং গণমাধ্যমে ফলাও করে তার অনুষ্ঠানের সংবাদ, সাক্ষাৎকার, বক্তৃতার কথা প্রকাশিত হয়েছে। তিনি সানন্দে রাজি হন এবং প্রায় এক মাস কবিগুরুকে আতিথ্য প্রদান করেন। এ সময় কবি অসুস্থ এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। কবিগুরুর চিকিৎসা, আরাম-আয়েশ, স্বাচ্ছন্দ্য-আনন্দ তথা আতিথেয়তার কোনো ঘাটতি রাখেননি ড. কুনিহিকো। এই সময় দুজনে নিভৃতে আধ্যাত্মিক এবং প্রাচ্যচিন্তা বিষয়ে মতবিনিময় করেন এবং গভীর বন্ধুত্বে বাঁধা পড়েন। ড. কুনিহিকো কবিকে নিজের রচিত ইংরেজি গ্রন্থ মাই থটস্ (আমার চিন্তা), জাপানের ইতিহাস, সংস্কৃতির ইতিহাস ইত্যাদির মহাগ্রন্থসমূহ উপহার প্রদান করেন। বিনিময়ে রবীন্দ্রনাথ স্বদেশে ফিরে গিয়ে পরের বছর বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় রচিত তার ১৭০টি গ্রন্থ ড. কুনিহিকোকে প্রতি-উপহার হিসেবে প্রেরণ করেন। যা দিয়ে ড. কুনিহিকোর য়োকোহামাস্থ ওওকুরায়ামা শহরে অবস্থিত হেলেনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত ভবনে সংরক্ষণ করা হয়। এই ভবনে ছিল তার প্রতিষ্ঠিত ওওকুরা আধ্যাত্মিক সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্র। ভবনেরই একটি কক্ষে গ্রন্থগুলো সাজিয়ে টেগোর মেমোরিয়াল রুম করা হয়েছিল কবির জন্মশতবর্ষ উদযাপনের অন্যতম প্রকল্প হিসেবে। রবীন্দ্রনাথকে তিনি কতখানি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন তার স্মৃতিচারণ থেকে সুস্পষ্টভাবে জানা যায়। রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করতে গিয়ে ১৯৫৯ সালে স্মৃতিকথায় লিখেছেন :
‘Sitting face to face with the Poet who was dressed in Indian clothes and sinking his tall stature deep in an armchair of the study, I talked about my project of building the Institute of Spiritual Culture, which was already started, and he talked, in turn, about his school at Santiniketan. The impressions I received then from him remain still vivid in my mind.’
এহেন ড. ওওকুরা কুনিহিকোর কাছে প্রস্তাব গেলে পরে তিনি সানন্দে অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃত্ব দিতে আগ্রহী হন। কার্যকরী পরিষদ গঠন করা হলে তিনি সম্মানিত চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। ব্যবস্থাপনা পরিচালক হন যথাক্রমে, অধ্যাপক, গবেষক, ধর্মবিশেষজ্ঞ ও রবীন্দ্র-রচনার অনুবাদক ইনাজু কিজোও; অধ্যাপক, জাতীয় সংসদ গ্রন্থাগারের জেনারেল ম্যানেজার ও জাপান ইউনেস্কো সংস্থার সভাপতি হারাদা মিচিও এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতি গবেষক রবীন্দ্রসুহৃদ মনীষী ওকাকুরার তেনশিনের পৌত্র অধ্যাপক ওকাকুরা কোশিরোও।
পরিচালক নিযুক্ত হন যথাক্রমে, বিশিষ্ট সাংবাদিক মাৎসুমোতো শিগেহারু; বিশ্ববিশ্রুত ভারতত্ত্ববিদ, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ, গবেষক, অমূল্য গ্রন্থরচয়িতা ড. নাকামুরা হাজিমে; প্রসিদ্ধ শিক্ষাবিদ ও বিখ্যাত তামাগাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ড. ওবারা কুনিয়োশি; বিশিষ্ট মনস্তত্ত্ববিদ, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, সাংসদ, স্বনামধন্য রবীন্দ্রভক্ত ও রবীন্দ্ররচনার অনুবাদক মাদাম ড. কোওরা তোমি; প্রভাবশালী খ্রিস্টান পাদ্রী, সমাজতান্ত্রিক কর্মী রেভারেন্ড ইশিকাওয়া সোনশোও; বৌদ্ধপুরোহিত, বাংলা ভাষার পণ্ডিত রবীন্দ্র ও নেতাজিসুহৃদ অধ্যাপক কিমুরা নিক্কি; শিক্ষাবিদ, গবেষক, রবীন্দ্রভক্ত পরবর্তীকালে বিশ্বভারতীর অতিথি অধ্যাপক শিনইয়া কাসুগাই; ভারতীয় প্রাচীন সাহিত্যবিশারদ ও শিশুসাহিত্যিক তানাকা ওতোইয়া; আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সাকামোতো তোকুমাৎসু এবং অধ্যাপক দোই কিউইয়া; কবি, অনুবাদক, শিশুসাহিত্যিক রবীন্দ্রভক্ত ইয়ামামুরো শিজুকা।
