শরীফ আহমেদ
প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০২৫ ১১:০৩ এএম
আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২৫ ১১:২১ এএম
ফাদার মারিনো রিগন তার অনুবাদ, নাগরিকত্ব, মুক্তিযোদ্ধার সম্মান সবই পেয়েছেন বাংলাদেশে। তিনি এ দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের দারিদ্র্য দূরীকরণ, শিক্ষার প্রসার, চিকিৎসাসেবা এবং দুস্থ নারীদের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এ ছাড়া তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, লালন শাহ ও কবি জসীমউদ্দীনের কবিতা ও গান ইতালীয় ভাষায় অনুবাদ করে বাংলা সাহিত্য বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিয়েছেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অসুস্থ ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা ও আশ্রয় দিয়ে তিনি যুদ্ধে অবদান রাখেন। তার অনন্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৯ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব প্রদান করে।
বাংলাদেশের বন্ধু ফাদার রিগনের জন্ম ১৯২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ইতালির ভেনিসের অদূরে ভিল্লাভেরলা গ্রামে। ১৯৫৩ সালে একজন মিশনারি হিসেবে বাংলাদেশে আসেন ফাদার রিগন। কিছুদিন যশোরে কাজ করার পর যান সুন্দরবন-ঘেঁষা জনপদ বাগেরহাটের মোংলায়। মোংলা তখন বিচ্ছিন্নপ্রায় এক জনপদ। লোকে বলত, সেখানে জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ বাস করে। পানিপথই যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। এমন এক পরিবেশে গিয়ে কাজ শুরু করেন মারিনো রিগন।
আমার ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল ফাদার মারিনো রিগনের সঙ্গে। ফাদার রিগন ছিলেন তখন আমার স্কুল সেন্ট পলস হাইস্কুলের পরিচালনা কমিটির সভাপতি। মিশনারি হাইস্কুল সেন্ট পলস-সংশ্লিষ্ট ছিলেন ফাদার মারিনো রিগন। ফাদার ছিলেন এ স্কুলের প্রথম প্রধান শিক্ষক (১৯৫৪-৫৭)। তিনি স্কুলেই বেশির ভাগ সময় কাটাতেন। মাঝে ফাদার কার্লো রুবিনি (১৯৭৬-৭৮) চলে যাওয়ার পর ওই সূত্রে ফাদার মারিনো রিগন আবারও স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে আসেন।
ফাদার রিগন দেশের দক্ষিণাঞ্চলে প্রতিষ্ঠা করেন ১৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া অগণিত দরিদ্র ছাত্রছাত্রীকে স্পন্সরশিপ প্রোগ্রামের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন পড়াশোনার সুযোগ করে দেন। মানবসেবা, সৃজনশীল কর্মকাণ্ড ও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে প্রদান করেছে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য তিনি বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে সম্মানিত হয়েছেন। পেয়েছেন বাংলাদেশ থেকে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’।
