ভূমিকা ও সংগ্রহ : দিলারা হাফিজ
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২৫ ১৪:২৬ পিএম
আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৫ ১৪:২৪ পিএম
রফিক আজাদ (১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৪১ - ১২ মার্চ ২০১৬ ) প্রতিকৃতি : বিপ্লব সরকার
কবিতা প্রকাশ সূত্রেই একদা কবি রফিক আজাদের সঙ্গে বাংলা একাডেমিতে আমার প্রথম পরিচয় ও প্রীতির সম্পর্ক। এরপর একজন অগ্রজ কবির অসামান্য ও অনন্য এক কাব্য-প্রতিভার প্রতি বিস্ময় জন্মানো অনুভব থেকে প্রেম-ভালোবাসা-পরিণয়-পরিণতি।
তাঁর একান্ত ব্যক্তিজীবনেরÑ এক চরম দুর্বিষহ সময়ে আমাদের পরিচয়। বলা বাহুল্য, জীবনের প্রতি পজিটিভ ধারণা ফিরিয়ে দিতেই নিজেকে উৎসর্গ করেছিলাম তাঁর কবিতার প্রণয়-বেদিমূলে। তাঁর অতৃপ্ত প্রণয়াকাঙ্ক্ষার যে আকুতি তিনি জীবদ্দশায় চিঠিপত্রে প্রকাশ করেছেন আমাকে; সেখান থেকে তিনটি চিঠি প্রিয় সম্পাদকের অনুরোধে পাঠালাম

২/৩/৮২
রাত
আমার কোমল,
তোমার চিঠির কোনো উত্তর হয় না। তুমি আমাকে শুধু ঋণী ক’রে যাচ্ছো, প্রতিনিয়ত। বাকি জীবন যদি কবিতা লিখি তো তা’তে শুধুই তুমি ছায়াপাত করবে। তোমাকে কী ক’রে ভুলবো বলো! তুমি এতোটাই সর্বব্যপ্ত যে, আমার সত্তায় তুমি ছাড়া নেই। শয়নে-স্বপনে, জাগরণে, চেতনে-অবচেতনে শুধুই তুমি, তুমি। তোমার নিজের সম্পর্কে কি ধারণা আমি জানি না Ñ তবে আমার বাস্তবে ও স্বপ্নে এখন ‘তুমি’ এতোটা জায়গা জুড়ে রয়েছো যে, তোমাকে ছাড়া কোনো চিন্তা সম্ভব নয়। এই নগণ্য কবির জীবনে তোমাকে আরো একটু আগে পেলে জীবন অন্যরকম হতো, আমার অগ্রযাত্রা বিশ্বব্যাপী হতো Ñ কেউ আমাকে রুখতে পারতো না। আমি এখন সৃষ্টিশীলতার দিক থেকেও হতাশার এক কিনারায় এসে পৌঁছেছি যে, এখান থেকে নতুন যাত্রা আর সম্ভব হবে কি না জানি না। সৃষ্টিশীলতার দিক থেকে আর ভরসা পাই না। আমি নিঃশোষিত হয়ে গেছি দিলা। মানসিক ও শারীরিক উভয় দিক থেকেই আমাকে তুমি কীভাবে উদ্ধার করবে আমি ভেবে পাই না। কেন তুমি আমার জীবনে আরো আগে এলে না, দিলা? সব ধরনের ‘অবসাদ’ আমাকে আঁকড়ে ধরেছে। আমার কোনো উদ্যম নেই, উৎসাহ নেই। সৃষ্টিশীলতার দিক থেকে আমি ক্রমশই পিছিয়ে যাচ্ছি। লিখতে আমার ইচ্ছে করে না। আঙুল অবশ হয়ে যায়। কোনো দৈহিক ও মানসিক রোগের আকর অলিন্দ আমি। আমি তোমার যোগ্য