অনুবাদ : বিপাশা চক্রবর্তী
প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২৫ ১৩:২৩ পিএম
ফিলিস্তিনি ঔপন্যাসিক, কবি, গল্পকার এবং অনুবাদক মায়া আবু আল-হায়াত ১৯৮০ সালে লেবাননের বৈরুতে জন্মগ্রহণ করেন, কিন্তু জর্ডানে বেড়ে ওঠেন। তার মা লেবানিজ এবং বাবা ফিলিস্তিনি। তিনি তার চাচির কাছে বেড়ে ওঠেন। কিছুকাল তিউনিসে তার বাবার কাছে থাকেন। ২০০৩ সালে নাবলুসের আন-নাজাহ ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি আম্মান, জর্ডান এবং তিউনিসিয়ায় বিভিন্ন সময় বাস করার পর পরিবারের সঙ্গে ২০০৮ সালে জেরুজালেমে চলে আসেন। তিনি তিনটি উপন্যাস এবং তিনটি কবিতা সংকলন প্রকাশ করেছেন। তার বইগুলো বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছে এবং কিছু গল্প বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। মায়া আবু আল-হায়াত একজন অভিনেত্রী হিসেবেও কাজ করেছেন। প্যালেস্টাইন রাইটিং ওয়ার্কশপ পরিচালনা করেছেন। আবু আল-হায়াত শিশুসাহিত্যে একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন, ‘ইফতাহ ইয়া সিমসিম’সহ শিশুদের জন্য টেলিভিশন অনুষ্ঠান রচনা এবং উপস্থাপনা করেন। এবং শিশুগল্প লেখার মাধ্যমে পরিচিতি পান। বর্তমানে স্বামী এবং তিন সন্তানের সঙ্গে জেরুজালেমে বসবাস করছেন।

ফিলিস্তিনি কবি মায়া আবু আল হায়াত
আমি একজন নিঃস্ব নারী
যে চেকপয়েন্টে বাস করে
তুচ্ছ
জিনিসে আমি সুখ পাই
যেমন, আমার দিনটি যদি একজনও বিষণ্ন সৈনিককে না দেখেই কেটে যায়
সেখানে
আমি নতুন উপন্যাস লিখি
একজন
কসাইয়ের গল্প, যে হতে চেয়েছিল বেহালাবাদক
খ্যাপাটে আর দুষ্টু
কিন্তু তার হাত তাকে ধোঁকা দিল
একটি
ধারালো, চকচকে ছুরির জন্য
তুমি
জানো কেমন নিঃসঙ্গ লাগে
চেকপয়েন্টে
একা থাকতে
সাধারণ
জিনিসে আনন্দ খুঁজতে
যেন
একজন প্রলাপ বকতে থাকা কবিকে ছাড়িয়ে যাওয়া
আর
ক্লান্ত শ্রমিকদের, যারা বয়ে চলে
কলা,
পেয়ারা, আর তনুভা দুধের বোঝা
আমি
একাকী নারী
যে
কবরের ভেতরেই থেকেছে বছরের পর বছর
এখন
পর্যন্ত আমি দেখিনি কোনো দানব বা দেবদূত
কিন্তু
আমি অবশ্যই অসংখ্য বিষণ্ন
সৈনিক দেখতে পাই
চিত্রকর্ম : ফাতেমা ইসা, মিশর
বেদনাদায়ক ছবি
আমি তোমাকে বেদনাদায়ক ছবির কথা বলব
শীতের মধ্যে
১
বিশ জন পুরুষ
পুরোনো চামড়ার কোটে
সস্তা খেলাধুলার পোশাকে জুয়াড়ি
মুখে দাড়ি, যন্ত্রণা আর শীতলতা ফুটে ওঠে
হাতে প্লেট আর স্কার্ফে মুখ মোড়ানো
সবকিছুর ওপর তুষার ঝরে পড়ছে
নিচে লেখা আছে :
‘সিরিয়ানরা ঠান্ডা আর বৃষ্টিতে রুটি কেনার অপেক্ষায়
আছে’
আরও ছবি দেখার এক নিমন্ত্রণ থাকে, কিন্তু
আমি প্রবেশ করি না
আমি ঋষি নই
আমি শুধু একজন একঘেয়ে
মানুষ
যে বেদনাদায়ক ছবি দেখে
সামান্য একটু কাঁদে আর ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানায়