ফাদার মারিনো রিগন মোংলা এলাকার উন্নয়নে ও বাংলা ভাষার কাজের জন্য সুপরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। তিনি স্কুলসংলগ্ন বোর্ডিং হাউসে অথবা পাশের ভবনে থাকতেন। আমি তখন স্কুলের ছাত্র। স্কুল মাঠে ক্রিকেট খেলি আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে বেড়াই। একদিন বোর্ডিং হাউসে ফাদার মারিনো রিগনের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। আলাপচারিতার শেষে তার ‘বাংলাদেশ’ বইটা উপহার দেওয়ার আগে ফ্ল্যাপের নিচে মূল্য লেখা অংশটি কেটে ফেলেন। খাটের ওপর ঝুঁকে কাঁচি দিয়ে ক্যাচ করে কেটে ফেলার সে দৃশ্যটা আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে। অটোগ্রাফসহ লেখকের কাছ থেকে কোনো বই এই প্রথম হাতে পেলাম আমি। এ উপহার অমূল্য সম্পদের মতো মনে হয়েছিল। লাল কালি দিয়ে শিশুর মতো হস্তাক্ষরে তিনি লিখেছিলেন, ‘বাংলাদেশের প্রেমে/জড়িত বলে শরীফকে হাতে/দিলাম/ফাঃ রিগন/২৫.৮.৯২’। ‘বাংলাদেশের প্রেমে জড়িত বলে’ কথাটি তখন বুঝিনি। অনেক পরে তাকে বাংলাদেশপ্রেমী হিসেবে চিনেছি। তখন মনের মধ্যে একটা অস্বস্তি অনুভব করেছি। কেননা, তাকে যতটা কাছে পাওয়ার, শ্রদ্ধা করার সুযোগ ছিল তা গ্রহণ করতে পারিনি।
মোংলা থেকে ৪২ কিলোমিটার দূরে খুলনা শহরে একসময় যাতায়াতের একমাত্র উপায় ছিল লঞ্চ। সত্তর এবং আশির দশকের কিছু সময়ে এ যাতায়াতে ব্যয় হতো গড়ে ছয় ঘণ্টা। একদিন খুলনা যাচ্ছি। ঘাট থেকে লঞ্চ ছেড়ে যাওয়া এবং চলার মধ্যে একটা যাচ্ছি যাব যাচ্ছি যাব মতো ‘গজেন্দ্র গমন’ ভাব ছিল। মোংলা থেকে পরবর্তী ঘাট লাউডোব পৌঁছে কাদার মধ্যে সিঁড়ি ফেলে যাত্রী ওঠানামায় বহু সময় কেটে গেছে। লঞ্চের দোতলায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ দেখি ফাদার মারিনো রিগন। ফাদারকে প্রণাম জানাই। উনি একটু বিরক্ত ছিলেন। কিছু কথাবার্তার পর বললেন, ‘বাংলাদেশের একটা অমূল্য সম্পদ রয়েছে। তা বিক্রি করে দেশ ধনী হতে পারে।’
কী ফাদার?
‘সময়।’
লঞ্চটা তখন ‘বেগার’ দিয়ে প্রবল ভাটার উল্টোস্রোতে চলার চেষ্টা করছে। তীরে তাকিয়ে গাছপালার সরে যাওয়ার গতি অনুমান করে মনে হচ্ছিল পদব্রজে খুলনা যাচ্ছি।
সেন্ট পলস হাসপাতালের চিকিৎসকদের আবাসিক ভবন তৈরি হচ্ছিল ১৯৮৫ সালের দিকে। ঠেলাগাড়িতে শ্রমিকরা ইট নিয়ে আসতেন দূর থেকে। উঁচুনিচু পথের ধাক্কায় কিছু ইট পড়ে যেত। শ্রমিকরা তা ভ্রুক্ষেপ করতেন না। কিছুদিন পর ফাদার রিগন শ্রমিকদের ডেকে বললেন, ‘একটা ইটের দাম কত জানো?’ তারা কিছু বুঝে উঠতে পারছিলেন না। তারপর সবাইকে ডেকে নিয়ে গেলেন আস্ত ও ভাঙা ইটের একটি স্তূপের কাছে। পথে শ্রমিকদের ফেলে যাওয়া ইট বা ইটের টুকরো ফাদার একটা ঝুড়িতে করে কুড়িয়ে জড়ো করেছিলেন।