নই। একজন দৃঢ় দারুণ টগবগে তরুণই তোমার কাঙ্ক্ষিত হওয়া উচিত। যে তোমাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে যৌবন উপহার দিতে পারবে। তোমার কোমল নমনীয়তা একজন সত্যিকারের যুবকের প্রাপ্য। আমার মতো একজন মধ্যবয়স্ক ভাঙাচোরা, অবক্ষয়োন্মুখ অক্ষম মানুষের জন্য তুমি জন্মাওনি। আমার মধ্যে তুমি কি দেখেছো, কোমল? পরিণয়ে হতাশ হবে। সেটি কি আমার বা তোমার জন্য খুব আনন্দদায়ক হবে? Ñ কোমল, তুমি আমার আকাঙ্ক্ষার ও স্বপ্নের জগতের মানুষ হিশেবেই থেকে যাওনা। আমার এই ব্যর্থ কিমাকার জীবনের সঙ্গে কেউ জীবন মেলাতে চাইতে পারে? Ñ এই বোকামি তুমি কেন করলে, কোমল? আমার ব্যর্থতা তো সর্বজনবিদিত। জীবনে দুঃখ সয়েছি, সয়েই হয়তো যাইতাম। সেটি আমার জন্য যথেষ্ট হ’তো। মানে নিরুপায়।
৩/৩/৮২
যাকগে। উপরের অংশ কাল গভীর রাতে লেখা। তোমাকে পৌঁছে দিয়ে দর্জির কাছে যাই শার্টটির জন্য। দর্জি সাহেবও একজন কবি। তিনি শার্টটা কাটেনই নি। আজ দিতে চেয়েছে। ওখান থেকে গাজী ভাইকে পেয়ে যাই। সেখানে ব’সে তোমার চিঠি পড়ি। অতো তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করছিলো না। একটা আচ্ছন্নতার মধ্যে ছিলাম তো। অতো দ্রুত স্বর্গচ্যুতি চাইনি বলে বাড়ি যাইনি। গাজী ভাইর ওখান থেকেই টেলিফোনে খোঁজ নিই আমার সেই ধনকুবের বন্ধু সিঙ্গাপুর থেকে ফিরেছে কি না। ফিরেছে এবং সেই টেলিফোন ধরেছিল। বললো সে, অনেক দিন যাই না, ভুলে গিয়েছি কি না ইত্যাদি। অগত্যা ওর ওখানে যাই এবং VCR-এ ‘রিস্তা প্যেয়ার কী’ ছবি দেখি Ñ জীতেন্দ্র-রেখা-শাবানা আজমী অভিনীত ত্রিকোণ প্রেমের নিটোল ছবি। ভালোই লাগলো। রেখার মুখের একটা বিশেষ দিকের সঙ্গে তোমার মিল খুঁজে পেলাম। প্রেমের ও ত্যাগের ছবি Ñ বারবার তোমাকে মনে পড়ছিলো।
হ্যাঁ, তুমি সাধারণ তো নওই। ভয়ের হ’লো এইজন্যে যে, তুমি কি শেষ পর্যন্ত আমার থাকবে! ভয় হয়। আজ লিখতে পারছি না। অফিসে ব’সে চিঠি লেখা সম্ভব নয়। আদর নিও।
তোমার ‘জীবন’

আমার কোমল বউ,