একটি উষ্ণ ঘরের
আশীর্বাদের জন্য
তারপর জানালায় আরও ন্যাকড়া নেড়ে দিই
বাতাসের শিস থামাতে
২
‘আরও বেদনাদায়ক ছবি দেখতে এখানে ক্লিক করুন’
অন্তর্দৃষ্টি
আমি একজন সাহসী
শহীদের কন্যার জন্য অপেক্ষা করছি
যে উঠে দাঁড়াবে আর চিৎকার করবেÑ
তুমি তোমার মাতৃভূমি নাও
আর আমাকে আমার বাবা ফিরিয়ে দাও
বাদামের ফুল জানে তার জীবন সংক্ষিপ্ত
কিন্তু কুঁড়ি ফেটে হাই তোলে
আর শুধুমাত্র যখন এটি স্কুলের রাস্তায় পড়ে
তখনই আনন্দ ফোটে
সব নিঃশব্দ মুহূর্ত
একটি কণ্ঠকে জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারে না
আমি এমন এক জীবন কাটিয়েছি
যেখানে ছিল বীরেরা
আর পুরোপুরি নির্মম মানুষও কিছু
এখন আমি আর পারি না তাদের মাঝে পার্থক্য করতে
আমি দেখেছি শিশুরা
তাদের বাবা-মাকে দেশের জন্য উৎসর্গ করেছে
কিন্তু আমি কখনও দেখিনি কোনো দেশ
কোনো এতিমকে এক বাবা দিয়েছে
আমি চাই সবাই বেঁচে থাকুক, কেউ ধ্বংস না
হোক
আমার দানবরাও না
তোমার দানবরাও না
হয়তো যদি আমাদের কেউ ধ্বংস না
হয়
আমরা সবাই উঠব
এই নরকের ঊর্ধ্বে

যদি কখনও
প্রতিবার যখন আমি বাড়ি থেকে বের হই,
তা যেন আত্মহত্যা,
আর প্রত্যেক প্রত্যাবর্তন, এক ব্যর্থ চেষ্টা।
যদি জ্বলে ওঠা টায়ার বিস্ফোরিত হয়
আর সৈনিকরা নিয়ন্ত্রণ হারায়?
যদি কিশোররা উগ্রপন্থি হয়ে পড়ে
আর ট্রাকচালক
চাকা ধরেই ঘুমিয়ে পড়ে?
যদি আমি যা খুঁজছি তাই পেয়ে
যাই?
আমি চাই সম্পূর্ণরূপে ফিরে আসতে।
আমি রুটিগুলো চূর্ণ করে পথ চিহ্নিত করি
আসা-যাওয়ার জন্য
যতক্ষণ না
সব পাখি আমার রুটিগুলো খেয়ে ফেলে।
গৃহপালিত প্রাণীর মতো
আমি শিখেছি গৃহস্থদের অনুগ্রহ অর্জন করতে,
দুঃখভরে তাদের চোখের দিকে তাকাতে,
কাঁধে হাত বুলিয়ে দিতে।
আমার চাহিদা একেবারে সাধারণÑ
কিছুটা স্নেহময় হাতের স্পর্শ
আর আমার দৈনন্দিন ভয়াবহ কাজের জন্য ক্ষমা।
গৃহপালিত প্রাণীর মতো
আমি অপেক্ষা করি তাদের অতিরিক্ত সদয়তার,
তাদের দ্রুত হাত বোলানোর সংকেত
বলে,
এখন নিজে থেকেই সরে যেতে হবে
তাদের বিরক্ত
হওয়ার আগে
আমাকে দূরে ঠেলে দেওয়ার আগে।
আর যখন তারা ঘুমিয়ে থাকে,
আমি যা খুশি তাই করি
তাদের সুচারু সাজানো জিনিসপত্রের সাথে,
তাদের অ্যালার্ম ঘড়ি পুনরায় সেট করি
আমার চিৎকার, ক্ষুধা
আর দরজায় আঁচড়ানোর আওয়াজে।
স্নেহময় আমি কারও কথা শুনি না।
আমি কামড়াই, চিৎকার করি, লুটোপুটি খাই
অনুমোদনের জন্য, অভিশাপের জন্য,
আর শুধুমাত্র কিছুটা মনোযোগের জন্য।
পরে
যে গোপন রহস্য গোপন রয়ে গেছে,
আমাদের ভেতরে মৃতদেহের স্তূপ
সম্পূর্ণ পচনের অপেক্ষায়,
হাসিতে ভরপুর সুখ
যা কোনো আয়নায়
প্রতিফলিত হয় না,
তোমার ভালোবাসা
যা আসে কেবল ভালোবাসার সমাপ্তির পর,
সেই মিলনের সাথে
যা ঘটে প্রেমিকদের মৃত্যুর পরে,
আর সেই নিষ্ঠার সাথে
যা আসে যখন উপায়গুলো প্রচুর হয়ে গেছে...