হিসাব রক্ষক নিযুক্ত হন, কোন ফুমিতাকে এবং সোওমা য়ুজি।
উপদেশক হন, জেন্ মাস্টার রেভারেন্ড তাকাশিমা রোসেন; রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং লেখক মায়েদা তামোন; বৌদ্ধধর্মীয় গবেষক ড. মিয়ামোতো শোওসোন; প্রাচীন ভারত গবেষক, ভাষা বিশেষজ্ঞ টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস প্রফেসর ড. ৎসুজি নাওশিরোও; জাপান রেডক্রস সোসাইটির প্রেসিডেন্ট এবং যক্ষ্মারোগ নিরোধ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শিমাজু তাদাৎসুগু; ব্যবসায়ী এবং প্রেসিডেন্ট জাপানিজ ফেডারেশন অব ইকোনমিক অর্গানিজেশন ইশিজাকা তাইজোও; ব্যবসায়ী, প্রথম প্রেসিডেন্ট দাইদোও ফায়ার অ্যান্ড মেরিন ইনসুরেন্স কোম্পানি, প্রেসিডেন্ট জাপান কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন হারা ইয়াসুসাবুরোও; পূর্বোল্লিখিত শিমোনাকা ইয়াসুবুরোও; কবি, নাট্যকার, চিত্রশিল্পী, ঔপন্যাসিক এবং দার্শনিক মুশাকোওজি সানেআৎসু এবং চিত্রশিল্পী য়োকোয়ামা তাইকান।
কাউন্সিলর হন যথাক্রমে, কূটনীতিক ইতোও নোবুফুমি; চিত্রশিল্পী কাৎসুতা শোওকিন; শিক্ষাবিদ, দর্শনবিষয়ক গবেষক এবং বৌদ্ধ পুরোহিত ড. হানায়ামা শিনশোও; তাইশোও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক শিওইরি রিয়োওচুউ; অধ্যাপক এবং প্রাচ্য গবেষক ড. নিশি গিয়ু; বৌদ্ধধর্মীয় গবেষক ড. সাকামোতো য়ুকিও; ধর্মীয় গবেষক, ব্যবসায়ী, ওয়ার্ল্ড রিলিজিয়ন ফর পিস (WCRP)-এর নির্বাহী পরিচালক, পরিচালক গান্ধী শান্তি ফেডারেশন এবং সাপ্তাহিক বুক্কিয়োও টাইমস পত্রিকার কর্ণধার রেভারেন্ড নাকায়ামা রিরি; বৌদ্ধ পুরোহিত এবং শিক্ষাবিদ তাকাগাই শুনশি; বৌদ্ধ পুরোহিত রেভারেন্ড ওওতানি তোকুসুই; শিল্প সমালোচক, বৌদ্ধ গবেষক এবং সাহিত্যিক কামেই কাৎসুইচিরোও; কবি, সাহিত্য গবেষক, জার্মান সাহিত্য গবেষক, ফরাসি সাহিত্য গবেষক, অনুবাদক রবীন্দ্রভক্ত কাতায়ামা তোশিহিকো; বৌদ্ধ পণ্ডিত এবং সাহিত্য গবেষক অধ্যাপক ড. ফুরুতা শোওকিন; অর্থনীতির অধ্যাপক রবীন্দ্রভক্ত ইয়ামাগুচি কিয়োশি প্রমুখ।
ড. কুনিহিকো চেয়ারম্যান হওয়ার পর সমিতির বিধিবিধান রচনা এবং কার্যকর লক্ষ্য নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করেন। যে কারণে টেগোর মেমোরিয়াল অ্যাসোসিয়েশনের প্রসপেক্টাসে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে : ‘...the special reason why we have such eagerness in memorialising Tagore, lies in the fact that encouraging Tagore-study must have great importance for present Japan herself, and the other is with promoting the national friendship between India and Japan’
অ্যাসোসিয়েশনের কার্যক্রমের মধ্যে ড. কুনিহিকো দুটি বিষয়কে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছিলেন, একটি হচ্ছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত দিশাহারা জাপানে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক ভিশন ‘এক বিশ্ব’ চিন্তাদর্শনকে তরুণ সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া এবং দুই হচ্ছে, ভারতের সঙ্গে বিশেষত বেঙ্গলের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে জোরদার করা। অ্যাসোসিয়েশনের সংবিধানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের ৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে : ‘To make contribution to the progress of spiritual culture in Japan, also to the permanent intimate relationship between India and Japan, and moreover to attainment of the ideal of the ‘One world’ which Tagore indicated.’