আজো এক অস্থিরতার মধ্যে তোমাকে লিখছি। এই চিঠি ছিলো আমার প্রতিশ্রুত। জানি তুমি আজকের এলোমেলোমি ক্ষমা করতে না। তবু সত্য বলছি, কেননা তোমাকে জীবনে মিথ্যে বলবো না সত্য গোপন করবো না এই কথা দিয়েছি। কথা আমি রাখি। আজো আমি এদিক-ওদিক ক’রে ফেলছি। কোনো অজুহাতে নয়। তুমি কোনো আঘাত দাওনি। বাড়িতেও তেমন কোনো কারণ ঘটেনি। দুপুরে মিলন এসেছিল Ñ ওকে দেখেই কেন যেন মনে হলো এখনি বেরিয়ে যাই বাড়ি থেকে Ñ এবং কোথাও ব’সে পান করি। সত্যি বলছি, কোনো কারণ নেই, নেহাৎ-ই অকারণে, অভ্যাবশত, আমি মিলনকে নিয়ে বেরিয়ে যাই Ñ আমার কাছে টাকা ছিলো না, ওর কাছেও নেই Ñ অপর এক ছেলে আশরাফ আহমেদ Ñ কবিতা লেখে Ñ তার কাছ থেকে ২০০ টাকা ধার করে একটি বোতল কিনে শোয়েব সিদ্দিকী ব’লে মিলনের এক বন্ধুর বাড়িতে ব’সে পান করি Ñ পরে আরো পান করা দরকার ব’লে সন্ধ্যেয় অপর এক বন্ধু মি. রায়ের বাড়ি যাই Ñ তার স্ত্রী বাড়ি নেই Ñ তিনি দুটো বোতল কিনে আনেন Ñ ও দুটো আমরা তিনজনে খাই Ñ এই ক’রে সাড়ে ১১টা বাজে। কোমল বউ তোমার আদেশ অমান্য করেছি Ñ আমাকে শাস্তি দাও। শাস্তি দাও Ñ কিন্তু আমি তো অকপটে অপরাধ স্বীকার করলাম। সত্য তো গোপন করিনি। লোভ বা ঝোঁক সামলাতে না পেরে পান ক’রে ফেলেছি। নিজেকে সংযত করতে পারিনি। শাস্তি দাও। কোমল, আমি বোধ হয় এরকমই। আমাকে তুমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না হয়তো। কী করবো, হ’য়ে যায় Ñ আমি নিজেকে Control করতে পারি না। কোমল, তোমাকে মানিনি, তোমার প্রেমকে অবমাননা করেছি। তুমি আমাকে অতঃপর কীভাবে নেবে? Ñ আমি পারিনি Ñ কথা রাখিতে পারিনি।
বউ, তোমার চিঠির কোনো উত্তর হয় না Ñ এই চিঠি এতোটাই পবিত্র যে, ওর প্রতিটি ছত্র থেকে পবিত্র আলোর ছটা বেরিয়ে আসে। আমি ধন্য তোমার ভালোবাসা পেয়ে, আমার চেয়ে ভাগ্যবান পুরুষ এ দেশে জন্মায়নি।
কোমল বউ, তুমি আমার জন্ম-জন্মান্তরের আরাধ্য নারী, তোমাকে আমি কি যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে পারবো? নিজেকে তোমার কাছে অনেক ছোট মনে হয়। তোমার ত্যাগ-স্পৃহা, তোমার মহত্ত্বের কাছে নিজেকে খুব ছোট মনে হয় Ñ তোমার তুলনা তুমি।
তোমাকে স্তুতি করা আমার উদ্দেশ্য নয়। তুমি আমার জীবনসর্বস্ব Ñ রবীন্দ্রনাথের অনুসরণে ‘জীবনদেবতা’ বলতে পারতাম Ñ বললে অত্যুক্তি হতো না Ñ তবে খুব অনাধুনিক শোনাতো তাই বললাম না।
হ্যাঁ, আর কাগজে-কলমে নয় Ñ এবার, আমিও চাই, সরাসরি দেহ থেকে দেহে, হৃদয় থেকে হৃদয়ে সত্যায়িত হোক আমাদের দুঃখ বেদনা, আনন্দ-উল্লাস। আমিও তাই চাই। তুমি মন খারাপ কোরো না কোমল, সবকিছু ঠিকঠাক চলবে, আছে। আমি কেবল তোমারইÑ
তোমারই ‘জীবন’
২৭/৬/৮২