আমরা কী করব সেই রাস্তাগুলো নিয়ে
যখন পথগুলো আমাদের হাতের পেছনে হারিয়ে গেছে,
আর ঠোঁটের আবিষ্কারের পরে
আর যা কিছু এখন ঘটছে?

আমার বাড়ি
আমি বহু বাড়িতে থেকেছি,
কিন্তু তাদের কোনোটা আমাকে ভাবায় না।
তৃতীয় বাড়ির পর
আমি আগ্রহ হারিয়েছিলাম,
কিন্তু এখন আমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ
অজানা ব্যাধির অভিযোগ জানাচ্ছে।
আমার হাত গাছের চেয়ে উঁচুতে
প্রসারিত,
আমার অ্যাক্রোমেগালি।
আর যখন আমি দৌড়াই
তা সব সময় পরিবর্তনশীল গতিতে হয়।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো
আমার সবচেয়ে কাছের পথচারীদের অতিক্রম
করা,
তাদের পেছনে ফেলে আসা,
যতক্ষণ না তারা আমাকে পেছনে ফেলে
যায়।
একজন তিউনিসিয়ান ডাক্তার
আমার বাবাকে বলেছিলেনÑ
‘এটা মানসিক অবস্থা।’
আমি তাকে পছন্দ করেছিলাম
আর তাকে আমার বাড়ি ভাবতাম
যতক্ষণ না তিনি সেই কথাটি বললেন,
যা অনেক ক্ষত সৃষ্টি করেছিল
আর বাড়িটি ধ্বংস করে দিয়েছিল।
আমি কয়েকটি লেখা পড়েছি
যেগুলোকে আমি বাড়ি ভেবেছিলাম
আর সেখানে কিছুদিন থেকেছিÑ
‘লিকুইড মিররস’
একটি উন্মাদ আশ্রয় ছিল
যেখানে আমি আমার প্রথম প্রেমকে ভুলে
গিয়েছিলাম।
সেখানে ম্যাগাজিনও ছিলÑ
আল-কারমাল, পোয়েটস, আকওয়াস।
তারপর আমি প্রকৌশল অধ্যয়ন করেছি,
ভূমিকম্পে বিশেষজ্ঞ হয়েছি
এমন বাড়ি তৈরি করতে
যার ভিত্তি জলবায়ু এবং অপ্রত্যাশিত
ঘটনাকে সহ্য করতে পারে।
আমার সন্তানরা আমার জন্য একটি পরিখা
খনন করেছে
আর বলেছেÑ
‘এখানে একটু বিশ্রাম নাও, মা।’
কিন্তু পরিখা ত্বকে চিহ্ন রেখে যায়,
যেন একটি মাঠের মতো,
আর পাখিরা এসে
আমার বীজ খেয়ে ফেলে
যখন মাঠ স্থির জলে ডুবে যায়।
একটি লেখায় আমি বাড়ি তৈরি করতে
পারিÑ
জানালা ও বারান্দাসহ,
যা গ্যালাক্সি ও তারার দিকে চেয়ে
থাকে,
আমজাদ নাসেরের লেখনীর রঙে রাঙিয়েÑ
যিনি বলেছিলেন,
কল্পনা ও জ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য করতে
হবে
একটি দৃঢ় বাড়ির জন্য,
যদিও তা মায়ার ওপর নির্মিত হয়।
আমি আমার বাড়িটি ঘোড়ার পিঠে তুলব
যারা এটিকে মাঠে নিয়ে যাবে,
সেখানে আমার পা বিশ্রাম নেবে।