ফাদারের বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের জন্য প্রীতি নব্বইয়ের দশকে ব্যাপক পরিচিতি পায়। মোংলার আঞ্চলিক সব জাতীয় অনুষ্ঠানে তাকে প্রধান অতিথি করা হতে থাকে। একের পর এক তার অনুবাদ প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, লালন শাহ ও কবি জসীমউদ্দীনের বেশ কিছু কবিতা ও গান এ সময়ে অনুবাদ করেন ফাদার মারিনো রিগন। ইতালিয়ান ভাষায় তিনি অনুবাদ করেছেন রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলিসহ চল্লিশ কাব্য, জসীমউদ্দীনের নক্সী কাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট, নির্বাচিত কবিতা, লালনের তিনশ পঞ্চাশটি গান ছাড়াও বাংলাদেশের অসংখ্য কবিতা। তিনি ইতালীয় রূপকথা পিনোকিও অনুবাদ করেছেন বাংলা ভাষায়। এ ছাড়া ফাদার রিগন রচিত মুক্তিযুদ্ধের দিনলিপি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মূল্যবান ইতিহাস। ২০০৬ সালের ২৮ নভেম্বর ফাদার রিগন তার লেখা মুক্তিযুদ্ধের ডায়েরি, মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্র মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরকে দান করেন।
ফাদারদের বিরুদ্ধে একটা কথা প্রচলিত ছিল যে খ্রিস্টানদের তারা বেশি সুযোগ দিতেন। বিষয়টি হয়তো সত্যি কিন্তু একদিনের ঘটনা : ফাদার মারিনো রিগনের সঙ্গে একদিন তার ঘরে বসে কথা বলছিলাম। এমন সময় হলদিবুনিয়া গ্রামের এক খ্রিস্টান ব্যক্তি ফাদারের কাছে এসে তার ভাইয়ের জন্য কিছু সুবিধা দাবি করেন, যা অন্যায্য। ফাদার তা দিতে অস্বীকার করেন। একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি উচ্চবাচ্য করলে ফাদার উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং তাকে ঘর থেকে বের করে দেন। আমি কিছুটা অপ্রস্তুত হই। পরক্ষণেই ঠিক আগের মতো শান্ত, ধীরস্থিরভাবে আমার সঙ্গে আলাপে যুক্ত হন। সামাজিক, ধর্মীয়, প্রাতিষ্ঠানিক এবং ব্যক্তিগত কঠোর নিয়মনীতি পালনের মধ্যে একই স্থলে দুটি ভিন্ন পরিস্থিতিতে তার মানসিক স্থৈর্যের যে পরিচয় পেয়েছিলাম, মহাত্মা গান্ধীর চরিত্রে এ গুণের সবিশেষ উপস্থিতি ছিল বলে জেনেছি।
ফাদার মারিনো রিগনকে বাতাসের মতন মনে হয়। যার কোনো গুরুত্ব আছে, সহসা এমনটা অনুভূত হয় না। খুবই সাধারণ, সহজ। সাদাসিধে মানুষ। আমাদের স্কুলের রাস্তা ধরে তাকে কত হেঁটে যেতে দেখেছি! কখনও তাকে আলাদা কিছু মনে হয়নি। আলাদা করে কিছু মনে না হওয়াই তাকে সবার থেকে পৃথক করেছে। বাতাস থেকে অক্সিজেন বের করে নিলে মানুষের যে অবস্থা হবে, ফাদারের সমস্ত অবদান তুলে নিলে মোংলা এলাকারও ওই একই পরিণতি হবে। তাই তিনি আমাদের জন্য অনন্য জীবন এক।
ফাদার মারিনো রিগন বাগেরহাটের মোংলায় আসেন ১৯৫৩ সালে। তখন এ এলাকা ঠিক জনপদ ছিল না, ছিল জঙ্গল। এলাকাবাসী দুর্ধর্ষ ডাকাত হিসেবে খ্যাত ছিল এবং আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি করে সুন্দরবনে শিকারে প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছিল। সে সময় ফাদার মারিনো রিগন এবং তার মতো কয়েকজন মিশনারি কীভাবে মোংলা থানার মালগাজী গ্রাম পর্যন্ত যাতায়াত করেছেন, তা চিন্তা করাও কঠিন। মোংলা এলাকা ও সেন্ট পলস হাইস্কুলের উন্নয়নে ফাদার মারিনো রিগনসহ অন্যান্য ফাদারের অবদান বিশাল। তাদের এ ত্যাগ ও প্রচেষ্টা এ এলাকায় আজও স্মরণীয়।