অ্যাসোসিয়েশনের কার্যকরী পদক্ষেপের ২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে : ‘Research and investigation into the culture of India, especially that of Bengal, as the background of Tagore; into the relation between Tagore and his eminent contemporaries, such as Ghandi, Tenshin Okakura, Taikan Yokoyama etc,; and also into the abiding influences of Tagore in the world.’
রবীন্দ্রসুহৃদ ড. ওওকুরা কুনিহিকোর বিচক্ষণ নেতৃত্বে টেগোর মেমোরিয়াল অ্যাসোসিয়েশন যেসব বড়মাপের কাজ করে নজিরবিহীন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
০১. একটি মাসিক জার্নাল বা বুলেটিন সাচিয়া প্রকাশ, যার অর্থ সত্য। ১৯৫৯ সালের জুলাই মাস থেকে ১৯৬২ সালের মার্চ পর্যন্ত ট্যাবলয়েড আকারে ৬/৪ পৃষ্ঠায় সর্বমোট ২২টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। যাতে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা, দর্শন, চিন্তা, কর্মকাণ্ড নিয়ে বিদগ্ধ ব্যক্তিরা গবেষণামূলক প্রবন্ধ-নিবন্ধ, স্মৃতিচারণ এবং রবীন্দ্ররচনার অনুবাদ করেছেন। সেই সঙ্গে জাপানের বিভিন্ন শহরে রবীন্দ্রবিষয়ক কর্মতৎপরতার সচিত্র সংবাদ রয়েছে।
০২. রবীন্দ্ররচনা এবং রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন দিক নিয়ে মাসিক বক্তৃতার আয়োজন।
০৩. সাড়ে ৩০০ পৃষ্ঠার বৃহদাকারে রবীন্দ্রস্মারক প্রবন্ধ সংকলন তাগো-রু প্রকাশ।
০৪. সারা দেশ থেকে রবীন্দ্রনাথের স্মারক বস্তুসামগ্রী সংগ্রহকরণ।
০৫. বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রবীন্দ্রনাথের রচনা এবং রবীন্দ্রবিষয়ক জাপানিদের রচনাসমূহের তালিকাভুক্তিকরণ।
০৬. টেগোর মেমোরিয়াল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপস্বরূপ টেগোর মেমোরিয়াল রুম স্থাপন। বর্তমানে রুমটি না থাকলেও ওওকুরায়ামা ভবনে রবীন্দ্রনাথের এক বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। জাপানে রবীন্দ্রনাথের অন্যতম তীর্থস্থান এই ভবন।
০৭. বাংলা ভাষা শেখার প্রশিক্ষণ কক্ষ। তাতে বহুভাষাবিদ মূল বাংলা থেকে গীতাঞ্জলির জাপানি অনুবাদক অধ্যাপক ড. ওয়াতানাবে শোওকোওর কাছে বাংলা শিক্ষার আয়োজন।
০৮. রবীন্দ্র স্নেহধন্য সত্যজিৎ রায় কর্তৃক নির্মিত রবীন্দ্রনাথের ওপর প্রামাণ্যচিত্র রবীন্দ্রনাথ টেগোর প্রদর্শনীর আয়োজন।
০৯. ইউনেস্কোর সহযোগিতায় রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্মগুলোর বিশেষ প্রযুক্তিতে সংস্কার ও সুকৃতিকরণ এবং জাপানে প্রদর্শনীর আয়োজন।
১০. জাপানি শিল্পীদের দ্বারা চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্যের আংশিক মঞ্চাভিনয়।
এসবের বাইরেও অন্যান্য আরও প্রকাশনা এবং সারাবছর ধরেই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্র-উৎসবে সরব ছিল জাপানের রাজধানী টোকিওসহ য়োকোহামা, ওসাকা, নাগাসাকি প্রভৃতি শহর। কী রকম সাড়া পড়েছিল জাপানব্যাপী মাসিক সাচিয়া বুলেটিনে সেসব বিধৃত আছে। উল্লেখ্য, রবীন্দ্রজন্মজয়ন্তী উদযাপনকল্পে যে তহবিল ড. ওওকুরা কুনিহিকোর আহ্বানে গঠিত হয়েছিল তা এক কথায় বিস্ময়কর! তৎকালীন জাপানের আর্থ-সামাজিক অবস্থায় অকল্পনীয়! ১০৫টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ২২টি ধর্মীয় সংস্থা, ১০ জন ধনী ব্যক্তি এবং অন্য একটি সূত্র থেকে সর্বমোট চাঁদা উঠেছিল ৬,৫৫০,৫০০ ইয়েন।